সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ নোটিশ বা অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট (পর্ব- ০১)
সিটি কর্পোরেশন বা অন্য কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো নাগরিককে উচ্ছেদ (Eviction) করার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ নয়। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের সম্পত্তি ও জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশন হঠাৎ করে বুলডোজার নিয়ে এসে উচ্ছেদ অভিযান (Eviction drive) শুরু করে, যা অনেক সময় প্রচলিত আইনের পরিপন্থী।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ যদি বেআইনিভাবে কোনো কাজ করে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করে প্রতিকার চাইতে পারেন।
আপনার উল্লিখিত আইনি বিষয়াবলি (Keywords) পর্যালোচনা করে, সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ নোটিশ বা আদেশকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করার প্রধান গ্রাউন্ডগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘন (Violation of Natural Justice):
আইনের একটি সর্বজনীন নীতি হলো 'Audi Alteram Partem' বা কাউকে না শুনে দণ্ড দেওয়া যাবে না। সিটি কর্পোরেশন কাউকে 'অবৈধ বা অননুমোদিত দখলদার' (unauthorized or illegal occupant) আখ্যা দিয়ে উচ্ছেদ করার আগে অবশ্যই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show cause notice) দিতে হবে।
রিটের গ্রাউন্ড: যদি কর্তৃপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ বা 'opportunity of being heard' না দিয়েই উচ্ছেদের আদেশ দেয়, তবে তা সরাসরি 'Natural Justice' বা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন। এই গ্রাউন্ডে রিট করে উচ্ছেদ স্থগিত করা যায়।
২. যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অভাব (Lack of Due Process & Legal Procedure)
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন অনুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না (In accordance with law, rules and regulations)।
রিটের গ্রাউন্ড: উচ্ছেদ করতে হলে প্রচলিত আইন (যেমন: সরকারি পাওনা আদায় আইন, সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধার অধ্যাদেশ ইত্যাদি) মেনে করতে হবে। কোনো আইনি প্রক্রিয়া (legal procedure) অনুসরণ না করে খেয়াল-খুশিমতো উচ্ছেদ করা হলে তা 'Due process'-এর পরিপন্থী। হাইকোর্ট তখন প্রশ্ন তুলতে পারে যে এটি কোন আইনের ভিত্তিতে (On what basis; law, rules and regulations) করা হচ্ছে।
৩. পর্যাপ্ত সময়ের নোটিশ না দেওয়া (Failure to provide at least 7 days of notice)
যেকোনো উচ্ছেদের আগে দখলদারকে তার স্থাপনা বা মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য যৌক্তিক সময় দিতে হবে। বিভিন্ন আইন ও উচ্চ আদালতের নজির অনুযায়ী, উচ্ছেদের আগে অন্তত ৭ দিনের নোটিশ (at least 7 days of notice) দেওয়া বাধ্যতামূলক।
রিটের গ্রাউন্ড: যদি দেখা যায় নোটিশ দেওয়ার ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে, তবে নোটিশের সময়কালকে 'অযৌক্তিক' দাবি করে রিট পিটিশন দায়ের করা যায়।
৪. কারণ বা ভিত্তি উল্লেখ না করা (Not mentioning the reasons or grounds)
একটি বৈধ উচ্ছেদ নোটিশে অবশ্যই সুস্পষ্ট কারণ লেখা থাকতে হবে।
রিটের গ্রাউন্ড: নোটিশে যদি উচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট কারণ বা ভিত্তি (Mentioning the reasons or grounds of serving notice) উল্লেখ না থাকে, অর্থাৎ কোন দাগ বা খতিয়ানের কতটুকু জায়গা অবৈধ দখলে আছে তা সুনির্দিষ্ট না করা হয়, তবে সেই অস্পষ্ট নোটিশ বা আদেশের কোনো আইনি বৈধতা (legal effect) থাকে না।
৫. আইনগত কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার (Lawful Authority and Legality)
সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ করার ক্ষমতা কেবল তাদের আওতাধীন বা সরকারি খাস জমির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
রিটের গ্রাউন্ড: যদি জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হয় বা মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি আদালতে (Civil Court) কোনো মামলা চলমান থাকে, তবে সিটি কর্পোরেশন সেখানে উচ্ছেদ চালাতে পারে না। এক্ষেত্রে তাদের আদেশের কোনো 'Lawful authority' বা 'legality' নেই মর্মে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যায়।
বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ
উক্ত গ্রাউন্ডগুলোর ভিত্তিতে কীভাবে রিট পিটিশন করা হয়, তার কয়েকটি বাস্তব ও কাল্পনিক উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
উদাহরণ ১: বস্তি উচ্ছেদে পুনর্বাসন ও নোটিশের অভাব (ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলা সমতুল্য)
ঘটনা: সিটি কর্পোরেশন হঠাৎ মাইকিং করে ঘোষণা দিল যে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি বস্তি উচ্ছেদ করা হবে। বস্তিবাসীদের কোনো লিখিত নোটিশ বা কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি।
রিটের প্রেক্ষিত: মানবাধিকার সংগঠনগুলো হাইকোর্টে রিট দায়ের করে দাবি করে যে, এটি 'Right to Life' এবং 'Natural Justice'-এর লঙ্ঘন। হাইকোর্ট সাধারণত এক্ষেত্রে রুল জারি করেন এবং নির্দেশ দেন যে, অন্তত ৭ দিনের নোটিশ এবং পুনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা (In accordance with rules and regulations) না করা পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান (Eviction drive) স্থগিত থাকবে।
উদাহরণ ২: বৈধ ইজারাদারকে 'অবৈধ দখলদার' সাব্যস্ত করা
ঘটনা: একজন ব্যবসায়ী সিটি কর্পোরেশন থেকে বৈধভাবে দোকান বরাদ্দ নিয়ে ব্যবসা করছেন। হঠাৎ করে তাকে একটি 'Eviction Notice' ধরিয়ে দেওয়া হলো যেখানে তাকে 'Unauthorized occupant' বলা হয়েছে, কিন্তু ইজারা বাতিলের কোনো কারণ (reasons or grounds) বা শুনানি (opportunity of being heard) দেওয়া হয়নি।
রিটের প্রেক্ষিত: ব্যবসায়ী হাইকোর্টে রিট করে দেখাবেন যে, উচ্ছেদ নোটিশটি কোনো 'Lawful authority' থেকে আসেনি এবং এটি 'Due process' মেনে দেওয়া হয়নি। হাইকোর্ট এই আদেশের 'Legal effect' স্থগিত করে সিটি কর্পোরেশনকে কারণ দর্শাতে বলবেন।
উদাহরণ ৩: সীমানা নির্ধারণ ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান
ঘটনা: রাস্তার পাশ প্রশস্ত করার জন্য সিটি কর্পোরেশন ব্যক্তি মালিকানাধীন কিছু ভবনের অংশ ভাঙার জন্য বুলডোজার নিয়ে আসে। দাবি করা হয় তারা অবৈধভাবে রাস্তার জায়গা দখল করেছে (illegal occupant)। কিন্তু সরকারি মাপজোখ বা সীমানা নির্ধারণ করা হয়নি।
রিটের প্রেক্ষিত: ভবন মালিকরা রিট করে বলবেন যে, কোন আইনের ভিত্তিতে (On what basis) এবং কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া (legal procedure) ছাড়া এই অভিযান চালানো হচ্ছে। আদালত তখন স্থিতাবস্থা (Status Quo) জারি করে আগে সার্ভেয়ার দিয়ে মাপজোখ করার নির্দেশ দিতে পারেন।
উপসংহার:
সিটি কর্পোরেশন বা যেকোনো সরকারি সংস্থার উচ্ছেদ করার ক্ষমতা থাকলেও তা অবশ্যই 'In accordance with law' হতে হবে। নাগরিকের 'Opportunity of being heard', 'Due process', এবং 'Natural justice' নিশ্চিত না করে দেওয়া যেকোনো 'Eviction notice' হাইকোর্টের রিট জুরিসডিকশনের মাধ্যমে বাতিল বা স্থগিত (Quash or Stay) করা সম্ভব। কোনো নাগরিক এমন পরিস্থিতির শিকার হলে দ্রুত প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রসহ একজন রিট বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com