বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-২২): ডোমেইন নাম (domain names) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ
ভূমিকা:
ইন্টারনেটের এই যুগে একটি প্রতিষ্ঠানের "ডোমেইন নাম" (Domain Name) তার ডিজিটাল পরিচয় ট্রেডমার্কের সমতুল্য। ই-কমার্স, স্টার্টআপ বা যেকোনো আধুনিক ব্যবসার জন্য একটি সঠিক ডোমেইন নাম (যেমন: abc.com, xyyz.com.bd) তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালুর অন্যতম প্রধান অংশ। ডোমেইন নামের বাণিজ্যিক মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় বিশ্বব্যাপী এর মালিকানা এবং ব্যবহার নিয়ে প্রতিনিয়ত জটিল আইনি বিরোধ তৈরি হয়।
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৬)-তে মেধা সম্পদের অন্যান্য উপাদানের (যেমন- ট্রেডমার্ক, কপিরাইট) পাশাপাশি "ডোমেইন নাম" (Domain Names) সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধকে সুস্পষ্টভাবে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ডোমেইন হাইজ্যাক, সাইবারস্কোয়াটিং বা ডোমেইন চুক্তি ভঙ্গের মতো আধুনিক ডিজিটাল অপরাধ ও বিরোধগুলোর বিচার এখন বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
নিচে ডোমেইন নাম সংক্রান্ত প্রধান বাণিজ্যিক বিরোধসমূহ, মামলা দায়েরের সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ড (কারণ) এবং সেগুলোর বাস্তব উদাহরণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. সাইবারস্কোয়াটিং বা অসৎ উদ্দেশ্যে ডোমেইন দখল (Cybersquatting):
ডোমেইন নাম সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বিরোধ হলো 'সাইবারস্কোয়াটিং'। যখন কোনো অসাধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো বিখ্যাত ব্র্যান্ড বা ট্রেডমার্কের নাম ব্যবহার করে বদ উদ্দেশ্যে (Bad faith) ডোমেইন নিবন্ধন করে রাখে, তখন এই বিরোধ সৃষ্টি হয়। এদের মূল উদ্দেশ্য থাকে ওই ডোমেইনটি আসল ব্র্যান্ড মালিকের কাছে চড়া দামে বিক্রি করা।
মামলার পেক্ষাপট: সাইবারস্কোয়াটিং হলো এমন একটি অপরাধ যেখানে কোনো ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে (Bad faith) এমন কোনো ডোমেইন নাম কিনে রাখে, যা অন্য কোনো বিখ্যাত কোম্পানি, ব্র্যান্ড বা ব্যক্তির ট্রেডমার্কের সাথে হুবহু মিলে যায়। সাইবারস্কোয়াটারদের মূল উদ্দেশ্য থাকে ওই বিখ্যাত কোম্পানির কাছে ডোমেইনটি পরবর্তীতে বিশাল অঙ্কের টাকায় বিক্রি করা (Ransom)। এই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিরুদ্ধে মূল কোম্পানি মামলা করতে পারে।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) বাদীর নিবন্ধিত ট্রেডমার্ক বা সুপরিচিত ব্র্যান্ডের হুবহু বা বিভ্রান্তিকরভাবে সদৃশ ডোমেইন নাম নিবন্ধন করা। (২) ওই ডোমেইন নামের ওপর বিবাদীর কোনো বৈধ অধিকার বা ব্যবসায়িক স্বার্থ না থাকা। এবং (৩) ডোমেইনটি চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে (Extortion) বা চড়া দামে বিক্রির জন্য (Bad faith registration) আটকে রাখা।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ব্র্যান্ডের নাম দখল):
ধরুন, বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য শিল্পগোষ্ঠী "মেঘনা গ্রুপ" নতুন একটি সাব-ব্র্যান্ড "MeghnaPay" বাজারে আনার ঘোষণা দিল। এই খবর শুনে এক অসাধু ব্যক্তি দ্রুত meghnapay.com এবং meghnapay.com.bd ডোমেইনগুলো নিজের নামে কিনে রাখল। এরপর মেঘনা গ্রুপ যখন ডোমেইনগুলো কিনতে গেল, তখন ওই ব্যক্তি ২ কোটি টাকা দাবি করল। মেঘনা গ্রুপ তখন "সাইবারস্কোয়াটিং ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের" সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ডে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে ডোমেইনগুলোর মালিকানা দাবি করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (দেশীয় ব্র্যান্ড):
'Apex' বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য পাদুকা ব্র্যান্ড। একজন অসাধু ব্যক্তি আগে থেকেই www.apexshoes.com.bd ডোমেইনটি কিনে রাখল। যখন এপেক্স কোম্পানি তাদের ওয়েবসাইট বানাতে গেল, তখন ওই ব্যক্তি ডোমেইনটি ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করল। এপেক্স কোম্পানি ওই সাইবারস্কোয়াটারের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে ডোমেইনটির মালিকানা উদ্ধার করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড):
একজন লোকাল ব্যবসায়ী বাংলাদেশে 'Tesla' কোম্পানির কোনো উপস্থিতি না থাকার সুযোগে www.tesla.com.bd ডোমেইনটি নিবন্ধন করে রাখল। পরবর্তীতে টেসলা যখন বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে আসবে, তখন তারা এই অসৎ উদ্দেশ্যে ডোমেইন দখলের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে সাইবারস্কোয়াটিংয়ের মামলা দায়ের করবে।
২. টাইপোস্কোয়াটিং বা নামের বানান বিকৃতি (Typosquatting / URL Hijacking):
টাইপোস্কোয়াটিং হলো সাইবারস্কোয়াটিং-এর একটি ধরন, যেখানে অসাধু ব্যক্তিরা কোনো জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের নামের সাধারণ ভুল বানান (Typographical error) দিয়ে ডোমেইন নিবন্ধন করে। এর উদ্দেশ্য থাকে ব্যবহারকারীদের ভুল পথে পরিচালিত করে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে টাকা আয় করা বা ফিশিং (Phishing) করা।
মামলার প্রেক্ষাপট: টাইপোস্কোয়াটিং হলো জনপ্রিয় কোনো ওয়েবসাইটের নামের বানানে খুব সামান্য ভুল (Typo) করে নতুন ডোমেইন কেনা। এর উদ্দেশ্য হলো, ব্যবহারকারীরা যখন তাড়াহুড়ো করে মূল ওয়েবসাইটের নাম টাইপ করতে গিয়ে ভুল বানান লেখে, তখন তাদের ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে গিয়ে বিজ্ঞাপনের টাকা আয় করা বা ফিশিংয়ের (Phishing) মাধ্যমে তাদের ডেটা চুরি করা। মূল ডোমেইনের মালিক এর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ ও ডোমেইন বাতিলের মামলা করতে পারেন।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) বাদীর ওয়েবসাইটের নামের ইচ্ছাকৃত ভুল বানান (যেমন একটি অক্ষর কম বা বেশি) ব্যবহার করে ডোমেইন তৈরি করা। (২)বাদীর ওয়েবসাইটের ট্রাফিক (Traffic) অন্যায়ভাবে নিজের ওয়েবসাইটে ডাইভার্ট করে ব্যবসায়িক ক্ষতি সাধন করা। এবং, (৩) ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করে নকল পণ্য বিক্রি বা ম্যালওয়্যার ছড়ানো।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ই-কমার্স ট্রাফিক চুরি):
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইট "Daraz" (daraz.com.bd)। একজন প্রতারক darazbd.co বা daraaz.com নামে ডোমেইন কিনে সেখানে হুবহু দারাজের মতো দেখতে একটি ওয়েবসাইট বানাল। অনেক ক্রেতা ভুল করে ওই সাইটে ঢুকে প্রতারিত হলো এবং দারাজের সুনাম নষ্ট হলো। দারাজ কর্তৃপক্ষ তখন ওই ডোমেইন মালিকের বিরুদ্ধে "টাইপোস্কোয়াটিং এবং ক্রেতা প্রতারণার" গ্রাউন্ডে ক্ষতিপূরণ ও ডোমেইন বাতিলের মামলা দায়ের করবে।
বাস্তব উদাহরণ ১ (মোবাইল ব্যাংকিং/ফিশিং):
'bKash' এর মূল ওয়েবসাইট হলো www.bkash.com। একটি জালিয়াত চক্র www.bkaash.com (একটি 'a' বেশি) বা www.bksh.com নামে ডোমেইন কিনে হুবহু বিকাশের মতো একটি ভুয়া ওয়েবসাইট বানাল গ্রাহকদের পিন নম্বর চুরি করার জন্য। বিকাশ কর্তৃপক্ষ তাদের ব্র্যান্ডের সুনাম রক্ষার্থে এবং প্রতারণা রোধে ধারা ২(ঘ)(১৬) এর অধীনে মামলা করবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (সংবাদমাধ্যম):
দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা 'প্রথম আলো' (www.prothomalo.com)। কেউ যদি www.prothom-alo-news.com নামে ডোমেইন খুলে মিথ্যা সংবাদ ছড়ায় এবং বিজ্ঞাপনের টাকা হাতায়, তবে মূল পত্রিকা কর্তৃপক্ষ পাঠক বিভ্রান্তি এবং বাণিজ্যিক ক্ষতির জন্য মামলা করতে পারবে।
৩. ডোমেইন ক্রয়-বিক্রয় বা ট্রান্সফার চুক্তি লঙ্ঘন (Breach of Domain Sale or Transfer Agreement):
অনেক সময় প্রিমিয়াম ডোমেইন নাম (Premium Domains) হাজার বা লাখ ডলারে ক্রয়-বিক্রয় হয়। ডোমেইন ব্রোকার বা মালিকের সাথে ক্রেতার চুক্তি হওয়ার পর যদি কেউ শর্ত ভঙ্গ করে, তবে বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হয়।
মামলার প্রেক্ষাপট: ভালো বা প্রিমিয়াম ডোমেইন নাম (যেমন- cars.com বা shop.bd) অনেক সময় লাখ বা কোটি টাকায় বেচাকেনা হয়। ডোমেইন হস্তান্তরের জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি হয়। ক্রেতা টাকা পরিশোধ করার পরও বিক্রেতা যদি ডোমেইনের কন্ট্রোল প্যানেল (Auth Code) বুঝিয়ে না দেয়, বা বিক্রেতা ডোমেইন ট্রান্সফার করার পর ক্রেতা টাকা না দেয়, তবে তা বাণিজ্যিক বিরোধ।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) চুক্তিকৃত অর্থ (Payment) বুঝিয়ে পাওয়ার পরও ডোমেইন নাম ক্রেতার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার (Push) করতে অস্বীকৃতি জানানো। (২) ডোমেইন ট্রান্সফার সম্পন্ন হওয়ার পর ক্রেতা কর্তৃক পেমেন্ট আটকে রাখা বা চার্জব্যাক (Chargeback) করা। এবং, (৩) এসক্রো (Escrow) সার্ভিস প্রদানকারীর অবহেলায় ডোমেইন বা অর্থের ক্ষতি হওয়া।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ডোমেইন হস্তান্তর না করা):
একটি ফিনটেক স্টার্টআপ একজন ডোমেইন ইনভেস্টরের কাছ থেকে Taka.com ডোমেইনটি ১০ লাখ টাকায় কেনার চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী স্টার্টআপটি ৫ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করে। কিন্তু টাকা পাওয়ার পর ওই ইনভেস্টর ডোমেইনটি ট্রান্সফার না করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় অথবা অন্য কারো কাছে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করে। স্টার্টআপটি তখন "চুক্তিভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাতের" গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে ডোমেইন ট্রান্সফারের আদেশ (Specific Performance) চাইতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (টাকা নিয়ে ডোমেইন না দেওয়া):
একটি ই-কমার্স স্টার্টআপ একজন ডোমেইন ইনভেস্টরের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে www.bazaardhaka.com ডোমেইনটি কেনার চুক্তি করল। স্টার্টআপটি অগ্রিম ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করল। কিন্তু ইনভেস্টর ডোমেইনটি ট্রান্সফার না করে হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। স্টার্টআপটি চুক্তি বাস্তবায়ন (Specific Performance) এবং ডোমেইন উদ্ধারের জন্য মামলা করতে পারে।
৪. ডোমেইন রেজিস্ট্রার বা হোস্টিং কোম্পানির অবহেলা (Negligence by Domain Registrar/Hosting Provider):
যাদের মাধ্যমে ডোমেইন কেনা হয় (যেমন: GoDaddy, Namecheap বা দেশীয় প্রোভাইডার), তাদের প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক অবহেলার কারণে ডোমেইনের নিয়ন্ত্রণ হারালে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) গ্রাহক ডোমেইন নবায়নের (Renewal) ফি যথাসময়ে প্রদান করার পরও রেজিস্ট্রার কর্তৃক তা রিনিউ না করা এবং ডোমেইনটি অন্যের হাতে চলে যাওয়া। (২) নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে ডোমেইন কন্ট্রোল প্যানেল হ্যাক হওয়া এবং ডোমেইন চুরি (Domain Hijacking) যাওয়া। এবং, (৩) কোনো আইনি নোটিশ ছাড়াই একতরফাভাবে ডোমেইন সাসপেন্ড করে দেওয়া।
বাস্তব উদাহরণ ( নবায়নে অবহেলা):
দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল তাদের ডোমেইন ও হোস্টিং প্রোভাইডারকে ২ বছরের রিনিউয়াল ফি অগ্রিম প্রদান করে। কিন্তু প্রোভাইডারের সিস্টেমের ত্রুটির কারণে ডোমেইনটি যথাসময়ে রিনিউ হয়নি। ফলে ডোমেইনটি 'Expired' হয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিদেশের একজন ডোমেইন হান্টার সেটি কিনে নেয়। এর ফলে নিউজ পোর্টালটি তাদের লাখ লাখ পাঠক এবং ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি হারায়। নিউজ পোর্টালটি তখন ওই হোস্টিং প্রোভাইডারের বিরুদ্ধে "চরম পেশাগত অবহেলা ও ব্যবসায়িক ক্ষতির" গ্রাউন্ডে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারবে।
৫. আইটি এজেন্সি বা ডেভেলপারের বিশ্বাসঘাতকতা (Betrayal by IT Agency/Developer):
মামলার গ্রাউন্ড: অনেক কোম্পানি তাদের ওয়েবসাইট বানানোর সময় আইটি ফার্ম বা ডেভেলপারকে ডোমেইন কেনার দায়িত্ব দেয়। অসাধু ডেভেলপাররা ক্লায়েন্টের টাকায় ডোমেইন কিনলেও সেটি কোম্পানির নামে রেজিস্টার না করে নিজেদের নামে রেজিস্টার করে রাখে। পরে ক্লায়েন্ট অন্য কোনো এজেন্সির কাছে যেতে চাইলে বা রিনিউ করতে গেলে মূল ডেভেলপার ডোমেইন আটকে রেখে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ (Ransom) দাবি করে।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ডেভেলপার কর্তৃক ডোমেইন আটকে রাখা):
একটি ট্রাভেল এজেন্সি তাদের ওয়েবসাইটের জন্য একটি আইটি ফার্মকে দায়িত্ব দিল। ফার্মটি ২ বছর পর ট্রাভেল এজেন্সির কাছে মেইনটেন্যান্স ফি হিসেবে ১০ গুণ বেশি টাকা চাইল। ট্রাভেল এজেন্সি রাজি না হলে আইটি ফার্মটি মূল ডোমেইনের (Domain Control Panel) পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দিল। ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা লাটে ওঠার উপক্রম হলে তারা ডোমেইনের অধিকার ফিরে পেতে এবং ক্ষতির জন্য মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (নবায়নে অবহেলা):
কোম্পানি ডোমেইন নবায়নের (Renewal) জন্য আইটি এজেন্সিকে টাকা দিলেও এজেন্সি তা নবায়ন করতে ভুলে গেল। ফলে ডোমেইনটি 'ড্রপ' (Drop) হলো এবং অন্য একজন তা কিনে নিল। কোম্পানির মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক ক্ষতির জন্য এজেন্সির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করা যাবে।
৬. রিভার্স ডোমেইন নেম হাইজ্যাকিং (Reverse Domain Name Hijacking):
সব সময় যে ছোট বা অসাধু ব্যক্তিরা ডোমেইন দখল করে তা নয়। অনেক সময় বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানি তাদের পেশিশক্তি বা অর্থের জোরে বৈধ ডোমেইন মালিকের কাছ থেকে জোরপূর্বক ডোমেইন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, যাকে রিভার্স ডোমেইন নেম হাইজ্যাকিং (RDNH) বলে।
মামলার প্রেক্ষাপট: এটি সাইবারস্কোয়াটিংয়ের ঠিক উল্টো। এখানে কোনো ছোট ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষ বৈধভাবে অনেক আগে থেকে একটি ডোমেইন কিনে ব্যবহার করছেন। পরবর্তীতে একটি বড় বা ক্ষমতাবান কোম্পানি জোরপূর্বক বা আইনি ভয় দেখিয়ে (বিনা কারণে ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে) ওই ডোমেইনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একে 'রিভার্স হাইজ্যাকিং' বলে। ভুক্তভোগী ডোমেইন মালিক নিজের অধিকার সুরক্ষায় মামলা করতে পারেন।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) ডোমেইনটি বৈধভাবে এবং ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে, তা জানা সত্ত্বেও বড় কোম্পানি কর্তৃক হয়রানিমূলক আইনি নোটিশ পাঠানো। এবং (২) ডোমেইনের মালিককে ভয় দেখিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে ডোমেইন ছেড়ে দিতে বাধ্য করা।
বাস্তব উদাহরণ ১ (জোরপূর্বক দখলচেষ্টা):
ঢাকার একজন সাধারণ ব্যবসায়ী "রহিম টেলিকম" নামে ১৯৯৫ সাল থেকে ব্যবসা করেন এবং ২০০০ সালে rahimtelecom.com ডোমেইনটি নিবন্ধন করেন। ২০২৫ সালে "রহিম" নামে একটি বিশাল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বাজারে আসে। তারা ওই ডোমেইনটি নেওয়ার জন্য সাধারণ ব্যবসায়ীকে ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের মিথ্যা হুমকি দিয়ে উকিল নোটিশ পাঠায় এবং ডোমেইন ক্যানসেল করতে বলে। ওই সাধারণ ব্যবসায়ী তখন নিজের আইনি অধিকার সুরক্ষায় এবং হয়রানি বন্ধে বড় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে "রিভার্স ডোমেইন নেম হাইজ্যাকিং"-এর গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে পাল্টা মামলা (Declaratory judgment) দায়ের করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (বৈধ মালিককে হয়রানি):
'রহিম' নামের এক ব্যক্তি ২০০৫ সাল থেকে তার ব্যক্তিগত ব্লগ লেখার জন্য www.rahim.com ডোমেইনটি ব্যবহার করছেন। ২০২৫ সালে 'Rahim Group of Industries' নামে একটি বড় কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হলো। তারা জোর করে রহিমকে আইনি নোটিশ পাঠাল ডোমেইনটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য, নাহলে কোটি টাকার মামলার হুমকি দিল। রহিম তার বৈধ ডোমেইনের সুরক্ষা চেয়ে এবং হয়রানির বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে যেতে পারবেন।
৭. ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনকারী ডোমেইন নামের ব্যবহার (Domain Name causing Trademark Infringement):
মামলার গ্রাউন্ড: ট্রেডমার্কের মালিকানা যার, সেই নাম ব্যবহার করে ডোমেইন খোলার আইনি অধিকারও মূলত তারই। কেউ যদি অন্যের নিবন্ধিত ট্রেডমার্ক ব্যবহার করে ডোমেইন খোলে এবং সেখানে প্রতিযোগী পণ্য বা নকল পণ্য বিক্রি করে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করে, তবে তা ট্রেডমার্ক ও ডোমেইন নাম—উভয় আইনেরই লঙ্ঘন।
বাস্তব উদাহরণ ১ (নকল পণ্য বিক্রি):
'Aarong' (আড়ং) একটি সুপরিচিত ব্র্যান্ড। একজন অসাধু কাপড় ব্যবসায়ী www.aarong-discount.com নামে একটি ডোমেইন খুলে সেখানে আড়ংয়ের লোগো ব্যবহার করে নিম্নমানের ও নকল পোশাক বিক্রি শুরু করল। আড়ং কর্তৃপক্ষ তাদের ট্রেডমার্ক লঙ্ঘন ও ডোমেইনের অবৈধ ব্যবহারের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে ওই ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দিতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (পরিবেশকের অপব্যবহার):
একটি বিখ্যাত ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ডের ডিলার চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও www.[brandname]-dhaka.com ডোমেইনটি ব্যবহার করে অন্য কোম্পানির পণ্য বিক্রি করতে থাকলে মূল কোম্পানি ডোমেইনটি বাতিলের মামলা করতে পারে।
উপসংহার:
আধুনিক ব্যবসায় ডোমেইন নাম শুধু একটি ওয়েবসাইটের ঠিকানাই নয়, এটি কোম্পানির একটি মূল্যবান মেধা স্বত্ব এবং ডিজিটাল রিয়েল এস্টেট। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৬) এর অধীনে ডোমেইন নামকে অন্তর্ভুক্ত করায় বাংলাদেশের ই-কমার্স, স্টার্টআপ এবং আইটি উদ্যোক্তারা সাইবার অপরাধী ও প্রতারকদের হাত থেকে তাদের ডিজিটাল পরিচয় রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো পেলেন। এর মাধ্যমে ডোমেইন চুরি বা সাইবারস্কোয়াটিং এর মতো বিষয়গুলো দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com