বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-০৯): বিতরণ ও লাইসেন্সিং চুক্তি (distribution and licensing agreements) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ
বিতরণ চুক্তি হলো এমন একটি আইনি ব্যবস্থা যেখানে একজন উৎপাদক বা সরবরাহকারী (Supplier) অন্য একটি পক্ষকে (Distributor) একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় পণ্য বিক্রয়ের অধিকার প্রদান করেন । এক্ষেত্রে ডিস্ট্রিবিউটর পণ্যটি সরবরাহকারীর কাছ থেকে কিনে নিজের নামে বাজারে বিপণন করেন । অন্যদিকে, লাইসেন্সিং চুক্তি হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মেধা সম্পদের মালিক (Licensor) অন্য একটি পক্ষকে (Licensee) নির্দিষ্ট শর্তে সেই সম্পদ (যেমন- ট্রেডমার্ক, পেটেন্ট, প্রযুক্তিগত জ্ঞান) ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেন এবং বিনিময়ে রয়্যালটি বা ফি গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের বাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর (MNCs) প্রবেশের প্রধান মাধ্যম হলো এই দুই ধরনের চুক্তি। ২(ঘ)(৮) ধারার অধীনে এই চুক্তিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রতা থেকে এই উচ্চ-মূল্যের বিরোধগুলোকে মুক্ত করা এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দক্ষ বিচারকদের মাধ্যমে নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা ।
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ (Commercial Courts Ordinance, 2026) দেশে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং কার্যকরভাবে ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন। এর মধ্যে ধারা ২(ঘ)(৮) সরাসরি "বিতরণ ও লাইসেন্সিং চুক্তি" (Distribution and Licensing Agreements) থেকে উদ্ভূত বিরোধগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যে ডিস্ট্রিবিউটরশিপ (পরিবেশক নিয়োগ) এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি বা লাইসেন্সিং চুক্তির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। যখন পণ্য প্রস্তুতকারক এবং পরিবেশক, অথবা ব্র্যান্ডের মালিক এবং লাইসেন্স গ্রহীতার মধ্যে চুক্তির শর্ত নিয়ে মতানৈক্য বা লঙ্ঘন ঘটে, তখন তা এই ধারার অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা হিসেবে দায়ের করা যায়।
নিচে বিতরণ ও লাইসেন্সিং চুক্তির অধীন সৃষ্ট প্রধান বিরোধগুলো এবং যেসব কারণে বা গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়, তা বাস্তব উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
চুক্তির মৌলিক শর্তভঙ্গ (Material Breach of Contract):
চুক্তির এমন কোনো শর্ত লঙ্ঘন করা যা চুক্তির মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দেয়, তাকে মেটেরিয়াল ব্রিচ বা মৌলিক শর্তভঙ্গ বলা হয় । এটি চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর ৭৩ ধারার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ২(ঘ)(৮) ধারার অধীনে মামলা দায়েরের সবচেয়ে বড় কারণ।
বাস্তব উদাহরণ:
ধরি, একটি জাপানি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের একটি কোম্পানিকে তাদের খুচরা যন্ত্রাংশ (Spare Parts) বিতরণের লাইসেন্স দিয়েছে। চুক্তির শর্ত ছিল যে, ডিস্ট্রিবিউটর কেবল ওই জাপানি কোম্পানির অনুমোদিত কারখানা থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করবে। কিন্তু ডিস্ট্রিবিউটর অধিক মুনাফার আশায় স্থানীয় খোলা বাজার থেকে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে জাপানি কোম্পানির লোগো ব্যবহার করে বিক্রি শুরু করল। এখানে ডিস্ট্রিবিউটর চুক্তির গুণগত মান ও মেধা সম্পদ সংক্রান্ত মৌলিক শর্ত ভঙ্গ করেছে। এক্ষেত্রে জাপানি কোম্পানিটি বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(৮) ধারার অধীনে মামলা দায়ের করে নিষেধাজ্ঞা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে ।
একচেটিয়া অধিকার বা আঞ্চলিক সীমানা লঙ্ঘন (Breach of Exclusivity or Territorial Rights):
বিতরণ বা ডিস্ট্রিবিউশন চুক্তিতে সাধারণত পরিবেশককে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার জন্য একচেটিয়া (Exclusive) অধিকার দেওয়া হয়। যদি মূল কোম্পানি (Principal) এই শর্ত ভঙ্গ করে অন্য কাউকে সেখানে পণ্য দেয়, বা ডিস্ট্রিবিউটর তার নির্ধারিত সীমানার বাইরে পণ্য বিক্রি করে, তবে এই ধারায় মামলা করা যায়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: চুক্তিভিত্তিক একচেটিয়া অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং ব্যবসায়িক আর্থিক ক্ষতি সাধন।
বাস্তব উদাহরণ ১:
'সনি ইলেকট্রনিক্স' ঢাকা উত্তরের জন্য 'মেসার্স রহিম এন্টারপ্রাইজ'কে এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু রহিম এন্টারপ্রাইজ দেখতে পেল যে, সনি ইলেকট্রনিক্স সরাসরি কিছু বড় কর্পোরেট ক্লায়েন্টের কাছে ঢাকা উত্তরে পণ্য বিক্রি করছে। এর ফলে রহিম এন্টারপ্রাইজের কমিশন ক্ষতি হচ্ছে। রহিম এন্টারপ্রাইজ ধারা ২(ঘ)(৮) এর অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২:
'প্রাণ-আরএফএল' সিলেটের একজন ডিস্ট্রিবিউটরকে শুধুমাত্র সিলেট বিভাগের জন্য পণ্য বিক্রির অধিকার দিল। কিন্তু ওই ডিস্ট্রিবিউটর গোপনে কম দামে ঢাকার বাজারে পণ্য সরবরাহ (Cross-border selling) শুরু করল, যা ঢাকার ডিস্ট্রিবিউটরের বাজার নষ্ট করছে। এক্ষেত্রে কোম্পানি ওই ডিস্ট্রিবিউটরের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে চুক্তি ভঙ্গের মামলা করতে পারে।
টেরিটোরিয়াল পোচিং বা সীমানা দখল (Territorial Poaching):
যদি কোনো ডিস্ট্রিবিউশন চুক্তিতে নির্দিষ্ট এলাকা উল্লেখ থাকে এবং সরবরাহকারী ওই এলাকায় অন্য ডিস্ট্রিবিউটরের পণ্য প্রবেশের সুযোগ দেয়, তবে তা চুক্তি লঙ্ঘনের কারণ হয়।
বাস্তব উদাহরণ:
একটি কসমেটিকস কোম্পানি তাদের 'এক্সক্লুসিভ' ডিস্ট্রিবিউশন চুক্তির মাধ্যমে একটি স্থানীয় ফার্মকে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব প্রদান করল। কিন্তু কসমেটিকস কোম্পানিটি গোপনে ঢাকা বিভাগের ডিস্ট্রিবিউটরকে চট্টগ্রামের বড় সুপার শপগুলোতে সরাসরি পণ্য সরবরাহের অনুমতি দিল। এর ফলে চট্টগ্রামের মূল ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যবসায়িক স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ডিস্ট্রিবিউটরটি তার 'এক্সক্লুসিভিটি ক্লজ' ভঙ্গের কারণে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে ।
রয়্যালটি, ফি বা পণ্যের বকেয়া মূল্য পরিশোধে ব্যর্থতা (Non-payment of Royalties, Fees, or Dues):
লাইসেন্সিং চুক্তিতে লাইসেন্স গ্রহীতা সাধারণত আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ রয়্যালটি হিসেবে প্রদান করে। অন্যদিকে বিতরণ চুক্তিতে পরিবেশক বাকিতে পণ্য নিয়ে পরে মূল্য পরিশোধ করে। এই পাওনা টাকা প্রদানে ব্যর্থ হলে তা সুস্পষ্ট বাণিজ্যিক বিরোধ। বাণিজ্যিক লেনদেনে সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করা একটি সরাসরি মামলার ভিত্তি। ২(ঘ)(৮) ধারার অধীনে বকেয়া আদায় বা ড্যামেজ ক্লেম করার জন্য এই গ্রাউন্ডটি ব্যবহৃত হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: চুক্তিতে উল্লিখিত আর্থিক পাওনা, রয়্যালটি বা ইনভয়েসের বিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করা।
বাস্তব উদাহরণ ১ (লাইসেন্সিং):
আমেরিকার বিখ্যাত ফাস্ট-ফুড চেইন 'কেএফসি' বাংলাদেশের একটি কোম্পানিকে তাদের ব্র্যান্ড নাম ও রেসিপি ব্যবহারের লাইসেন্স দিয়েছে। শর্ত হলো, মাসিক মোট বিক্রির ৫% রয়্যালটি দিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশি কোম্পানিটি গত ৬ মাস ধরে বিক্রির তথ্য গোপন করে রয়্যালটি দিচ্ছে না। কেএফসি বকেয়া রয়্যালটি আদায়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (বিতরণ):
'স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস' তাদের একজন ডিস্ট্রিবিউটরকে ২ কোটি টাকার ওষুধ বাকিতে সরবরাহ করেছে, যা ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধের কথা। কিন্তু ডিস্ট্রিবিউটর ৬০ দিন পার হলেও টাকা দিচ্ছে না। স্কয়ার ফার্মা বকেয়া আদায়ে ধারা ২(ঘ)(৮) এর অধীন মামলা করতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (JioStar vs. Excel Lead/T-Sports):
২০২৬ সালের শুরুর দিকে জিওস্টার ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড বাংলাদেশের স্পোর্টস ব্রডকাস্টার টি-স্পোর্টসের (Excel Lead IT Solutions) সাথে করা আইপিএল (IPL) ও ডব্লিউপিএল (WPL) মিডিয়া রাইটস সংক্রান্ত সাব-লাইসেন্স চুক্তি বাতিল করে । মামলার প্রধান ভিত্তি ছিল 'পেমেন্ট ডিফল্ট'। জিওস্টার দাবি করে যে, ২০২৫ সিজনের জন্য নির্ধারিত ফি বকেয়া থাকা সত্ত্বেও টি-স্পোর্টস সম্প্রচার চালিয়ে গেছে এবং একাধিকবার সময় দেওয়ার পরেও পাওনা পরিশোধ করেনি । জিওস্টার এখন এই বকেয়া আদায় এবং অবৈধ সম্প্রচার বন্ধের জন্য বাণিজ্যিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার অধিকার রাখে ।
লাইসেন্সের পরিধি লঙ্ঘন এবং মেধাস্বত্বের অপব্যবহার (Exceeding Scope of License and IP Infringement):
একটি লাইসেন্স চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা থাকে লাইসেন্স গ্রহীতা ঠিক কী কী কাজ করতে পারবে। যদি গ্রহীতা সেই নির্দিষ্ট পরিধির বাইরে গিয়ে ব্র্যান্ড বা সফটওয়্যারের অপব্যবহার করে, তবে মূল মালিক আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: অনুমতি ছাড়া লাইসেন্সকৃত প্যাটেন্ট, ট্রেডমার্ক, কপিরাইট বা সফটওয়্যারের অননুমোদিত ব্যবহার বা পরিবর্ধন।
বাস্তব উদাহরণ ১:
'মাইক্রোসফট' একটি দেশীয় আইটি কোম্পানিকে তাদের একটি সফটওয়্যার শুধুমাত্র "অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের" (Internal Use) লাইসেন্স দিয়েছে। কিন্তু ওই আইটি কোম্পানি সফটওয়্যারটির কোড পরিবর্তন করে "ক্লাউড সার্ভিস" হিসেবে অন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি করা শুরু করল। এটি লাইসেন্স চুক্তির মারাত্মক লঙ্ঘন এবং মাইক্রোসফট বাণিজ্যিক আদালতে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) ও ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ ২:
'ডিজনি' তাদের কার্টুন চরিত্র মিকি মাউসের ছবি কেবল "বাচ্চাদের টি-শার্টে" ছাপানোর জন্য একটি গার্মেন্টসকে লাইসেন্স দিল। কিন্তু গার্মেন্টসটি টি-শার্টের পাশাপাশি স্কুল ব্যাগ ও জুতায় মিকি মাউসের ছবি ছাপিয়ে বিক্রি শুরু করল। এটি পরিধি লঙ্ঘন (Exceeding the scope) হিসেবে গণ্য হবে।
গোপনীয়তা রক্ষা ও মেধা সম্পদ চুরি (Breach of Confidentiality and IP Misappropriation):
লাইসেন্সিং চুক্তিতে লাইসেন্সিকে প্রায়শই ব্যবসার গোপন সূত্র (Trade Secrets) প্রদান করা হয়। যদি লাইসেন্সি ওই গোপনীয়তা ভঙ্গ করে বা চুক্তির মেয়াদ শেষেও তথ্যগুলো ব্যবহার করতে থাকে, তবে তা মামলা দায়েরের কারণ হয়।
বাস্তব উদাহরণ (MOL Inc. v. People's Republic of Bangladesh):
যদিও এটি একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক মামলা, কিন্তু এর প্রেক্ষাপট ২(ঘ)(৮) ধারার বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ সরকার একটি আমেরিকান কোম্পানিকে বানর রপ্তানির লাইসেন্স দিয়েছিল এই শর্তে যে, তারা একটি প্রজনন খামার তৈরি করবে এবং নির্দিষ্ট মানবিক কাজে ব্যবহারের শর্ত মানবে । আমেরিকান কোম্পানিটি যখন খামার তৈরিতে ব্যর্থ হলো এবং শর্ত লঙ্ঘন করে সামরিক গবেষণায় ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেল, তখন বাংলাদেশ সরকার লাইসেন্স বাতিল করে । বর্তমান অধ্যাদেশের অধীনে এই ধরনের লাইসেন্সিং চুক্তির শর্তভঙ্গ সরাসরি বাণিজ্যিক আদালতে বিচারযোগ্য হতো, যেখানে উভয় পক্ষই তাদের দাবি পেশ করতে পারত ।
ন্যূনতম বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা বা পারফরম্যান্স শর্ত পূরণে ব্যর্থতা (Failure to Meet Minimum Performance/Sales Targets):
অধিকাংশ বাণিজ্যিক বিতরণ চুক্তিতে ডিস্ট্রিবিউটরদের জন্য মাসিক বা বাৎসরিক একটি ন্যূনতম বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা (Minimum Sales Quota) বেঁধে দেওয়া থাকে। এই টার্গেট পূরণ না হলে চুক্তি বাতিল বা ক্ষতিপূরণের বিরোধ সৃষ্টি হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: চুক্তিতে উল্লেখিত ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স বা টার্গেট অর্জনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং এর জেরে চুক্তি বাতিলের বৈধতা।
বাস্তব উদাহরণ:
একটি স্বনামধন্য কসমেটিকস ব্র্যান্ড তাদের ডিস্ট্রিবিউটরকে বছরে ৫ কোটি টাকার পণ্য বিক্রির টার্গেট দিল। ডিস্ট্রিবিউটর সারা বছরে মাত্র ১ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করতে পারল। ফলস্বরূপ কোম্পানি চুক্তি বাতিল করে দিল। ডিস্ট্রিবিউটর দাবি করল যে, কোম্পানির মার্কেটিং পলিসি খারাপ থাকায় বিক্রি হয়নি এবং সে উল্টো ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করল। কোম্পানি বনাম পরিবেশকের এই বিরোধটি বাণিজ্যিক আদালতে নিষ্পত্তি হবে।
মান নিয়ন্ত্রণ এবং ব্র্যান্ডের সুনাম ক্ষুণ্ণ করা (Failure of Quality Control and Degradation of Brand Image):
লাইসেন্সিং বা ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো মূল ব্র্যান্ডের মান (Standard) বজায় রাখা। মানহীন পণ্য বা সেবা দিলে মূল কোম্পানির ব্র্যান্ড ইমেজ নষ্ট হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: চুক্তিতে নির্ধারিত কোয়ালিটি কন্ট্রোল (মান নিয়ন্ত্রণ) প্রোটোকল মানতে ব্যর্থ হওয়া এবং ব্র্যান্ডের সুনাম ক্ষুণ্ণ করা।
বাস্তব উদাহরণ:
'ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনাল' (Marriott) ঢাকায় একটি পাঁচতারা হোটেলকে তাদের নাম ব্যবহারের ফ্র্যাঞ্চাইজি লাইসেন্স দিয়েছে। চুক্তিতে হোটেলের রুম সাইজ, খাবারের মান এবং পরিচ্ছন্নতার কঠোর শর্ত ছিল। কিন্তু স্থানীয় মালিক খরচ বাঁচাতে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন ও অপরিষ্কার রুম রাখা শুরু করল, যার ফলে আন্তর্জাতিক ট্রাভেলাররা অনলাইনে খারাপ রিভিউ দিতে শুরু করল। ম্যারিয়ট গ্রুপ ব্র্যান্ড ইমেজ ক্ষুণ্ণ হওয়ার গ্রাউন্ডে চুক্তি বাতিল এবং ক্ষতিপূরণের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
বেআইনিভাবে বা নোটিশ ছাড়া চুক্তি বাতিল (Unlawful Termination of Contract):
বিতরণ বা লাইসেন্সিং চুক্তিতে সাধারণত বলা থাকে যে চুক্তি বাতিল করতে হলে ৬০ বা ৯০ দিনের একটি লিখিত নোটিশ বা আগাম বার্তা দিতে হবে। নোটিশ ছাড়া হুট করে চুক্তি বাতিল করলে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। অধিকাংশ বাণিজ্যিক চুক্তিতে চুক্তি অবসানের আগে একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন- ৯০ দিন বা ১৮০ দিন) নোটিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে । এই পদ্ধতি অনুসরণ না করা একটি শক্তিশালী মামলার ভিত্তি।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: চুক্তির মেয়াদের আগে বা নোটিশ পিরিয়ড অনুসরণ না করে একতরফাভাবে (Unilateral) বেআইনি চুক্তি বাতিল।
বাস্তব উদাহরণ ১:
'এপেক্স ফুটওয়্যার' একজন ডিলারের সাথে ৫ বছরের ডিলারশিপ চুক্তি করল। ডিলার একটি বড় শোরুম ভাড়া নিল এবং কোটি টাকা ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে খরচ করল। কিন্তু মাত্র ১ বছর পর কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বা কোনো নোটিশ না দিয়েই এপেক্স ডিলারশিপ বাতিল করে দিল। এই বেআইনি বাতিলের কারণে ডিলারের যে আর্থিক ক্ষতি ও বিনিয়োগ নষ্ট হলো, তা আদায়ের জন্য সে ধারা ২(ঘ)(৮) এর অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (Unilever Bangladesh Restructuring):
২০২৬ সালের একটি আলোচিত ঘটনায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড তাদের দীর্ঘদিনের ডিস্ট্রিবিউটর অগ্রণী ট্রেডিং কর্পোরেশন এবং মাসুদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের চুক্তি বাতিল করে ভেক্টর এন্টারপ্রাইজ নামক নতুন একটি পক্ষকে ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগের চেষ্টা করে । ডিস্ট্রিবিউটররা অভিযোগ করেন যে, তাদের সাথে করা ২০ বছরেরও বেশি সময়ের চুক্তিতে যে নোটিশ পিরিয়ড এবং সালিসির (Arbitration) বিধান ছিল, ইউনিলিভার তা পালন করেনি । হাইকোর্ট এই গ্রাউন্ডে ইউনিলিভারের নতুন ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থার ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করে এবং আগের ডিস্ট্রিবিউটরদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় । এটি ২(ঘ)(৮) ধারার অধীনে ডিস্ট্রিবিউটরদের অধিকার রক্ষার একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৮) আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত যুগোপযোগী একটি বিধান। বিতরণ এবং লাইসেন্সিং চুক্তি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মেরুদণ্ড। এই চুক্তির অধীন একচেটিয়া অধিকার, পাওনা আদায়, মেধাস্বত্ব রক্ষা বা বেআইনি চুক্তি বাতিলের মতো বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে ব্যবসায়িক শৃঙ্খলায় ধস নামে। এই ধারার অধীনে বাণিজ্যিক আদালতগুলো এসব বিরোধকে সাধারণ দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা থেকে বের করে এনে দ্রুততম সময়ে (Fast-track) ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, যা দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশকে (Ease of doing business) আরও সুরক্ষিত করে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com