অর্থজারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৮): ৩৩(৯) ডিক্রী জারী মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকে চ্যালেঞ্জ
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(৯) ধারা ডিক্রিজারী মামলার (Execution Case) একেবারে শেষ ধাপ। এই ধারায় বলা হয়েছে—উপ-ধারা (৫) এর অধীনে সম্পত্তির দখল ও ভোগের অধিকার অথবা উপ-ধারা (৭) এর অধীনে সম্পত্তির স্বত্ব ডিক্রীদারের অনুকূলে ন্যস্ত হলে, ধারা ২৮ এর বিধান সাপেক্ষে, উক্ত ডিক্রী জারী মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি (Final Disposal) হবে।
আপাতদৃষ্টিতে এটি মামলার সমাপ্তি মনে হলেও, যদি এই নিষ্পত্তির আদেশের পেছনে কোনো বেআইনি প্রক্রিয়া বা পদ্ধতিগত ত্রুটি থাকে, তবে একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে এই চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।
নিচে ৩৩(৯) ধারার ডিক্রিজারী মামলার চুড়ান্ত নিষ্পত্তি আদেশ চ্যালেঞ্জ করার প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ, উদাহরণ ও নজির আলোচনা করা হলো:
৩৩(৯) ধারায় নিষ্পত্তি চ্যালেঞ্জ করার গ্রাউন্ডসমূহ
ভিত্তিমূলের অবৈধতা (Illegality of the Foundation):
আইনের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— "Sublato fundamento cadit opus" (ভিত্তি যখন ধসে পড়ে, তার ওপর নির্মিত ইমারতও ধসে পড়ে)।
গ্রাউন্ড: ৩৩(৯) ধারার নিষ্পত্তি পুরোপুরি নির্ভর করে ৩৩(৫) বা ৩৩(৭) ধারার সনদের ওপর। যদি প্রথম বা দ্বিতীয় নিলাম (৩৩-১ বা ৩৩-৪) যথাযথভাবে না ডাকার কারণে ৩৩(৫) বা ৩৩(৭) সনদটি অবৈধ হয়, তবে সেই অবৈধ সনদের ওপর ভিত্তি করে ৩৩(৯) ধারায় জারী মামলা নিষ্পত্তি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা সরাসরি বাতিলযোগ্য।
বেআইনি দখল ও উচ্ছেদ (Illegal Physical Possession):
৩৩(৯) ধারায় মামলা নিষ্পত্তির আগে আদালতযোগে সম্পত্তির ভৌত দখল (Physical Possession) ডিক্রীদারকে বুঝিয়ে দিতে হয়।
গ্রাউন্ড: যদি আদালত বা ব্যাংক আইনি প্রক্রিয়া (যেমন- ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, আদালতের বেইলিপের মাধ্যমে দখল হস্তান্তর নোটিশ) অনুসরণ না করে গায়ের জোরে বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে দায়িককে উচ্ছেদ করে এবং আদালতে মিথ্যা কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট দিয়ে ৩৩(৯) ধারায় মামলা নিষ্পত্তি করে, তবে তা রিট করার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রাউন্ড।
২৮ ধারার বিধান সাপেক্ষে' শর্তের লঙ্ঘন (Violation of Section 28):
২৮ ধারার বিধান সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হলে ৩৩(৯) ধারার জারী মামলার নিস্পত্তি আদেশেকে চ্যালেঞ্জ করার এটি খুবই কৌশলগত গ্রাউন্ড (Violation of Section 28 - The Most Crucial Ground)। ৩৩(৯) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে— নিষ্পত্তিটি হবে "ধারা ২৮ এর বিধান সাপেক্ষে" (Subject to the provisions of Section 28)।
২৮ ধারার নিয়ম: এই ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংক যে সম্পত্তি গ্রহণ করছে তার মূল্য যদি ব্যাংকের পাওনা (ডিক্রিকৃত অর্থ) থেকে বেশি হয়, তবে ব্যাংককে সেই বাড়তি বা অতিরিক্ত অর্থ দায়িককে (Judgment Debtor) ফেরত দিতে হবে। যদি ফেরত না দিয়ে বা সমন্বয় না করে জারী মামলা পূর্ণ সন্তুষ্টিতে নিস্পত্তি করে দেন তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট দায়ের করার মাধ্যমে প্রতিকার পেতে পারেন।
গ্রাউন্ড: ২৮(৩) ধারা অনুযায়ী যদি ব্যাংক ও দায়িকের মধ্যে কোনো আপস-মীমাংসা (Solenama) হয়ে থাকে এবং দায়িক নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে থাকেন, এমতাবস্থায় ব্যাংক যদি জালিয়াতি করে বা তথ্য গোপন করে ৩৩(৭) সনদ নিয়ে মামলাটি ৩৩(৯) ধারায় নিষ্পত্তি করে দেয়, তবে তা সরাসরি আইনের লঙ্ঘন।
রিটের বাস্তব গ্রাউন্ড/উদাহরণ: যদি দেখা যায় যে, ১০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিকানা ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে যেখানে ব্যাংকের পাওনা ছিল মাত্র ২ কোটি টাকা, এবং আদালত ২৮ ধারার অধীনে এই অতিরিক্ত ৮ কোটি টাকার হিসাব সমন্বয় বা দায়িককে ফেরত দেওয়ার আদেশ না দিয়েই ৩৩(৯) ধারায় জারী মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে দেয়, তবে সেটি আইনের চোখে একটি চরম ভুল (Error of law on the face of record)। এই গ্রাউন্ডে বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পাওয়া যাবে।
বাস্তব উদাহরণ-১: নিলাম প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া (৩৩(৭) এর ক্ষেত্রে):
'ক' ব্যাংকের কাছে ১ কোটি টাকা ঋণের দায়ে 'খ'-এর একটি জমি বন্ধক আছে। আদালত ডিক্রি দেওয়ার পর ব্যাংক জারি মামলা করে। আইন অনুযায়ী, প্রথম নিলামে বিক্রি না হলে দ্বিতীয় নিলাম ডাকতে হবে। কিন্তু ব্যাংক ও আদালত যোগসাজশে বা ভুলে দ্বিতীয় নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই সরাসরি ৩৩(৭) ধারায় ব্যাংককে সম্পত্তির মালিকানার সনদ দিয়ে দেয়। 'খ' হাইকোর্টে রিট করে প্রমাণ করেন যে ৩৩(৩) ধারার বিধান মানা হয়নি। হাইকোর্ট সনদপত্রটি বাতিল করে দেবেন।
বন্ধক বহির্ভূত সম্পত্তি ন্যস্তকরণ:
যদি এমন কোনো সম্পত্তির ওপর ৩৩(৯) ধারায় নিষ্পত্তি টানা হয় যা দায়িক কখনোই বন্ধক দেননি (ভুল দাগ বা খতিয়ানের কারণে), তবে উক্ত নিষ্পত্তি আদেশ এখতিয়ার বহির্ভূত (Without Jurisdiction)।
এক্সপোর্ট বিল বা লিয়েনকৃত অর্থ সমন্বয় না করা:
যদি ব্যাংকের কাছে দায়িকের নগদ টাকা, এফডিআর (FDR) বা এক্সপোর্ট বিল জমা থাকে, তবে তা সমন্বয় (Adjust) না করে সরাসরি সম্পত্তি দখল নিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করে দেওয়া 'অন্যায্য ব্যাংকিং প্র্যাকটিস' এবং রিটযোগ্য।
অকাল নিষ্পত্তি (Premature Disposal):
দায়িক যদি আদালতে ডিক্রির টাকা কিস্তিতে বা এককালীন পরিশোধের জন্য কোনো আবেদন করে থাকেন এবং আদালত সেই আবেদনের শুনানি না করেই তড়িঘড়ি করে ৩৩(৯) ধারায় মামলা নিষ্পত্তি করে দেয়, তবে তা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন হিসেবে রিটযোগ্য হবে।
বাস্তব উদাহরণ-১ (২৮ ধারার সমন্বয় না করে ৩৩(৯) এ নিষ্পত্তি):
ব্যাংকের পাওনা ২ কোটি টাকা। নিলামে বিক্রি না হওয়ায় আদালত ৩৩(৭) ধারায় একটি বাণিজ্যিক ভবনের মালিকানা ব্যাংককে দেয়, যার সরকারি মৌজা মূল্য বা বাজারমূল্য ৫ কোটি টাকা। এরপর আদালত ৩৩(৯) ধারায় জারী মামলাটি "চূড়ান্ত নিষ্পত্তি" বলে আদেশ দেয়। কিন্তু ২৮ ধারা অনুযায়ী দায়িকের যে ৩ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার কথা, আদালত সে বিষয়ে নীরব থাকে। দায়িক এই আদেশের বিরুদ্ধে রিট করলে হাইকোর্ট ৩৩(৯) এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আদেশটি বেআইনি ঘোষণা করে স্থগিত করবেন এবং ২৮ ধারার বিধান পরিপালনের নির্দেশ দেবেন।
বাস্তব উদাহরণ-২ (কাগজে-কলমে দখল ও নিষ্পত্তি):
ব্যাংক জারি মামলায় ৩৩(৭) ধারায় মালিকানা সনদ পেল। কিন্তু বাস্তবিকভাবে ঋণগ্রহীতা এখনো সেই ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন চালাচ্ছেন এবং কোনো উচ্ছেদ নোটিশ পাননি। ব্যাংক আদালতের লোকজনের সাথে যোগসাজশ করে একটি 'কাগজে-কলমে' (Paper Transaction) দখল হস্তান্তরের রিপোর্ট জমা দিল এবং আদালত ৩৩(৯) ধারায় জারী মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে দিলেন।
প্রতিকার: ঋণগ্রহীতা হাইকোর্টে রিট করে প্রমাণ করতে পারেন যে আইনি প্রক্রিয়ায় ভৌত দখল হস্তান্তর হয়নি। হাইকোর্ট উক্ত ৩৩(৯) এর আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ দিতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ-৩ (ত্রুটিপূর্ণ নিলামের ওপর ভিত্তি করে নিষ্পত্তি):
ব্যাংক কোনো জাতীয় দৈনিকে নিলামের বিজ্ঞাপন না দিয়েই ৩৩(৫) এর সার্টিফিকেট নিল এবং এরপর ৩৩(৯) ধারায় মামলা নিষ্পত্তি করাল।
প্রতিকার: যেহেতু মূল নিলাম প্রক্রিয়াই (৩৩-১) ত্রুটিপূর্ণ ছিল, তাই হাইকোর্ট ৩৩(৯) ধারার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আদেশকে "Void ab initio" (শুরু থেকেই বাতিল) ঘোষণা করতে পারেন।
উপসংহার:
৩৩(৯) ধারায় জারী মামলার "চূড়ান্ত নিষ্পত্তি" মানেই আইনি লড়াইয়ের শেষ নয়। যদি ব্যাংক বা আদালত এই নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় পৌঁছানোর জন্য কোনো বেআইনি পথ অবলম্বন করে বা দায়িকের আইনি অধিকার ক্ষুণ্ণ করে, তবে হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ার (Writ Jurisdiction) ব্যবহার করে সেই 'চূড়ান্ত নিষ্পত্তি'কেও পুনরায় উন্মুক্ত (Re-open) এবং বাতিল করা সম্পূর্ণ আইনসম্মত। অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ৩৩(৭) এবং ৩৩(৯) ধারা দুটি একে অপরের পরিপূরক। ৩৩(৭) ধারার মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর হয় এবং ৩৩(৯) ধারার মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ার যবনিকা টানা হয়। এই চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা একটি অত্যন্ত কার্যকরী আইনি প্রতিকার, বিশেষ করে যখন আদালত ২৮ ধারার বিধান (সম্পত্তির অতিরিক্ত মূল্য ফেরত) সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দায়িককে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে মামলাটি নিষ্পত্তি করে দেয়। তবে রিট দায়ের করার সময় অবশ্যই আদেশের মধ্যে দৃশ্যমান চরম বেআইনি কার্যকলাপ (Gross Illegality) প্রমাণ করতে হবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com