জেলা প্রশাসকের উচ্ছেদ নোটিশ/অভিযান/আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট (পর্ব- ০৩)

ভূমিকাঃ
সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জমি অথবা ইমারত থেকে তথাকথিত "অবৈধ দখলদার" উচ্ছেদের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকরা (DC) সাধারণত The Government and Local Authority Lands and Buildings (Recovery of Possession) Ordinance, 1970-এর প্রয়োগ করে থাকেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার সময় আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process) অনুসরণ করা হয় না।

যখন কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বা মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে কোনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে, তখন সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ of Certiorari / Mandamus) দায়ের করে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

এই অর্ডিন্যান্সের Section 5 (Eviction of unauthorised occupant)-এর উপধারা (১) ও (২) এবং আইনি নীতিমালার আলোকে রিট দায়েরের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাউন্ডগুলো নিচে বাস্তব উদাহরণসহ পর্যালোচনা করা হলো:

১. তদন্ত ছাড়া নোটিশ প্রদান (Inquiry Required Before Notice):
আইনের বিধান: Section 5 (1)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, "If the Deputy Commissioner is satisfied after making such enquiry as he thinks fit..." অর্থাৎ, কাউকে উচ্ছেদ করার আগে জেলা প্রশাসককে অবশ্যই একটি ন্যূনতম 'তদন্ত' করতে হবে।

রিটের গ্রাউন্ড: যদি দেখা যায় যে, কোনো পূর্ববর্তী ফিল্ড সার্ভে বা নথিপত্র যাচাই-বাছাই (Inquiry) ছাড়াই হঠাৎ করে কাউকে অবৈধ দখলদার আখ্যা দিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তবে তা আইনের পরিপন্থি।

উদাহরণ: রহিম সাহেব ৩০ বছর ধরে একটি জমির বৈধ লিজ নিয়ে আছেন। ডিসি অফিস কোনো তদন্ত বা লিজের রেকর্ড চেক না করেই তাকে অবৈধ দখলদার হিসেবে উচ্ছেদের নোটিশ দিল। এই নোটিশের কোনো আইনি ভিত্তি (Legal effect) নেই।

২. আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার (Show Cause Notice & Natural Justice):
আইনের বিধান ও নীতি: আইনের সর্বজনীন নীতি হলো 'অডি অল্টারাম পার্টেম' (Audi Alteram Partem)—কাউকে না শুনে তার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া যাবে না।

রিটের গ্রাউন্ড: উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়ার আগে ব্যক্তিকে অবশ্যই কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) দিতে হবে। তাকে কেন 'অবৈধ দখলদার' বলা হচ্ছে না এবং তার কাছে কী কাগজপত্র আছে, তা প্রদর্শনের সুযোগ বা 'Opportunity of being heard' না দেওয়া হলে তা সরাসরি 'Natural Justice'-এর লঙ্ঘন। বিভিন্ন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন যে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে উচ্ছেদ করা সংবিধানের লঙ্ঘন।

৩. বৈধ ও অবৈধ দখলদারের সীমানা নির্ধারণের অভাব (No Demarcation):
রিটের গ্রাউন্ড: অনেক সময় একটি বড় দাগের জমিতে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি পাশাপাশি থাকে। উচ্ছেদ নোটিশে যদি সুনির্দিষ্টভাবে সীমানা নির্ধারণ (Demarcating the legal/illegal occupants) না করা থাকে, তবে সেই ঢালাও নোটিশ (Vague Notice) অবৈধ।

উদাহরণ: একটি বাজারের পাশে সরকারি খাস জমি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে। ডিসি অফিস পুরো বাজারের ওপর উচ্ছেদ নোটিশ টানিয়ে দিল, কিন্তু লাল নিশানা বা জরিপ করে সীমানা নির্ধারণ করল না। সীমানা নির্ধারণ ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান রিট করে স্থগিত করা যায়।

৪. বিধিবদ্ধ সময়সীমা লঙ্ঘন (Violation of 30 days or 7 days Time Limit):
আইনের বিধান: Section 5 (2) অনুযায়ী, উচ্ছেদের জন্য নোটিশ প্রাপ্তির দিন থেকে কমপক্ষে ৩০ দিনের সময় দিতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে, জনস্বার্থে (Public Interest) যদি জরুরি ভিত্তিতে উচ্ছেদ করতে হয়, তবে সময়সীমা কমপক্ষে ৭ দিন হতে হবে।

রিটের গ্রাউন্ড: যদি নোটিশে ২৪ ঘণ্টা বা ৩ দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে তা Section 5 (2)-এর সরাসরি লঙ্ঘন। এছাড়া, ৭ দিনের নোটিশ দিলে জেলা প্রশাসককে প্রমাণ করতে হবে যে সেখানে কী এমন "জনস্বার্থ" বা জরুরি পরিস্থিতি ছিল।

উদাহরণ: একটি এলাকায় কোনো মেগা প্রজেক্টের কাজ নেই, অথচ সাধারণ বস্তিবাসীদের মাত্র ৩ দিনের নোটিশে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং রিটযোগ্য।

৫. নোটিশের ভিত্তি ও কারণ উল্লেখ না থাকা (Lack of Basis, Reasons or Grounds):
রিটের গ্রাউন্ড: একটি আইনি নোটিশে অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে যে, (ক) কোন আইনের কোন ধারা অনুযায়ী নোটিশ দেওয়া হচ্ছে (On what basis; law, rules and regulations), এবং (খ) উচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট কারণ কী (Reasons or grounds of serving notice)। কারণ ও আইনের উল্লেখবিহীন ব্লাইন্ড নোটিশ আইনগতভাবে অকার্যকর (Without lawful authority)।

৬. 'অবৈধ দখলদার' হওয়ার আইনি শর্ত পূরণ না হওয়া (Must be Unauthorized Occupant):
রিটের গ্রাউন্ড: রিটে চ্যালেঞ্জ করা যায় যে, পিটিশনার আদৌ "Unauthorized or illegal occupant" নন। হয়তো তার কাছে বৈধ লিজ, ডিক্রি বা মালিকানার দলিল আছে, অথবা বিষয়টি দেওয়ানি আদালতে বিচারাধীন (Sub-judice)। দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব নির্ধারণের মামলা চলমান থাকলে ডিসি নিজের খেয়ালখুশি মতো কাউকে অবৈধ দখলদার বলতে পারেন না।

৭. আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process & In Accordance with Law):
সংবিধানের বিধান: বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, "আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।"

রিটের গ্রাউন্ড: জেলা প্রশাসকের উচ্ছেদ কার্যক্রম যদি The Government and Local Authority Lands and Buildings Ordinance, 1970 বা প্রচলিত অন্য কোনো আইন, রুলস ও রেগুলেশনস-এর (In accordance with law) কঠোর অনুসরণ না করে করা হয়, তবে তা সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

উপসংহার:
উপরিউক্ত বিষয়গুলোর আলোকে বলা যায়, জেলা প্রশাসকের উচ্ছেদ ক্ষমতা শর্তহীন বা নিরঙ্কুশ নয়। যখনই উচ্ছেদ কার্যক্রমে Section 5(1) এর তদন্ত, Section 5(2) এর সময়সীমা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সীমানা নির্ধারণ বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘিত হয়, তখন ভুক্তভোগী ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে উক্ত নোটিশকে "Without lawful authority and is of no legal effect" ঘোষণার আবেদন করতে পারেন এবং উচ্ছেদ অভিযানের ওপর স্থগিতাদেশ (Stay Order) পেতে পারেন।

মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com