অর্থঋণ ও জারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১৭): Fundamental rights (অনুচ্ছেদ- ৩১, ৩২ ও ৪২) লঙ্ঘনকে চ্যালেঞ্জ

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ দ্রুত ঋণ আদায়ের জন্য প্রণীত হলেও, এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের উর্ধ্বে নয়। যদি অর্থ ঋণ আদালত বা ডিক্রীদার ব্যাংক ঋণ আদায়ের নামে কোনো নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার—বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৩১, ৩২ এবং ৪২—লঙ্ঘন করে, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে কার্যকর প্রতিকার পেতে পারেন।

নিচে অর্থ ঋণ আইনের প্রেক্ষাপটে এই তিনটি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের গ্রাউন্ড, বাস্তব উদাহরণ ও বিচারিক নজির বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. অনুচ্ছেদ ৩১: আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার (Right to Protection of Law):

অনুচ্ছেদ ৩১ নিশ্চিত করে যে, "আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।" ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ লাভ প্রত্যেক নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। অর্থ ঋণ মামলায় এই অধিকার লঙ্ঘনের গ্রাউন্ডসমূহ:

১.১) আইনি প্রক্রিয়া (Due Process) লঙ্ঘন: যদি আদালত অর্থ ঋণ আইনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি (যেমন- সমন জারি, নিলামের ১৫ দিনের সময়সীমা) কঠোরভাবে অনুসরণ না করেন।

১.২) Natural Justice: বিবাদীকে নোটিশ না দেওয়া বা 'কারণ দর্শানো ছাড়া আদেশ' (Non-speaking Order) প্রদান করা। আদালত যদি বিবাদীর যৌক্তিক আবেদন (যেমন- কিস্তি বা সুদ মওকুফ) কেন খারিজ করা হলো তার কোনো আইনগত কারণ আদেশে উল্লেখ না করে যান্ত্রিকভাবে খারিজ করে দেন, তবে তা অনুচ্ছেদ ৩১-এর লঙ্ঘন।

১.৩) একতরফা ডিক্রি: সমন জালিয়াতি করে বিবাদীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ডিক্রি দেওয়া।

১.৪) পদ্ধতিগত অবিচার: যদি অর্থ ঋণ আদালত আইনের কোনো বাধ্যতামূলক পদ্ধতি (যেমন—ধারা ৩৩-এর নিলাম প্রক্রিয়া বা ধারা ৩৪-এর কারণ দর্শানোর নোটিশ) পালন না করে কোনো আদেশ দেওয়া হয়, তবে তা ৩১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

১.৫) স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত: আইনের বাইরে গিয়ে বা আইনের অপব্যাখ্যা করে কোনো দায়িককে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে (যেমন—অযৌক্তিক সুদ আরোপ বা কিস্তির আবেদন বিনাশুনানিতে খারিজ)।
বাস্তব উদাহরণ: ব্যাংক জারী মামলায় ৩৩(১) ধারায় নিলাম না ডেকেই ৩৩(৭) ধারায় সম্পত্তির মালিকানা দাবি করল এবং আদালত বিবাদীকে কোনো নোটিশ না দিয়েই মালিকানা সনদ দিয়ে দিলেন। এটি আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ: ৩১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন (নিলাম সংক্রান্ত)
ব্যাংক দায়িকের ৫ কোটি টাকার সম্পত্তি মাত্র ১ কোটি টাকায় নিলামে বিক্রি করে দিল এবং নিলামের বিজ্ঞপ্তি কোনো নামসর্বস্ব পত্রিকায় ছাপানো হলো। এখানে দায়িক তার সম্পত্তির সঠিক মূল্য পাওয়ার অধিকার (৪২ অনুচ্ছেদ) এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া লাভের অধিকার (৩১ অনুচ্ছেদ) থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এটি সরাসরি রিটযোগ্য।

২. অনুচ্ছেদ ৩২: জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার (Protection of Personal Liberty):

অনুচ্ছেদ ৩২-এ বলা হয়েছে যে, "আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।"। ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনানুযায়ী পদ্ধতি ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হতে বঞ্চিত করা যাবে না। অর্থ ঋণ মামলায় এই অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের গ্রাউন্ডসমূহ:

২.১) বেআইনি গ্রেফতারি পরোয়ানা (Section 34 WA): আইনের ৩৪(৯) ধারায় বলা আছে, অন্তত একটি নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কাউকে জেলে পাঠানো যাবে না। ব্যাংক যদি বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করার চেষ্টা না করেই সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানার আবেদন করে এবং আদালত তা মঞ্জুর করেন, তবে তা অনুচ্ছেদ ৩২-এর সরাসরি লঙ্ঘন।

২.২) কিস্তির সুযোগ না দেওয়া: অসুস্থতা বা ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিকে কিস্তির সুযোগ (৪৯ ধারা) না দিয়ে যান্ত্রিকভাবে জেলে পাঠানো।

২.৩) বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা: শুধুমাত্র সিভিল ঋণের কারণে ইমিগ্রেশনে চিঠি দিয়ে বিদেশ গমনে বাধা দেওয়া নাগরিকের স্বাধীনতা এবং অনুচ্ছেদ ৩২ ও ৩৬-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

২.৪) বেআইনি আটকাদেশ: ধারা ৩৪ অনুযায়ী কোনো দায়িককে দেওয়ানী কারাগারে আটক রাখার আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি 'Due Process' লঙ্ঘিত হয় (যেমন—৬ মাসের বেশি আটক রাখা বা অসুস্থতা সত্ত্বেও মুক্তি না দেওয়া), তবে তা ৩২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

২.৫) বিদেশ গমনে বাধা: ধারা ৩৪ক অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কারণ বা শুনানি ছাড়া কারো বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী।

বাস্তব উদাহরণ: জনাব 'ক' এর ১০ কোটি টাকার সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক আছে। তার ঋণের পরিমাণ ৫ কোটি টাকা। ব্যাংক সেই সম্পত্তি নিলামে না তুলেই জনাব 'ক' কে গ্রেফতার করিয়ে জেলে পাঠাল। এটি অনুচ্ছেদ ৩২-এর সরাসরি লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ- ৩২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন (আটকাদেশ):
এক জন দায়িক ক্যান্সার আক্রান্ত। আদালত তাকে ৩৪ ধারায় দেওয়ানী কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিলেন এবং তার চিকিৎসার বিষয়টি বিবেচনা করলেন না। এখানে তার 'জীবন রক্ষার অধিকার' (৩২ অনুচ্ছেদ) লঙ্ঘিত হওয়ায় রিট করা যাবে।

৩. অনুচ্ছেদ ৪২: সম্পত্তির অধিকার (Rights to Property):
অনুচ্ছেদ ৪২-এ বলা হয়েছে যে, "আইনের দ্বারা আরোপিত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর বা অন্যভাবে বিলি-ব্যবস্থা করিবার অধিকার থাকিবে এবং আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বা দখল করা যাইবে না।" ৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ বা দখল করা যাবে না। অর্থ ঋণ মামলায় এই অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের গ্রাউন্ডসমূহ:

৩.১) অস্বাভাবিক অবমূল্যায়ন (Undervaluation): ৩৩ ধারায় নিলাম ডাকার সময় যদি সম্পত্তির বাজারমূল্যের চেয়ে সংরক্ষিত মূল্য (Reserve Price) ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক কম ধরা হয়, যাতে ব্যাংক নামমাত্র মূল্যে সম্পত্তির মালিকানা নিতে পারে।

৩.২) ভুল সম্পত্তি দখল বা ন্যস্তকরণ: ৩৩(৭খ) অনুযায়ী মালিকানা যাচাই না করে এমন কোনো সম্পত্তি ব্যাংকের নামে ডিক্রি করে দেওয়া যা কখনোই বন্ধক ছিল না।

৩.৩) ত্রুটিপূর্ণ নিলামের ওপর ভিত্তি করে দখল: আইনের ১২ ধারা বা ৩৩ ধারার নিলামের বিধানগুলো যথাযথভাবে না মেনেই (যেমন- পত্রিকায় বিজ্ঞাপন না দিয়ে) বিবাদীকে তার পৈত্রিক বা অর্জিত সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করা।

৩.৪) অবৈধ সম্পত্তি গ্রহণ: ধারা ৩৩(৭) অনুযায়ী ব্যাংককে সম্পত্তির মালিকানা দেওয়ার সময় যদি সম্পত্তির সঠিক মূল্যায়ন না করা হয় অথবা ২৮ ধারার বিধান (অতিরিক্ত মূল্য ফেরত) অমান্য করে পুরো সম্পত্তি ব্যাংককে দিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা ৪২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

৩.৫) জামানতহীন সম্পত্তি ক্রোক: ঋণের বিপরীতে বন্ধক দেওয়া নেই এমন কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি যদি ৪৪ ধারার অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের মাধ্যমে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া ক্রোক করা হয়।

বাস্তব উদাহরণ: ৫ কোটি টাকা বাজারমূল্যের একটি ফ্যাক্টরির নিলাম মূল্য ধরা হলো মাত্র ১ কোটি টাকা। কোনো ক্রেতা না আসায় ব্যাংক ১ কোটি টাকায় ওই সম্পত্তির ৩৩(৭) ধারায় মালিকানা সনদ নিয়ে নিল। এটি ঋণগ্রহীতার অনুচ্ছেদ ৪২ অনুযায়ী সম্পত্তির অধিকারের চরম লঙ্ঘন।

উপসংহার:
অর্থ ঋণ আদালত আইনের উদ্দেশ্য দ্রুত ঋণ আদায় হলেও, তা কখনোই সংবিধানের ৩১, ৩২ এবং ৪২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারকে পাশ কাটিয়ে হতে পারে না। আইনের আশ্রয় লাভ (৩১), ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (৩২) এবং সম্পত্তির অধিকার (৪২) প্রতিটি নাগরিকের রক্ষাকবচ। যখনই কোনো আদেশ এই সীমানা অতিক্রম করে, তখনই হাইকোর্ট বিভাগ রিট এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেন। যদি ব্যাংক বা আদালত আইনি প্রক্রিয়া (Due Process) লঙ্ঘন করে, ব্যক্তি স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে বা সম্পত্তির অবমূল্যায়ন করে, তবে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করাই হলো নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com