বাণিজ্যিক আদালতে ব্যবসায়িকদের অধিকার (পর্ব- ২৮): “সালিস আইন এর অধীন সালিস চুক্তি, সালিস, সালিসি কার্যধারা ও রোয়েদাদ” সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ ও প্রতিকার
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। আধুনিক বাণিজ্যে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পক্ষগণ প্রায়শই 'সালিস' (Arbitration) বা মধ্যস্থতার পথ বেছে নেন। তবে সালিসি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে আদালতের হস্তক্ষেপ বা আইনি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এই আইনের ধারা ২(ঘ)(২২)-এ "সালিস আইন এর অধীন সালিস চুক্তি, সালিস, সালিসি কার্যধারা ও রোয়েদাদ" (Arbitration agreements, arbitration, arbitral proceedings and awards)-কে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
এটি মূলত সালিসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালতের তত্ত্বাবধানকারী ক্ষমতা (Supervisory Jurisdiction) এবং সালিসি রোয়েদাদ (Award) কার্যকর বা বাতিলের প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত।
বাস্তব উদাহরণ:
ধরা যাক, "এপেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড" এবং একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান "গ্লোবাল ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন"-এর মধ্যে ঢাকার একটি মেগা-প্রকল্প নির্মাণের জন্য ২০০ কোটি টাকার একটি যৌথ উদ্যোগ চুক্তি (Joint Venture Agreement - ধারা ২(ঘ)(১০)) স্বাক্ষরিত হয় । চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, যেকোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তা ঢাকায় সালিস আইন, ২০০১-এর অধীনে মীমাংসা করা হবে। কিন্তু নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায়, এপেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার সালিসে না গিয়ে সরাসরি ঢাকার বাণিজ্যিক আদালত-১ এ গ্লোবাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি মামলা দায়ের করে।
যেহেতু এটি ৫০ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের একটি বাণিজ্যিক বিরোধ, তাই মামলাটি বাণিজ্যিক আদালতে গৃহীত হয় । কিন্তু প্রথম শুনানিতেই গ্লোবাল ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন ধারা ২(ঘ)(২২)-এর অধীনে একটি দরখাস্ত দাখিল করে আদালতকে অবহিত করে যে, মূল চুক্তিতে সালিস ধারা রয়েছে। বাণিজ্যিক আদালত তখন নথিপত্র পর্যালোচনা করে চুক্তির অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর, দেওয়ানি কার্যধারাটি স্থগিত (Stay) করে এবং উভয় পক্ষকে সালিসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দেশ প্রদান করে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীর আইনি অধিকার সুরক্ষিত হয় এবং চুক্তির পবিত্রতা (Sanctity of Contract) বজায় থাকে
নিচে ধারা ২(ঘ)(২২)-এর অধীন উদ্ভূত প্রধান বাণিজ্যিক বিরোধসমূহ, মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড এবং সেগুলোর বাস্তব উদাহরণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
সালিস চুক্তি বা আরবিট্রেশন এগ্রিমেন্টের বৈধতা নিয়ে বিরোধ:
অনেক সময় বিরোধ দেখা দিলে এক পক্ষ দাবি করে যে, তাদের মধ্যে কোনো বৈধ সালিস চুক্তি নেই অথবা চুক্তিটি বাতিল বা অকার্যকর।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
চুক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার: এক পক্ষ দাবি করে যে চুক্তিতে কোনো আরবিট্রেশন ক্লজ (Arbitration Clause) ছিল না।
চুক্তি বাতিল (Void Agreement): সালিস চুক্তিটি জালিয়াতির মাধ্যমে বা জোরপূর্বক স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা।
বিষয়ের অ-সালিসযোগ্যতা (Non-arbitrability): বিরোধের বিষয়বস্তু এমন যা সালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা আইনত সম্ভব নয় (যেমন- অপরাধমূলক বিষয়)।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ ১:
'এবিসি কনস্ট্রাকশন' এবং 'এক্সওয়াইজেড ডেভেলপার্স'-এর মধ্যে একটি প্রকল্পের কাজ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। 'এবিসি' সালিসের দাবি জানালে 'এক্সওয়াইজেড' দাবি করে যে, মূল চুক্তিতে থাকা সালিস ক্লজটি অস্পষ্ট এবং সেটি কার্যকর করার মতো নয়। এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বাণিজ্যিক আদালতে আবেদন করতে হবে যে, চুক্তিটি বৈধ ও কার্যকর কি না।
উদাহরণ ২:
এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড' এবং 'সাপ্লাইয়ার্স কোং' এর মধ্যে একটি সাপ্লাই চুক্তি আছে যেখানে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিস ধারা রয়েছে। 'এন্টারপ্রাইজ' সরাসরি দেওয়ানি আদালতে মামলা করে। 'সাপ্লাইয়ার্স কোং' তখন বাণিজ্যিক আদালতে আবেদন জানায় যে, তাদের মধ্যে সালিস চুক্তি বিদ্যমান, তাই মামলাটি সালিসে পাঠানো উচিত। এখানে সালিস চুক্তির প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বাণিজ্যিক আদালতে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
সালিসকারী বা ট্রাইব্যুনাল নিয়োগ ও অপসারণ সংক্রান্ত বিরোধ:
সালিসি প্রক্রিয়ায় সালিসকারী বা আরবিট্রেটর নিয়োগ নিয়ে পক্ষগণের মধ্যে মতানৈক্য হলে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
নিয়োগে ব্যর্থতা: পক্ষগণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সালিসকারী নিয়োগ করতে ব্যর্থ হওয়া।
পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ (Bias): সালিসকারী নিয়োগের পর যদি দেখা যায় তিনি কোনো এক পক্ষের সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত বা স্বার্থান্বেষী, তবে তাকে অপসারণের আবেদন।
যোগ্যতার অভাব: সালিসকারী সালিস আইন বা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন নন।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ ১:
একটি বড় আমদানি-রপ্তানি বিরোধে দুই পক্ষ সালিসকারী হিসেবে একজনকে নিয়োগ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এক পক্ষ দাবি করল, প্রস্তাবিত সালিসকারী অপর পক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ব্যবসায়িক অংশীদার। এই নিরপেক্ষতার অভাব ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে সালিসকারীকে অপসারণের জন্য পক্ষটি বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
উদাহরণ ২:
একটি নির্মাণ প্রকল্পে বিরোধ দেখা দিলে পক্ষদ্বয় সালিসকারী নিয়োগে একমত হতে পারছে না। এক পক্ষ এমন একজনকে সালিসকারী হিসেবে প্রস্তাব করছে যিনি অপর পক্ষের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী। সংক্ষুব্ধ পক্ষ তখন বাণিজ্যিক আদালতে আবেদন করে নিরপেক্ষ সালিসকারী নিয়োগের জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করতে পারে।
অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ (Interim Measures) সংক্রান্ত বিরোধ:
সালিসি প্রক্রিয়া চলাকালীন বিরোধীয় বিষয়বস্তু (যেমন- মালামাল বা সম্পদ) রক্ষা করার জন্য অনেক সময় আদালতের নির্দেশের প্রয়োজন হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
সম্পদ সুরক্ষায় ব্যর্থতা: বিপক্ষ পক্ষ যদি বিরোধীয় সম্পত্তি বা পণ্য সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে।
ইনজাংশন বা নিষেধাজ্ঞা: সালিসি রোয়েদাদ দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার জন্য আদালতের আদেশ চাওয়া।
বাস্তব উদাহরণ:
একটি শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত বিরোধে সালিসি চলছে। এক পক্ষ জানতে পারল, বিপক্ষ পক্ষ সালিসি চলাকালীনই বিতর্কিত শেয়ারগুলো অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। সালিসের ফলাফল আসার আগেই এই বিক্রি ঠেকানোর জন্য উক্ত পক্ষ বাণিজ্যিক আদালতে জরুরি অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আবেদন করবে।
সালিসি রোয়েদাদ বা অ্যাওয়ার্ড (Arbitral Award) চ্যালেঞ্জ করা:
সালিসকারী বা ট্রাইব্যুনাল যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন তাকে 'অ্যাওয়ার্ড' বা 'রোয়েদাদ' বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরাজিত পক্ষ এই রোয়েদাদ চ্যালেঞ্জ করে তা বাতিলের আবেদন জানায়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
জুরিডিকশন বা এখতিয়ার বহির্ভূত সিদ্ধান্ত: ট্রাইব্যুনাল এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যা তাদের বিচার্য বিষয়ের বাইরে ছিল।
পাবলিক পলিসির পরিপন্থী: রোয়েদাদটি দেশের প্রচলিত আইন বা জনস্বার্থের পরিপন্থী।
প্রক্রিয়াগত ত্রুটি: স্বাভাবিক বিচারের নীতি (Natural Justice) লঙ্ঘন করা হয়েছে, যেমন- এক পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া।
জালিয়াতি: রোয়েদাদটি জালিয়াতি বা মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে অর্জিত হয়েছে।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ ১:
একটি আন্তর্জাতিক সরবরাহ চুক্তির সালিসে ট্রাইব্যুনাল আদেশ দিলেন যে, সরবরাহকারীকে বিশাল অংকের জরিমানা দিতে হবে। সরবরাহকারী বাণিজ্যিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করল যে, ট্রাইব্যুনাল তার পেশ করা অডিট রিপোর্টটি বিবেচনা না করেই একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা 'ন্যাচারাল জাস্টিস' বা প্রাকৃতিক ন্যায়ের পরিপন্থী।
উদাহরণ ২:
সালিসকারী একটি রোয়েদাদ প্রদান করলেন যেখানে তিনি চুক্তির শর্তের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেছেন। সংক্ষুব্ধ পক্ষ বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে এই রোয়েদাদটি 'রদ (Set Aside)' করার আবেদন জানাবে, কারণ সালিসকারী তার এখতিয়ার (Jurisdiction) লঙ্ঘন করেছেন।
উদাহরণ ৩:
একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং একটি বৃহৎ কর্পোরেট গ্রাহকের মধ্যে ঋণ পুনর্গঠন ও পরিষেবা চুক্তি নিয়ে সালিস অনুষ্ঠিত হয় (ধারা ২(ঘ)(১) ও (১২)) । ট্রাইব্যুনাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু কর্পোরেট গ্রাহক রোয়েদাদ প্রাপ্তির ৬০ দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক আদালতে ধারা ২(ঘ)(২২)-এর অধীন রোয়েদাদ বাতিলের মামলা দায়ের করে। তাদের প্রধান গ্রাউন্ড ছিল যে, ট্রাইব্যুনাল এমন একটি ক্ষতিপূরণ (Liquidated Damages) ধার্য করেছে, যা মূল চুক্তির সালিস ধারার আওতাভুক্তই ছিল না এবং শুনানির সময় গ্রাহককে তাদের গুরুত্বপূর্ণ একজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষীকে উপস্থাপন করার সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের (Principles of Natural Justice) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাণিজ্যিক আদালত এই গ্রাউন্ডগুলোর সত্যতা প্রমাণ সাপেক্ষে সম্পূর্ণ রোয়েদাদ বা এর আংশিক অংশ বাতিল করতে পারে।
রোয়েদাদ বা অ্যাওয়ার্ড, ডিক্রি জারি (Enforcement of Award) সংক্রান্ত বিরোধ:
পেশ করা অ্যাওয়ার্ড কার্যকর করতে বিপক্ষ পক্ষ গড়িমসি করলে তা আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করতে হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
রোয়েদাদ মানতে অস্বীকৃতি: ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাওনা টাকা বা সম্পত্তি দিতে অস্বীকৃতি জানানো।
বিদেশি রোয়েদাদ কার্যকর: বিদেশি কোনো সালিসি রোয়েদাদ বাংলাদেশে কার্যকর করার ক্ষেত্রে আইনি বাধা বা বিরোধ।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ ১: সালিসি ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন যে, 'ক' কোম্পানি 'খ' কোম্পানিকে ৫ কোটি টাকা ফেরত দেবে। কিন্তু রায় হওয়ার ৩ মাস পরও 'ক' টাকা দিচ্ছে না। 'খ' কোম্পানি এখন বাণিজ্যিক আদালতে আবেদন করবে যেন ওই সালিসি রোয়েদাদটিকে আদালতের ডিক্রি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তা কার্যকর (Execute) করা হয়।
উদাহরণ ২: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বিরোধে সালিসকারী একটি বিদেশি কোম্পানির পক্ষে রোয়েদাদ দিয়েছেন যে, বাংলাদেশি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশি কোম্পানি টাকা দিচ্ছে না। বিজয়ী পক্ষ বাণিজ্যিক আদালতে মামলা বা আবেদন দায়ের করবে যেন ওই রোয়েদাদটিকে আদালতের ডিক্রি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর করা হয়।
বাস্তব উদাহরণ (দেশীয় রোয়েদাদ):
"মেট্রো কনস্ট্রাকশনস" এবং "সরবরাহকারী এক্স"-এর মধ্যে নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের (ধারা ২(ঘ)(৫)) একটি চুক্তিতে বিরোধ দেখা দেয় । সালিস শেষে মেট্রো কনস্ট্রাকশনস ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার রায় লাভ করে। সরবরাহকারী এক্স টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, মেট্রো কনস্ট্রাকশনস বাণিজ্যিক আদালতে ধারা ২(ঘ)(২২)-এর অধীনে ডিক্রি জারির মামলা দায়ের করে। আদালত বিবাদীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ক্রোক (Garnishee Order) করে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করে।
বাস্তব উদাহরণ (বিদেশি রোয়েদাদ/International Commercial Arbitration):
বাণিজ্যিক আদালতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এখতিয়ার হলো বিদেশি রোয়েদাদ কার্যকর করা। বাংলাদেশের "গার্মেন্টস এক্সপোর্টার্স লিমিটেড" এবং যুক্তরাজ্যের "ইউরো-ফ্যাশন রিটেইলস"-এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পণ্য রপ্তানি চুক্তি ছিল (ধারা ২(ঘ)(২))। লন্ডনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিসে (International Commercial Arbitration) বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের পক্ষে রায় আসে। যেহেতু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশে কিছু ওয়্যারহাউস এবং সম্পদ রয়েছে, তাই বাংলাদেশি রপ্তানিকারক ধারা ২(ঘ)(২২) এবং সালিস আইনের ৪৫ ধারার অধীনে বিদেশি রোয়েদাদটি প্রয়োগের জন্য ঢাকার বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করে। নিউইয়র্ক কনভেনশন (New York Convention)-এর আলোকে, আদালত অতি দ্রুত এই বিদেশি রায়কে দেশীয় আদালতের রায়ের সমমর্যাদা দিয়ে তা কার্যকর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাণিজ্যিক বিচার ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (UNCITRAL Model Law) প্রতিফলিত হয় এবং ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যে নিশ্চয়তা তৈরি হয়।
উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬-এর ধারা ২(ঘ)(২২) সালিস প্রক্রিয়ার সাথে আদালতের সম্পর্ককে সুসংজ্ঞায়িত করেছে। সালিস একটি বেসরকারি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া হলেও এর বৈধতা, সালিসকারীর নিরপেক্ষতা এবং রোয়েদাদের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আদালতের ভূমিকা অপরিসীম। পূর্বে এসব ক্ষেত্রে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হতো, যা দীর্ঘসূত্রতার কারণে সালিসের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করত। এখন থেকে এই বিশেষায়িত ধারার অধীনে বাণিজ্যিক আদালত সালিস সংক্রান্ত বিরোধগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করবে, যা ব্যবসায়ীদের আস্থা বৃদ্ধি করবে এবং সালিসি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com