হাইকোর্টে আপনার অধিকার ও প্রতিকার: অনুচ্ছেদ ৩৯- চিন্তা-বিবেকের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা (পর্ব- ১৫)
চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের অধীনে নিশ্চিতকৃত একটি মৌলিক অধিকার। যখন রাষ্ট্র, সরকারি কর্তৃপক্ষ বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা কর্তৃক সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের অধীনে নিশ্চিতকৃত এই মৌলিক অধিকারগুলো (চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা) লঙ্ঘিত হয়, তখন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে। যখন রাষ্ট্র বা কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ ভিন্নমত দমন করে, গণমাধ্যম সেন্সর করে অথবা জনসমক্ষে মতামত প্রকাশের জন্য কোনো নাগরিককে শাস্তি প্রদান করে, তখন এই গণতান্ত্রিক স্তম্ভগুলোকে রক্ষা করার জন্য ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে।
৩৯ অনুচ্ছেদ তিনটি মূল গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়; ১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা – ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মতামত লালন করার অধিকার, ২) বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা – কথা, লেখা, গণমাধ্যম, শিল্প বা যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের ধারণা প্রকাশের অধিকার, এবং ৩) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা – সংবাদ ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমগুলোর অধিকার।
নিচে প্রধান ইস্যু এবং ভিত্তিগুলো উদাহরণ ও বিচারিক নজিরসহ আলোচনা করা হলো:
বাকস্বাধীনতা দমনে ফৌজদারি আইনের অপব্যবহার:
ইস্যু: অনেক সময় কর্তৃপক্ষ বৈধ সমালোচনা বা ভিন্নমতকে স্তব্ধ করতে ফৌজদারি আইনের অপব্যবহার করে।
রিটের ভিত্তি: যখন অভিব্যক্তিকে রুদ্ধ করার জন্য বিদ্বেষমূলকভাবে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয় এবং বাকস্বাধীনতা খর্ব করতে আইনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রয়োগ করা হয়, তখন রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে।
উদাহরণ: একজন সাংবাদিক দুর্নীতির ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন এবং এর ফলে তাকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে সাজানো ফৌজদারি মামলার সম্মুখীন হতে হলো। এ ধরনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক স্বাধীনতা রক্ষায় আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অবৈধ বিধিনিষেধ:
ইস্যু: কর্তৃপক্ষ অনেক সময় আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই সমালোচনা বা ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করতে পারে।
রিটের ভিত্তি: যখন সরকার কোনো ব্যক্তিকে মতামত প্রকাশে বাধা দেয়, বিধিবদ্ধ আইনের কর্তৃত্ব ছাড়াই বাকস্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং সরকারি কর্মকর্তারা সরকারি নীতির সমালোচনাকারীদের দমন করে, তখন রিট করা যেতে পারে।
উদাহরণ: কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও একজন বক্তাকে সরকারি নীতির সমালোচনা সম্বলিত বক্তৃতা প্রদানে পুলিশ বাধা প্রদান করল।
বিচারিক নজির: 'বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদ বনাম বাংলাদেশ' মামলায় আদালত রায় দিয়েছেন যে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য এবং একে স্বেচ্ছাচারীভাবে সংকুচিত করা যাবে না।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর বেআইনি বিধিনিষেধ:
ইস্যু: ৩৯ অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।
রিটের ভিত্তি: যখন কর্তৃপক্ষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কোনো সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল বা স্থগিত করে, সরকারি কর্মকর্তারা স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করেন এবং সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয়।
উদাহরণ: কোনো আইনি আদেশ ছাড়াই প্রশাসনিক চাপের মাধ্যমে একটি সংবাদপত্র বন্ধ করতে বাধ্য করা হলো।
বিচারিক নজির: 'সেক্রেটারি, তথ্য মন্ত্রণালয় বনাম একুশে টেলিভিশন লিঃ' মামলায় আদালত পর্যবেক্ষণ দেন যে, ভাবপ্রকাশের এই স্বাধীনতা ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
প্রকাশনা বা ভাবপ্রকাশের ওপর আগাম নিয়ন্ত্রণ (Prior Restraint):
ইস্যু: যখন কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকাশনা হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে, তাকে 'আগাম নিয়ন্ত্রণ' বা 'প্রায়র রেস্ট্রেইন্ট' বলা হয়।
রিটের ভিত্তি: যখন কর্তৃপক্ষ প্রকাশনা-পূর্ব সেন্সরশিপ আরোপ করে অথবা কনটেন্ট প্রকাশের আগে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্বানুমতি নিতে বাধ্য করে।
উদাহরণ: কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও একটি সরকারি বিভাগ আদেশ দিল যে, সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি দেওয়া যাবে না।
গণমাধ্যম বা সম্প্রচারের ওপর স্বেচ্ছাচারী নিষেধাজ্ঞা:
ইস্যু: সরকারি কর্তৃপক্ষ অনেক সময় আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই মিডিয়া আউটলেটগুলো বন্ধ করে দিতে পারে।
রিটের ভিত্তি: যখন কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার লাইসেন্স স্বেচ্ছাচারীভাবে বাতিল করা হয় এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সম্প্রচার ব্লক করা হয়।
উদাহরণ: কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই নির্বাহী আদেশে একটি টেলিভিশন স্টেশনকে সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলো।
বিচারিক নজির: 'সেক্রেটারি, তথ্য মন্ত্রণালয় বনাম একুশে টেলিভিশন লিঃ' মামলায় আদালত রায় দেন যে, সম্প্রচার কার্যক্রম সাংবিধানিক বাকস্বাধীনতারই একটি অংশ।
ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা মতামত প্রকাশের জন্য শাস্তি প্রদান:
ইস্যু: ৩৯(১) অনুচ্ছেদ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।
রিটের ভিত্তি: যখন কোনো ব্যক্তিকে কেবল তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস প্রকাশের জন্য শাস্তি দেওয়া হয় এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের আদর্শিক বা রাজনৈতিক মতামতের জন্য দণ্ডিত করে।
উদাহরণ: একটি শান্তিপূর্ণ আলোচনা সভায় রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের জন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে শাস্তি প্রদান করা হলো। এ ধরনের পদক্ষেপ সংবিধানের ৩১ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন হতে পারে।
উপসংহার:
রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে যখন—অভিব্যক্তি দমনে ফৌজদারি আইনের অপব্যবহার করা হয়, কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাচারীভাবে বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করে, সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বেআইনিভাবে হস্তক্ষেপ করে, কর্তৃপক্ষ আগাম সেন্সরশিপ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, মিডিয়া আউটলেটগুলো স্বেচ্ছাচারীভাবে নিষিদ্ধ বা বন্ধ করা হয় অথবা কোনো ব্যক্তিকে তার বিশ্বাস বা মতামত প্রকাশের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com