অর্থজারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৬): ৩৩(৫) ধারার দখল-সার্টিফিকেট ইস্যুকে চ্যালেঞ্জ

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(৫) ধারা অনুযায়ী, যখন কোনো সম্পত্তি উপ-ধারা (১), (২), (২ক), (২খ), (২গ), (৩) ও (৪) এর বিধান অনুসারে বিক্রয় করা সম্ভব হয় না, তখন আদালত উক্ত সম্পত্তি ডিক্রীদারের (ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান) অনুকূলে 'দখল ও ভোগের অধিকারসহ' ন্যস্ত করে একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করেন। এটি ঋণগ্রহীতার জন্য একটি চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে তিনি সম্পত্তির দখল হারান। এখানে উল্লেখ করে রাখা প্রয়োজন যে, ৩৩(৫) ধরার সার্টিফিকেটের মাধ্যমে ডিক্রীদারের (ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান) অনুকূলে মালিকানা হস্তান্তর করা হয় না, শুধু 'দখল ও ভোগের অধিকারসহ' ন্যস্ত কর হয়। এই সার্টিফিকেট ইস্যুর ক্ষেত্রে আইনগত কোন বিচ্যুতি বা পদ্ধতিগত কোনো ভুল থাকলে পর সংক্ষুব্ধ পক্ষ হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন এবং প্রতিকার পেতে পারেন।

৩৩(৫) ধারার সার্টিফিকেট চ্যালেঞ্জ করার প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ:
আইনের ৩৩(৫) ধারার শুরুতেই বলা হয়েছে—"উপ-ধারা (১), (২), (২ক), (২খ), (২গ), (৩) ও (৪) এর বিধান অনুসারে বিক্রয় করা সম্ভব না হইলে..."। এর অর্থ হলো, এই সার্টিফিকেট পাওয়ার আগে ব্যাংক ও আদালতকে পূর্ববর্তী প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে পালন করতে হবে। এর কোনো একটিতে বিচ্যুতি ঘটলে ৩৩(৫) এর সার্টিফিকেট অবৈধ হবে এবং এই বিচ্যুতিকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে। 

১. পূর্ববর্তী নিলাম ও প্রচারণায় ত্রুটি (Violation of Section 33(1) & 33(4)):
আ৩৩(৫) সার্টিফিকেট দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো অন্তত দুইবার, ৩৩(১) এবং ৩৩(৪) ধারায়, যথাযথ নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রচার করে নিলামের চেষ্টা করা। ৩৩(৫) ধারার সার্টিফিকেট তখনই ইস্যু করা যাবে যখন ৩৩(১), (২), (৩) এবং (৪) ধারার বিধান অনুযায়ী সম্পত্তি বিক্রয় করা সম্ভব হয় না। যদি প্রথম নিলাম বিজ্ঞপ্তি (৩৩-১), তৎপরবর্তীতে দ্বিতীয় নিলামের বিজ্ঞপ্তি (৩৩-৪) বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত না হয় অথবা ১৫ দিনের ন্যূনতম সময় না দিয়ে নিলাম ডাকা হয় অথবা ৩৩(১), (২), (৩) এবং (৪) ধারার কোন একটি বিধান লঙ্ঘন হয়, এই লঙ্ঘন, বিচ্যুতি বা অপ্রতিপালন সত্ত্বেও ৩৩(৫) ধারায় সার্টিফিকেটটি ইস্যু করা হলে সেই দখল-সার্টিফিকেটটি আইনত বাতিলযোগ্য হবে এবং ৩৩(৫) এর দখল-সার্টিফিকেটটি কে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে।

২. নিলামের ক্রম বা সিকোয়েন্স লঙ্ঘন (Violation of Auction Sequence):
আইন অনুযায়ী, অন্তত দুইবার (৩৩-১ এবং ৩৩-৪ ধারায়) যথাযথভাবে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রচার করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রথম নিলাম (৩৩-১) বিফল হওয়ার পর আদালত দ্বিতীয়বার নিলাম (৩৩-৪) না ডেকেই সরাসরি ডিক্রিদার (ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান) কে ৩৩(৫) এর দখল-সার্টিফিকেট দিয়ে দেন। এটি ৩৩(৫) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ আইনে উপ-ধারা (৪) এর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। যদি আদালত মাত্র একবার নিলাম ডাকার পর দ্বিতীয়বার নিলামের চেষ্টা না করেই সরাসরি ব্যাংককে ৩৩(৫) সার্টিফিকেট দিয়ে দেন, তবে তা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইনের এই লঙ্ঘনকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে।

উদাহরণ: একটি ব্যাংক জারি মামলায় ৩৩(১) ধারায় প্রথম নিলাম ডাকল। কোনো দরদাতা পাওয়া গেল না। ব্যাংক এরপর ৩৩(৪) ধারায় দ্বিতীয়বার নিলাম ডাকার আবেদন না করেই সরাসরি আদালতকে অনুরোধ করল ৩৩(৫) ধারায় সার্টিফিকেট দিতে। আদালত ব্যাংকের আবেদন মঞ্জুর করে সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন। এটি সরাসরি ৩৩(৫) ধারার পরিপন্থী, কারণ এখানে উপ-ধারা (৪) পরিপালিত হয়নি।

৩. দরপত্র দাতার জামানত ও পদ্ধতিগত ভুল (Section 33(2) & 33(2b)):
যদি নিলামে কোনো দরদাতা অংশগ্রহণ করে থাকেন কিন্তু আদালত তার জামানত (১০%, ১৫% বা ২০%) বা মূল্য পরিশোধের সময়সীমা (৩০, ৬০ বা ৯০ দিন) সংক্রান্ত জটিলতায় তাকে সুযোগ না দিয়ে সরাসরি ৩৩(৫)-এ চলে যান, তবে এই পদ্ধতিগত ত্রুটিকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে।

৪. দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে সুযোগ না দেওয়া (Section 33(3)):
৩৩(৩) ধারা অনুযায়ী, প্রথম সর্বোচ্চ দরদাতা ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে সুযোগ দিতে হয়। আদালত যদি এই ধাপটি এড়িয়ে সরাসরি ব্যাংককে সার্টিফিকেট দিয়ে দেন, তবে তা বেআইনি। এই বেআইনি পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে।

৫. বন্ধকী সম্পত্তির ভুল বর্ণনা (Misdescription of Property):
যদি ৩৩(৫) সার্টিফিকেটে উল্লিখিত সম্পত্তির তফসিল, দাগ নম্বর বা খতিয়ান মূল বন্ধকী দলিলের সাথে না মিলে বা ভুল থাকে, তবে উক্ত সার্টিফিকেট অকার্যকর। ভুল সম্পত্তির ওপর সার্টিফিকেট ইস্যু করা এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ। ৩৩(৫) সার্টিফিকেটে বন্ধকী সম্পত্তির তফসিলের বাইরে কোন সম্পত্তি উল্লেখ করলে সেই সার্টিফিকেট অবৈধ ও বেআইনি হবে। তখন এই ৩৩(৫) সার্টিফিকেটকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে। 

উদাহরণ: সার্টিফিকেটে যে সম্পত্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা মূল বন্ধকী দলিলের সাথে মিলছে না। এমতাবস্থায় ৩৩(৫) এর সার্টিফিকেট চ্যালেঞ্জ করে রিট করলে হাইকোর্ট উক্ত সার্টিফিকেটের কার্যকারিতা স্থগিত করতে পারেন।

৬. সম্পত্তির অস্বাভাবিক অবমূল্যায়ন (Gross Undervaluation):
৩৩(২গ) অনুযায়ী, দরপত্রে প্রস্তাবিত মূল্য যদি 'অস্বাভাবিকভাবে কম' হয় এবং ডিক্রীদার তা অগ্রাহ্য করার আবেদন করে, তবে আদালত তা পুনরায় নিলামে তুলতে পারেন। যদি ব্যাংক উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো দরপত্র অগ্রাহ্য করিয়ে সরাসরি ৩৩(৫) দখল নিতে চায়, সম্পত্তিটি নিজের দখলে নেওয়ার জন্য প্রতারণামূলক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেয়, তবে সেই প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে।

৭. আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার (Natural Justice):
৩৩(৫) ধারায় সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে ন্যস্ত করার আগে দায়িককে (Judgment Debtor) শোকজ নোটিশ না দেওয়া বা তার কোনো ওজর-আপত্তি শোনার সুযোগ না দেওয়া Natural Justice পরিপন্থী।

৮. এক্সপোর্ট বিল বা অন্যান্য জমা সমন্বয় না করা:
যদি ব্যাংকের কাছে বিবাদীর লিয়েন করা কোনো টাকা বা এক্সপোর্ট বিল জমা থাকে যা দিয়ে ডিক্রির টাকা আংশিক বা পূর্ণ সমন্বয় সম্ভব ছিল, তা না করে সরাসরি সম্পত্তি দখল নেওয়া অন্যায্য।

ঋণগ্রহীতার হাইকোর্টে রিট করার গ্রাউন্ডে:
আইনের ৩৩(৪) ধারার বিধান (দ্বিতীয়বার নিলাম) পালন না করে সরাসরি ৩৩(৫)-এ যাওয়া হয়েছে। তাকে এই মালিকানা হস্তান্তরের আগে কোনো শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়নি। সম্পত্তির মূল্য অনেক কম দেখিয়ে ব্যাংক লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছে। হাইকোর্ট এক্ষেত্রে ৩৩(৫) সার্টিফিকেটটি স্থগিত (Stay) করতে পারেন এবং পুনরায় আইনানুগ নিলামের নির্দেশ দিতে পারেন।

ঋণগ্রহীতার রিট পিটিশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রতিকার:
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ যেসব প্রতিকার দিতে পারেন সেগুলো হলো- Stay of the Certificate- ৩৩(৫) সার্টিফিকেটের কার্যকারিতা এবং দখল হস্তান্তরের ওপর স্থগিতাদেশ, Setting aside the Order/Suit- যদি পদ্ধতিগত ভুল প্রমাণিত হয়, তবে সার্টিফিকেটটি বাতিল করা, Direction for Re-Auction- নতুন করে যথাযথ প্রচারণা ও সঠিক মূল্যায়নে নিলাম ডাকার নির্দেশ, Installment Opportunity- ডিক্রিকৃত টাকার একটি অংশ (যেমন- ১০% বা ১৫%) জমা দেওয়ার শর্তে ৩৩(৫) স্থগিত করে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ।

উপসংহার:
৩৩(৫) ধারার সার্টিফিকেটটি একটি আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যদি সেই কাঠামোর কোনো একটি স্তম্ভ (অর্থাৎ উপ-ধারা ১ থেকে ৪) দুর্বল হয় বা ভঙ্গ করা হয়, তবে সার্টিফিকেটটি অবৈধ হয়ে পড়বে। যদি ৩৩(১) থেকে ৩৩(৪) পর্যন্ত কোনো একটি ধাপে আইনি ব্যত্যয় ঘটে, তবে ৩৩(৫) সার্টিফিকেটটি বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়বে। তাই ব্যাংক যখন ৩৩(৫) এর সার্টিফিকেট চায়, তখনই দায়িককে দেখতে হবে আইনের প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না। তাই ব্যাংক যখন ৩৩(৫) এর আবেদন করে, তখনই বিবাদীর উচিত সচেতন হওয়া এবং কোনো অনিয়ম থাকলে দ্রুত উচ্চ আদালতের আশ্রয় নেওয়া।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com