বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-১৬): অংশীদারিত্ব চুক্তি (partnership agreements) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ
ভূমিকা:
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার একটি অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হলো অংশীদারিত্ব ব্যবসা বা পার্টনারশিপ ফার্ম (Partnership Firm)। একাধিক ব্যক্তি যখন মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে চুক্তির ভিত্তিতে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করেন, তখন তাকে অংশীদারিত্ব ব্যবসা বলে। অংশীদারদের মধ্যে এই চুক্তি লিখিত (Partnership Deed) বা মৌখিক হতে পারে।
যেহেতু এখানে একাধিক ব্যক্তির স্বার্থ, মূলধন এবং শ্রম জড়িত থাকে, তাই অংশীদারদের মধ্যে প্রায়শই বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দেয়। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৪) অনুযায়ী "অংশীদারিত্ব চুক্তি" (partnership agreements) থেকে উদ্ভূত যেকোনো বিরোধ বাণিজ্যিক আদালতের আওতাভুক্ত হিসেবে গণ্য হবে। ধারা ২(ঘ)(১৪)-তে "অংশীদারিত্ব চুক্তি" (Partnership Agreements)-এর অধীন সৃষ্ট যেকোনো মতবিরোধকে স্পষ্টভাবে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ফলে অংশীদারদের মধ্যকার দ্বন্দ্বগুলো এখন দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাণিজ্যিক আদালতে নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
নিচে অংশীদারিত্ব চুক্তির অধীনে সৃষ্ট প্রধান বাণিজ্যিক বিরোধসমূহ, মামলার সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ড বা কারণ এবং সেগুলোর বাস্তব উদাহরণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. মুনাফা ও লোকসান বণ্টন সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Profit and Loss Sharing):
অংশীদারিত্ব ব্যবসায় মুনাফা ও ক্ষতির অংশ চুক্তিতে নির্ধারিত অনুপাতে বণ্টিত হতে হয়। এখানে অনিয়ম হলে বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। অংশীদারিত্ব চুক্তির প্রধান শর্ত থাকে একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে ব্যবসার মুনাফা (Profit) এবং লোকসান (Loss) ভাগ করে নেওয়া। যদি ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কোনো অংশীদার অন্য অংশীদারদের চুক্তিতে উল্লেখিত অনুপাতে মুনাফা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, কিংবা ব্যবসায়ের লোকসানের পুরো দায়ভার অন্যায়ভাবে অন্য অংশীদারের ওপর চাপিয়ে দেয়, তবে ভুক্তভোগী অংশীদার মামলা করতে পারেন।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) বছর শেষে ন্যায্য মুনাফার অংশ (Profit share) বুঝিয়ে না দেওয়া। (২) ভুয়া ক্ষতির অজুহাত দেখিয়ে অন্য অংশীদারকে তার পাওনা থেকে বঞ্চিত করা। এবং (৩) অংশীদারদের সম্মতি ছাড়াই মুনাফার টাকা দিয়ে অযৌক্তিক বোনাস বা বেতন হিসেবে নিজের পকেটে নেওয়া।
বাস্তব উদাহরণ ১ (মুনাফা আটকে রাখা):
একটি সফটওয়্যার কোম্পানির চারজন অংশীদার। বছর শেষে কোম্পানির ১ কোটি টাকা লাভ হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যেকের ২৫ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু ম্যানেজিং পার্টনার বলেন যে, আগামী বছর ব্যবসার প্রসারের জন্য এই টাকা এখন কাউকে দেওয়া হবে না। যেহেতু চুক্তিতে এমন কোনো শর্ত ছিল না, তাই বাকি তিন অংশীদার তাদের "ন্যায্য মুনাফা আদায়ের" গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (একতরফা বেতন গ্রহণ):
চুক্তি অনুযায়ী অংশীদারদের ব্যবসার লভ্যাংশ নেওয়ার কথা। কিন্তু এক অংশীদার অন্যদের না জানিয়ে ফার্মের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি মাসে নিজের জন্য ২ লাখ টাকা 'ব্যবস্থাপনা ফি' বা 'বেতন' হিসেবে তুলে নেন, যা চুক্তিতে অনুমোদিত ছিল না। অন্য অংশীদাররা এই অবৈধ অর্থ উত্তোলনের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ১ (রেস্টুরেন্ট ব্যবসা):
তিনজন বন্ধু মিলে সমান (৩৩.৩৩%) মূলধন বিনিয়োগ করে একটি রেস্টুরেন্ট চালু করলেন। একজন বন্ধু ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। বছর শেষে রেস্টুরেন্ট ৩০ লাখ টাকা লাভ করলেও, ম্যানেজার বন্ধুটি ভুয়া খরচ দেখিয়ে মাত্র ৩ লাখ টাকা লাভ দেখান এবং বাকি দুই বন্ধুকে নামমাত্র মুনাফা দেন। বঞ্চিত দুই বন্ধু সঠিক মুনাফা আদায়ের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (হার্ডওয়্যার স্টোর):
দুজন অংশীদার মিলে একটি হার্ডওয়্যারের দোকান দিলেন। চুক্তিতে ছিল লাভ-ক্ষতি অর্ধেক ভাগ হবে। কিন্তু বাজারে মন্দার কারণে ব্যবসায় ৫ লাখ টাকা ক্ষতি হলে, এক অংশীদার পুরো ক্ষতির টাকা পরিশোধ করতে অস্বীকার করে এবং সব দায়ভার অপরজনের ওপর চাপিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী অংশীদার ক্ষতিপূরণ আদায়ে মামলা দায়ের করতে পারেন।
২. তহবিলের আত্মসাৎ ও হিসাব-নিকাশে অস্বচ্ছতা (Misappropriation of Funds and Falsification of Accounts):
অংশীদারিত্ব ব্যবসায় আর্থিক অস্বচ্ছতা সবচেয়ে বেশি বিরোধের জন্ম দেয়। যে অংশীদারের হাতে ব্যবসার অর্থ পরিচালনার দায়িত্ব থাকে, তিনি যদি অসদুপায় অবলম্বন করেন, তবে বাকিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) ফার্মের অর্থ বা সম্পদ নিজের ব্যক্তিগত কাজে বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া (Siphoning of funds)। (২) হিসাবের খাতায় (Books of Accounts) ভুয়া খরচ দেখিয়ে মুনাফা কমিয়ে দেখানো। এবং (৩) অন্য অংশীদারদের ব্যবসার প্রকৃত হিসাব বা আর্থিক বিবরণী দেখতে না দেওয়া।
বাস্তব উদাহরণ ১ (তহবিল আত্মসাৎ):
একটি ফার্মেসির ব্যবসার হিসাবরক্ষণের দায়িত্ব ছিল এক অংশীদারের ওপর। বছর শেষে তিনি দেখান যে ব্যবসায় কোনো লাভ হয়নি। কিন্তু অন্য অংশীদাররা অডিট করে দেখতে পান যে, ওই অংশীদার ফার্মের অ্যাকাউন্ট থেকে নগদ ২০ লাখ টাকা সরিয়ে নিজের স্ত্রীর নামে একটি জমি কিনেছেন। "তহবিল আত্মসাৎ এবং প্রতারণার" সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ডে ওই অংশীদারের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (হিসাব দেখাতে অস্বীকৃতি):
একটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় একজন 'স্লিপিং পার্টনার' (যিনি শুধু মূলধন দিয়েছেন কিন্তু পরিচালনায় নেই) আছেন। তিনি ছয় মাস পর ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখতে চান। কিন্তু 'অ্যাকটিভ পার্টনাররা' (যারা পরিচালনা করেন) তাকে হিসাবের খাতা বা সফটওয়্যারের অ্যাক্সেস দিতে অস্বীকৃতি জানান। স্লিপিং পার্টনার "হিসাব-নিকাশে অস্বচ্ছতা এবং তথ্য গোপনের" গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।
৩. হিসাবের খাতা এবং তথ্যে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চনা (Denial of Access to Books of Accounts)
মামলার গ্রাউন্ড: অংশীদারিত্ব আইনে প্রতিটি অংশীদারের অধিকার রয়েছে ব্যবসার হিসাবের খাতা (Books of Accounts), ভাউচার, এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখা ও পরীক্ষা করার। যদি কোনো 'অ্যাক্টিভ পার্টনার' (যিনি ব্যবসা চালান) অন্য কোনো 'স্লিপিং পার্টনার' (যিনি শুধু বিনিয়োগ করেছেন) বা সাধারণ অংশীদারকে হিসাব দেখতে বাধা দেন বা অডিট করতে না দেন, তবে সেটি মামলার সুস্পষ্ট গ্রাউন্ড।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ফার্মেসি ব্যবসা):
একজন প্রবাসী বিনিয়োগকারী দেশে তার আত্মীয়ের সাথে পার্টনারশিপে একটি বড় ফার্মেসি দিলেন। আত্মীয় দোকান পরিচালনা করেন। দুই বছর পর প্রবাসী অংশীদার ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখতে চাইলে আত্মীয় নানা টালবাহানা করেন এবং ক্যাশ মেমো লুকাতে থাকেন। প্রবাসী অংশীদার বাণিজ্যিক আদালতে গিয়ে রিসিভার নিয়োগ ও হিসাব নিরীক্ষার (Audit) আদেশ চাইতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (এক্সপোর্ট ফার্ম):
একটি চামড়া রফতানি প্রতিষ্ঠানের এক অংশীদার সন্দেহ করেন যে বিদেশি বায়ারদের পেমেন্ট ঠিকমতো অ্যাকাউন্টে আসছে না। তিনি ইনভয়েসগুলো দেখতে চাইলে অপর অংশীদার তা ড্রয়ারে তালা মেরে রাখেন। তথ্যে বাধা দেওয়ার এই ঘটনা বাণিজ্যিক আদালতে বিচারযোগ্য।
৪. অংশীদারিত্বের সম্পদ বা তহবিলের অপব্যবহার (Misappropriation of Partnership Assets or Funds):
মামলার গ্রাউন্ড: অংশীদারিত্ব ব্যবসার যেকোনো সম্পদ বা তহবিল শুধুমাত্র ব্যবসার কাজেই ব্যবহার করা যাবে। কোনো অংশীদার যদি ব্যবসার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরিয়ে নেন, ব্যবসার কোনো জমি বা গাড়ি নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন, অথবা ব্যবসার সম্পদ বিক্রি করে টাকা নিজে আত্মসাৎ করেন, তবে তা চুক্তিভঙ্গ এবং ফৌজদারি অপরাধের পাশাপাশি একটি বাণিজ্যিক বিরোধ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (রিয়েল এস্টেট পার্টনারশিপ):
একটি রিয়েল এস্টেট পার্টনারশিপ ফার্মের অ্যাকাউন্টে জমি কেনার জন্য ১০ কোটি টাকা রাখা ছিল। একজন অংশীদার বাকিদের না জানিয়ে সেই অ্যাকাউন্ট থেকে ৩ কোটি টাকা তুলে নিজের নামে একটি ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট কিনে ফেললেন। এটি সরাসরি ফার্মের তহবিলের তছরুপ এবং এর বিরুদ্ধে ধারা ২(ঘ)(১৪) এর অধীনে অর্থ পুনরুদ্ধারের মামলা করা যাবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (ডেলিভারি সার্ভিস):
একটি ই-কমার্স ডেলিভারি পার্টনারশিপ কোম্পানির ৫টি কাভার্ড ভ্যান ছিল। একজন অংশীদার ব্যবসার কাজ বাদ দিয়ে ওই ভ্যানগুলো নিজের শ্যালকের ফার্নিচার ব্যবসার মালামাল পরিবহনের জন্য বিনা ভাড়ায় ব্যবহার করতে শুরু করেন। অপর অংশীদাররা এই সম্পদের অপব্যবহারের জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারেন।
৫. অংশীদারিত্ব চুক্তি বা ডিডের শর্ত ভঙ্গ (Breach of Partnership Deed):
অংশীদারিত্ব ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো চুক্তিপত্র (Deed)। চুক্তিতে প্রত্যেক অংশীদারের দায়িত্ব, মূলধনের পরিমাণ, এবং ক্ষমতা নির্দিষ্ট করা থাকে। কোনো অংশীদার এই শর্তগুলো অমান্য করলে তা মামলার একটি প্রধান গ্রাউন্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) প্রতিশ্রুত মূলধন (Capital) বা সম্পদ ফার্মে বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হওয়া। (২) চুক্তিতে উল্লেখিত দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা বা অস্বীকৃতি। এবং (৩) অন্য অংশীদারদের সম্মতি ছাড়া চুক্তির শর্তের বাইরে গিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
বাস্তব উদাহরণ ১ (মূলধন বিনিয়োগে ব্যর্থতা):
তিনজন বন্ধু মিলে একটি এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসা শুরু করেন। চুক্তিতে শর্ত ছিল প্রত্যেকে ৫০ লাখ টাকা করে মূলধন দেবেন। এ এবং বি তাদের টাকা দিলেও, সি মাত্র ১০ লাখ টাকা দেয় এবং বাকি টাকা দিতে টালবাহানা করে। মূলধনের অভাবে ফার্মটি একটি বড় রপ্তানি অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং বিশাল ক্ষতির মুখে পড়ে। এই ক্ষেত্রে এ এবং বি, সি-এর বিরুদ্ধে "চুক্তিভঙ্গ ও মূলধন প্রদানে ব্যর্থতার" গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (ক্ষমতার অপব্যবহার):
একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মের চুক্তিতে বলা ছিল যে, ১০ লাখ টাকার বেশি কোনো ব্যাংক লোন নিতে হলে সব অংশীদারের লিখিত সম্মতি লাগবে। কিন্তু ম্যানেজিং পার্টনার (Managing Partner) অন্যদের না জানিয়ে ফার্মের নামে ১ কোটি টাকার লোন নেন। অন্য অংশীদাররা "চুক্তিভঙ্গ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের" গ্রাউন্ডে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।
৬. বিশ্বস্ততা ভঙ্গ এবং প্রতিযোগী ব্যবসা পরিচালনা (Breach of Fiduciary Duty & Competing Business):
অংশীদারদের মধ্যে সম্পর্কটি চরম বিশ্বাসের। আইন অনুযায়ী, কোনো অংশীদার ফার্মের ব্যবসার সাথে প্রতিযোগিতা করে এমন কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসা অন্যদের অনুমতি ছাড়া করতে পারেন না।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) অন্যদের না জানিয়ে একই প্রকৃতির আরেকটি ব্যবসা (Competing business) খোলা। (২) ফার্মের ক্লায়েন্ট বা কাস্টমারদের নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসার দিকে সরিয়ে নেওয়া। এবং (৩) ফার্মের নাম, ট্রেডমার্ক বা সম্পত্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত গোপন মুনাফা (Secret profit) অর্জন।
বাস্তব উদাহরণ ১ (প্রতিযোগী ব্যবসা):
তিন অংশীদার মিলে ঢাকায় একটি স্বনামধন্য ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্ম চালান। এর মধ্যে একজন অংশীদার অন্যদের না জানিয়ে নিজের স্ত্রীর নামে আরেকটি ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্ম খোলেন। এরপর তিনি মূল ফার্মের বড় বড় ক্লায়েন্টদের গোপনে তার স্ত্রীর ফার্মে পাঠিয়ে দেন। অন্য অংশীদাররা এই "বিশ্বস্ততা ভঙ্গ ও প্রতিযোগী ব্যবসা পরিচালনার" কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা করে ক্ষতিপূরণ ও ওই নতুন ব্যবসার মুনাফার অংশ দাবি করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (গোপন মুনাফা/কমিশন):
একটি ট্রেডিং ফার্মের পারচেজ পার্টনার (Purchase Partner) সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে পণ্য কেনার সময় গোপনে নিজের পকেটে ১০% কমিশন বা ঘুষ নেন, যা ফার্মের চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অন্য অংশীদাররা প্রমাণ পেলে "গোপন মুনাফা অর্জনের" গ্রাউন্ডে ওই অর্থ ফার্মের তহবিলে ফেরত আনার জন্য মামলা করতে পারবেন।
৭. ফিডুশিয়ারি ডিউটি (Fiduciary Duty) লঙ্ঘন এবং গোপন মুনাফা অর্জন
মামলার গ্রাউন্ড: অংশীদারদের একে অপরের প্রতি পরম আস্থার সম্পর্ক (Fiduciary relationship) থাকে। প্রত্যেক অংশীদারের দায়িত্ব ব্যবসার সর্বোচ্চ লাভ নিশ্চিত করা। যদি কোনো অংশীদার নিজের পদ বা ব্যবসার নাম ব্যবহার করে গোপনে কোনো মুনাফা অর্জন করেন (Secret Profit) বা এমন কোনো কাজ করেন যাতে ব্যবসার ক্ষতি ও নিজের লাভ হয়, তবে তাকে সেই মুনাফা ফার্মের কাছে ফেরত দিতে হয়। তা না দিলে মামলা করা যায়।
বাস্তব উদাহরণ ১ (কাঁচামাল ক্রয়):
একটি গার্মেন্টস সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানার পার্টনারশিপে, একজন পার্টনারের দায়িত্ব ছিল সুতা কেনা। তিনি বাজার থেকে ন্যায্য মূল্যে সুতা না কিনে, নিজের ভাইয়ের দোকান থেকে বাজার দরের চেয়ে ২০% বেশি দামে সুতা কিনতে থাকেন, যার বিনিময়ে ভাইয়ের কাছ থেকে গোপন কমিশন পান। ফার্মের অন্যান্য অংশীদাররা বিষয়টি জানতে পারলে ওই গোপন মুনাফা আদায়ের মামলা করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (টেন্ডার চুরি):
একটি কনস্ট্রাকশন পার্টনারশিপ ফার্ম একটি সরকারি টেন্ডারে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু ফার্মের এক অংশীদার গোপনে নিজের স্ত্রীর নামে খোলা একটি নতুন কোম্পানির মাধ্যমে ওই একই টেন্ডারে অংশ নিয়ে কাজটি বাগিয়ে নেন। এটি আস্থার চরম লঙ্ঘন এবং এর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করা যাবে।
৮. প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা না করার শর্ত ভঙ্গ (Breach of Non-Compete Clause)
মামলার গ্রাউন্ড: অনেক অংশীদারিত্ব চুক্তিতেই শর্ত থাকে যে, কোনো অংশীদার ফার্ম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে ফার্মের একই রকম বা প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা শুরু করতে পারবেন না এবং ফার্মের পুরনো ক্লায়েন্টদের ভাঙিয়ে নিতে পারবেন না। এই শর্ত ভঙ্গ করলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
বাস্তব উদাহরণ ১ (কোচিং সেন্টার):
একটি বিখ্যাত ভর্তি কোচিং সেন্টারের পার্টনারশিপ ভেঙে এক অংশীদার আলাদা হয়ে গেলেন। চুক্তিতে বলা ছিল আগামী ২ বছর তিনি ওই একই শহরে নতুন কোচিং সেন্টার দিতে পারবেন না। কিন্তু তিনি ৩ মাসের মাথায় ঠিক উল্টো দিকে নতুন কোচিং খুলে পুরনো ফার্মের শিক্ষকদের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গেলেন। বিদ্যমান কোচিং সেন্টারটি এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) চেয়ে মামলা করতে পারবে।
৯. বেআইনিভাবে অংশীদারকে বহিষ্কার বা ব্যবসা বিলোপসাধন (Wrongful Expulsion or Dissolution)
মামলার গ্রাউন্ড: অংশীদারিত্ব চুক্তিতে সুস্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া না থাকলে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোনো অংশীদারকে জোরপূর্বক বহিষ্কার (Expel) করা যায় না। এছাড়া, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া বা অন্য অংশীদারদের নোটিশ না দিয়ে হঠাৎ করে লাভজনক ব্যবসা বিলুপ্ত (Dissolve) করে দেওয়াও চুক্তিভঙ্গ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (আইটি ফার্ম):
৪ জন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মিলে একটি আইটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করলেন। ফার্মটি যখন প্রচুর লাভ করতে শুরু করল, তখন ৩ জন মিলে ষড়যন্ত্র করে চুক্তির কোনো কারণ ছাড়াই চতুর্থ অংশীদারকে জোর করে ফার্ম থেকে বের করে দিলেন এবং তাকে লভ্যাংশ দেওয়া বন্ধ করে দিলেন। ওই চতুর্থ অংশীদার তার অধিকার পুনর্বহাল ও ক্ষতিপূরণের জন্য মামলা করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (হঠাৎ ব্যবসা বন্ধ):
২ জন অংশীদারের একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম একটি বড় বিয়ের কাজ পেল। কাজ শুরুর ঠিক আগে এক অংশীদার হঠাৎ ঘোষণা দিলেন যে তিনি আর পার্টনারশিপে থাকবেন না এবং ব্যবসা এখনই বন্ধ করতে হবে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল তিনি একাই নতুন কোম্পানি খুলে কাজটি করবেন। অপর অংশীদার এই বেআইনি বিলোপসাধনের কারণে হওয়া ক্ষতির জন্য মামলা করতে পারেন।
১০. ফার্মের বিলুপ্তি (Dissolution) এবং হিসাব নিষ্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ (Settlement of Accounts on Dissolution):
যখন অংশীদাররা আর একসাথে ব্যবসা করতে চান না বা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তখন ফার্ম ভেঙে দেওয়া (Dissolution) হয়। এ সময় সম্পদ বিক্রি করে দায় মেটানো এবং বাকি টাকা ভাগাভাগি করা নিয়ে সবচেয়ে জটিল বিরোধ তৈরি হয়।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) ফার্ম বিলুপ্তির নোটিশ (Notice of Dissolution) পাওয়ার পরও কোনো অংশীদার ফার্মের সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা। (২) ফার্ম ভেঙে যাওয়ার সময় গুডউইল (Goodwill) বা ট্রেডমার্কের মূল্যায়ন নিয়ে মতবিরোধ। এবং (৩) মৃত বা অবসরগ্রহণকারী (Retiring/Deceased) অংশীদারের আইনি উত্তরাধিকারীদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি।
বাস্তব উদাহরণ ১ (সম্পদ ভাগাভাগিতে বাধা):
পাঁচ বছরের চুক্তিতে একটি সুপারশপ চালু করা হয়। পাঁচ বছর পর চুক্তি শেষ হলে এক অংশীদার সুপারশপের সমস্ত ফ্রিজ, এসি এবং ইনভেন্টরি নিজের বাসায় বা গোডাউনে সরিয়ে ফেলেন এবং অন্যদের হিস্যা দিতে অস্বীকার করেন। অন্য অংশীদাররা "ফার্মের বিলুপ্তি এবং সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের" দাবিতে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন, যাতে আদালত রিসিভার (Receiver) নিয়োগ করে সম্পদগুলো নিলামে তুলে টাকা ভাগ করে দেয়।
বাস্তব উদাহরণ ২ (অবসরপ্রাপ্ত অংশীদারের পাওনা):
একজন অংশীদার বার্ধক্যজনিত কারণে ফার্ম থেকে অবসর নেন। নিয়ম অনুযায়ী ওই দিনের হিসাব অনুযায়ী ফার্মের সম্পদে তার যে অংশ (Capital and accrued profit) তা তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান অংশীদাররা তাকে মাত্র ৫ লাখ টাকা দিয়ে বিদায় করতে চান, যেখানে অডিট অনুযায়ী তার পাওনা ৫০ লাখ টাকা। ওই অবসরপ্রাপ্ত অংশীদার তার "প্রকৃত হিস্যা ও হিসাব নিষ্পত্তির" গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করতে পারবেন।
উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৪) এর অধীনে অংশীদারিত্ব ব্যবসার বিরোধগুলোকে বাণিজ্যিক আদালতের আওতায় আনার ফলে ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। অংশীদারদের মধ্যে বিশ্বাসভঙ্গ, আর্থিক প্রতারণা বা হিসাবের অস্বচ্ছতা নিয়ে বছরের পর বছর সাধারণ দেওয়ানি আদালতে (Civil Courts) ঝুলে থাকা মামলাগুলো এখন সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হবে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশকে আরও সুষ্ঠু ও বিনিয়োগবান্ধব করবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com