অর্থঋণ ও জারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১৬): Natural Justice লঙ্ঘনকে চ্যালেঞ্জ
Natural Justice বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) এবং ৩১ অনুচ্ছেদ (আইনের আশ্রয় লাভ)-এর পরোক্ষ রক্ষাকবচ হলো এই Natural Justice। এর সবচেয়ে বড় দুটি নীতি হলো:
১. Audi Alteram Partem (কাউকে তার বক্তব্য না শুনে দণ্ড দেওয়া যাবে না)।
২. Nemo Judex in Causa Sua (কেউ নিজের বিচারের বিচারক হতে পারবে না / পক্ষপাতিত্বহীন বিচার)।
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ দ্রুত ঋণ আদায়ের জন্য একটি কঠোর আইন। দ্রুত ঋণ আদায়ের স্বার্থে এই আইনের ৪৪ ধারা অনেক ক্ষেত্রে আপিল বা রিভিশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু নিম্ন আদালত যদি দ্রুত বিচার করতে গিয়ে বিবাদীর 'Natural Justice' বা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হরণ করেন, তবে বিকল্প প্রতিকার না থাকার গ্রাউন্ডে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যায়।
নিচে অর্থ ঋণ আদালতের প্রেক্ষাপটে 'Natural Justice' লঙ্ঘনের প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ, বাস্তব উদাহরণ ও বিচারিক নজির আলোচনা করা হলো:
১. উভয় পক্ষকে শোনা- (Audi Alteram Partem):
এই নীতির অর্থ হলো- কাউকে তার বক্তব্য পেশ করার সুযোগ না দিয়ে বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে দণ্ড বা শাস্তি দেওয়া যাবে না।
১.১) যথারীতি সমন ও নোটিশ জারি না করা (রিটের গ্রাউন্ড):
ক. সমন জারি না করা (Non-service of Summons):
যদি আদালত সমন বা নোটিশ যথাযথভাবে জারি না করে (যেমন—জারি কারকের ভুয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে) একতরফা রায় (Ex-parte Decree) প্রদান করে।
খ. সমন গোপন করে একতরফা ডিক্রি (Suppression of Summons):
আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী বিবাদীর ওপর সমন কিংবা ৩০ ধারা অনুযায়ী শোকজ নোটিশ জারি করা বাধ্যতামূলক। ডিক্রিদার ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি আদালতের জারিকারকের (Process Server) সাথে যোগসাজশ করে 'বিবাদীকে পাওয়া যায়নি' মর্মে মিথ্যা রিপোর্ট দেয় এবং পত্রিকায় এমনভাবে বিজ্ঞপ্তি দেয় যা বিবাদীর নজরে আসেনি, তবে বিবাদীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই একতরফা (Ex-parte) ডিক্রি হয়ে যায়। এটি Audi Alteram Partem নীতির সবচেয়ে বড় লঙ্ঘন।
উদাহরণ (নিলাম প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তা):
ধারা ৩৩ অনুযায়ী সম্পত্তি নিলামের সময় যদি দায়িককে নোটিশ না দেওয়া হয় বা নিলামের বিজ্ঞাপন এমন কোনো পত্রিকায় দেওয়া হয় যা বহুল প্রচারিত নয়, তবে দায়িক তার সম্পত্তির সঠিক মূল্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং রিটযোগ্য।
উদাহরণ (সমন জালিয়াতি ও একতরফা ডিক্রি):
জনাব 'এ' ঢাকায় ব্যবসা করেন। ব্যাংক তার বিরুদ্ধে মামলা করল এবং সমন পাঠাল তার গ্রামের ঠিকানায়, যেখানে তিনি ২০ বছর ধরে যান না। জারিকারক সেখানে সমন লটকে দিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট দিল। এরপর একটি অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো। জনাব 'এ' কিছুই জানলেন না এবং ৫ কোটি টাকার একতরফা ডিক্রি হয়ে গেল। জারি মামলায় ওয়ারেন্ট আসার পর তিনি জানলেন।
রিটের গ্রাউন্ড: জনাব 'এ' কে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ (Right to be Heard) দেওয়া হয়নি। তিনি হাইকোর্টে রিট করে প্রমাণ করতে পারেন যে সমন জারিতে জালিয়াতি হয়েছে। হাইকোর্ট এই গ্রাউন্ডে একতরফা ডিক্রি স্থগিত করে মামলাটি পুনরায় শুনানির (Remand) নির্দেশ দিতে পারেন।
গ. ৩৩ ধারার দখল বা মালিকানা হস্তান্তরে নোটিশ না দেওয়া:
৩৩(৫) ধারায় ব্যাংকের নামে দখল ও ভোগের সার্টিফিকেট ইস্যু করার আগে কিংবা ৩৩(৭) ধারায় মালিকানাস্বত্তের সনদপত্র (Title Certificate) জারীর আগে আদালত যদি বিবাদীকে কোনো নোটিশ না দেন বা তার কোনো ওজর-আপত্তি শোনার সুযোগ না দেন, তবে তা Natural Justice চরম লঙ্ঘন। একজন ব্যক্তির সম্পত্তি চিরতরে কেড়ে নেওয়ার আগে তাকে শেষবারের মতো শোনা আদালতের দায়িত্ব।
উদাহরণ (৩৩-৭ ধারায় নোটিশ ছাড়া মালিকানাস্বত্বে সনদপত্র):
ব্যাংক নিলামে ক্রেতা না পেয়ে সরাসরি ৩৩(৭) ধারায় মালিকানাস্বত্বে সনদপত্র দাবি করল। বিবাদী তখন আদালতে উপস্থিত হয়ে বললেন যে, তার একটি এক্সপোর্ট বিল ব্যাংকে আটকে আছে, সেটি সমন্বয় করলে ঋণের অর্ধেক শোধ হয়ে যাবে। আদালত তার কথা না শুনেই সরাসরি ব্যাংককে মালিকানা সনদ দিয়ে দিলেন।
রিটের গ্রাউন্ড: বিবাদীর যুক্তিসঙ্গত দাবি বিবেচনা না করা বা তাকে এড়িয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন। হাইকোর্ট এই সনদটি স্থগিত করতে পারেন।
১.২) শুনানি ছাড়া আদেশ দেওয়া (রিটের গ্রাউন্ড):
ধারা ৩৪ অনুযায়ী গ্রেফতারি পরোয়ানা বা ধারা ৪৪ অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার আগে যদি দায়িককে কারণ দর্শানোর (Show Cause) সুযোগ না দেওয়া হয়।
ক. ৩৪ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে গ্রেফতার:
৩৪(১) ধারায় গ্রেফতারি পরোয়ানা (WA) জারি করার আগে দায়িককে কিস্তি দেওয়ার সুযোগ (৪৯ ধারা) বা তার অপারগতার কারণ ব্যাখ্যার সুযোগ না দেওয়া। ঋণগ্রহীতা হয়তো অসুস্থ বা তার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে—এই কথাগুলো বলার সুযোগ না দিয়েই যান্ত্রিকভাবে জেলে পাঠানো Natural Justice-এর লঙ্ঘন।
খ. তৃতীয় পক্ষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা (Violation of 3rd Party Rights):
যদি এমন কোনো সম্পত্তি নিলামে তোলা হয় যা ঋণগ্রহীতা অন্য কারো (তৃতীয় পক্ষ) কাছে বৈধভাবে বিক্রি করেছিলেন, কিন্তু আদালত সেই তৃতীয় পক্ষকে মামলায় যুক্ত হওয়ার (Order 1 Rule 10 of CPC) বা তার বক্তব্য শোনার আবেদন খারিজ করে দেন।
২. পক্ষপাতহীন বিচার (Nemo Judex in Causa Sua):
Conflict of interest (স্বার্থের সংঘাত):
এই নীতির অর্থ হলো—কোনো ব্যক্তি নিজের মামলায় নিজে বিচারক হতে পারবেন না বা বিচারককে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। যদি বিচারকের conflict of interest (স্বার্থের সংঘাত) থাকে অর্থাৎ যদি বিচারকের সাথে ডিক্রিদার ব্যাংকের কোনো সরাসরি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে বা বিচারক কোনো বিশেষ পক্ষের প্রতি প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেন। যদি আদালতের আচরণে মনে হয় যে বিচার প্রক্রিয়াটি পূর্বনির্ধারিত (Pre-determined) এবং দায়িকের যুক্তি শোনার আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
General Constitutional Precedent (Audi Alteram Partem):
আপিল বিভাগের একাধিক নজিরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, আইনে স্পষ্টভাবে 'শুনানির সুযোগ দেওয়ার' কথা লেখা না থাকলেও, যখন কোনো আদেশের ফলে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি বা অধিকার খর্ব হয়, তখন 'Natural Justice'-এর নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে।
উদাহরণ (কিস্তির আবেদন সরাসরি খারিজ):
ধারা ৪৯ অনুযায়ী দায়িক কিস্তির আবেদন করলে আদালতকে অবশ্যই তার আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। যদি আদালত কোনো শুনানি বা কারণ ছাড়াই আবেদনটি সরাসরি নাকচ করে দেন, তবে সেটি 'Audi Alteram Partem' নীতির লঙ্ঘন।
৩. যুক্তিযুক্ত আদেশ (Speaking Order/Reasoned Decision):
ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রতিটি আদেশের পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে হবে। যদি আদালত কোনো নথিপত্র বা প্রমাণের বিশ্লেষণ না করে কেবল "আবেদন মঞ্জুর করা হলো" বা "পরোয়ানা জারি করা হোক"—এ ধরণের যান্ত্রিক (Mechanical) আদেশ দেন, তবে তা Natural Justice লঙ্ঘন। আদালত যখন গ্রাউন্ড উল্লেখ না করেই আদেশ (Non-speaking Order) দেন অর্থাৎ আদালত যখন কোনো আবেদন (যেমন- আরজি খারিজ বা সুদ মওকুফের আবেদন) খারিজ করেন, তখন কেন খারিজ করলেন তার কোনো যৌক্তিক কারণ আদেশে উল্লেখ না করা (Failure to pass a 'Reasoned/Speaking Order')। এটিও Natural Justice নীতির লঙ্ঘন।
উদাহরণ (গ্রেফতারি পরোয়ানা (WA)):
ধারা ৩৪(২) অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। যদি আদালত নোটিশ ছাড়াই সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করেন, তবে দায়িকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা খর্ব হয়। এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে সরাসরি রিটযোগ্য।
উপসংহার:
Natural Justice বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার হলো বিচারের আত্মা। অর্থ ঋণ আদালত যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন, কোনো নাগরিকের কথা না শুনে তার সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া বা তাকে জেলে পাঠানোর ক্ষমতা এই আদালতের নেই। যদি কোনো ব্যাংক বা আদালত তড়িঘড়ি করে এই অলিখিত কিন্তু সর্বোচ্চ আইনি নীতিটি লঙ্ঘন করে, তবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশন দায়ের করাই আপনার আইনি অধিকার পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অব্যর্থ উপায়।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com