অর্থঋণ মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৩): জামানত বিক্রয় বা নিলাম বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ

 আপনি জানেন কি- আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বরাবরে আপনার জামানতকৃত বা বন্ধকী সম্পত্তি বে-আইনি ও অবৈধভাবে বিক্রয় করলে বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নিলাম বিজ্ঞপ্তি দিলে পর আপনি বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন এবং প্রতিকার পেতে পারেন? আপনি কি জানেন যে- এই সংক্রান্তে হাইকোর্টে আসা এবং প্রতিকার চাওয়া আপনার একটি মৌলিক অধিকার? আর এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের? যদি না জানেন, তবে আসুন জেনে নেই যে, জামানত বিক্রয় বা নিলাম বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে কিভাবে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন;

অর্থঋণ মামলা দায়েরের পূর্বশর্ত? (Condition Precedent):
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ১২(১), ১২(২) ও ১২(৩) ধারায় বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক অর্থঋণ মামলা দায়ের করতে হবে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয় না করে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঋণ পরিশোধ বাবদ সমন্বয় না করে, অথবা বিক্রয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ না হয়ে, অর্থ ঋণ আদালতে কোন মামলা দায়ের করতে পারবে না।

১২ ধারার ১ ও ২ উপধারায় বলা হয়েছে যে;
১২(১) উপ-ধারা (২) এর বিধান সাপেক্ষে, কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উহার নিজ দখল বা নিয়ন্ত্রণে থাকা বিবাদীর কোন সম্পত্তি যাহা পণ বা বন্ধক (Lien or pledge) রাখিয়া ঋণ প্রদান করা হইয়াছে, এবং যাহা বিক্রয় করিবার আইনগত অধিকার বাদীর রহিয়াছে বা বাদীকে অর্পণ করা হইয়াছে, উহা বিক্রয় না করিয়া এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঋণ পরিশোধ বাবদ সমন্বয় না করিয়া, অর্থ ঋণ আদালতে কোন মামলা দায়ের করিবে না৷
(২) উপ-ধারা (১) এর বিধান সত্ত্বেও, কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজ দখল বা নিয়ন্ত্রণে থাকা পণ বা বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয় না করিয়া মামলা দায়ের করিলে অনতিবিলম্বে উক্ত সম্পত্তি পূর্ব-বর্ণিত মতে বিক্রয় করিয়া বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঋণের সহিত সমন্বয় করিবে এবং বিষয়টি আদালতকে লিখিতভাবে অবহিত করিবে৷
(৩) কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিবাদীর নিকট হইতে কোন স্থাবর সম্পত্তি (Immovable Property) বন্ধক (Mortgage) রাখিয়া অথবা অস্থাবর সম্পত্তি (Movable Property) দায়বদ্ধ রাখিয়া (Hypothecated) ঋণ প্রদান করিলে এবং বন্ধক প্রদান বা দায়বদ্ধ রাখার সময় বন্ধকী বা দায়বদ্ধ সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হইয়া থাকিলে, উহা বিক্রয় না করিয়া এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঋণ পরিশোধ বাবদ সমন্বয় না করিয়া, অথবা বিক্রয়ের চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ না হইয়া, অর্থ ঋণ আদালতে কোন মামলা দায়ের করিবে না।

আইনের ১২(১) ধারার মূল চেতনা হলো—আদালতের সময় নষ্ট না করে আগে গচ্ছিত সম্পদ থেকে টাকা আদায় করা। যদি ব্যাংক ১২ ধারা পরিপালন না করে সরাসরি মামলা করে, তবে সেই মামলাটিই অচল (Non-maintainable) হয়ে পড়ে।

বাস্তব উদাহরণ:
একটি টেক্সটাইল মিল ব্যাংক থেকে ১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তাদের কারখানাটি বন্ধক রেখেছে। কারখানার বর্তমান বাজারমূল্য ১৫ কোটি টাকা। ব্যাংক কোনো নোটিশ না পাঠিয়ে এবং বড় কোনো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে একটি স্থানীয় পত্রিকায় ছোট করে নিলামের খবর ছাপাল। এরপর মাত্র ৫ কোটি টাকায় জনৈক ক্রেতার কাছে কারখানাটি বিক্রি করে দিল এবং বাকি ৫ কোটি টাকার জন্য অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করল।

১২ ধারায় জামানত বিক্রয় বা নিলাম বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ:
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ১২ ধারা অনুযায়ী, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো ঋণ আদায়ের মামলা দায়ের করার আগে বন্ধকী সম্পত্তি (Collateral) বিক্রির মাধ্যমে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করা আইনত বাধ্যতামূলক। এই প্রক্রিয়াকে "Condition Precedent" বা মামলা দায়েরের পূর্বশর্ত বলা হয়। যদি এই প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যত্যয় ঘটে, তবে আপনি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হিসাবে হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ১২ ধারায় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বরাবরে বন্ধকী বা জামানতকৃত সম্পত্তি বিক্রয় করা বা বিক্রয়ের জন্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিধান বলে দেওয়া আছে। এই ১২ ধারায় সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা due process বা legal procedure উল্লেখ রয়েছে। কোন  আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি এই process বা procedure বা প্রক্রিয়া অনুসরন না করে জামানতকৃত সম্পত্তি বিক্রয়ের বিজ্ঞপ্তি দেয় কিংবা বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয় করে দিলে, বন্ধকী সম্পত্তির বাইরের সম্পত্তি বিক্রয়ের বিজ্ঞপ্তি দিলে, বিজ্ঞপ্তি প্রচারের তারিখ হতে ১৫ দিনের সময় না দিলে, সীলমোহরকৃত টেন্ডার আহ্বান না করলে, উক্ত বিজ্ঞপ্তি কমপক্ষে বহুল প্রচারিত ১টি বাংলা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এবং স্থানীয় ১টি পত্রিকায় প্রকাশ না করলে, আদালতের নোটিশ বোর্ডে উক্ত বিজ্ঞপ্তি লটকাইয়া না দিলে, এবং স্থানীয়ভাবে ঢোল সহরত যোগেও উক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রচার না করলে উক্ত বিক্রয় প্রক্রিয়া বা নিলাম বিজ্ঞপ্তি বেআইনি, অবৈধ ও অরক্ষনীয় হিসাবে পরিগণিত হবে। আপনি উক্ত প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন এবং সেমতে প্রতিকার পেতে পারেন।


ধারা ১২ মতে নিলাম চ্যালেঞ্জ করার প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ:
ক. বন্ধকদাতাকে নোটিশ জারিতে ব্যর্থতা (Failure to serve Notice):
১২ ধারার অধীনে নিলাম করার আগে ঋণগ্রহীতা এবং বন্ধকদাতাকে (Mortgagor) সুনির্দিষ্ট নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। যদি ব্যাংক নোটিশ না দিয়েই নিলাম প্রক্রিয়া শুরু করে, তবে তা সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। এই গ্রাউন্ডে নিলাম প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

খ. ১২(৩) ধারায় নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ সংক্রান্ত অনিয়ম (Irregularity in Publication):
আইনের ১২(৩) ধারা অনুযায়ী, নিলামের বিজ্ঞপ্তি অন্তত দুটি বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় (একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি) প্রকাশ করতে হবে। যদি কোনো নামসর্বস্ব বা অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় এবং এটা যদি mala fide intention নিয়ে করা হয় তবে সেই নিলাম চ্যালেঞ্জযোগ্য। এই গ্রাউন্ডে নিলাম প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

গ. সম্পত্তির অবমূল্যায়ন (Undervaluation of Property):
ব্যাংক অনেক সময় কম দামে সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সম্পত্তির বাজারমূল্য (Market Value) অনেক কম দেখিয়ে নিলাম ডাকে। যদি দেখা যায় যে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্যের চেয়ে নিলামের সংরক্ষিত মূল্য (Reserve Price) অনেক কম ধরা হয়েছে, তবে এটি একটি প্রতারণামূলক নিলাম হিসেবে গণ্য হবে। এই গ্রাউন্ডে নিলাম প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

ঘ. পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া (Insufficient Time Period):
নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দরপত্র জমার জন্য আইনত ১৫ দিনের সময় দিতে হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রচারের তারিখ হতে ১৫ দিনের সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি করে নিলাম সম্পন্ন করা হলে এই গ্রাউন্ডে নিলাম প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে।

ঙ. যোগসাজশ বা জালিয়াতি (Collusion or Fraud):
যদি ব্যাংক কর্মকর্তা এবং নিলাম ক্রেতার মধ্যে কোনো গোপন যোগসাজশ থাকে এবং অত্যন্ত কম দামে সম্পত্তিটি হস্তান্তর করা হয়, তবে তাকে "Sham Auction" বলা হয়। এটি একটি শক্তিশালী রিট গ্রাউন্ড। এই গ্রাউন্ডে নিলাম প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

চ.বন্ধকী সম্পত্তির বাইরের সম্পত্তি বিক্রয়:
বন্ধকী সম্পত্তির বাইরের সম্পত্তি বিক্রয়ের নিলাম বিজ্ঞপ্তি দিলে বা বিক্রয় করলে, Mortgaged property ছাড়া অন্য সম্পত্তি বিক্রি করলে, Guarantor/third party interest উপেক্ষা করলে, এবং Co-owner বা guarantor-কে notice না দিলে নিলাম প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

বিচারিক নজির:
আনোয়ার বেগম মামলায়, উচ্চ আদালত এটা স্পষ্ট করেছেন যে, ১২ ধারার বিধানগুলো অনুসরণ করা ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ঋণগ্রহীতার সম্পত্তির অধিকার রক্ষার একটি আইনি সুরক্ষা।

সোনালী ব্যাংক মামলায় উচ্চ আদালত বলেছেন, যদি ব্যাংক ১২ ধারার নিলাম প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন না করে মামলা দায়ের করে, তবে সেই মামলার আরজি (Plaint) খারিজযোগ্য।

পূবালী ব্যাংক মামলায় উচ্চ আদালত বলেছেন, নিলাম প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে এবং বিজ্ঞপ্তিতে সম্পত্তির সঠিক বর্ণনা ও মূল্য থাকতে হবে। এর অন্যথা হলে হাইকোর্ট উক্ত নিলাম বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন।

রিট পিটিশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রতিকার:
১২ ধারার নিলাম চ্যালেঞ্জ করে রিট করলে হাইকোর্ট সাধারণত যেই আদেশগুলো দিয়ে থাকেন সেগুলো হলো; Stay of Auction- নিলামের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ, Cancellation of Sale- যদি বিক্রি সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে সেই বিক্রয় দলিল বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণা করা, Direction for Re-valuation- একজন নিরপেক্ষ সার্ভেয়ার দিয়ে সম্পত্তির পুনরায় মূল্য নির্ধারণের নির্দেশ, এবং set aside the Artha Rin Suit- যদি ১২ ধারা না মেনে মামলা করা হয়, তবে মূল অর্থঋণ মামলার কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করা।

উপসংহার: 
১২ ধারার নিলাম প্রক্রিয়া কেবল ব্যাংককে ক্ষমতা দেয় না, এটি ঋণগ্রহীতার ওপর একটি দায়বদ্ধতাও তৈরি করে। যদি ব্যাংক এই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তবে তা সরাসরি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ (আইনের আশ্রয় লাভ) এবং অনুচ্ছেদ ৪২ (সম্পত্তির অধিকার)-এর লঙ্ঘন। তাই নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে সামান্যতম ত্রুটি থাকলেও দ্রুত উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com