বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-২০): পেটেন্ট (Patent) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ

ভূমিকা:
যেকোনো দেশের শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো 'উদ্ভাবন' বা Innovation। একজন উদ্ভাবক বা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ গবেষণা ও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে যখন কোনো নতুন পণ্য (Product) বা পদ্ধতি (Process) আবিষ্কার করেন, তখন রাষ্ট্র তাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই উদ্ভাবনটির ওপর একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার প্রদান করে, যাকে আইনি ভাষায় 'পেটেন্ট' (Patent) বলা হয়। বাংলাদেশে এই অধিকারগুলো সুরক্ষিত হয় 'বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, ২০২৩' এর মাধ্যমে।

যেহেতু পেটেন্টের সাথে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত থাকে, তাই এর লঙ্ঘন বা চুরি হওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৬)-তে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, "বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, ২০২৩" থেকে উদ্ভূত যেকোনো আইনি বিরোধ একটি 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে, উচ্চ-প্রযুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক এই বিরোধগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলার গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্ত হয়ে বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।

নিচে বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, ২০২৩ এর আলোকে যেসব কারণে বা গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়, তা একাধিক বাস্তব উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. পেটেন্ট লঙ্ঘন বা অননুমোদিত ব্যবহার (Patent Infringement):
পেটেন্ট আইনের সবচেয়ে বড় এবং সাধারণ বাণিজ্যিক বিরোধ হলো 'পেটেন্ট লঙ্ঘন'। পেটেন্ট মালিকের (Patentee) অনুমতি ছাড়া যদি কেউ নিবন্ধিত উদ্ভাবনটি তৈরি করে, ব্যবহার করে, বিক্রির প্রস্তাব দেয় বা বিক্রি করে, তবে তা পেটেন্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) পেটেন্টকৃত কোনো পণ্য (Patented Product) অনুমতি ছাড়া উৎপাদন বা বিক্রি করা। (২) পেটেন্টকৃত কোনো প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি (Patented Process) ব্যবহার করে অন্য কোনো পণ্য তৈরি করা। এবং, (৩) পেটেন্ট করা পণ্য বিদেশ থেকে বেআইনিভাবে আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ফার্মাসিউটিক্যাল পেটেন্ট লঙ্ঘন): 
একটি বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানি ক্যান্সারের একটি নতুন কার্যকরী ঔষধ আবিষ্কার করে এবং বাংলাদেশে তার পেটেন্ট নিবন্ধন করে। কিছুদিন পর, দেশের একটি স্থানীয় ঔষধ কোম্পানি ওই ঔষধটির রাসায়নিক ফর্মুলা (Chemical formula) রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করে হুবহু একই ঔষধ অন্য নামে বাজারে বিক্রি শুরু করে। বহুজাতিক কোম্পানিটি তখন "নিবন্ধিত পেটেন্ট লঙ্ঘনের" গ্রাউন্ডে ওই স্থানীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে ক্ষতিপূরণ এবং উৎপাদন বন্ধের (Injunction) মামলা করবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির নকল): 
দেশের একজন প্রকৌশলী কৃষিকাজের জন্য একটি জ্বালানি সাশ্রয়ী 'স্মার্ট সেচ পাম্প' উদ্ভাবন করে পেটেন্ট পান। একটি বড় এগ্রো-মেশিনারি ফ্যাক্টরি ওই প্রকৌশলীর অনুমতি ছাড়াই হুবহু একই প্রযুক্তির পাম্প তৈরি করে নিজেদের ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি শুরু করে। ওই প্রকৌশলী "অননুমোদিত উৎপাদন ও পেটেন্ট অধিকার হরণের" কারণে ফ্যাক্টরি মালিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারবেন।

২. পেটেন্টকৃত পণ্য বেআইনিভাবে উৎপাদন, ব্যবহার বা বিক্রি (Infringement of Product Patent):

মামলার গ্রাউন্ড: পেটেন্ট আইনের সবচেয়ে সাধারণ বিরোধ হলো 'প্রোডাক্ট পেটেন্ট লঙ্ঘন'। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি নতুন কোনো প্রযুক্তি, যন্ত্র বা ফর্মুলা উদ্ভাবন করে তার পেটেন্ট নিবন্ধন করে, তবে পেটেন্ট মালিকের পূর্বানুমতি বা লাইসেন্স ছাড়া অন্য কেউ সেই পণ্য উৎপাদন (Manufacture), ব্যবহার, বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করতে পারবে না। কেউ এমনটি করলে মূল মালিক ইনজাংশন (নিষেধাজ্ঞা) ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারেন।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ওষুধ আবিষ্কার): 
একটি স্বনামধন্য ওষুধ কোম্পানি দীর্ঘ ১০ বছর গবেষণা করে ক্যানসারের একটি নতুন ও কার্যকর ওষুধ (মলিকিউল) আবিষ্কার করল এবং বাংলাদেশে এর পেটেন্ট নিল। কয়েক মাস পর স্থানীয় অন্য একটি কোম্পানি লাইসেন্স ছাড়াই গোপনে তাদের কারখানায় হুবহু একই ফর্মুলার ওষুধ তৈরি করে বাজারে সস্তায় বিক্রি শুরু করল। উদ্ভাবক কোম্পানিটি অবিলম্বে বাণিজ্যিক আদালতে পেটেন্ট লঙ্ঘনের মামলা করে ওই ওষুধের উৎপাদন বন্ধ করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ইলেকট্রনিক্স ও হার্ডওয়্যার): 
দেশীয় একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন একটি নতুন 'সোলার ইনভার্টার' (Solar Inverter) আবিষ্কার করল যা প্রচলিত ইনভার্টারের চেয়ে ৫০% বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে এবং এর পেটেন্ট সনদ নিল। অন্য একটি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি সেই ইনভার্টারটি বাজার থেকে কিনে এর ডিজাইন রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং (Reverse-engineering) করে নিজেদের নামে বাজারে ছাড়ল। এটি প্রোডাক্ট পেটেন্টের সরাসরি লঙ্ঘন।

৩. পেটেন্টকৃত পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার অবৈধ ব্যবহার (Infringement of Process Patent):
মামলার গ্রাউন্ড: অনেক সময় পেটেন্ট কোনো চূড়ান্ত পণ্যের ওপর হয় না, বরং সেই পণ্যটি তৈরির একটি সম্পূর্ণ নতুন ও উদ্ভাবনী 'পদ্ধতি' বা 'প্রক্রিয়া'র (Process) ওপর হয়। অন্য কেউ যদি পণ্যটি তৈরি করতে হুবহু সেই পেটেন্টকৃত পদ্ধতিটি মালিকের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করে, তবে সেটি 'প্রসেস পেটেন্ট' লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (কৃষি ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ): 
একটি অ্যাগ্রো-কেমিক্যাল কোম্পানি বিশেষ একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন করল, যার মাধ্যমে খুব কম খরচে পাট থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন (সোনালী ব্যাগ) তৈরি করা যায় এবং এর 'প্রসেস পেটেন্ট' নিল। অন্য একটি প্লাস্টিক কারখানা গোপনে তাদের কারখানায় ঠিক একই রাসায়নিক তাপমাত্রা ও চাপ (Formula & Process) ব্যবহার করে ওই ব্যাগ তৈরি শুরু করল। আবিষ্কারক কোম্পানি বাণিজ্যিক আদালতে প্রসেস পেটেন্ট চুরির মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ): 
দীর্ঘক্ষণ খাবার সতেজ রাখার জন্য একটি বিশেষ প্যাকেজিং 'পদ্ধতি' পেটেন্ট করা হলো। প্রতিদ্বন্দ্বী একটি ফুড কোম্পানি একই পদ্ধতি ব্যবহার করে খাবার প্যাকেজিং শুরু করলে, তা প্রসেস পেটেন্টের লঙ্ঘন হবে।

৪. পেটেন্ট লাইসেন্সিং ও রয়্যালটি চুক্তি ভঙ্গ (Breach of Patent Licensing and Royalty Agreements):
পেটেন্ট মালিকরা সাধারণত নিজেরা পণ্য উৎপাদন না করে অন্য কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট ফি বা রয়্যালটির বিনিময়ে পেটেন্ট ব্যবহারের 'লাইসেন্স' দেন। এই চুক্তির বরখেলাপ হলে বাণিজ্যিক বিরোধের সৃষ্টি হয়।

মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: পেটেন্টের মালিক নিজে পণ্য উৎপাদন না করে অন্য কোম্পানিকে চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পণ্যটি উৎপাদনের অধিকার বা 'লাইসেন্স' (License) দিতে পারেন, যার বিনিময়ে তিনি নির্দিষ্ট হারে রয়্যালটি (Royalty) পান। লাইসেন্স গ্রহীতা যদি রয়্যালটি পরিশোধ না করে বা চুক্তির ভৌগোলিক ও পরিমাণগত সীমা লঙ্ঘন করে, তবে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করা যায়।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রুত রয়্যালটি (Royalty) বা লাইসেন্স ফি পরিশোধ না করা। (২) লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে চুক্তিকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি পণ্য উৎপাদন করা। এবং, (৩) লাইসেন্সে নির্ধারিত ভৌগোলিক সীমার (Geographical territory) বাইরে গিয়ে পণ্য বিক্রি করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন): 
একটি কোম্পানিকে শুধু বাংলাদেশের বাজারের জন্য একটি পেটেন্টকৃত কৃষিযন্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়া হলো। কিন্তু কোম্পানিটি গোপনে ওই যন্ত্র তৈরি করে ভারতে রপ্তানি শুরু করল। এটি লাইসেন্স চুক্তির ভৌগোলিক সীমার মারাত্মক লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (রয়্যালটি প্রদানে অস্বীকৃতি): 
বুয়েটের একদল গবেষক একটি সাশ্রয়ী 'ওয়াটার পিউরিফায়ার' আবিষ্কার করে পেটেন্ট নিলেন। তারা একটি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিকে প্রতিটি ফিল্টার বিক্রির ওপর ৫% রয়্যালটির বিনিময়ে ৫ বছরের জন্য উৎপাদনের লাইসেন্স দিলেন। কোম্পানিটি প্রথম বছর রয়্যালটি দিলেও, পরের বছর থেকে বিক্রি গোপন করে রয়্যালটি দেওয়া বন্ধ করে দিল। গবেষক দল বাণিজ্যিক আদালতে রয়্যালটি আদায় ও চুক্তি বাতিলের মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (ভৌগোলিক সীমার লঙ্ঘন): 
একজন উদ্ভাবক একটি পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের পেটেন্টের লাইসেন্স একটি কোম্পানিকে দেন, এই শর্তে যে তারা শুধুমাত্র 'বাংলাদেশ' এর বাজারে এটি বিক্রি করতে পারবে। কিন্তু কোম্পানিটি বেশি লাভের আশায় যন্ত্রগুলো ভারতে রপ্তানি করা শুরু করে, যেখানে উদ্ভাবকের অন্য একজন লাইসেন্স গ্রহীতা আছে। উদ্ভাবক তখন "লাইসেন্সের পরিধি ও শর্ত লঙ্ঘনের" গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করবেন।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (রয়্যালটি আত্মসাত): 
একটি টেক-স্টার্টআপ একটি নতুন ব্যাটারি চার্জিং প্রযুক্তি পেটেন্ট করে। তারা একটি মোবাইল কোম্পানির সাথে চুক্তি করে যে, প্রতিটি মোবাইল বিক্রির ওপর তারা ২% রয়্যালটি পাবে। প্রথম এক বছর মোবাইল কোম্পানি ঠিকমতো টাকা দিলেও, মোবাইলটি সুপারহিট হওয়ার পর তারা রয়্যালটি দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং অজুহাত দেখায় যে তারা প্রযুক্তিটি সামান্য পরিবর্তন করেছে। স্টার্টআপটি "লাইসেন্স চুক্তি ভঙ্গ ও রয়্যালটি আত্মসাতের" গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবে।

৫. পেটেন্টের মালিকানা, উদ্ভাবকের অধিকার এবং যৌথ-উদ্ভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ (Disputes over Ownership, Inventorship and Co-inventorship):

একটি উদ্ভাবনের প্রকৃত মালিক কে—তা নিয়ে প্রায়ই ব্যক্তি, গবেষক বা কোম্পানির মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বিশেষ করে যৌথ উদ্ভাবন বা চাকরিকালীন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।

মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: অনেক সময় গবেষণা বা উদ্ভাবন যৌথ উদ্যোগে হয়, অথবা কোনো চাকরিজীবী তার কোম্পানির ল্যাবে বসে কোনো কিছু আবিষ্কার করেন। এই উদ্ভাবনের প্রকৃত পেটেন্ট মালিক কে হবেন—প্রতিষ্ঠান নাকি কর্মী, অথবা দুই যৌথ গবেষকের মধ্যে শেয়ার কেমন হবে—তা নিয়ে বড় ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হয়।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) যৌথ উদ্ভাবকদের (Co-inventors) মধ্যে মুনাফা বণ্টন বা মালিকানার হিস্যা নিয়ে বিরোধ। (২) চাকরিকালীন সময়ে (During employment) তৈরি করা উদ্ভাবনের মালিকানা—কোম্পানির হবে নাকি কর্মীর হবে, তা নিয়ে বিরোধ। এবং (৩) প্রকৃত উদ্ভাবককে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তির নামে প্রতারণামূলকভাবে পেটেন্ট নিবন্ধন করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (যৌথ উদ্ভাবকের বঞ্চনা): 
বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন গবেষক মিলে একটি মেডিকেল ডিভাইস উদ্ভাবন করেন। কিন্তু পেটেন্ট ফাইলিং করার সময় প্রথম গবেষক গোপনে দ্বিতীয় গবেষকের নাম বাদ দিয়ে শুধু নিজের নামে পেটেন্ট নিয়ে নেন এবং একটি কোম্পানির কাছে কোটি টাকায় বিক্রি করে দেন। বঞ্চিত দ্বিতীয় গবেষক "প্রকৃত উদ্ভাবকের অধিকার হরণ এবং প্রতারণার" গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (চাকরিদাতা বনাম কর্মী): 
একটি সফটওয়্যার কোম্পানির একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার অফিসের সরঞ্জাম ও সময় ব্যবহার করে একটি নতুন 'এআই (AI) অ্যালগরিদম' আবিষ্কার করলেন। চাকরিবিধি অনুযায়ী এর পেটেন্ট কোম্পানির নামে হওয়ার কথা। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের নামে ওই অ্যালগরিদমের পেটেন্ট নেওয়ার জন্য আবেদন করলেন। কোম্পানি এর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মালিকানা (Ownership) দাবি করে মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (যৌথ গবেষণায় প্রতারণা): 
'A' এবং 'B' নামক দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে একটি অত্যাধুনিক মেডিকেল ডিভাইস আবিষ্কার করল। চুক্তি ছিল পেটেন্টের মালিকানা ৫০-৫০ হবে। কিন্তু 'A' প্রতিষ্ঠান গোপনে শুধুমাত্র নিজেদের নামে পেটেন্ট অফিসে আবেদন জমা দিল। 'B' প্রতিষ্ঠান তাদের উদ্ভাবকত্বের অধিকার (Co-inventorship rights) ফিরে পেতে মামলা দায়ের করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (নিয়োগকর্তা বনাম কর্মী): 
একটি সফটওয়্যার কোম্পানির আরঅ্যান্ডডি (R&D) বিভাগের একজন ইঞ্জিনিয়ার একটি নতুন ডেটা-কমপ্রেশন অ্যালগরিদম তৈরি করেন। তিনি দাবি করেন এটি তার ব্যক্তিগত মেধার ফসল এবং নিজের নামে পেটেন্ট আবেদন করেন। কিন্তু কোম্পানি দাবি করে যে, যেহেতু সে কোম্পানির ল্যাব, সময় এবং সরঞ্জাম ব্যবহার করে এটি বানিয়েছে ("Work for hire"), তাই এর মালিক কোম্পানি। এই "পেটেন্টের আইনি মালিকানা" নির্ধারণের জন্য বিষয়টি বাণিজ্যিক আদালতে গড়াবে।

৬. পূর্বানুমতি ছাড়া পেটেন্টকৃত পণ্য বেআইনিভাবে আমদানি (Unauthorized Importation / Parallel Import Issues):

মামলার গ্রাউন্ড: বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোনো পেটেন্ট পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রির একচেটিয়া অধিকার মালিকের থাকে। অন্য কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যদি মালিকের বিনা অনুমতিতে ওই একই পণ্য বিদেশ থেকে (যেখানে হয়তো কোনো থার্ড-পার্টি এটি তৈরি করছে) আমদানি করে দেশের বাজারে ছাড়ে, তবে তা পেটেন্ট অধিকারের লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ ১ (মেডিকেল ইকুইপমেন্ট আমদানি): 
একটি কোরিয়ান কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের উদ্ভাবিত একটি বিশেষ এমআরআই (MRI) মেশিনের পেটেন্ট নিয়েছে এবং তারা নিজেরাই সরাসরি হাসপাতালগুলোতে এটি সরবরাহ করে। হঠাৎ দেখা গেল, ঢাকার একজন লোকাল আমদানিকারক চীন থেকে ওই একই প্রযুক্তির নকল এমআরআই মেশিন কম দামে আমদানি করে বিক্রি করছে। কোরিয়ান কোম্পানিটি বাণিজ্যিক আদালতে ওই আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ইনজাংশন (নিষেধাজ্ঞা) চেয়ে মামলা করতে পারবে।

৭. পেটেন্ট বাতিল বা অবৈধ ঘোষণার আবেদন (Revocation or Invalidation of Patent):
অনেক সময় এমন বিষয়ের ওপর পেটেন্ট নেওয়া হয় যা আসলে নতুন নয় (Lacks Novelty) বা যার মধ্যে কোনো উদ্ভাবনী সত্ত্বা নেই (Lacks Inventive Step)। তখন প্রতিযোগী কোম্পানিগুলো ওই পেটেন্ট বাতিলের জন্য মামলা করে।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) উদ্ভাবনটি নতুন নয় এবং পেটেন্ট আবেদনের আগেই তা পৃথিবীর কোথাও প্রকাশিত বা ব্যবহৃত হয়েছে (Prior Art)। (২) উদ্ভাবনটি সংশ্লিষ্ট খাতের সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন কোনো ব্যক্তির কাছে খুব সাধারণ বা সুস্পষ্ট (Obviousness)। এবং (৩) প্রতারণা বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে পেটেন্ট অফিস থেকে নিবন্ধন নেওয়া।

বাস্তব উদাহরণ ১ (পূর্ব-বিদ্যমান প্রযুক্তি বা Prior Art): 
'ক' কোম্পানি একটি বিশেষ ধরনের "সৌর প্যানেল ক্লিনার" যন্ত্রের পেটেন্ট পায়। 'খ' কোম্পানি প্রমাণ পায় যে, ঠিক একই প্রযুক্তির বিষয়ে ৫ বছর আগে জার্মানির একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে বিস্তারিত প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল, অর্থাৎ এটি নতুন কিছু নয় (Prior Art বিদ্যমান)। 'খ' কোম্পানি তখন বাণিজ্যিক আদালতে "অভিনবত্বহীন (Lack of Novelty) পেটেন্ট অবৈধ ও বাতিল ঘোষণার" দাবিতে মামলা দায়ের করবে।

৮. পেটেন্ট আবেদনের পূর্বে গোপনীয়তা বা এনডিএ (NDA) ভঙ্গ:
মামলার গ্রাউন্ড: পেটেন্ট পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো উদ্ভাবনটিকে 'নতুন' (Novel) হতে হবে। অর্থাৎ পেটেন্ট আবেদন জমা দেওয়ার আগে এটি কোনোভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না। যদি কোনো বিনিয়োগকারী বা পার্টনার 'নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট' (NDA) স্বাক্ষর করার পরও উদ্ভাবনের ব্লু-প্রিন্ট বা ফর্মুলা পেটেন্ট আবেদনের আগেই ফাঁস করে দেন, তবে উদ্ভাবক বিশাল বাণিজ্যিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।

বাস্তব উদাহরণ ১ (বিনিয়োগকারী কর্তৃক ব্লু-প্রিন্ট ফাঁস): 
একটি হার্ডওয়্যার স্টার্টআপ একটি নতুন ড্রোন প্রযুক্তি আবিষ্কার করে। পেটেন্ট ফাইল করার আগে ফান্ডিংয়ের জন্য তারা একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টের (VC) সাথে NDA সই করে ড্রোনের ব্লু-প্রিন্ট দেখায়। কিন্তু ওই VC ফান্ডিং না দিয়ে সেই ব্লু-প্রিন্ট গোপনে তাদের পরিচিত অন্য একটি ড্রোন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়, যারা দ্রুত ড্রোনটি বাজারে এনে ফেলে। স্টার্টআপটির উদ্ভাবন এর ফলে পেটেন্ট অযোগ্য (Novelty destroyed) হয়ে যায়। স্টার্টআপটি ওই VC-এর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারবে।

উপসংহার:
গবেষণা এবং উদ্ভাবনে মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু আবিষ্কারের ফল যদি অন্যরা বিনা পরিশ্রমে চুরি করে নিয়ে যায়, তবে দেশে কোনো শিল্পোদ্যোক্তা বা গবেষক নতুন কিছু আবিষ্কারে উৎসাহী হবেন না। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(১৬) ধারার মাধ্যমে 'বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, ২০২৩' এর বিরোধগুলোকে বাণিজ্যিক আদালতের আওতায় আনায় এখন উদ্ভাবকরা দ্রুত আইনি সুরক্ষা পাবেন। এটি প্রযুক্তি চোরদের জন্য একটি কঠোর বার্তা এবং বাংলাদেশে একটি সত্যিকারের জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবন-বান্ধব অর্থনীতি (Innovation-friendly economy) গড়ে তোলার পথে এক বিশাল মাইলফলক।

মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com