রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৫): নির্মাণকাজ অপসারণের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ
রাজধানী ঢাকা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদিত নকশা (Approved Plan) থেকে বিচ্যুতি বা অনুমোদনহীন নির্মাণের অভিযোগে রাজউক প্রায়শই ভবন বা এর অংশবিশেষ ভেঙে ফেলার নোটিশ প্রদান করে। তবে, রাজউকের এই ক্ষমতা নিরঙ্কুশ বা স্বেচ্ছাচারী নয়। Section 3B-এর ৭টি উপ-ধারার ভেতরেই নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি রক্ষাকবচ (Safeguards) দেওয়া আছে। সাধারণ মানুষের একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, রাজউকের ভবন ভাঙার এই ক্ষমতা নিরঙ্কুশ এবং এর বিরুদ্ধে কিছু করার নেই। কিন্তু আইনের Section 3B এর উপধারা (১) থেকে (৭) পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি ভবন ভাঙার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়ার আগে রাজউক বা অথরাইজড অফিসারকে বেশ কিছু কঠোর আইনি ও পদ্ধতিগত ধাপ (Procedural Steps) অনুসরণ করতে হয়। এই ধাপগুলোর সামান্যতম লঙ্ঘন ঘটলে, বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে উচ্ছেদ বা ভাঙার নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ (Stay Order) বা রুল (Rule Nisi) পাওয়া সম্ভব।
নিম্নে আইনের সুনির্দিষ্ট ধারাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ, রিটের গ্রাউন্ড, বাস্তব উদাহরণ ও বিচারিক নজির নিয়ে একটি বিস্তারিত কলাম উপস্থাপন করা হলো:
নির্মাণকাজ ইত্যাদি অপসারণের নির্দেশের পূর্বে নোটিশ:
Authorised Officer বা রাজউক কমিটি কোন নির্মাণকাজ অপসারণ করার নির্দেশ দেওয়ার পূর্বে, অথবা কোন ইমারত বা এর কোনো অংশ ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার পূর্বে, অথবা খননকৃত পুকুর বা জলাশয়ের এর কোনো অংশ ভরাট করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পূর্বে কারণ দর্শানোর নোটিশ ইস্যু করার আইনগত আবশ্যকতা রয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশ ও নোটিশের বিষয়বস্তুর বাধ্যবাধকতা:
3B(1)(b) ধারা মোতাবেক কারণ দর্শানোর নোটিশ দিবেন, নোটিশে কমপক্ষে সাত দিনের সময় উল্লেখ করবেন, এবং 3B(1)(b)(i)(ii)(iii) অনুযায়ী বিষয়গুলো সংক্রান্তে কারণ দর্শানোর কথা নোটিশে উল্লেখ থাকতে হবে। নোটিশে 3B(1)(b)(i) মতে ইমারত বা এর কোনো অংশ, তা নির্মিত হোক বা নির্মাণাধীন হোক, যা নোটিশে নির্দিষ্ট করা থাকবে, তা কেন অপসারণ বা ভেঙে ফেলা হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর কথা উল্লেখ করতে হবে; অথবা 3B(1)(b)(ii) মতে নোটিশে নির্দিষ্টকৃত পুকুর বা এর কোনো অংশ, তা খননকৃত হোক বা খননাধীন হোক, কেন তা ভরাট করা হবে নামর্মে কারণ দর্শানোর কথা উল্লেখ করতে হবে; অথবা 3B(1)(b)(iii) মতে নোটিশে ইমারতের অধিকতর নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, পরিবর্ধন বা পরিবর্তন, পুকুরের অধিকতর খনন বা পুনঃখনন কেন বন্ধ করা হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর কথা উল্লেখ করতে হবে। রাজউক এই প্রক্রিয়া বা প্রক্রিয়ার কোন স্তর লঙ্ঘন করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
ন্যূনতম ৭ দিনের নোটিশ না দেওয়া:
আইনি বিধান অনুযায়ী, কোনো ইমারত যদি অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদিত নকশার শর্ত ভঙ্গ করে নির্মিত হয়, তবে অথরাইজড অফিসার সংশ্লিষ্ট মালিক বা দখলদারকে কারণ দর্শানোর (Show Cause) নোটিশ দেবেন। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, এই নোটিশের সময়সীমা হবে "not being less than seven days" (৭ দিনের কম নয়)।
রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি নোটিশে ৭ দিনের কম সময় দেয় (যেমন- ২৪, ৪৮ বা ৭২ ঘণ্টা), তবে তা Section 3B(1) এর সরাসরি লঙ্ঘন। এটি রিট করার একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী গ্রাউন্ড।
বাস্তব উদাহরণ: বনানীতে একজন মালিককে বৃহস্পতিবার নোটিশ দিয়ে বলা হলো রোববারের মধ্যে নিজ দায়িত্বে নকশা-বহির্ভূত অংশ ভেঙে ফেলতে। এখানে ৭ দিনের আইনি সময়সীমা মানা হয়নি বিধায় এই নোটিশটি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ পাওয়া সম্ভব।
শুনানীর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ (reasonable opportunity of being heard) এর বাধ্যবাধকতা:
3B(1)(b)(i)(ii)(iii) অনুযায়ী দর্শানো কারণ বিবেচনায় নিতে হবে, এবং 3B(3) মোতাবেক কারণ দর্শানো ব্যক্তিকে শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ প্রদান করতে হবে (reasonable opportunity of being heard)। রাজউক এই শুনানীর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ না দিলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া এবং কারণ উল্লেখ না করা:
আইনি বিধান অনুযায়ী, মালিক যদি কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দেন, তবে অথরাইজড অফিসারকে অবশ্যই জবাবটি বিবেচনা করতে হবে (considering the cause shown)। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে "শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ" (reasonable opportunity of being heard) দিতে হবে। নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রে লিখিতভাবে কারণ উল্লেখ করতে হবে (by an order in writing stating reasons therefore)।
রিটের গ্রাউন্ড: নোটিশের জবাব দেওয়ার পরও যদি রাজউক কোনো শুনানি না করে এবং জবাবটি কেন গ্রহণযোগ্য নয় তার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করে (Non-speaking Order) গৎবাঁধা নির্দেশে ভবন ভাঙতে আসে, তবে তা Section 3B(3) এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের 'Audi Alteram Partem' (অপর পক্ষকে শোনো) নীতির চরম লঙ্ঘন। সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য নজির রয়েছে যে, 'Speaking Order' ছাড়া কোনো উচ্ছেদ বা অপসারণ নির্দেশ টিকতে পারে না।
অনুসন্ধান (enquiry) বাধ্যবাধকতা:
নোটিশে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে কোনো কারণ দর্শানো না হলে, Authorised Officer বা কমিটি আইনানুগভাবে অনুসন্ধান (enquiry) করবেন। অনুসন্ধান (enquiry) করে দেখবেন যে, ধারা ৩-এর অধীন অনুমোদন না নিয়ে নির্মাণ, পুন:নির্মাণ, সংযোজন, পরিবর্তন, খনন বা পুন:খনন করা হয়েছে বা হচ্ছে কি-না, অথবা উক্ত ধারার অধীন প্রদত্ত অনুমোদনের কোনো শর্ত ভঙ্গ করে ইমারত নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে বা হচ্ছে কি-না, অথবা ইমারতের পরিবর্ধন বা পরিবর্তন করা হয়েছে বা হচ্ছে কি-না, অথবা পুকুর খনন বা পুনঃখনন করা হয়েছে বা হচ্ছে কি-না। রাজউক আইনানুগভাবে অনুসন্ধান (enquiry) না করলে বা এই প্রক্রিয়া অনুসরণ রা করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
লিখিত আদেশে কারণ উল্লেখপূর্বক সুনির্দিষ্ট নির্মাণ, পুন:নির্মাণ, সংযোজন, পরিবর্তন, খনন বা পুন:খনন বন্ধ/অপসারণ/ভেঙ্গে ফেলা/ভরাট করার নির্দেশের বাধ্যবাধকতা (speaking order):
যদি Authorised Officer বা কমিটি অনুসন্ধান (enquiry) করে দেখতে পান যে, ধারা-৩ এর অধীন অনুমোদন না নিয়ে নির্মাণ, পুন:নির্মাণ, সংযোজন, পরিবর্তন, খনন বা পুন:খনন করা হয়েছে বা হচ্ছে, অথবা উক্ত ধারার অধীন প্রদত্ত অনুমোদনের কোনো শর্ত ভঙ্গ করে ইমারত নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে বা হচ্ছে, অথবা ইমারতের পরিবর্ধন বা পরিবর্তন করা হয়েছে বা হচ্ছে, অথবা পুকুর খনন বা পুনঃখনন করা হয়েছে বা হচ্ছে, তাহলে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখপূর্বক নির্মাণ, পুন:নির্মাণ, সংযোজন, পরিবর্তন, খনন বা পুন:খনন বন্ধ, অপসারণ, ভেঙ্গে ফেলা, বা ভরাট করার জন্য লিখিত আদেশ প্রদান করতে হবে এবং লিখিত আদেশটি speaking order হতে হবে। Authorised Officer বা কমিটি কারণ উল্লেখপূর্বক লিখিত আদেশ দ্বারা, ইমারত বা পুকুরের মালিক, দখলদার এবং দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে আদেশে উল্লেখিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইমারত বা এর কোনো অংশ অপসারণ বা ভেঙে ফেলার, অথবা পুকুর বা এর কোনো অংশ ভরাট করার নির্দেশ দিতে পারেন, অথবা ক্ষেত্রমত অধিকতর নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, পরিবর্ধন বা পরিবর্তন অথবা খনন বা পুনঃখনন বন্ধ করার নির্দেশ দিবেন; এবং অন্যথায় (তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে) নোটিশটি প্রত্যাহার করে একটি আদেশ প্রদান করবেন। রাজউক এই প্রক্রিয়া বা প্রক্রিয়ার কোন স্তর লঙ্ঘন করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
১৫ দিনের মধ্যে আদেশ প্রদানে বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন:
3B(4) মোতাবেক যেখানে রাজউক কর্তৃক শোকজ নোটিশে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে কারণ দর্শানো হয়েছে এবং যেখানে উপ-ধারা (2) এর অধীন কোনো ইমারতের অধিকতর নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, পরিবর্ধন বা পরিবর্তন, অথবা কোনো পুকুরের খনন বা পুনঃখনন বন্ধ রাখা হয়েছে, সেক্ষেত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ক্ষেত্রমত কমিটি কারণ দর্শানোর তারিখ হতে পনেরো (১৫) দিনের মধ্যে উপ-ধারা (৩)-এর অধীন তার বা তাদের আদেশ প্রদান করবেন। রাজউক যদি এই ১৫ দিনের মধ্যে আদেশ প্রদানে বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ (১৫ দিনের আইনি বাধ্যবাধকতার চরম অবহেলা):
বেগম 'সালমা' রাজউকের কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়ে যথাসময়ে উপযুক্ত প্রমাণাদিসহ জবাব দাখিল করলেন এবং Sub-section (2) অনুযায়ী কাজ বন্ধ রাখলেন। রাজউক কোনো শুনানি না করে বা সিদ্ধান্ত না জানিয়ে ৩ মাস পর মোবাইল কোর্ট নিয়ে তার ভবনের একাংশ ভাঙতে এলো।
আইনি প্রতিকার: এই অভিযান সরাসরি চ্যালেঞ্জযোগ্য। Section 3B(4) অনুযায়ী রাজউকের ১৫ দিনের মধ্যে আদেশ দেওয়ার কথা ছিল। রাজউক নিজেদের পদ্ধতিগত আইনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে নাগরিকের সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত না দেওয়া এবং হয়রানি:
আইনি বিধান 3B(4) অনুযায়ী নোটিশ পাওয়ার পর মালিককে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হয়। এরপর Section 3B(4) এ বলা হয়েছে, মালিক যদি নির্ধারিত সময়ে জবাব দাখিল করেন, তবে অথরাইজড অফিসারকে জবাব পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে Section 3B(3) এর অধীনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (Order) প্রদান করতে হবে।
রিটের গ্রাউন্ড: অনেক সময় রাজউক কাজ বন্ধের নোটিশ দেয়, মালিক জবাবও দাখিল করেন, কিন্তু রাজউক মাসের পর মাস কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না। ফলে মালিকের নির্মাণকাজ বেআইনিভাবে আটকে থাকে এবং তিনি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। আইনে নির্ধারিত ১৫ দিনের সময়সীমা পার হয়ে গেলে রাজউকের এই নিষ্ক্রিয়তাকে (Inaction) চ্যালেঞ্জ করে 'Writ of Mandamus' দায়ের করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চাওয়া যেতে পারে।
যেক্ষেত্রে ইমারত অপসারণ/ভেঙে ফেলার বা খনন ভরাট করার নির্দেশ দেয়া যাবে না:
মাস্টার প্ল্যান বা উন্নয়ন প্ল্যানের পরিপন্থী না হলে;
3B(5)(a): ইমারত বা এর অংশবিশেষ এমন স্থানে বা এমনভাবে নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, অথবা উক্ত পুকুর বা এর অংশবিশেষ এমন স্থানে বা এমনভাবে খনন বা পুনঃখনন করা হয়েছে যা ইমারত বা পুকুরটি অবস্থিত এলাকার মাস্টার প্ল্যান বা উন্নয়ন পরিকল্পনার পরিপন্থী বা অসামঞ্জস্য না হলে। যদি ইমারতটি মাস্টার প্ল্যান বা উন্নয়ন প্ল্যানের পরিপন্থী না হলেও উক্ত ইমারত অপসারণ/ভেঙে ফেলার বা খনন ভরাট করার নির্দেশ প্রদান করা হয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
অনুমোদিত নকশা বা প্ল্যানের পরিপন্থী না হলে;
3B(5)(b): অনুমোদিত নকশা বা প্ল্যানে উল্লেখিত শর্তাবলি ভঙ্গ করে কোন ইমারত বা এর অংশবিশেষ পুনর্নির্মাণ বা পরিবর্তন করা না হলে, অথবা উক্ত পুকুর বা এর অংশবিশেষ পুনঃখনন করা না হলে। যদি ইমারতটি অনুমোদিত নকশা বা প্ল্যানের পরিপন্থী না হলেও উক্ত ইমারত অপসারণ/ভেঙে ফেলার বা খনন ভরাট করার নির্দেশ প্রদান করা হয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
অযাচিত অসুবিধার সৃষ্টি না করলে:
3B(5)(c): ইমারত বা এর অংশবিশেষ অথবা উক্ত পুকুর বা এর অংশবিশেষ তার সংলগ্ন এলাকার কোনো জমি, ইমারত, রাস্তা বা চলাচলের পথের ব্যবহার বা দখলের ক্ষেত্রে কোনো অযাচিত অসুবিধার সৃষ্টি না করলে। যদি ইমারতটি অযাচিত অসুবিধার সৃষ্টি না করলেও উক্ত ইমারত অপসারণ/ভেঙে ফেলার বা খনন ভরাট করার নির্দেশ প্রদান করা হয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত হলে:
3B(5)(d)(i): Authorised Officer বা কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত জরিমানা (৫,০০০-৫০,০০০ টাকা) প্রদানের সাপেক্ষে অনুমোদিত হলে;
3B(5)(d)(ii): Authorised Officer বা কমিটি কর্তৃক নির্দেশিত সময়সীমার মধ্যে ইমারতের প্রয়োজনীয় পরিবর্ধন বা পরিবর্তন সাধন করেন, অথবা পুকুরের খনন বা ভরাট কাজ সম্পন্ন করলে;
3B(5)(d)(iii): নির্ধারিত ফিসের দশ গুণ (১০ গুণ) ফি প্রদান করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ করলে:
যদি ইমারতটি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত হওয়ার পরও উক্ত ইমারত অপসারণ/ভেঙে ফেলার বা খনন ভরাট করার নির্দেশ প্রদান করা হয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
উচ্ছেদই 'শেষ বিকল্প': বৈধকরণের সুযোগ না দেওয়া:
আইনি বিধান 3B(5) ভবন মালিকদের জন্য সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। এতে বলা হয়েছে, কোনো ভবন ভাঙার নির্দেশ দেওয়া যাবে না (No order under this section shall be made directing any person to remove or dismantle...) যদি না বিচ্যুতিটি মাস্টার প্ল্যানের পরিপন্থী হয়, বা তা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো Section 3B(5) এর Proviso (শর্তাংশ)। আইন বলছে, রাজউক ভাঙার নির্দেশ দেওয়ার আগে মালিককে ৩টি সুযোগ/শর্ত দেবে: (i) ৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা জরিমানা প্রদান, (ii) রাজউকের নির্দেশমতো প্রয়োজনীয় সংশোধন করা, এবং (iii) নির্ধারিত ফির ১০ গুণ ফি দিয়ে অনুমোদন নেওয়া (Regularization)।
Section 3B(6) অনুযায়ী, ব্যক্তি যদি উপধারা ৫ এর শর্তগুলো (জরিমানা ও ফি) পূরণে ব্যর্থ হন, কেবল তখনই ভবন অপসারণ বা ভাঙার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া যাবে।
রিটের গ্রাউন্ড ও বিচারিক নজির: এটি রিট করার সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রাউন্ড। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নজির (যেমন- ব্র্যাক বনাম রাজউক বা সমজাতীয় মামলা) থেকে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, উচ্ছেদ বা ডিমোলিশন হলো 'Last Resort' (শেষ বিকল্প)। রাজউক প্রায়শই Section 3B(5) এর এই "জরিমানা ও বৈধকরণ" এর সুযোগ সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি ভবন ভাঙার নির্দেশ দেয়। যদি বিচ্যুতিটি মাস্টার প্ল্যানের (যেমন- ড্যাপ) সরাসরি পরিপন্থী না হয় এবং রাস্তা দখল করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে (minor deviation), তবে জরিমানা ও ফি আদায়ের মাধ্যমে তা বৈধ হওয়ার সুযোগ না দিয়ে ভাঙতে আসা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা হাইকোর্টে রিট করে বাতিলযোগ্য।
বাস্তব উদাহরণ (জরিমানার সুযোগ থেকে বঞ্চনা):
জনাব 'আহমেদ' ৫ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ছাদের কার্নিশ ও পেছনের সেটব্যাকে (Setback) সামান্য ১ ফুট ব্যত্যয় করেছেন। এটি মাস্টার প্ল্যানের কোনো মৌলিক লঙ্ঘন নয়। রাজউক তাকে নোটিশ দিল এবং জবাব পাওয়ার পর সরাসরি Sub-section (6) অনুযায়ী উচ্ছেদের নোটিশ দিল।
আইনি প্রতিকার: তিনি রিট করে উচ্ছেদ স্থগিত করতে পারবেন। তার শক্তিশালী গ্রাউন্ড হলো—যেহেতু তার ব্যত্যয়টি মাস্টার প্ল্যানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এবং প্রতিবেশীর ক্ষতি করছে না, তাই Section 3B(5) অনুযায়ী রাজউক তাকে জরিমানা প্রদান করে নকশা সংশোধনের সুযোগ দিতে বাধ্য ছিল। সরাসরি উচ্ছেদ ক্ষমতার অপব্যবহার।
যখন অপসারণ/ভেঙ্গে ফেলা/ভরাট করার জন্য লিখিত আদেশ দানে ব্যর্থতা:
3B(6): যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (৫) এ উল্লেখিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা প্রদান করতে, অথবা পরিবর্ধন বা পরিবর্তন বা খনন বা ভরাটের কাজ করতে, অথবা অনুমোদন গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন, তবে Authorised Officer বা কমিটি লিখিত আদেশ দ্বারা ইমারত বা পুকুরের মালিক, দখলদার বা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইমারত বা এর কোনো অংশ অপসারণ বা ভেঙে ফেলার অথবা পুকুর বা এর কোনো অংশ ভরাট করার নির্দেশ দিতে পারেন। যেক্ষেত্রে ইমারত অপসারণ করা, বা ভেঙ্গে ফেলা, বা ভরাট করার জন্য লিখিত আদেশ প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা লঙ্ঘন করে মৌখিক বা নিয়ম বহির্ভূতভাবে আদেশ প্রদান করা হয়, সেক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
নোটিশ বা আদেশ নির্ধারিত পদ্ধতিতে জারী না করলে:
3B(7): কোনো নোটিশ বা আদেশ নির্ধারিত পদ্ধতিতে জারি করতে হবে। নির্ধারিত পদ্ধতিতে বা আইনি পন্থায় নোটিশ বা আদেশ জারী না করলে তা abuse of the process হয়, সেক্ষেত্রে এই abuse of the process কে চ্যালেঞ্জ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
যথাযথ পদ্ধতিতে নোটিশ জারি না করা:
আইনি বিধান: Section 3B(7) অনুযায়ী, এই ধারার নোটিশ বা আদেশ "নির্ধারিত পদ্ধতিতে" (prescribed manner) জারি করতে হবে। সাধারণত এর মানে হলো মালিক বা দখলদারের হাতে পৌঁছানো বা রেজিস্টার্ড ডাকযোগে পাঠানো।
রিটের গ্রাউন্ড: রাজউকের কর্মকর্তারা অনেক সময় কাউকে না পেয়ে ভবনের দেয়ালে নোটিশ সেঁটে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। যদি প্রমাণ করা যায় যে মালিককে ব্যক্তিগতভাবে বা ডাকযোগে নোটিশ পাঠানোর কোনো চেষ্টাই করা হয়নি, তবে "Improper service of notice"-এর গ্রাউন্ডে পুরো উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি বেআইনি ঘোষণা করা যেতে পারে।
উপসংহার ও করণীয়:
The Building Construction Act, 1952 এর Section 3B রাজউককে ইমারত ভাঙার ক্ষমতা যেমন দিয়েছে, তেমনি নাগরিককে কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বাঁচানোর জন্য ৩বি(১)-এ ৭ দিনের সময়, ৩বি(৩)-এ শুনানির অধিকার এবং ৩বি(৫)-এ জরিমানার মাধ্যমে বৈধকরণের অধিকারও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। অতএব, রাজউকের অপসারণ নোটিশ পেলে ভয় না পেয়ে দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:
১. নোটিশে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে (যা ৭ দিনের কম হতে পারবে না) আইনজীবীর মাধ্যমে দালিলিক প্রমাণসহ একটি শক্ত 'Show Cause Reply' দাখিল করা।
২. জবাবে Section 3B(5) এর বিধান উল্লেখ করে ১০ গুণ ফি ও জরিমানার বিনিময়ে বিচ্যুতিটুকু নিয়মিত (Regularize) করার আবেদন করা।
৩. রাজউক যদি এই জবাব ও বৈধকরণের আবেদন বিবেচনা না করে, শুনানি না দিয়ে বা যুক্তিসঙ্গত কারণ উল্লেখ ছাড়াই (Without a Speaking Order) উচ্ছেদ করতে আসে, তবে কালক্ষেপণ না করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা। মনে রাখতে হবে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে মহামান্য হাইকোর্ট সর্বদা নাগরিকদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেন।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com