বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-১৯): কপিরাইট (Copyright) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ

ভূমিকা:
বর্তমান জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে (Knowledge-based Economy) মেধা বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের (Intellectual Property) সুরক্ষা ব্যবসার অন্যতম প্রধান শর্ত। সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সফটওয়্যার বা অ্যাপ—এসব কিছুর স্রষ্টা বা মালিকের আইনগত অধিকার সুরক্ষার প্রধান হাতিয়ার হলো 'কপিরাইট আইন, ২০২৩'। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৬) মেধা স্বত্ব (Intellectual Property) অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে "কপিরাইট আইন, ২০২৩ (Copyright Act, 2023)" এর অধীন সৃষ্ট যেকোনো বাণিজ্যিক ও আর্থিক বিরোধ এখন সরাসরি বাণিজ্যিক আদালতের বিচার্য বিষয়।

সৃজনশীল বা আইটি খাতে যখন কোনো কর্ম (Work) বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়, তখন তার অননুমোদিত কপি, পাইরেসি বা চুক্তিভঙ্গের ঘটনা অহরহ ঘটে। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৬)-তে "কপিরাইট আইন, ২০২৩" থেকে উদ্ভূত যেকোনো অধিকার লঙ্ঘনজনিত বিরোধকে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে লেখক, প্রকাশক, সফটওয়্যার ডেভেলপার বা প্রযোজকরা তাদের কপিরাইট লঙ্ঘিত হলে সাধারণ দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার বদলে বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুততম সময়ে ইনজাংশন (নিষেধাজ্ঞা) ও ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন।

নিচে কপিরাইট আইন, ২০২৩ এর আলোকে যেসব কারণে বা গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়, তা একাধিক বাস্তব উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. সফটওয়্যার ও আইটি পণ্যের কপিরাইট লঙ্ঘন (Infringement of Software Copyright):
মামলার গ্রাউন্ড: আধুনিক যুগে সফটওয়্যার, সোর্স কোড এবং ডেটাবেস 'সাহিত্যকর্ম' (Literary Work) হিসেবে কপিরাইট আইনে সুরক্ষিত। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি লাইসেন্স ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে, সোর্স কোড চুরি করে নতুন সফটওয়্যার বানায় বা ক্র্যাক (Crack) ভার্সন বিক্রি করে, তবে মূল মালিক বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারেন।

বাস্তব উদাহরণ ১ (সফটওয়্যার পাইরেসি): 
একটি দেশীয় আইটি প্রতিষ্ঠান একটি হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট (ERP) সফটওয়্যার তৈরি করল। একটি হাসপাতাল মাত্র একটি কম্পিউটারের জন্য এর লাইসেন্স কিনল, কিন্তু বেআইনিভাবে তা কপি করে তাদের ৫টি শাখার ৫০টি কম্পিউটারে ইনস্টল করল। এটি এন্টারপ্রাইজ লাইসেন্স চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইটি প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (সোর্স কোড চুরি): 
একটি ফিনটেক কোম্পানির একজন প্রাক্তন ডেভেলপার চাকরি ছাড়ার সময় ওই কোম্পানির মূল অ্যাপের 'সোর্স কোড' চুরি করে নিয়ে যায় এবং সামান্য পরিবর্তন করে অন্য একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির নামে বাজারে লঞ্চ করে। মূল কোম্পানি কপিরাইট আইনের অধীনে ওই কোড ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করবে।

২. অননুমোদিত পুনরুৎপাদন এবং পাইরেসি (Unauthorized Reproduction and Piracy):
কপিরাইট আইনের সবচেয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক বিরোধ হলো মূল স্রষ্টা বা মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনো সৃজনশীল কাজের কপি বা প্রতিলিপি তৈরি করে তা বাজারে বিক্রি করা। একে সাধারণত 'পাইরেসি' বলা হয়।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) কপিরাইট করা বই, অডিও, ভিডিও বা শিল্পকর্মের হুবহু কপি তৈরি করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিক্রি করা। (২) মূল কাজের এমন কোনো অনুবাদ বা রূপান্তর (Adaptation) তৈরি করা, যার জন্য স্বত্বাধিকারীর অনুমতি নেওয়া হয়নি। এবং, (৩) বিদেশী নিবন্ধিত সৃষ্টিকর্ম বাংলাদেশে বেআইনিভাবে রিপ্রোডাকশন করে বাজারজাত করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (বই পাইরেসি): 
একুশে বইমেলায় একজন বিখ্যাত লেখকের নতুন উপন্যাস তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। একটি অসাধু প্রকাশনা সংস্থা ওই লেখকের বা মূল প্রকাশকের অনুমতি ছাড়াই বইটির সস্তা পিডিএফ ও হার্ডকপি ছাপিয়ে নীলক্ষেতসহ সারা দেশের লাইব্রেরিতে বিক্রি শুরু করে। এতে মূল প্রকাশক লাখ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হন। মূল প্রকাশক তখন "কপিরাইট লঙ্ঘন ও আর্থিক ক্ষতির" গ্রাউন্ডে ওই অসাধু প্রকাশকের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (চলচ্চিত্র পাইরেসি): 
একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সিনেমা রিলিজ করে। সিনেমাটি হলে চলার সময়ই একটি চক্র হল-প্রিন্ট চুরি করে সিডি/ডিভিডি আকারে বাজারে বিক্রি শুরু করে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি "অননুমোদিত রিপ্রোডাকশন বা পাইরেসির" কারণে ওই চক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে।

৩. কম্পিউটার সফটওয়্যার এবং সোর্স কোড পাইরেসি (Software and Source Code Piracy):
কপিরাইট আইন, ২০২৩ অনুযায়ী 'কম্পিউটার প্রোগ্রাম' বা সফটওয়্যার এবং ডেটাবেস সাহিত্যকর্ম (Literary work) হিসেবে সুরক্ষিত। আইটি সেক্টরে এর লঙ্ঘন একটি মারাত্মক বাণিজ্যিক অপরাধ।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) একটি কোম্পানির মূল সোর্স কোড (Source code) চুরি করে অন্য কোম্পানির নামে সফটওয়্যার বাজারে ছাড়া। (২) এন্টারপ্রাইজ লেভেলের সফটওয়্যারের (যেমন: ERP বা অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার) ক্র্যাক (Cracked) বা আনলাইসেন্সড কপি ব্যবহার করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (সোর্স কোড চুরি): 
একটি বাংলাদেশি সফটওয়্যার ফার্ম বহুজাতিক কোম্পানির জন্য একটি কাস্টম সিআরএম (CRM) সফটওয়্যার তৈরি করে। ওই ফার্মের একজন লিড প্রোগ্রামার চাকরি ছেড়ে যাওয়ার সময় সফটওয়্যারের সোর্স কোড পেনড্রাইভে নিয়ে যায় এবং নিজের নতুন স্টার্টআপের নামে সেটি অন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি করে। মূল ফার্মটি "সফটওয়্যার কপিরাইট লঙ্ঘন এবং সোর্স কোড চুরির" কারণে ওই সাবেক কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (বেআইনি সফটওয়্যার ব্যবহার): 
একটি বড় পোশাক কারখানা কোনো লাইসেন্স না কিনেই তাদের ৫০০টি কম্পিউটারে একটি গ্লোবাল কোম্পানির (যেমন: মাইক্রোসফট বা অ্যাডোবি) প্রিমিয়াম সফটওয়্যার ক্র্যাক করে ব্যবহার করছে। ওই সফটওয়্যার কোম্পানি অডিটের মাধ্যমে এটি ধরতে পারলে "বেআইনি বাণিজ্যিক ব্যবহারের" গ্রাউন্ডে ওই পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

২. বাণিজ্যিক সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং স্বত্ব লঙ্ঘন (Digital Piracy and Streaming Rights Violation):
বর্তমান ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল যুগে স্ট্রিমিং অধিকার একটি বিশাল বাণিজ্যিক খাত। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেআইনিভাবে কন্টেন্ট প্রচার করলে বড় ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হয়।

মামলার ব্যকগ্রাউন্ড: চলচ্চিত্র, নাটক, খেলাধুলা বা সংগীতের ডিজিটাল ও ব্রডকাস্টিং স্বত্ব (Broadcasting Rights) অত্যন্ত মূল্যবান বাণিজ্যিক সম্পদ। কোনো টিভি চ্যানেল, ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম বা কেবল অপারেটর যদি স্বত্বাধিকারীর (কপিরাইট হোল্ডার) লিখিত অনুমতি এবং রয়্যালটি প্রদান ছাড়া কোনো কনটেন্ট সম্প্রচার বা স্ট্রিম করে, তবে তা মামলার শক্ত গ্রাউন্ড।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) অনুমতি ছাড়া ইউটিউব, ফেসবুক বা অন্য কোনো ওয়েবসাইটে কপিরাইট করা গান, নাটক বা সিনেমা আপলোড করা। (২) সম্প্রচার অধিকার (Broadcasting rights) না কিনে কোনো টিভি চ্যানেল বা রেডিওতে গান বা মুভি চালানো। এবং (৩) ওটিটি প্ল্যাটফর্মের এক্সক্লুসিভ কন্টেন্ট অন্য কোনো অ্যাপ বা সাইটে অবৈধভাবে প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে দেখানো।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ওয়েব সিরিজের অবৈধ স্ট্রিমিং): 
"চরকি" বা "হইচই"-এর মতো একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম একটি অরিজিনাল ওয়েব সিরিজ রিলিজ করে, যা শুধুমাত্র পেইড সাবস্ক্রাইবাররা দেখতে পারেন। একটি থার্ড-পার্টি ওয়েবসাইট সেই সিরিজটি ডাউনলোড করে নিজেদের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে টাকা আয় করার উদ্দেশ্যে আপলোড করে দেয়। ওটিটি প্ল্যাটফর্মটি "ডিজিটাল কপিরাইট লঙ্ঘন এবং বাণিজ্যিক ক্ষতির" গ্রাউন্ডে সাইট মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (টিভি চ্যানেল কর্তৃক লঙ্ঘন): 
একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল তাদের একটি জনপ্রিয় মেগা-সিরিয়ালে আবহ সঙ্গীত হিসেবে দেশের একজন বিখ্যাত ব্যান্ড তারকার গান ব্যবহার করে, কিন্তু এর জন্য কোনো রয়্যালটি বা অনুমতি নেয়নি। ওই ব্যান্ড তারকা "সম্প্রচার অধিকার লঙ্ঘন" এর গ্রাউন্ডে ওই টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (খেলাধুলার অবৈধ সম্প্রচার): 
একটি স্পোর্টস চ্যানেল (যেমন- টি-স্পোর্টস) কোটি টাকা দিয়ে বিপিএল (BPL) ক্রিকেটের এক্সক্লুসিভ সম্প্রচার স্বত্ব কিনল। কিন্তু কিছু লোকাল কেবল অপারেটর এবং অননুমোদিত আইপিটিভি (IPTV) চ্যানেল লাইভ ফিড চুরি করে নিজেদের চ্যানেলে খেলা দেখাতে শুরু করল। স্পোর্টস চ্যানেলটি তাদের বিশাল বাণিজ্যিক ক্ষতির জন্য ওই অপারেটরদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা): 
একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক তার নতুন সিনেমাটি শুধুমাত্র সিনেমা হলে দেখানোর চুক্তি করেছেন। কিন্তু একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েবসাইট প্রযোজকের ডিজিটাল রাইটস না কিনেই সিনেমাটি তাদের অ্যাপে আপলোড করে সাবস্ক্রিপশন ব্যবসা শুরু করল। প্রযোজক কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলা করে কনটেন্টটি নামানোর আদেশ (Take-down order) আনতে পারবেন।

৩. সংগীত, অডিও-ভিজ্যুয়াল ও শিল্পকর্মের পাইরেসি (Piracy of Musical and Artistic Works):
মামলার গ্রাউন্ড: কোনো ব্যান্ডের গান, সুরকারের সুর, ফটোগ্রাফারের তোলা ছবি বা চিত্রশিল্পীর আঁকা ছবি বাণিজ্যিক কাজে (যেমন- বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক) ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই লাইসেন্স নিতে হবে। বিনা অনুমতিতে অন্যের সৃজনশীল কর্ম নিজের বাণিজ্যিক প্রসারে ব্যবহার করলে কপিরাইট লঙ্ঘন হয়।

বাস্তব উদাহরণ ১ (বিজ্ঞাপনে গানের অবৈধ ব্যবহার): 
একটি স্বনামধন্য বহুজাতিক টেলিকম কোম্পানি তাদের ঈদ ক্যাম্পেইনের টিভি বিজ্ঞাপনে দেশের একটি জনপ্রিয় ব্যান্ডের একটি বিখ্যাত গানের সুর হুবহু ব্যবহার করল, কিন্তু ব্যান্ডের কাছ থেকে কোনো অনুমতি বা লাইসেন্স নিল না। ব্যান্ড দলটি তাদের মেধা সম্পদের অবৈধ বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য টেলিকম কোম্পানির বিরুদ্ধে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ফটোগ্রাফির চুরি): 
একজন প্রফেশনাল ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারের তোলা একটি সুন্দর ছবি একটি ট্রাভেল এজেন্সি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে বিনা অনুমতিতে তাদের বাণিজ্যিক ব্রোশিওর এবং বিলবোর্ডে ব্যবহার করল। ফটোগ্রাফার তার শিল্পকর্মের (Artistic Work) কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য মামলা করতে পারবেন।

৪. কপিরাইট হস্তান্তর বা লাইসেন্সিং চুক্তি ভঙ্গ (Breach of Copyright Assignment/Licensing Agreement):
মামলার গ্রাউন্ড: কপিরাইটের মালিক চাইলে চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় বা অঞ্চলের জন্য তার অধিকার অন্য কাউকে হস্তান্তর (Assignment) বা লাইসেন্স (License) করতে পারেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যদি লাইসেন্স গ্রহীতা তা ব্যবহার করতে থাকেন, অথবা নির্দিষ্ট মাধ্যমের বাইরে অন্য মাধ্যমে কনটেন্ট ব্যবহার করেন, কিংবা রয়্যালটি (Royalty) না দেন, তবে সেটি বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি করে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (বইয়ের প্রকাশনা ও রয়্যালটি): 
একজন লেখক একটি স্বনামধন্য প্রকাশনীর সাথে ৫ বছরের জন্য তার বই ছাপানোর চুক্তি করলেন এবং শর্ত ছিল প্রতি বছর বিক্রির ১৫% রয়্যালটি লেখককে দিতে হবে। কিন্তু ৩ বছর পর প্রকাশনী রয়্যালটি দেওয়া বন্ধ করে দিল, অথচ বই ছাপিয়ে ঠিকই বিক্রি করতে থাকল। লেখক চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণে রয়্যালটি আদায় এবং প্রকাশনা বন্ধের জন্য আদালতে যেতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (মাধ্যমের সীমা লঙ্ঘন): 
একজন সুরকার একটি অডিও লেবেলের কাছে শুধুমাত্র তার গানের 'অডিও রাইটস' (Audio Rights) বিক্রি করলেন। কিন্তু লেবেল কোম্পানিটি সেই গান ব্যবহার করে একটি মিউজিক ভিডিও (Video Rights) তৈরি করে ইউটিউব থেকে টাকা আয় করতে শুরু করল। যেহেতু ভিডিও স্বত্ব হস্তান্তর করা হয়নি, তাই সুরকার কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলা করতে পারবেন।

৫. লাইসেন্স, রয়্যালটি ও স্বত্ব হস্তান্তর চুক্তি বিরোধ (Licensing, Royalty, and Assignment Disputes):
কপিরাইট মালিক নিজে কাজ না করে অনেক সময় অন্য প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাইসেন্স (License) দেন বা পুরোপুরি স্বত্ব হস্তান্তর (Assignment) করেন। এই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে বিরোধ বাঁধে।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) চুক্তি অনুযায়ী স্রষ্টাকে (লেখক, গায়ক, সফটওয়্যার ডেভেলপার) প্রতিশ্রুত রয়্যালটি (Royalty) পরিশোধ না করা। (২) লাইসেন্সের পরিধি (Scope of License) অতিক্রম করা (যেমন: শুধু ছাপানোর অনুমতি নিয়ে ডিজিটাল কপি বিক্রি করা)। এবং (৩) নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য স্বত্ব হস্তান্তরের পর মেয়াদ শেষ হলেও কন্টেন্ট ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া।

বাস্তব উদাহরণ ১ (রয়্যালটি প্রদানে অস্বীকৃতি): 
একজন স্বনামধন্য গীতিকার একটি রেকর্ড লেবেলের (অডিও কোম্পানি) সাথে চুক্তি করেন যে, তার লেখা গানগুলো থেকে কোম্পানি যত টাকা আয় করবে, তার ১০% রয়্যালটি তাকে দেওয়া হবে। গানগুলো ইউটিউব ও স্পটিফাইয়ে হিট হওয়ার পর কোম্পানিটি কোটি টাকা আয় করলেও গীতিকারকে কোনো হিসাব বা রয়্যালটি দেয় না। গীতিকার "লাইসেন্স চুক্তি ভঙ্গ ও রয়্যালটি আত্মসাতের" গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (লাইসেন্সের পরিধি লঙ্ঘন): 
একজন ফটোগ্রাফার একটি ম্যাগাজিনকে তার তোলা একটি বন্যপ্রাণীর ছবি শুধু একবার প্রচ্ছদে ছাপানোর (Print License) অনুমতি দেন। কিন্তু ম্যাগাজিন কর্তৃপক্ষ ওই ছবিটি দিয়ে ক্যালেন্ডার ও টি-শার্ট বানিয়ে বিক্রি শুরু করে। ফটোগ্রাফার "লাইসেন্সের পরিধি লঙ্ঘন" এর কারণে বাণিজ্যিক আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করবেন।

৬. অননুমোদিত ডেরিভেটিভ কর্ম ও কুম্ভিলকবৃত্তি (Unauthorized Derivative Works and Plagiarism):
মামলার গ্রাউন্ড: অন্যের মূল সাহিত্য বা শিল্পকর্মের ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু তৈরি করাকে 'ডেরিভেটিভ ওয়ার্ক' (যেমন- উপন্যাস থেকে সিনেমা বা নাটক তৈরি, অন্য ভাষায় অনুবাদ) বলে। মূল লেখকের পূর্বানুমতি ছাড়া এমন ডেরিভেটিভ কর্ম তৈরি করে ব্যবসা করা কপিরাইট আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ ১ (উপন্যাস থেকে নাটক): 
একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিকের জনপ্রিয় একটি থ্রিলার উপন্যাসের গল্প হুবহু নকল করে একটি প্রোডাকশন হাউস একটি মেগা-সিরিয়াল তৈরি করে টিভিতে প্রচার শুরু করল। কিন্তু উপন্যাসের লেখকের কাছ থেকে কোনো 'অ্যাডাপ্টেশন রাইটস' (Adaptation Rights) কেনা হয়নি। লেখক তার মেধা চুরির দায়ে প্রোডাকশন হাউসের বিরুদ্ধে মামলা করে সিরিয়ালটির প্রচার বন্ধ করতে পারেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (বিদেশি বইয়ের অবৈধ অনুবাদ): 
আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার একটি আত্মউন্নয়নমূলক (Self-help) বইয়ের বাংলা অনুবাদের স্বত্ব (Translation Right) না কিনেই, স্থানীয় একটি প্রকাশনী বইটি অনুবাদ করে বাজারে দেদারসে বিক্রি শুরু করল। মূল বিদেশি প্রকাশনী বা লেখক দেশীয় বাণিজ্যিক আদালতে কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলা দায়ের করতে পারবেন।

৭. নৈতিক অধিকার (Moral Rights) লঙ্ঘন:
মামলার গ্রাউন্ড: কপিরাইট আইন, ২০২৩ অনুযায়ী স্রষ্টার অর্থনৈতিক অধিকারের (Economic Rights) পাশাপাশি 'নৈতিক অধিকার' (Moral Rights) থাকে। এর মানে হলো, কর্মের ওপর স্রষ্টার নামের স্বীকৃতি থাকতে হবে (Right of Paternity) এবং তার কর্মকে এমনভাবে বিকৃত করা যাবে না যা তার সুনামের জন্য ক্ষতিকর (Right of Integrity)। কপিরাইট বিক্রি করে দিলেও এই অধিকার স্রষ্টার থাকে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (নামের স্বীকৃতি না দেওয়া): 
একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা একজন ফ্রিল্যান্স স্ক্রিপ্ট রাইটারের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে একটি চমৎকার বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট কিনল। কিন্তু বিজ্ঞাপনটি প্রচার হওয়ার পর দেখা গেল, স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে সংস্থারই একজন ডিরেক্টরের নাম দেখানো হচ্ছে। মূল লেখক তার নৈতিক অধিকার (প্যাটার্নিটি রাইট) লঙ্ঘনের জন্য মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (শিল্পকর্মের বিকৃতি): 
একজন ভাস্কর একটি করপোরেট অফিসের লবির জন্য একটি সুন্দর ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য তৈরি করে দিলেন। কয়েক বছর পর নতুন ম্যানেজমেন্ট এসে ভাস্কর্যটিতে অদ্ভুত সব রং করে এর মূল শৈল্পিক সৌন্দর্য নষ্ট করে দিল, যা শিল্পীর সুনামের জন্য অপমানজনক। শিল্পী তার কর্মের বিকৃতি (Integrity Right violation) রোধে বাণিজ্যিক আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন।

উপসংহার:
ডিজিটাল যুগে কপিরাইট শুধু শিল্পের স্বীকৃতি নয়, এটি একটি বিশাল অঙ্কের বাণিজ্যিক খাত। একটি সফটওয়্যার বা একটি সিনেমা তৈরি করতে যে শ্রম ও মূলধন বিনিয়োগ হয়, পাইরেসির কারণে তা নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(১৬) ধারার মাধ্যমে কপিরাইট আইন, ২০২৩-এর বিরোধগুলোকে বাণিজ্যিক আদালতের আওতায় আনায় এখন মেধা সম্পদের স্রষ্টা ও বিনিয়োগকারীরা দ্রুত আইনি সুরক্ষা পাবেন। এটি দেশের সৃজনশীল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একটি সুষ্ঠু, পাইরেসি-মুক্ত এবং বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com