বাণিজ্যিক আদালতে ব্যবসায়িকদের অধিকার (পর্ব-২৬):“এজেন্সি চুক্তি” (agency contracts) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ ও প্রতিকার
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও গতিশীল ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। আধুনিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ পরিচালিত হয় 'এজেন্সি' বা প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। এই আইনের ধারা ২(ঘ)(২০)-এ "এজেন্সি চুক্তি" (Agency Contracts)-এর অধীন সৃষ্ট বিরোধগুলোকে সুস্পষ্টভাবে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
একটি এজেন্সি চুক্তিতে মূলত দুজন পক্ষ থাকে: 'প্রিন্সিপাল' (Principal) বা মূল মালিক, যিনি অপর একজন ব্যক্তিকে বা প্রতিষ্ঠানকে তার পক্ষে কাজ করার ক্ষমতা দেন; এবং 'এজেন্ট' (Agent) বা প্রতিনিধি, যিনি সেই ক্ষমতাবলে প্রিন্সিপালের পক্ষে তৃতীয় পক্ষের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন করেন।
নিচে ধারা ২(ঘ)(২০)-এর অধীন উদ্ভূত প্রধান বাণিজ্যিক বিরোধসমূহ, মামলার গ্রাউন্ড বা কারণ এবং সেগুলোর বাস্তব উদাহরণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
কমিশন বা পারিশ্রমিক বকেয়া সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes regarding Unpaid Commission/Remuneration):
এজেন্সি চুক্তির সবচেয়ে সাধারণ উদ্দেশ্য হলো এজেন্টের কাজ বা বিক্রির বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে কমিশন বা পারিশ্রমিক পাওয়া। প্রিন্সিপাল যদি এই প্রাপ্য পরিশোধ না করেন, তবে বড় ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
কমিশন প্রদানে অস্বীকৃতি বা বিলম্ব: চুক্তিতে উল্লেখিত শর্ত অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পরও প্রিন্সিপাল কর্তৃক কমিশন বা সার্ভিস ফি প্রদান না করা।
হিসাব বা ক্যালকুলেশনে জালিয়াতি: এজেন্ট যে পরিমাণ বিক্রি বা ব্যবসা এনে দিয়েছেন, প্রিন্সিপাল যদি সেই হিসাব উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কম দেখিয়ে কম কমিশন অফার করেন।
চুক্তি বাতিলের পর বকেয়া আটকে রাখা: এজেন্সি চুক্তি শেষ বা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এজেন্টের আগের কাজের ন্যায্য বকেয়া আটকে রাখা।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ ১ (ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্সি বিরোধ):
একটি বহুজাতিক ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির 'এক্সক্লুসিভ সেলস এজেন্ট' হিসেবে কাজ করে 'ঢাকা ট্রেডার্স'। চুক্তি অনুযায়ী, বছরে ৫০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করতে পারলে তারা ৫% হারে অতিরিক্ত বোনাস কমিশন পাবে। ঢাকা ট্রেডার্স নির্দিষ্ট সময়ে ৫২ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিটি দাবি করে যে, এর মধ্যে ৫ কোটি টাকার অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে, তাই তারা বোনাস পাবে না। এই কমিশন বা পারিশ্রমিক আদায়ের জন্য ঢাকা ট্রেডার্স ধারা ২(ঘ)(২০) এর অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ 2 (বিক্রয় এজেন্ট):
'সুপার ইলেকট্রনিক্স' তাদের টেলিভিশন বিক্রির জন্য 'ঢাকা ট্রেডার্স' কে তাদের একমাত্র এজেন্ট নিয়োগ দেয় এবং প্রতিটি টিভির উপর ৫% কমিশন নির্ধারণ করে। ঢাকা ট্রেডার্স এক বছরে ১০০০ টিভি বিক্রি করে কিন্তু সুপার ইলেকট্রনিক্স দাবি করে যে তাদের সরাসরি বিক্রয়ের কারণে এজেন্ট শুধু ৫০০ টিভির কমিশন পাবে। ঢাকা ট্রেডার্স চুক্তি মোতাবেক সম্পূর্ণ কমিশন আদায়ের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ 3 (ব্রোকার):
একজন রিয়েল এস্টেট ব্রোকার একটি বড় বাণিজ্যিক ভবন বিক্রয়ের জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তিতে ব্রোকারের জন্য ২% কমিশন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু চুক্তি সম্পাদনের পর বিক্রেতা কমিশন দিতে অস্বীকার করে এই বলে যে, ব্রোকার ক্রেতাকে ভবনের কিছু ত্রুটি সম্পর্কে জানায়নি। ব্রোকার তখন তার প্রাপ্য কমিশন আদায়ের জন্য মামলা করতে পারে।
চুক্তির বেআইনি বা একতরফা অবসান (Wrongful or Unlawful Termination of Agency):
এজেন্সি চুক্তি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য হয় অথবা এটি বাতিল করার জন্য নির্দিষ্ট নোটিশ পিরিয়ডের (Notice Period) প্রয়োজন হয়। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া বা নোটিশ না দিয়ে চুক্তি বাতিল করলে তা বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনে।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
বিনা নোটিশে চুক্তি বাতিল: চুক্তিতে ৩ বা ৬ মাসের নোটিশ দেওয়ার শর্ত থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে একতরফা চুক্তি বাতিল করে দেওয়া।
বড় কমিশন ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে চুক্তি বাতিল: এজেন্ট কোনো একটি মেগা ডিল চূড়ান্ত করার ঠিক আগ মুহূর্তে প্রিন্সিপাল যদি ইচ্ছাকৃতভাবে চুক্তি বাতিল করে, যাতে এজেন্টের বিশাল অঙ্কের কমিশন না দিতে হয়।
লগ্নি বা বিনিয়োগের ক্ষতিপূরণ না দেওয়া: এজেন্সির কাজ চালানোর জন্য এজেন্ট যদি অফিস বা গোডাউনে বড় বিনিয়োগ করে থাকে এবং মেয়াদ শেষের আগেই বেআইনিভাবে চুক্তি বাতিল হয়, তবে সেই ক্ষতিপূরণের জন্য।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ ১ (বায়িং হাউজ বা সোর্সিং এজেন্সি):
ইউরোপের একটি বিখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ডের বাংলাদেশের 'সোর্সিং এজেন্ট' হিসেবে কাজ করে 'এবিসি বায়িং হাউজ'। তারা ব্র্যান্ডের জন্য বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে কোটি কোটি টাকার অর্ডার প্লেস করে। চুক্তি অনুযায়ী তাদের মেয়াদ আরও ৩ বছর বাকি। কিন্তু ইউরোপীয় ব্র্যান্ডটি বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব অফিস খুলবে বলে হঠাৎ করে কোনো নোটিশ ছাড়াই 'এবিসি'-এর সাথে চুক্তি বাতিল করে দেয়। এর ফলে 'এবিসি' মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বেআইনি চুক্তি বাতিলের ক্ষতিপূরণ (Damages for Wrongful Termination) চেয়ে তারা বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (ডিস্ট্রিবিউটর):
একটি বহুজাতিক প্রসাধনী কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের পণ্যের জন্য 'বিউটি কেয়ার' কে ৫ বছরের জন্য ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়। বিউটি কেয়ার ব্যাপক প্রচারণা ও মার্কেট ডেভেলপমেন্টে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে। কিন্তু ২ বছর পর কোম্পানিটি কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই চুক্তি বাতিল করে এবং অন্য একটি ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ দেয়। বিউটি কেয়ার চুক্তি ভঙ্গের দায়ে এবং তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের ক্ষতিপূরণের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে।
এজেন্টের অধিকার বহির্ভূত কাজ বা চুক্তিভঙ্গ (Agent Exceeding Authority or Breach of Exclusivity):
এজেন্টকে প্রিন্সিপালের দেওয়া নির্দিষ্ট ক্ষমতার (Authority) গণ্ডির মধ্যেই কাজ করতে হয়। এজেন্ট যদি তার ক্ষমতা অতিক্রম করে এমন কোনো চুক্তি করে যা প্রিন্সিপালকে দায়বদ্ধ করে, তবে সেটি বিরোধের সৃষ্টি করে।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
ক্ষমতা অতিক্রম (Ultra Vires Act): প্রিন্সিপালের অনুমতি ছাড়া পণ্যের দামে বিশাল ছাড় দেওয়া বা এমন কোনো ওয়ারেন্টি/গ্যারান্টি দেওয়া যা চুক্তিতে নেই।
এক্সক্লুসিভিটি বা ভৌগোলিক সীমানা লঙ্ঘন: এজেন্টকে যদি শুধু ঢাকা শহরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়, কিন্তু সে যদি অনুমতি ছাড়াই চট্টগ্রামে গিয়ে পণ্য বিক্রি শুরু করে, যা অন্য এজেন্টের ব্যবসায়িক ক্ষতি করে।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ 1 (সিঅ্যান্ডএফ বা ফরওয়ার্ডিং এজেন্সি):
'জেড লজিস্টিকস' একটি কোম্পানির সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্ট হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত। চুক্তি অনুযায়ী তাদের শুধু কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স করার কথা। কিন্তু তারা প্রিন্সিপালের (মালিকের) অনুমতি ছাড়াই থার্ড-পার্টি একটি পরিবহন কোম্পানির সাথে মালিকের নামে অনেক উচ্চমূল্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলে। এই অধিকার বহির্ভূত কাজের কারণে মালিকের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা আদায়ের জন্য প্রিন্সিপাল উক্ত এজেন্টের বিরুদ্ধে এই ধারায় মামলা করতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (ক্রয় এজেন্ট):
একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি তাদের সুতা ক্রয়ের জন্য একজন এজেন্ট নিয়োগ করে এবং তাকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা কেজি দরে সুতা কেনার ক্ষমতা দেয়। কিন্তু এজেন্ট তৃতীয় একটি কোম্পানির সাথে ১২০ টাকা দরে চুক্তিবদ্ধ হয়, যা ফ্যাক্টরির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফ্যাক্টরি মালিক এজেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
অর্থ আত্মসাৎ এবং হিসাব প্রদানে ব্যর্থতা (Misappropriation of Funds and Failure to Account):
এজেন্ট যখন প্রিন্সিপালের পক্ষে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে, তখন সেই টাকা নির্দিষ্ট সময়ে প্রিন্সিপালকে বুঝিয়ে দেওয়া এবং সঠিক হিসাব রাখা এজেন্টের অন্যতম প্রধান আইনি দায়িত্ব।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
সংগৃহীত অর্থ হস্তান্তর না করা: বিক্রিত পণ্যের বা সেবার টাকা তুলে তা প্রিন্সিপালকে না দিয়ে এজেন্ট নিজের ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করলে।
হিসাব বা অডিট করতে বাধা দেওয়া: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রিন্সিপাল বা তার নিয়োজিত অডিটরকে হিসাবের খাতা বা ইনভয়েস দেখতে না দেওয়া।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ ১ (ট্রাভেল বা টিকিটিং এজেন্সি):
একটি বিদেশি এয়ারলাইন্সের 'প্যাসেঞ্জার সেলস এজেন্ট' (PSA) হলো 'গ্লোবাল ট্রাভেলস'। তারা যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করে মাসে ১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রতি ১৫ দিন অন্তর এই টাকা এয়ারলাইন্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু গ্লোবাল ট্রাভেলস ২ মাস ধরে কোনো টাকা দিচ্ছে না এবং হিসাবও দেখাচ্ছে না। এই অর্থ আত্মসাৎ এবং হিসাব প্রদানে ব্যর্থতার দায়ে এয়ারলাইন্সটি এজেন্টের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
পণ্য সরবরাহ বা সেবার মানে অবহেলা (Negligence in Supply of Goods or Services):
এজেন্ট যখন প্রিন্সিপালের পণ্য বাজারজাত করে বা সেবা প্রদান করে, তখন তার কাজে অবহেলার কারণে প্রিন্সিপালের সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ:
এজেন্ট কর্তৃক নিম্নমানের সেবা প্রদান বা পণ্যের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা।
পণ্য বিক্রয়ের পর বিক্রয়োত্তর সেবা (After-sales Service) প্রদানে ব্যর্থতা।
বাস্তব উদাহরণ (ফ্র্যাঞ্চাইজি এজেন্ট):
একটি নামকরা আন্তর্জাতিক ফুড চেইন (প্রিন্সিপাল) ঢাকায় তাদের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট দেয়। চুক্তিতে খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করেন এবং গ্রাহকদের অভিযোগ বাড়তে থাকে, যা মূল কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালু নষ্ট করে। প্রিন্সিপাল চুক্তি বাতিল এবং ব্র্যান্ডের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণে ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
বিশ্বাসভঙ্গ এবং স্বার্থের সংঘাত (Breach of Fiduciary Duty & Conflict of Interest):
প্রিন্সিপাল এবং এজেন্টের সম্পর্কটি পরম বিশ্বাসের (Fiduciary Relationship)। এজেন্ট কখনোই প্রিন্সিপালের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কাজ করতে পারে না।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
প্রতিযোগীর হয়ে কাজ করা: এক্সক্লুসিভ এজেন্ট হওয়ার পরও গোপনে প্রিন্সিপালের সরাসরি ব্যবসায়িক প্রতিযোগীর (Competitor) পণ্য বিক্রি করা বা তাদের এজেন্সি নেওয়া।
বাণিজ্যিক গোপনীয়তা (Trade Secrets) ফাঁস: প্রিন্সিপালের কাস্টমার লিস্ট, প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজি বা ফর্মুলা অন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া বা নিজের ব্যবসায় ব্যবহার করা।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ ১ (ট্রেড সিক্রেট ও স্বার্থের সংঘাত):
'ফার্মা কেয়ার' একটি ওষুধ কোম্পানির একমাত্র ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্ট। তারা মূল কোম্পানির ক্রেতাদের তালিকা, ডাক্তারদের ডেটাবেস এবং ডিসকাউন্ট পলিসি সম্পর্কে সব জানে। হঠাৎ দেখা গেল, 'ফার্মা কেয়ার' ওই একই ধরনের ওষুধ তৈরি করে এমন অন্য একটি নতুন কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিয়েছে এবং পুরনো কোম্পানির ক্লায়েন্টদের সেই নতুন কোম্পানির ওষুধ কিনতে প্ররোচিত করছে। এটি সুস্পষ্ট বিশ্বাসভঙ্গ এবং স্বার্থের সংঘাত। এই গ্রাউন্ডে ওষুধ কোম্পানি চুক্তির শর্তভঙ্গের দায়ে তাদের এজেন্টের বিরুদ্ধে ইনজাংশন (নিষেধাজ্ঞা) ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (কমিশন এজেন্ট):
একজন এজেন্ট একটি কোম্পানির হয়ে কাঁচামাল কিনে আনেন। তিনি কাঁচামাল সরবরাহকারীর সাথে যোগসাজশ করে পণ্যের দাম বেশি দেখান এবং অতিরিক্ত টাকা সরবরাহকারীর কাছ থেকে গোপনে কমিশন হিসেবে গ্রহণ করেন। কোম্পানি অডিটের মাধ্যমে এটি জানতে পেরে এজেন্টের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ ও গোপন মুনাফা আদায়ের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬-এর ধারা ২(ঘ)(২০) দেশের ব্যবসায়িক কাঠামোর একটি বড় সুরক্ষাকবচ। ডিস্ট্রিবিউটর, ব্রোকার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্র্যাঞ্চাইজি বা সোর্সিং এজেন্ট—এসবই এজেন্সি চুক্তির আওতাভুক্ত। পূর্বে এসব চুক্তিভঙ্গের মামলা সাধারণ আদালতে বছরের পর বছর চলত, ফলে মূল কোম্পানি বা এজেন্ট উভয়েরই পুঁজি আটকে যেত। বর্তমান আইনের অধীনে, কমিশন বকেয়া, বেআইনি টার্মিনেশন বা অর্থ আত্মসাতের মতো এই সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ডগুলোর কারণে মামলাগুলো দ্রুততর সময়ে (Fast-track) বাণিজ্যিক আদালতে নিষ্পত্তি হবে, যা দেশে একটি সুশৃঙ্খল ও আস্থাশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com