হাইকোর্টে আপনার অধিকার ও প্রতিকার: অনুচ্ছেদ ২৭- আইনের দৃষ্টিতে সমতা (পর্ব- ০৭)

অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) এর অধীনে হাইকোর্টে আপনার মৌলিক অধিকার:

যখন সরকার, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা (statutory bodies) বা কোনো কর্তৃপক্ষ "স্বেচ্ছাচারী" (arbitrary) বা "বৈষম্যমূলক" (discriminatory) পদক্ষেপের মাধ্যমে— "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী"— এই নীতিটি লঙ্ঘন করে, তখন একজন নাগরিক সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি Writ Petition দায়ের করতে পারেন।

আমরা সবাই জানি যে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে- আইনের কাছে সবাই সমান এবং সবাই সমানভাবে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী (Article- 27: All citizens are equal before law and are entitled to equal protection of law.)। এখন কোন আইন যদি আপনাকে সমান অধিকার বা সমান প্রটেকশন না দেয় তাহলে কিভাবে আপনি এই সমান অধিকার বা সমান প্রটেকশন নিশ্চিত করবেন। আপনি মাহামান্য হাইকোর্টে আসবেন, রিট পিটিশন দায়ের করবেন। হাইকোর্টের কাছে বৈষম্য প্রতিয়মান হলে আদেশ জারী করে সমান অধিকার বা সমান প্রটেকশন বিধান করবেন।

এই যে, আইনের কাছে সবাই সমান, এই আইন বলতে কি বুঝায়? সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে বলা আছে আইন হল- কোন ‘এ্যাক্ট’ যা সংসদে পাশ হয়- তাকে আইন বলা হয়। কোন ‘অর্ডিন্যণ্স’ যা প্রেসিডেন্ট জারী করে- তাকে আইন বলা হয়। আইনের অধিনে কোন বিধি, বিধান, আদেশ কে আইন বলা হয়। প্রজ্ঞাপন/বিজ্ঞপ্তি যা নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ বা সরকারী-আধাসরকারী কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জারী করা হয়- সেগুলোও আইন। এখন আপনি যদি এই act, ordinance, order, rule, regulation, bye law, notification দ্বারা সমানভাবে বিবেচিত না হন কিংবা সমানভাবে আইনের আশ্রয়/প্রটেকশন না পান তাহলে আপনি কোথায় যাবেন? এই হাইকোর্টে আসবেন।  রিট পিটিশন দায়ের করবেন। হাইকোর্টের কাছে যদি এটি প্রতিয়মান হয় যে, আপনি আইনের সমান প্রটেকশন/আশ্রয় পান নি কিংবা আইনের কাছে আপনি সমানভাবে বিবেচিত হন নি, তাহলে হাইকোর্ট বিভাগ act, ordinance, order, rule, regulation, bye law, notification কে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষনা করে দিতে পারেন।

উদারহরণ-১: সরকারী-আধাসরকারী চাকুরীতে নিয়োগ, পদন্নতি, অপসারণের ক্ষেত্রে আপনি একই ক্যাটাগরির সবার সাথে সমানভাবে বিবেচিত হননি কিংবা সমান অধিকার পান নি। বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।  তাহলে আইনের কাছে সমানভাবে বিবেচিত হওয়ার জন্য বা সমান অধিকার লাভের জন্য আপনি মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করবেন।  হাইকোর্টের কাছে যদি প্রতিয়মান হয় যে, আপনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, তাহলে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ জারী করে আপনার অধিকার নিশ্চিত করবেন।

উদারহরণ-২: সরকারী ও আধাসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগ, পদন্নতি ও অপসারণের ক্ষেত্রে আপনি যদি সমানভাবে বিবেচিত না হন, সমান অধিকার না পান, বৈষম্যের শিকার হন।  তাহলে আপনি আপনার এই অধিকার কিভাবে ফিরে পাবেন। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে যাবেন? জজ কোর্টে যাবেন? না-কি আপিল বিভাগে যাবেন? না, আপনি হাইকোর্টেই প্রথমে আসবেন, রিট করবেন।  আপনার এই নাগরিক অধিকাররের রক্ষকই হচ্ছে- মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ। হাইকোর্টের কাছে যদি প্রতিয়মান হয় যে, আপনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, তাহলে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ জারী করে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন।

উদারহরণ-৩: আপনি যে ধরনের ব্যবসা করছেন সেই একই ক্যাটাগরির ব্যবসার ক্ষেত্রে কোন বিধি-বিধান অথবা সরকারের কোন পদক্ষেপের কারণে আপনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাহলে আপনি সেই বৈষম্য, বিধি-বিধান বা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে আপনি মহামান্য হাইকোর্টে আসবেন, রিট পিটিশন দায়ের করবেন।  হাইকোর্টের কাছে যদি প্রতিয়মান হয় যে, সেই বিধি-বিধান বা পদক্ষেপের ফলে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, তাহলে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ জারী করে সেই বিধি-বিধান বা পদক্ষেপকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক হিসাবে ঘোষণা করবেন।

অনুচ্ছেদ ২৭-এর অধীনে যেসব বিষয় বা সমস্যার জন্য Writ Petition দায়ের করা যেতে পারে:

১. শ্রেণি-আইন (Class Legislation)  বা বৈষম্যমূলক আইন:

যখন সংসদ বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর জন্য কোনো আইন পাস করে, তখন এটি সমতার নীতি লঙ্ঘন করে।

  • বিষয় (Issue): এমন কোনো আইন বা বিধান যা নাগরিকদের মধ্যে একটি "বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি" (privileged class) তৈরি করে।
  • ব্যবহারিক উদাহরণ: দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৩-এ মূলত সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার আগে দুদকের জন্য "সরকারের পূর্বানুমতি" নেওয়ার বিধান ছিল, যেখানে অন্য নাগরিকদের ক্ষেত্রে এমন কোনো অনুমতির প্রয়োজন ছিল না।
  • ফলাফল: হাই কোর্ট এই বিধানটিকে বাতিল (void) ঘোষণা করে; কারণ এটি সরকারি কর্মচারীদের আইনের সামনে একটি "উচ্চতর শ্রেণি" (superior class) হিসেবে গণ্য করার মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ২৭ লঙ্ঘন করেছিল।

২. সরকারি নিয়োগ এবং চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে বৈষম্য:

অনুচ্ছেদ ২৭-এর অধীনে Writ দায়ের করার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে সাধারণ ক্ষেত্র। এটি নিয়োগ (recruitment), পদোন্নতি (promotion), জ্যেষ্ঠতা (seniority) এবং অব্যাহতি বা বরখাস্তকরণ (termination) সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে। যখন সরকার কোনো স্বেচ্ছাচারী মানদণ্ড নির্ধারণ করে যা নির্দিষ্ট নাগরিকদের বাদ দেয়, তখন এটি "আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার" লঙ্ঘন করে। নিয়োগ, পদোন্নতি এবং চাকরির অব্যাহতির ক্ষেত্রে বৈষম্যের ভিত্তিতে Writ Petition দায়ের করা যেতে পারে।

  • বিষয় (Issue): চাকরি থেকে স্বেচ্ছাচারী বর্জন বা অন্যায়ভাবে পদোন্নতি অস্বীকার করা।
  • উদাহরণ: একটি সরকারি চাকরির সার্কুলারে বলা হলো যে, কোনো বিশেষ স্থানীয় প্রয়োজন ছাড়াই একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক পদের জন্য কেবল একটি নির্দিষ্ট জেলার প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন।
  • ফলাফল: অন্য জেলার একজন সংক্ষুব্ধ প্রার্থী (aggrieved candidate) এই সার্কুলারটি বাতিলের জন্য Writ of Mandamus দায়ের করতে পারেন, যেহেতু এটি জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য করে।

৩. স্বেচ্ছাচারী প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা স্বেচ্ছাচারিতার মতবাদ (Doctrine of Arbitrariness):

আইনের দৃষ্টিতে সমতা মানে হলো সকল নাগরিকের সাথে বৈষম্য, অন্যায় এবং পক্ষপাতহীন আচরণ করতে হবে। যদি কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ যেমন— রাজউক (RAJUK), সিটি কর্পোরেশন বা কোনো মন্ত্রণালয় এমন সিদ্ধান্ত নেয় যা একই পরিস্থিতিতে থাকা একজন ব্যক্তির অধিকারকে অন্যজনের চেয়ে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে, তবে তা স্বেচ্ছাচারী হিসেবে বিবেচিত হবে।

  • বিষয় (Issue): একই পরিস্থিতিতে একজনকে সুবিধা দেওয়া এবং অন্যজনকে তা অস্বীকার করা।
  • উদাহরণ: দুই প্রতিবেশী একই নিয়মের অধীনে ভবন নির্মাণের অনুমতির (building permit) জন্য আবেদন করলেন। কর্তৃপক্ষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (due process) ছাড়াই একজনকে অনুমতি দিল কিন্তু অন্যজনকে প্রত্যাখ্যান করল।
  • ফলাফল: প্রত্যাখ্যাত প্রতিবেশী ওই প্রত্যাখ্যানের আদেশ বাতিল করার জন্য Writ of Certiorari দায়ের করতে পারেন, যা "আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার" লঙ্ঘনের উদাহরণ।

৪. লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য:

রাষ্ট্রের এমন যেকোনো পদক্ষেপ বা নিয়ম যা কোনো জৈবিক বা যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই নারী ও পুরুষের মধ্যে ভিন্নতর আচরণ করে, তাকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।

  • উদাহরণ-১: 'ডালিয়া পারভীন বনাম বাংলাদেশ বিমান' মামলায় পুরুষ স্টুয়ার্ডদের অবসরের বয়স ছিল ৪৫ বছর, যেখানে নারী স্টুয়ার্ডেসদের ক্ষেত্রে ছিল ৩৫ বছর।
  • উদাহরণ-২: দুটি কোম্পানি একটি সরকারি কন্ট্রাক্ট বা টেন্ডারের জন্য আবেদন করল। উভয়ই সকল কারিগরি এবং আর্থিক মানদণ্ড পূরণ করেছে। সরকার কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কম দরদাতা যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করে উচ্চ দরের বিড করা কোম্পানিকে কাজ প্রদান করল।
  • ফলাফল-১: হাই কোর্ট এই নিয়মটিকে বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ ও ২৮-এর অধীনে অসাংবিধানিক হিসেবে বাতিল ঘোষণা করে।
  • ফলাফল-২: সংক্ষুব্ধ দরদাতা (aggrieved bidder) এই কার্যাদেশ বাতিলের জন্য Writ of Certiorari দায়ের করতে পারেন; কারণ রাষ্ট্রের এই পদক্ষেপটি ছিল স্বেচ্ছাচারী এবং সম-আচরণের অধিকারের পরিপন্থী।

৫. শিক্ষা এবং ভর্তির ক্ষেত্রে অসম আচরণ:

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে যখন "কোটা" পদ্ধতি বা প্রবেশের শর্তাবলী অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করা হয়।

  • বিষয় (Issue): ভর্তির নিয়মাবলী অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা।
  • উদাহরণ: যদি কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর হঠাৎ করে ভর্তির মানদণ্ড পরিবর্তন করে ফেলে, যার ফলে এমন একটি নির্দিষ্ট ছাত্রগোষ্ঠী সুবিধা পায় যারা মূল নিয়মে অযোগ্য ছিল।
  • আইনি ফলাফল: ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল এবং অভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণে বাধ্য করতে Writ দায়ের করতে পারেন।

 

মো: কামরুজ্জামান

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

এবং মৌলিক অধিকার কর্মী