বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-১০): ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ চুক্তি (management and consultancy agreements) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ
বাংলাদেশে Management and Consultancy সংক্রান্তে কোন বিরোধ সৃষ্টি হলে দেওয়ানী আদালতে মামলা করতে হত এবং বছরের পর বছর রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হত। আলাদা কোন আইন-আদালত ছিল না এবং এই সংক্রান্তের বিরোধগুলোর আইনি স্বীকৃতি বা নিরসনের ব্যবস্থা ছিল না। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(৯) উপ-ধারায় "ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ চুক্তি" (Management and Consultancy Agreements) থেকে উদ্ভূত বিরোধগুলোকে বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং নিরসনের জন্য ৯০ দিনের মধ্যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
আধুনিক কর্পোরেট বিশ্বে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা (Management) বা বিশেষজ্ঞ মতামত (Consultancy) গ্রহণের জন্য তৃতীয় পক্ষের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া একটি সাধারণ বিষয়। এই চুক্তিগুলোর জটিলতা এবং এর সাথে জড়িত বড় অংকের অর্থের কারণে প্রায়শই বিরোধ সৃষ্টি হয়।
ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ (Management and Consultancy) চুক্তির সংজ্ঞা:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এ “ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ চুক্তি”এর কোনো স্বতন্ত্র সংজ্ঞা সরাসরি প্রদান করা না হলেও, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রীতিনীতি এবং চুক্তির প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এর একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়।
ব্যবস্থাপনা চুক্তি (Management Agreement): এটি এমন একটি চুক্তি যার মাধ্যমে একটি কোম্পানি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক তার প্রতিষ্ঠানের আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ পরিচালনার দায়িত্ব কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বা তৃতীয় কোনো সংস্থাকে অর্পণ করে। এর বিনিময়ে ব্যবস্থাপক একটি নির্দিষ্ট ফি বা লভ্যাংশের অংশ লাভ করেন।
পরামর্শ চুক্তি (Consultancy Agreement): এটি এমন এক প্রকার চুক্তি যেখানে একজন বিশেষজ্ঞ (পরামর্শক) তার বিশেষ জ্ঞান, দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা একটি নির্দিষ্ট ফি-এর বিনিময়ে মক্কেল বা প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করেন । এটি আইনি, আর্থিক, প্রযুক্তিগত বা কৌশলগত যেকোনো বিষয়ে হতে পারে।
নিচে এই চুক্তির অধীনে সৃষ্ট প্রধান বিরোধ এবং মামলা দায়েরের ক্ষেত্রসমূহ বাস্তব উদাহরণসহ আলোচনা করা হলো:
পেশাগত অবহেলা ও সেবার মান লঙ্ঘন (Professional Negligence and Breach of Service Standard):
ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল এবং আলোচিত বিরোধ হলো পেশাগত অবহেলা। একজন পেশাদার পরামর্শক যখন তার দায়িত্ব পালনে সেই পরিমাণ সতর্কতা বা দক্ষতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন যা একজন সমপর্যায়ের দক্ষ ব্যক্তির কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছিল, তখন তাকে পেশাগত অবহেলা বলা হয়। পরামর্শদাতা (Consultant) বা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান যদি চুক্তিতে নির্ধারিত মান অনুযায়ী সেবা প্রদান করতে ব্যর্থ হয় বা ভুল পরামর্শ প্রদান করে যার ফলে প্রতিষ্ঠানের বড় আর্থিক ক্ষতি হয়, তবে এই গ্রাউন্ডে মামলা করা যায়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ:
১. অবহেলার অস্তিত্ব (Duty of Care): বিবাদী (পরামর্শক/ব্যবস্থাপক) বাদীর প্রতি একটি নির্দিষ্ট আইনি ও চুক্তিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে বাধ্য ছিলেন ।
২. মানদণ্ড লঙ্ঘনের প্রমাণ (Breach of Standard): বিবাদী তার পেশাগত দায়িত্ব পালনে যুক্তিসঙ্গত মানদণ্ড বজায় রাখতে পারেননি ।
৩. ক্ষতির কারণ (Causation): বিবাদীর উক্ত অবহেলার কারণেই বাদী সরাসরি আর্থিক বা ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ।
৪. আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ: ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণযোগ্য হতে হবে এবং তা দূরবর্তী কোনো সম্ভাবনা হলে চলবে না ।
পেশাগত অবহেলা (Professional Negligence) গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের:
পেশাগত অবহেলা (Professional Negligence), চুক্তিতে উল্লিখিত 'Scope of Work' বা সেবার মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে ২(ঘ)(৯) ধারার অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়। নিম্নোক্ত উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা পরিস্কার করা যাক।
বাস্তব উদাহরণ ১:
একটি টেক্সটাইল মিল তাদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য একটি বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিল। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি ত্রুটিপূর্ণ মেশিনারি সেটআপের পরামর্শ দিল যা মিলের উৎপাদনে কোনো উন্নতি না ঘটিয়ে বরং বিদ্যুত খরচ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। মিল কর্তৃপক্ষ ধারা ২(ঘ)(৯) এর অধীনে ভুল পরামর্শের কারণে হওয়া ক্ষতির জন্য মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২:
একটি হোটেল ব্যবস্থাপনা কোম্পানিকে (Management Company) একটি রিসোর্ট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলো। কিন্তু তাদের অব্যবস্থাপনার কারণে রিসোর্টটি তার 'ফাইভ স্টার' রেটিং হারিয়ে ফেলল। রিসোর্টের মালিকপক্ষ সেবার মান ভঙ্গের অভিযোগে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
ব্যবস্থাপনায় (Management) অবহেলা:
বাস্তব উদাহরণ ৩ (তৈরি পোশাক (RMG) খাতের উৎপাদন ব্যবস্থাপনা):
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের একটি বড় কারখানা তাদের উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে একটি বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি কারখানার লে-আউট পরিবর্তনের পরামর্শ দেয় এবং নতুন এক সেট মেশিন স্থাপন করে। কিন্তু পরামর্শের ত্রুটির কারণে কারখানার ফ্লোর প্ল্যান এমনভাবে বিঘ্নিত হয় যে, শ্রমিকদের গতিবিধি ধীর হয়ে যায় এবং নতুন মেশিনগুলো বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়ার সাথে মানানসই ছিল না ।
ফলাফল: কারখানার উৎপাদন বাড়ার পরিবর্তে ১৫ শতাংশ কমে যায় এবং একটি বড় শিপমেন্ট সময়মতো শেষ করতে না পারায় বিদেশী বায়ার ৫ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে।
মামলার ভিত্তি: এখানে কারখানা মালিক বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(৯) ধারার অধীনে ওই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পেশাগত অবহেলার গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবেন। তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং স্থানীয় শ্রমিকদের সক্ষমতা বিবেচনা না করে ভুল পরামর্শ প্রদান করেছে যা তাদের পেশাগত দায়িত্বের অবহেলা ।
বাস্তব উদাহরণ ৪ (করপোরেট ফিন্যান্সিয়াল পরামর্শ):
একটি নতুন টেলিকম কোম্পানি তাদের আইপিও (IPO) প্রস্তুতির জন্য একটি মার্চেন্ট ব্যাংককে ফিন্যান্সিয়াল কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে। কনসালটেন্ট কোম্পানিটির সম্পদ মূল্যায়নে ভুল পদ্ধতি ব্যবহার করে এবং বিএসইসি-র (BSEC) নীতিমালার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা এড়িয়ে যায়।
ফলাফল: বিএসইসি কোম্পানিটির আইপিও আবেদন বাতিল করে দেয় এবং বাজারের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ায় কোম্পানিটি বিপুল বিনিয়োগ হারায়।
মামলার ভিত্তি: কোম্পানিটি ধারা ২(ঘ)(৯) এর অধীনে ফিন্যান্সিয়াল কনসালটেন্টের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য প্রদানের গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবে, কারণ কনসালটেন্টের প্রাথমিক দায়িত্বই ছিল নির্ভুল আইনি ও আর্থিক পরামর্শ প্রদান করা ।
পরামর্শক ফি, পারিশ্রমিক এবং পারফরম্যান্স বোনাস সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Fees and Performance Bonuses):
পরামর্শক বা ব্যবস্থাপকের প্রধান পাওনা হলো তাদের পারিশ্রমিক বা ফি। অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হওয়ার পর বা মাইলস্টোন অর্জিত হওয়ার পর মক্কেল প্রতিষ্ঠান অর্থ পরিশোধে অনীহা প্রকাশ করে, যা বাণিজ্যিক বিরোধের জন্ম দেয়। ম্যানেজমেন্ট বা কনসালটেন্সি চুক্তিতে প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট ফি এবং কাজের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত কমিশন বা বোনাসের শর্ত থাকে। এই ফি পরিশোধ না করা বা বোনাসের যোগ্যতা নিয়ে দ্বিমত থাকলে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ: এই ক্ষেত্রে মামলার প্রধান গ্রাউন্ডগুলো হলো:
১. চুক্তি অনুযায়ী সেবা প্রদান: বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন ।
২. ইনভয়েস বা বিল গ্রহণ: বিবাদী কর্তৃক বিল বা ইনভয়েস প্রাপ্তি এবং তা নিয়ে পূর্বে কোনো আপত্তি না থাকার প্রমাণ।
৩. পরিশোধের সময়সীমা অতিক্রম: চুক্তিতে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করা ।
৪. অন্যায়ভাবে অর্থ আটকে রাখা: বিবাদী কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই পেমেন্ট স্থগিত রেখেছেন।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: বকেয়া পাওনা (Recovery of Dues), চুক্তিতে নির্ধারিত পেমেন্ট শিডিউল লঙ্ঘন।
বাস্তব উদাহরণ ১:
একজন ট্যাক্স কনসালটেন্ট একটি বড় শিল্প গ্রুপকে তাদের ট্যাক্স প্ল্যানিং করে দিয়ে ২০ কোটি টাকা সাশ্রয় করে দিলেন। চুক্তি অনুযায়ী সাশ্রয়কৃত টাকার ৫% তার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শিল্প গ্রুপটি কাজ শেষে তাকে কেবল নির্ধারিত রিটেইনার ফি দিয়ে বিদায় করে দিল। কনসালটেন্ট তার প্রাপ্য কমিশনের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ ২:
একটি আইটি কনসালটেন্সি ফার্ম একটি ব্যাংকের সফটওয়্যার আপগ্রেড করার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করল। কিন্তু ব্যাংকটি 'টেকনিক্যাল ত্রুটি'র অজুহাতে চূড়ান্ত বিলের ৪০% আটকে রাখল। কনসালটেন্সি ফার্মটি এই পাওনা আদায়ের জন্য ২(ঘ)(৯) ধারায় মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (আইটি সিস্টেম ইমপ্লিমেন্টেশন কনসালটেন্সি):
একটি ব্যাংক তাদের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার মডার্নাইজেশনের জন্য একটি আইটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে। চুক্তিতে মোট ৫টি মাইলস্টোন ছিল এবং প্রতিটি মাইলস্টোন শেষে ১৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের কথা ছিল ।
ফলাফল: পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ৩টি মাইলস্টোন সাফল্যের সাথে শেষ করে এবং ব্যাংক তা গ্রহণও করে। কিন্তু চতুর্থ মাইলস্টোন চলাকালীন ব্যাংকের নতুন ম্যানেজমেন্ট আসে এবং তারা আগের কাজগুলো নিয়ে অহেতুক প্রশ্ন তুলে পূর্বের বকেয়া ২ কোটি টাকা এবং বর্তমান কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করে দেয়।
মামলার ভিত্তি: আইটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক আদালতে ২(ঘ)(৯) ধারার অধীনে বকেয়া পাওনা আদায়ের জন্য মামলা দায়ের করতে পারবে । এক্ষেত্রে আদালত দ্রুততম সময়ে বকেয়া পরিশোধের আদেশ দিতে পারেন, কারণ এটি একটি স্পষ্ট বাণিজ্যিক পাওনা যা চুক্তি দ্বারা সমর্থিত।
গোপনীয়তা রক্ষা, মেধা সম্পদ এবং অ-প্রতিযোগিতা শর্ত লঙ্ঘন (Breach of Confidentiality and Non-compete Clause):
ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ চুক্তির ক্ষেত্রে মেধা সম্পদ এবং গোপনীয়তা রক্ষা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। পরামর্শক বা ব্যবস্থাপক কাজের খাতিরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড সিক্রেট জানতে পারেন। পরামর্শদাতারা প্রতিষ্ঠানের অতি গোপন তথ্য ও কৌশল সম্পর্কে জানেন। যদি তারা এই তথ্য ফাঁস করেন বা একই ধরনের অন্য কোনো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হন, তবে তা বড় ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি করে।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ:
১. মেধা সম্পদের অপব্যবহার: চুক্তির অধীনে তৈরিকৃত কোনো সফটওয়্যার, ডিজাইন বা মেথডোলজি যদি বিবাদী নিজের নামে ব্যবহার করেন বা অন্য কারও কাছে বিক্রি করেন ।
২. গোপনীয়তা রক্ষা শর্ত (Confidentiality Clause) লঙ্ঘন: ব্যবসায়িক তথ্য বা গ্রাহক তালিকা ফাঁস করা ।
৩. প্রতিযোগিতাহীনতা (Non-compete) শর্ত লঙ্ঘন: চুক্তির মেয়াদ চলাকালীন বা সমাপ্তির পরপরই প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের কাজ শুরু করা ।
এনডিএ (Non-Disclosure Agreement) বা গোপনীয়তা চুক্তির লঙ্ঘন, ব্যবসায়িক গোপন তথ্য (Trade Secret) পাচার গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করা যায়:
বাস্তব উদাহরণ ১:
একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক কৌশল ঢেলে সাজানোর জন্য একজন ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট নিয়োগ করল। চুক্তি শেষ হওয়ার মাসখানেকের মধ্যেই ওই কনসালটেন্ট ই-কমার্সের 'কাস্টমার ডাটাবেজ' ও 'ফিউচার স্ট্র্যাটেজি' একটি প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক আদালতে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞার মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২(অ্যালগরিদম ও ডেটা সায়েন্স কনসালটেন্সি):
একটি ই-কমার্স কোম্পানি তাদের ডেলিভারি রুট অপ্টিমাইজেশনের জন্য একটি ডেটা সায়েন্স কনসালটেন্সি ফার্ম নিয়োগ দেয়। ফার্মটি একটি বিশেষ অ্যালগরিদম তৈরি করে যা কোম্পানির খরচ ২০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। চুক্তিতে স্পষ্ট ছিল যে, এই কাজের পূর্ণ মেধা সম্পদ ই-কমার্স কোম্পানির হবে ।
ফলাফল: কনসালটেন্সি ফার্মটি একই অ্যালগরিদম সামান্য পরিবর্তন করে ই-কমার্স কোম্পানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দেয়।
মামলার ভিত্তি: ই-কমার্স কোম্পানিটি বাণিজ্যিক আদালতে ২(ঘ)(৯) এবং ২(ঘ)(১৬) ধারার সমন্বয়ে মামলা করতে পারবে । গ্রাউন্ড হবে ‘চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন’ এবং ‘মেধা সম্পদ চুরি’। আদালত এক্ষেত্রে অবিলম্বে ওই অ্যালগরিদম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) জারি করতে পারেন ।
৪. চুক্তির মেয়াদের আগে বেআইনি অবসান (Unlawful Early Termination of Agreement):
ব্যবস্থাপনা বা পরামর্শ চুক্তিগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী হয়। যদি কোনো পক্ষ যৌক্তিক কারণ বা চুক্তিতে নির্ধারিত নোটিশ ছাড়াই মাঝপথে চুক্তি বাতিল করে, তবে অপর পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ:
১. নোটিশ পিরিয়ড লঙ্ঘন: চুক্তিতে উল্লিখিত নোটিশ না দিয়েই চুক্তি বাতিল করা।
২. ভিত্তিহীন টার্মিনেশন: যে অভিযোগে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই ।
৩. ক্ষতিপূরণ দাবি: চুক্তির অকাল সমাপ্তির কারণে যে পরিমাণ বিনিয়োগ বা সুযোগ নষ্ট হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ।
বিধিবহির্ভূতভাবে চুক্তি বাতিল (Arbitrary Termination), সম্ভাব্য আয়ের ক্ষতিপূরণ (Loss of expected profit) গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করা যায়। নিম্নের উদাহরণ লক্ষ্য করুন।
বাস্তব উদাহরণ ১:
একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি একটি ম্যানেজমেন্ট ফার্মকে তাদের একটি শপিং মল ৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব দিল। ২ বছর না যেতেই মালিকপক্ষ কোনো কারণ ছাড়াই চুক্তি বাতিল করে দিয়ে নিজেদের লোক নিয়োগ করল। ম্যানেজমেন্ট ফার্মটি বাকি ৩ বছরের সম্ভাব্য আয়ের ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (হোটেল ম্যানেজমেন্ট):
চুক্তিএকটি আন্তর্জাতিক হোটেল চেইন বাংলাদেশের একটি বিলাসবহুল হোটেলের সাথে ১০ বছর মেয়াদী ব্যবস্থাপনা চুক্তি করে। ৩ বছর পর হোটেলের মালিক পক্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবে বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে কোনো কারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক চেইনটিকে ৩ দিনের নোটিশে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় ।
মামলার ভিত্তি: আন্তর্জাতিক হোটেল চেইনটি বাণিজ্যিক আদালতে ২(ঘ)(৯) ধারার অধীনে মামলা করতে পারবে। গ্রাউন্ড হবে ‘অন্যায্য চুক্তি ভঙ্গ’(Unlawful Breach of Contract)। তারা আদালত থেকে তাদের কার্যক্রম পুনরায় চালু রাখার জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বা চুক্তি মেয়াদের অবশিষ্ট সময়ের জন্য প্রাক্কলিত লাভের ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে ।
স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest):
পরামর্শদাতা যদি একই সময়ে দুটি প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন বা এমন কোনো কাজ করেন যা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তা বিরোধের সৃষ্টি করে।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: ফাইডুসিয়ারি ডিউটি (Fiduciary Duty) বা বিশ্বাসের অমর্যাদা, স্বার্থের সংঘাত গোপন রাখা।
বাস্তব উদাহরণ:
একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নতুন ঔষধের ফর্মুলা তৈরির জন্য একজন কনসালটেন্ট নিয়োগ করল। ওই কনসালটেন্ট গোপনে ওই কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। তিনি এমন পরামর্শ দিলেন যা প্রথম কোম্পানির প্রজেক্টকে বিলম্বিত করে দিল যাতে দ্বিতীয় কোম্পানি বাজারে আগে পৌঁছাতে পারে। এটি স্বার্থের সংঘাতের একটি বড় উদাহরণ এবং এর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা সম্ভব।
সেবার ফলাফল বা গ্যারান্টি সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Deliverables and Guarantees):
কনসালটেন্সি চুক্তিতে প্রায়শই নির্দিষ্ট 'লিভারেবলস' (যেমন: রিপোর্ট, ডিজাইন, সফটওয়্যার মডিউল) বা নির্দিষ্ট ফলাফল (যেমন: ২০% খরচ কমানো) অর্জনের গ্যারান্টি দেওয়া হয়। এগুলো অর্জিত না হলে বিরোধ দেখা দেয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: চুক্তিতে প্রতিশ্রুত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থতা, অসম্পূর্ণ কাজ (Incomplete deliverables)।
বাস্তব উদাহরণ:
একটি লজিস্টিকস কোম্পানি তাদের ডেলিভারি খরচ কমানোর জন্য একজন অপারেশনাল কনসালটেন্ট নিয়োগ করল। কনসালটেন্ট লিখিতভাবে গ্যারান্টি দিয়েছিলেন যে তার পদ্ধতিতে খরচ ১৫% কমবে। কিন্তু বাস্তবে খরচ ১% ও কমেনি, বরং বাস্তবায়নে আরও অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। কোম্পানিটি কনসালটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগে মামলা করতে পারবে।
উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৯) এর অন্তর্ভুক্ত "ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ চুক্তি" সংক্রান্ত এই বিরোধগুলো সাধারণত জটিল আইনি ও ব্যবসায়িক ব্যাখ্যা দাবি করে। আগে এই মামলাগুলো সাধারণ দেওয়ানি আদালতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকত। এখন বাণিজ্যিক আদালতের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ বিচারকের অধীনে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই বিরোধগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে, যা দেশের কর্পোরেট খাতের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। পেশাগত অবহেলা, ফি পরিশোধে ব্যর্থতা, মেধা সম্পদ চুরি বা অন্যায্য চুক্তি বাতিলের মতো বিষয়গুলোতে এখন ব্যবসায়ীরা দ্রুত বিচার পাবেন। ৯০ দিনের ট্রায়াল পিরিয়ড এবং বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা বিচার ব্যবস্থায় যে গতিশীলতা এনেছে, তা বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে অনেক বাড়িয়ে দেবে ।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com