জেলা প্রশাসকের উচ্ছেদ নোটিশ/অভিযান/আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট (পর্ব- ০২)
ভূমিকাঃ
সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জমি ও ইমারত অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য The Government and Local Authority Lands and Buildings (Recovery of Possession) Ordinance, 1970 একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা। তবে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জেলা প্রশাসক (DC) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (Due process of law) অনুসরণ করেন না। ফলশ্রুতিতে, অনেক বৈধ মালিক বা দীর্ঘমেয়াদী ইজারাদার হয়রানির শিকার হন। এ ধরনের বেআইনি বা স্বেচ্ছাচারী উচ্ছেদ আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।
নিম্নে উক্ত অর্ডিন্যান্সের Section 5 পর্যালোচনা করে উচ্ছেদ আদেশ চ্যালেঞ্জ করার প্রধান আইনি গ্রাউন্ডসমূহ এবং বাস্তব উদাহরণ আলোচনা করা হলো।
Section 5 এর পর্যালোচনা: আইন কী বলছে?
আইনের Section 5 (Eviction of unauthorised occupant) জেলা প্রশাসককে উচ্ছেদের ক্ষমতা প্রদান করেছে। এই ধারার দুটি উপধারা রয়েছে:
Sub-section (1): জেলা প্রশাসক যদি কোনো অভিযোগ পান বা নিজে সন্তুষ্ট হন যে, কোনো ব্যক্তি ‘অবৈধ দখলদার’ (unauthorised occupant), তবে তিনি তার পছন্দমতো তদন্ত (inquiry) সাপেক্ষে ওই ব্যক্তিকে ৩০ দিনের মধ্যে জমি বা ইমারত ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে একটি নোটিশ জারি করতে পারেন।
শর্ত (Proviso): যদি জেলা প্রশাসক সন্তুষ্ট হন যে, ৩০ দিনের নোটিশ দেওয়া ‘জনস্বার্থের’ (public interest) অনুকূলে হবে না, তবে তিনি নোটিশের মেয়াদ কমিয়ে আনতে পারেন, তবে তা কোনোভাবেই ৭ দিনের কম হতে পারবে না।
Sub-section (2): যদি উপধারা (১) এর অধীনে নোটিশ পাওয়া ব্যক্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমি বা ইমারত ছাড়তে ব্যর্থ হন বা অস্বীকৃতি জানান, তবে অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, জেলা প্রশাসক ওই স্থানে প্রবেশ করে, দখলদারকে উচ্ছেদ করে এবং প্রয়োজনে স্থাপনা ভেঙে ফেলে খাস দখল পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।
হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ
Section 5 এর উপর্যুক্ত পর্যালোচনার ভিত্তিতে, জেলা প্রশাসকের উচ্ছেদ অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে নিম্নলিখিত গ্রাউন্ড বা কারণগুলোতে রিট পিটিশন (প্রধানত Writ of Certiorari ও Mandamus) দায়ের করা যায়:
১. আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া (Violation of Natural Justice):
গ্রাউন্ড: Section 5(1) এ স্পষ্ট বলা আছে, জেলা প্রশাসক উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়ার আগে "after making such inquiry as he thinks fit" (তার বিবেচনা অনুযায়ী তদন্ত করবেন)। আইনি নজির বা জুরিসপ্রুডেন্স অনুযায়ী, 'তদন্ত' করার অর্থ হলো দখলদারকে একটি 'কারণ দর্শানোর নোটিশ' (Show Cause Notice) দেওয়া। কাউকে তার বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি 'অবৈধ দখলদার' ঘোষণা করা Audi Alteram Partem (কাউকে না শুনে দণ্ডিত করা যাবে না) নীতির পরিপন্থী।
বাস্তব উদাহরণ: করিম সাহেব একটি জমির সিএস ও এসএ রেকর্ড অনুযায়ী মালিক। কিন্তু আরএস রেকর্ডে ভুলবশত জমিটি ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে যায়। জেলা প্রশাসক করিম সাহেবকে কোনো প্রকার নোটিশ বা শুনানির সুযোগ না দিয়েই Section 5(2) এর ক্ষমতা বলে বুলডোজার নিয়ে উচ্ছেদ করতে চলে আসেন। এক্ষেত্রে করিম সাহেব হাইকোর্টে রিট করতে পারবেন যে, তাকে কোনো ইনকোয়ারি বা শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়নি।
২. নোটিশ প্রদানে আইনি ব্যত্যয় (Defective Notice under Section 5(1)):
গ্রাউন্ড: আইনে বলা আছে নোটিশ নির্ধারিত পদ্ধতিতে (in the prescribed manner) জারি করতে হবে এবং অন্তত ৩০ দিনের সময় দিতে হবে। অনেক সময় কর্তৃপক্ষ মাইকিং করে বা মৌখিক নির্দেশ দিয়ে উচ্ছেদ করতে আসে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
বাস্তব উদাহরণ: একটি বাজারের দোকানদারদের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মৌখিকভাবে বলা হলো, "আগামীকাল আপনাদের দোকান ভেঙে দেওয়া হবে, জায়গা খালি করুন।" যেহেতু Section 5(1) অনুযায়ী লিখিত নোটিশ এবং ন্যূনতম সময় দেওয়া হয়নি, তাই এই উচ্ছেদ অভিযান হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জযোগ্য এবং স্থগিতাদেশ (Stay order) পাওয়ার যোগ্য।
৩. শর্তের (Proviso) অপব্যবহার এবং ৭ দিনের কম সময় দেওয়া:
গ্রাউন্ড: Section 5(1) এর Proviso অনুযায়ী, জনস্বার্থে নোটিশের মেয়াদ কমানো গেলেও তা '৭ দিনের কম' হতে পারবে না। যদি জেলা প্রশাসক ২৪ ঘণ্টা বা ৪৮ ঘণ্টার নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ করতে যান, তবে তা সরাসরি Section 5(1) এর Proviso-এর লঙ্ঘন।
বাস্তব উদাহরণ: একটি বস্তি উচ্ছেদের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট মাত্র ৩ দিনের নোটিশ দিয়ে বস্তিবাসীদের সরে যেতে বললেন। হাইকোর্টে রিট করে দেখানো যায় যে, আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে বিশেষ ক্ষেত্রেও সময়সীমা ৭ দিনের কম হতে পারবে না (not less than seven days)। সুতরাং, ৩ দিনের নোটিশ এখতিয়ার বহির্ভূত (Ultra Vires)।
৪. "অবৈধ দখলদার" (Unauthorised Occupant) সংজ্ঞার অপপ্রয়োগ:
গ্রাউন্ড: অর্ডিন্যান্সে 'unauthorised occupant' এর সংজ্ঞা দেওয়া আছে। যদি কোনো ব্যক্তির কাছে সরকারের দেওয়া বৈধ লিজ, ইজারা দলিল, বন্দোবস্ত বা কোর্টের ডিক্রি থাকে, তবে তাকে কোনোভাবেই Section 5 এর অধীনে অবৈধ দখলদার বলা যাবে না।
বাস্তব উদাহরণ: রহিম সাহেব সরকারের কাছ থেকে একটি অর্পিত সম্পত্তি (Vested Property) বা জলমহাল ৫ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন এবং নিয়মিত খাজনা দিচ্ছেন। ৩ বছর পর নতুন ডিসি এসে তাকে অবৈধ দখলদার হিসেবে উচ্ছেদের নোটিশ দিলেন। রহিম সাহেব রিট পিটিশন করে লিজ ডিড দেখিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন যে তিনি 'Unauthorised occupant' নন, ফলে Section 5 তার উপর প্রযোজ্য নয়।
৫. দেওয়ানি আদালতে মামলা চলমান থাকা (Sub Judice Matter):
গ্রাউন্ড: যদি ওই নির্দিষ্ট জমি বা ইমারতের স্বত্ব, মালিকানা বা দখল নিয়ে কোনো উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে (Civil Court) আগে থেকেই কোনো মামলা (যেমন: Title Suit বা Declaration of Title) চলমান থাকে, তবে নির্বাহী আদেশে (Executive Order) উচ্ছেদ করা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নজিরে বলা আছে, দেওয়ানি আদালতের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখতে হবে।
বাস্তব উদাহরণ: সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত একটি জমি নিয়ে রহিমা বেগমের সাথে সরকারের দেওয়ানি আদালতে স্বত্বের মামলা চলছে। আদালত এখনো রায় দেননি। এমতাবস্থায় ডিসি সাহেব Section 5(2) প্রয়োগ করে স্থাপনা ভাঙতে এলে রিট দায়ের করা যাবে। গ্রাউন্ড হবে- যেহেতু বিষয়টি সাব-জুডিস, তাই ডিসি সাহেবের একতরফা উচ্ছেদ এখতিয়ারবহির্ভূত।
৬. পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন:
গ্রাউন্ড: যদিও ১৯৭০ সালের এই আইনটি সরাসরি সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের অনেক নজির (যেমন: ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ, বস্তিবাসী উচ্ছেদ মামলা) অনুযায়ী, বস্তি বা দীর্ঘদিনের বসতি উচ্ছেদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ (Right to Life/Livelihood) প্রযোজ্য হয়। যথাযথ পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া রাতারাতি উচ্ছেদ করা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।
বাস্তব উদাহরণ: রেলওয়ের জায়গায় ৩০ বছর ধরে গড়ে ওঠা কলোনি কোনো পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই Section 5 এর নোটিশ দিয়ে ভাঙতে এলে, মানবাধিকার সংগঠন বা ভুক্তভোগীরা রিট দায়ের করতে পারেন।
উপসংহার:
সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব হলেও, সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে The Government and Local Authority Lands and Buildings (Recovery of Possession) Ordinance, 1970 এর Section 5 এর বিধানগুলো আক্ষরিক অর্থে এবং আইনের চেতনার সাথে মিল রেখে প্রয়োগ করতে হবে। যথাযথ নোটিশ প্রদান, শুনানির সুযোগ দান এবং নির্ধারিত সময়সীমা মানা বাধ্যতামূলক। এর ব্যত্যয় ঘটলে, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে নাগরিকগণ তাদের সম্পত্তির অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com