বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-১১):যৌথ উদ্যোগ চুক্তি (joint venture agreements) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ

ভূমিকা:
যৌথ উদ্যোগ বা Joint Venture (JV) হলো এমন একটি ব্যবসায়িক চুক্তি যেখানে দুই বা ততোধিক পক্ষ একটি নির্দিষ্ট প্রকল্প বা ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিজেদের মূলধন, সম্পদ, মেধা বা প্রযুক্তি একত্রিত করে। যেহেতু এতে একাধিক পক্ষের স্বার্থ জড়িত থাকে, তাই মতবিরোধ বা চুক্তিভঙ্গের সম্ভাবনাও প্রবল। ২(ঘ)(১০)-এ স্পষ্টভাবে "যৌথ উদ্যোগ চুক্তি" (Joint Venture Agreements) থেকে উদ্ভূত যেকোনো বিরোধকে বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে এই সংক্রান্তে আইন-আদালত ছিল না।

নিচে বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১০) এর অধীনে যৌথ উদ্যোগ চুক্তির ক্ষেত্রে যেসব কারণে বা গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়, তা একাধিক বাস্তব উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

মূলধন বা সম্পদ বিনিয়োগে ব্যর্থতা (Failure to Contribute Capital/Resources):
যৌথ উদ্যোগের প্রাথমিক শর্তই হলো চুক্তিবদ্ধ পক্ষগুলোর নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন (Capital) বা সম্পদ (Assets) বিনিয়োগ করা। কোনো পক্ষ এই শর্ত ভঙ্গ করলে তা বাণিজ্যিক বিরোধের জন্ম দেয়।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণ:
১. চুক্তিতে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে নগদ মূলধন বিনিয়োগে ব্যর্থতা।
২. প্রতিশ্রুত জমি, যন্ত্রপাতি বা অন্য কোনো ভৌত সম্পদ হস্তান্তরে অস্বীকৃতি বা বিলম্ব।
৩. সম্পদের অবমূল্যায়ন (Undervaluation) বা মিথ্যা তথ্য প্রদান।
যৌথ উদ্যোগ চুক্তির প্রাথমিক শর্তই থাকে প্রত্যেক পক্ষের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, জমি, প্রযুক্তি বা শ্রম বিনিয়োগ করা। যদি কোনো পক্ষ চুক্তিতে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে বা শর্ত অনুযায়ী তাদের নির্ধারিত মূলধন বা সম্পদ বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়, তবে অপর পক্ষ বাণিজ্যিক আদালতে চুক্তিভঙ্গের (Breach of Contract) মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ১:
বাংলাদেশের 'ক' লিমিটেড এবং জাপানের 'খ' কর্পোরেশন একটি যৌথ উদ্যোগ চুক্তি করে একটি অটোমোবাইল ফ্যাক্টরি করার জন্য। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী 'ক' লিমিটেডের ফ্যাক্টরির জন্য গাজীপুরে ১০ একর জমি দেওয়ার কথা এবং জাপানি কোম্পানির ৫০ কোটি টাকা মূলধন দেওয়ার কথা। কিন্তু ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও 'ক' লিমিটেড জমির রেজিস্ট্রেশন যৌথ উদ্যোগ কোম্পানির নামে হস্তান্তর করেনি। এখানে জাপানি কোম্পানি 'খ' ধারা ২(ঘ)(১০) এর অধীনে 'ক'-এর বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের দায়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২:
চুক্তিতে বলা ছিল 'এক্স' কোম্পানি তাদের পুরাতন মেশিনারিগুলো জেভি (JV) কোম্পানিতে বিনিয়োগ হিসেবে দেবে যার মূল্য ধরা হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। পরে অডিট করে দেখা গেল মেশিনগুলোর বাস্তব বাজারমূল্য মাত্র ১ কোটি টাকা। অপর পক্ষ এখানে জালিয়াতি ও চুক্তিভঙ্গের গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (আবাসন প্রকল্প): 
'ABC রিয়েল এস্টেট' এবং জমির মালিক 'জনাব করিম' এর মধ্যে একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি হলো। চুক্তি অনুযায়ী জনাব করিম জমি দেবেন এবং ABC কোম্পানি ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ভবন নির্মাণ করবে। জনাব করিম জমি বুঝিয়ে দিলেও, ABC কোম্পানি ২ বছর পার হওয়ার পরও নির্মাণ কাজের জন্য মূলধন বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হলো। জনাব করিম এখন ধারা ২(ঘ)(১০) এর অধীনে ক্ষতিপূরণ ও চুক্তি বাতিলের জন্য মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস): 
একটি দেশীয় লজিস্টিকস কোম্পানি এবং একটি বিদেশি আইটি ফার্মের মধ্যে জেভি (JV) হলো। লজিস্টিকস কোম্পানি গুদাম ও গাড়ি দেবে, আর আইটি ফার্ম এআই (AI) চালিত সফটওয়্যার দেবে। গুদাম প্রস্তুত হওয়ার পরও আইটি ফার্ম সফটওয়্যার হস্তান্তর না করায় পুরো ব্যবসা থমকে গেল। দেশীয় কোম্পানিটি তাদের আর্থিক ক্ষতির জন্য মামলা দায়ের করতে পারে।

মুনাফা ও লভ্যাংশ বণ্টন সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Profit Sharing and Financial Liabilities):
মামলার গ্রাউন্ড: ব্যবসা থেকে অর্জিত লভ্যাংশ (Profit) চুক্তিতে উল্লেখিত অনুপাতে বণ্টন না করা, হিসাব-নিকাশে অস্বচ্ছতা রাখা (Financial irregularities), কিংবা লোকসান হলে তার দায়ভার একা অন্য পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। যখন কোনো এক পক্ষ অপর পক্ষকে তার ন্যায্য লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত করে, তখন এই বিরোধের সৃষ্টি হয়। যেই গ্রাউন্ডে মামলা করা যায় তা হল: ১) হিসাবপত্রে কারচুপি করে মুনাফা কম দেখানো (Manipulation of Accounts), ২) চুক্তিতে উল্লেখিত অনুপাতে লভ্যাংশ প্রদানে অস্বীকৃতি, এবং ৩) বোর্ড অব ডিরেক্টরস-এর সিদ্ধান্ত ছাড়া মুনাফার টাকা অন্য কোনো খাতে সরিয়ে ফেলা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি): 
'X' এবং 'Y' কোম্পানির সমান অংশীদারিত্বে একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরি গড়ে উঠল। 'X' কোম্পানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল। বছর শেষে দেখা গেল 'X' কোম্পানি কাঁচামাল ক্রয়ের ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে খরচ বেশি দেখিয়েছে এবং 'Y'-কে প্রকৃত লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত করেছে। 'Y' কোম্পানি ফরেনসিক অডিট রিপোর্টের ভিত্তিতে মুনাফা আদায়ের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে যেতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম): 
যৌথ উদ্যোগে গড়া একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। চুক্তিতে ছিল ঋণের দায় দুই পক্ষেরই। কিন্তু ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে এক পক্ষ ঋণের কিস্তি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অপর পক্ষ বাধ্য হয়ে পুরো কিস্তি পরিশোধ করে এবং অংশীদারের অংশ আদায়ের জন্য মামলা করে।

বাস্তব উদাহরণ ৩:
রহিম ও করিম মিলে একটি রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টের জন্য জেভি চুক্তি করে (লাভের অনুপাত ৬০:৪০)। বছর শেষে প্রজেক্ট থেকে ১০ কোটি টাকা লাভ হয়। কিন্তু রহিম (যে মূল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল) ভুয়া খরচের ভাউচার দেখিয়ে কোম্পানির লাভ মাত্র ১ কোটি টাকা দেখায় এবং করিমকে ৪০ লাখ টাকা দেয়। করিম হিসাব জালিয়াতি এবং ন্যায্য পাওনা আদায়ের গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪:
একটি আইটি যৌথ উদ্যোগে বিদেশি পার্টনারকে তাদের লভ্যাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পাঠানোর কথা। কিন্তু দেশীয় পার্টনার ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের অজুহাত দেখিয়ে বছরের পর বছর লভ্যাংশ আটকে রাখে। বিদেশি পার্টনার পাওনা আদায়ের জন্য মামলা করতে পারবে।

ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত বিরোধ (Management & Control Disputes):
যৌথ উদ্যোগ কোম্পানিতে কার কতটুকু নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা চুক্তিতে স্পষ্ট থাকে। এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে যেই গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করা যায় তা হল- ১) চুক্তি অমান্য করে একতরফাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ২) মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডার বা পার্টনারের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা (Oppression and Mismanagement), ৩) সংরক্ষিত বিষয়গুলোতে (Reserved Matters) ভেটো পাওয়ার (Veto power) বা সম্মতির তোয়াক্কা না করা, এবং ৪) ব্যবস্থাপনায় অচলাবস্থা (Deadlock in Management) সৃষ্টি হওয়া। যৌথ উদ্যোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণত উভয় পক্ষের সম্মতি লাগে। কিন্তু অনেক সময় কে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) হবেন, কর্মী নিয়োগ কীভাবে হবে, বা দৈনন্দিন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত কে নেবেন তা নিয়ে মারাত্মক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। একে 'ডেডলক' (Deadlock) পরিস্থিতি বলে, যা ব্যবসার মারাত্মক ক্ষতি করে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (হাসপাতাল পরিচালনা): 
একটি মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরিতে ৫০% শেয়ার দেশি চিকিৎসকদের একটি গ্রুপের এবং ৫০% শেয়ার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী (CEO) নিয়োগ দেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। কোনো পক্ষই ছাড় না দেওয়ায় হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। এই ডেডলক নিরসনে বা রিসিভার (Receiver) নিয়োগের জন্য আদালতে আবেদন করা যায়।

বাস্তব উদাহরণ ২:
JV চুক্তিতে স্পষ্ট লেখা আছে যে, কোম্পানি ৫ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক লোন নিতে চাইলে উভয় পক্ষের ডিরেক্টরদের সর্বসম্মত অনুমোদন লাগবে। কিন্তু 'পক্ষ এ'-এর ডিরেক্টররা 'পক্ষ বি'-কে না জানিয়েই রেজুলেশন পাশ করে ব্যাংক থেকে ২০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে নেয়। 'পক্ষ বি' তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়া এবং আল্ট্রা-ভায়ার্স (Ultra-vires) কাজের গ্রাউন্ডে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) চেয়ে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৩:
দুটি কোম্পানি ৫০%-৫০% মালিকানায় একটি জেভি গঠন করে। কিন্তু কোম্পানির সিইও নিয়োগ নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়, ফলে কোম্পানির দৈনন্দিন কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় (Deadlock)। এই অচলাবস্থা নিরসন বা জেভি বিলুপ্তির (Winding up) জন্য আদালতে আবেদন করা যাবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪: 
যৌথ উদ্যোগ চুক্তিতে বলা আছে কোনো বড় টেন্ডারে অংশ নিতে হলে বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত লাগবে। কিন্তু একটি লাভজনক সরকারি টেন্ডারের আগে এক পক্ষের ডিরেক্টররা ইচ্ছাকৃতভাবে বোর্ড মিটিংয়ে অনুপস্থিত থেকে কোরাম (Quorum) পূর্ণ হতে দিলেন না, যার ফলে কোম্পানি টেন্ডারটি হারাল। ভুক্তভোগী পক্ষ অপর পক্ষের এই অসহযোগিতামূলক আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে।

বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (IP) এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘন (Breach of IP and Confidentiality):
মামলার গ্রাউন্ড: জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজ করার সময় এক পক্ষ অপর পক্ষের অনেক ব্যবসায়িক গোপনীয়তা (Trade Secrets), ক্লায়েন্ট লিস্ট বা প্যাটেন্ট সম্পর্কে জানতে পারে। চুক্তির শর্ত ভেঙে কোনো পক্ষ যদি এই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে বা তৃতীয় পক্ষের কাছে ফাঁস করে দেয়।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ফার্মাসিউটিক্যালস): 
একটি দেশীয় ওষুধ কোম্পানির সাথে বিদেশি কোম্পানির জয়েন্ট ভেঞ্চার হলো একটি বিশেষ ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনের জন্য। দেশীয় কোম্পানিটি বিদেশি কোম্পানির মূল ফর্মুলাটি (Trade Secret) চুরি করে তাদের অন্য একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে বাজারে ভিন্ন নামে বিক্রি শুরু করল। বিদেশি কোম্পানিটি অবিলম্বে ইনজাংকশন (নিষেধাজ্ঞা) এবং ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (সফটওয়্যার সোর্স কোড): 
যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা একটি ফিনটেক (Fintech) অ্যাপের সোর্স কোড এক পার্টনার গোপনে বিক্রি করে দিল প্রতিদ্বন্দ্বী একটি কোম্পানির কাছে। এটি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (NDA) এবং জেভি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ ৩: একটি কোরিয়ান কসমেটিকস ব্র্যান্ড বাংলাদেশের একটি কোম্পানির সাথে জেভি করে তাদের ফর্মুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রসাধন সামগ্রী তৈরির জন্য। চুক্তিতে বলা ছিল এই ফর্মুলা শুধু জেভি কোম্পানির প্রোডাক্টেই ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশি পার্টনার সেই ফর্মুলা চুরি করে নিজেদের আরেকটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে ভিন্ন নামে বাজারে পণ্য ছাড়ে। কোরিয়ান কোম্পানি মেধাসম্পদ চুরি ও জেভি চুক্তির লঙ্ঘনের গ্রাউন্ডে ধারা ২(ঘ)(১০) অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞার মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪:
চুক্তির শর্ত ছিল আমেরিকান কোম্পানি তাদের সর্বাধুনিক সফটওয়্যারের সোর্স কোড জেভি কোম্পানিকে হস্তান্তর করবে। কিন্তু তারা শুধু পুরনো ভার্সন দেয়, সোর্স কোড দেয় না। দেশীয় কোম্পানি চুক্তি সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎকরণ (Specific Performance of Contract) এর জন্য মামলা করতে পারে।

ফিউডিশিয়ারি ডিউটি (Fiduciary Duty) লঙ্ঘন এবং তহবিল তছরুপ:
যৌথ উদ্যোগে একে অপরের প্রতি চরম বিশ্বস্ততা বা Fiduciary Duty বজায় রাখতে হয়। স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এই ক্ষেত্রে বড় বিরোধের জন্ম দেয়।

যেসব গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করা যায় সেগুলো হল: ১) জেভি ফান্ডের টাকা ব্যক্তিগত কাজে বা নিজের অন্য কোম্পানিতে সরিয়ে নেওয়া (Siphoning of funds), ২) জেভি কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতা করে এমন সমজাতীয় ব্যবসা গোপনে পরিচালনা করা (Non-compete clause breach), এবং ৩) ওভার-ইনভয়েসিং বা আন্ডার-ইনভয়েসিং করে আত্মসাৎ।

বাস্তব উদাহরণ ১:
একটি কনস্ট্রাকশন জেভির ম্যানেজিং ডিরেক্টর (যিনি 'ক' কোম্পানির প্রতিনিধি) জেভি প্রজেক্টের জন্য রড-সিমেন্ট কেনার ক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণ দামে তার শ্যালকের কোম্পানি থেকে কাঁচামাল কেনার চুক্তি করেন। এর ফলে জেভি কোম্পানি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপর পার্টনার 'খ' কোম্পানি এখানে ফিউডিশিয়ারি ডিউটি লঙ্ঘন এবং আত্মসাতের কারণে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২:
জেভি কোম্পানির একজন ডিরেক্টর জেভি'র ক্লায়েন্ট লিস্ট চুরি করে গোপনে নিজের আরেকটি কোম্পানি খুলে জেভি'র ক্লায়েন্টদের সেখানে নিয়ে যায়। এটি স্পষ্টতই Non-compete clause এবং বিশ্বস্ততার লঙ্ঘন।

প্রস্থান কৌশল (Exit Strategy) এবং চুক্তির অবসান (Termination) সংক্রান্ত বিরোধ:
মামলার গ্রাউন্ড: যৌথ উদ্যোগ চিরস্থায়ী নাও হতে পারে। চুক্তিতে 'Right of First Refusal (ROFR)' বা 'Tag-along/Drag-along' অধিকার থাকে। অর্থাৎ, কেউ নিজের শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যেতে চাইলে আগে তার পার্টনারকে প্রস্তাব দিতে হবে। এই নিয়মগুলো লঙ্ঘন করে তৃতীয় পক্ষের কাছে জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রি বা ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে বিরোধের সৃষ্টি হয়। যৌথ উদ্যোগ থেকে কীভাবে কোনো পার্টনার বের হতে পারবে, তার নির্দিষ্ট নিয়ম চুক্তিতে থাকে। এই নিয়ম না মানলে বিরোধ তৈরি হয়। মামলা দায়েরের কারণ হল: ১) Right of First Refusal (ROFR) লঙ্ঘন করা (অর্থাৎ, নিজের শেয়ার বাইরে বিক্রি করার আগে বর্তমান পার্টনারকে প্রস্তাব না দেওয়া), ২) লক-ইন পিরিয়ড (Lock-in period) শেষ হওয়ার আগেই একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করা, এবং ৩) কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই অন্যায়ভাবে জেভি টার্মিনেট (Wrongful termination) করে অপর পক্ষকে পথে বসিয়ে দেওয়া।

বাস্তব উদাহরণ ১ (অবকাঠামো প্রকল্প): 
একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্টে 'A' এবং 'B' কোম্পানির জয়েন্ট ভেঞ্চার আছে। চুক্তিতে ROFR ক্লজ আছে। কিন্তু 'B' কোম্পানি 'A'-কে কোনো প্রস্তাব না দিয়েই গোপনে তাদের সমস্ত শেয়ার 'C' নামক একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিল, যারা মূলত 'A' এর ব্যবসায়িক শত্রু। 'A' কোম্পানি এই শেয়ার হস্তান্তর অবৈধ ঘোষণার জন্য মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (চুক্তি বাতিল): 
চুক্তির মেয়াদ ৫ বছর থাকলেও, ২ বছর পরই এক পক্ষ বিনা কারণে একতরফাভাবে জেভি চুক্তি বাতিলের (Termination) নোটিশ দিল, যার ফলে মাঝপথে থাকা একটি বড় প্রজেক্ট আটকে গেল। অন্যায়ভাবে চুক্তি বাতিলের কারণে অপর পক্ষ ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ৩:
চুক্তিতে "Right of First Refusal" (ROFR) ক্লজ ছিল। 'ক' কোম্পানি জেভি থেকে বের হতে চায় এবং তাদের ৪০% শেয়ার বিক্রি করতে চায়। নিয়ম অনুযায়ী এই শেয়ার প্রথমে 'খ' কোম্পানিকে কেনার অফার করতে হবে। কিন্তু 'ক' তা না করে গোপনে তৃতীয় একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির কাছে শেয়ার বিক্রি করে দেয়। 'খ' কোম্পানি এই বিক্রয় বাতিল চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪:
৫ বছরের জন্য জেভি চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু দুই বছর পরেই একটি পার্টি বিনা নোটিশে এবং চুক্তিতে উল্লেখিত কোনো 'Force Majeure' বা বৈধ কারণ ছাড়াই জেভি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ক্ষতিগ্রস্ত অপর পক্ষ ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য মুনাফার ক্ষতি (Loss of anticipated profit) ও একতরফা চুক্তিভঙ্গের গ্রাউন্ডে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারে।

প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায় যুক্ত না হওয়ার শর্ত (Non-Compete Clause) ভঙ্গ:
মামলার গ্রাউন্ড: জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিতে সাধারণত শর্ত থাকে যে, এই জেভি চলাকালীন বা তা ভেঙে যাওয়ার নির্দিষ্ট কয়েক বছর পর্যন্ত কোনো পার্টনার একই ধরনের প্রতিযোগী ব্যবসায় (Competing Business) যুক্ত হতে পারবে না। এই শর্ত ভঙ্গ করলে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করা যায়।

বাস্তব উদাহরণ ১ (রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম): 
দুজন উদ্যোক্তা মিলে একটি রাইড-শেয়ারিং অ্যাপ তৈরি করল। বছর খানেক পর, একজন উদ্যোক্তা ওই জেভি কোম্পানিতে বহাল থেকেই বেনামে নিজের স্ত্রীর নামে হুবহু একই রকম আরেকটি রাইড-শেয়ারিং অ্যাপ বাজারে লঞ্চ করে প্রমোশন শুরু করল। এটি 'Conflict of Interest' এবং 'Non-Compete' ক্লজের লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ফুড চেইন): 
একটি বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট ব্র্যান্ডের যৌথ মালিকানা থেকে এক পার্টনার আলাদা হয়ে গেল। চুক্তিতে ছিল আগামী ৩ বছর সে একই এলাকায় ফাস্ট-ফুডের ব্যবসা করতে পারবে না। কিন্তু সে ৬ মাসের মধ্যেই ঠিক উল্টো দিকে নতুন একটি ফাস্ট-ফুডের দোকান খুলল। অপর পার্টনার এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) চেয়ে মামলা করতে পারে।

উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(১০) ধারাটি যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার ব্যবসায়ের অংশীদারদের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি রক্ষাকবচ। অংশীদারিত্বের ব্যবসায়িক জটিলতা এবং বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের কারণে এসব বিরোধ সাধারণ দেওয়ানি আদালতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে ব্যবসার অপূরণীয় ক্ষতি হয়। বাণিজ্যিক আদালতের বিশেষায়িত বিচার ব্যবস্থা এবং সময়সীমাবদ্ধ (Time-bound) বিচার প্রক্রিয়ার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন যেকোনো চুক্তিভঙ্গ বা আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি প্রতিকার পাবেন, যা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও সুরক্ষিত ও আস্থাশীল করে তুলবে।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com