রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রিট (পর্ব- ১৫): আপীলের সিদ্ধান্ত, আদশে বা রায়কে চ্যালেঞ্জ
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বা অথরাইজড অফিসারের দেওয়া ভবন ভাঙা (Section 3B), নকশা বাতিল (Section 9) বা উচ্ছেদ (Section 6) সহ এইরকম আদেশগুলোর বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আইনি প্রতিকার পাওয়ার প্রথম ধাপ হলো 'আপিল' করা। The Building Construction Act, 1952 এর Section 15 (Appeal) এর অধীনে এই আপিল দায়ের করতে হয়।
Section 15 অনুযায়ী, ধারা ৩, ৩ক, ৩খ, ৩গ, ৩ঘ, ৪, ৫, ৬ অথবা ৯ এর অধীনে প্রদত্ত যেকোনো আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যায়। তবে এই ধারার শেষাংশে থাকা একটি বিশেষ বাক্য— "...and the decision of such officer or authority on such appeal shall be final and shall not be called in question in any Civil Court." (আপিল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে এবং কোনো দেওয়ানি আদালতে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না)— অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে।
দেওয়ানি আদালতের দরজা বন্ধ থাকলেও, বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ার (Writ Jurisdiction) সর্বদা উন্মুক্ত। নিম্নে Section 15 এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণসহ আপিল আদেশের বিরুদ্ধে রিট দায়েরের সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ডগুলো আলোচনা করা হলো:
১. কারণহীন বা ভিত্তিহীন বা 'রাবার স্ট্যাম্প' সিদ্ধান্ত (Non-Speaking Order):
এটি আপিল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রিটের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আপিল কর্তৃপক্ষের কাজ হলো নিম্নস্তরের অফিসারের আদেশের আইনগত ভিত্তি পুনরায় পরীক্ষা করা। তারা যদি আপিলকারীর যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ না করে কেবল এক লাইনে রায় দেয়—"আপিলকারীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বিধায় আপিল নামঞ্জুর করা হলো"—তবে তা একটি 'Non-speaking order'। আইন অনুযায়ী আপিল রায়কে অবশ্যই দালিলিক ও যুক্তিনির্ভর হতে হবে।
রিটের গ্রাউন্ড: বাস্তবে দেখা যায়, রাজউকের আপিল কর্তৃপক্ষ আপিলকারীর আইনি যুক্তিগুলোর কোনো বিশ্লেষণ না করেই মাত্র এক লাইনে লিখে দেয়— "আপিল নামঞ্জুর করা হলো।" এটি একটি 'Non-Speaking Order'।
বিচারিক নজির: মহামান্য আপিল বিভাগ বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, যেকোনো আধা-বিচারিক (Quasi-judicial) কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই কারণ উল্লেখ করে আদেশ দিতে হবে। কারণ ছাড়া দেওয়া আপিলের রায় হাইকোর্টে রিট করে সরাসরি বাতিলযোগ্য।
উদাহরণ ১: "এক লাইনের আপিল রায়"
জনাব 'আহমেদ'-এর ভবনের নকশা রাজউক ধারা ৯ অনুযায়ী বাতিল করেছিল। তিনি ধারা ১৫ অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করলেন এবং শুনানিতে প্রমাণ দেখালেন যে তিনি কোনো শর্ত ভঙ্গ করেননি। কিন্তু আপিল কমিটি তাকে পাঠানো চিঠিতে শুধু লিখল, "আপনার আপিলটি রাজউক কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় নামঞ্জুর করা হয়েছে।"
আইনি প্রতিকার: জনাব আহমেদ হাইকোর্টে রিট করে চ্যালেঞ্জ করবেন যে আপিল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তটি একটি 'Non-speaking Order'। তারা বিচারিক মনন (Judicial mind) প্রয়োগ করেনি। আদালত এই আপিল রায় স্থগিত করে রাজউককে পুনরায় আইন অনুযায়ী বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেবেন।
২. শুনানির সুযোগ না দেওয়া (Violation of Natural Justice):
আপিল কর্তৃপক্ষ যদি আপিলকারীকে শুনানির জন্য (Hearing) না ডাকে, তার বক্তব্য না শুনে, তার পক্ষের কাগজপত্র বা ড্যাপের (DAP) রেফারেন্স জমা দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, অথবা একতরফাভাবে আপিল নিষ্পত্তি করে দেয়, তবে তা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি এবং সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।
রিটের গ্রাউন্ড: Section 15 এর অধীনে আপিল একটি আধা-বিচারিক প্রক্রিয়া। আপিলকারী যদি ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করেন, তবে তাকে অবশ্যই ব্যক্তিগত শুনানির (Personal Hearing) সুযোগ দিতে হবে। আপিল কর্তৃপক্ষ যদি আপিলকারী বা তার আইনজীবীকে না শুনেই কেবল নথিপত্র দেখে একতরফাভাবে (Ex-parte) আপিল খারিজ করে দেন, তবে তা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের 'Audi Alteram Partem' (অপর পক্ষকে শোনো) নীতির চরম লঙ্ঘন এবং রিট এখতিয়ারে হস্তক্ষেপযোগ্য।
আইনি প্রতিকার: তিনি রিট করে Mandamus ও Certiorari আদশে চাইবেন। গ্রাউন্ড হবে, আপিল একটি বিধিবদ্ধ অধিকার (Statutory right)। শুনানির সুযোগ না দিয়ে আপিল খারিজ করা চরম স্বেচ্ছাচারিতা।
বাস্তবউদাহরণ (শুনানির অধিকার থেকে বঞ্চনা): বেগম 'ফাতেমা'র আবাসিক ভবনের বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে ধারা ৩ক-এর অধীনে উচ্ছেদ আদেশের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। আপিল কমিটি তাকে শুনানিতে না ডেকেই মূল উচ্ছেদ আদেশ বহাল রাখে এবং তাকে ৩ দিনের মধ্যে ভবন ছাড়তে বলে।
বাস্তব উদাহরণ: যদি রাজউক কোনো ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়, ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার জবাব দাখিল করেন, কিন্তু রাজউক তাকে ব্যক্তিগতভাবে শুনানির সুযোগ না দিয়েই বা কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ (Reasons) উল্লেখ না করেই ভবন ভাঙার চূড়ান্ত নির্দেশ জারি করে, তবে এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের চরম লঙ্ঘন।
বিচারিক নজির: Mohammad Amir Hossain Vs. RAJUK & Ors. (9 BLT HCD-326) মামলায় এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। রাজউক প্রথমে পিটিশনারকে অনুমোদিত নকশা প্রদর্শনের নোটিশ দেয়। পরবর্তীতে অননুমোদিত নির্মাণ ভাঙার জন্য ৭ দিনের সময় দিয়ে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ ইস্যু করে। পিটিশনার ওই নোটিশের জবাব দাখিল করেন। কিন্তু প্রায় আড়াই মাস পর রাজউক জবাবটিকে "অসন্তোষজনক" আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ দুই তলা ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। আদেশে রাজউক কেন পিটিশনারের জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারেনি, তার কোনো কারণ উল্লেখ করেনি এবং পিটিশনারকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো শুনানির সুযোগ দেয়নি ।
মহামান্য হাইকোর্ট এই রিট পিটিশনের রায়ে সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, ইমারত নির্মাণ আইনের ৩বি ধারার বিধান অনুযায়ী পিটিশনারকে ব্যক্তিগতভাবে শোনার (Heard in person) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই সুযোগ না দিয়ে এবং পর্যাপ্ত কারণ না দর্শিয়ে সম্পূর্ণ ভবন ভাঙার নির্দেশ দেওয়া কেবল প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘনই নয়, বরং তা বেআইনি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত (Without lawful authority) । আপিল কর্তৃপক্ষ যদি এমন ত্রুটিপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেয়, তবে রিট আদালতে তা টিকবে না।
৩. দেওয়ানি আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও রিটের আবশ্যকতা (Ouster Clause):
Section 15 স্পষ্টভাবে বলেছে, আপিলের আদেশের বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে (Civil Court) যাওয়া যাবে না। প্রশাসনিক আইনে একে 'Ouster Clause' বলা হয়।
রিটের গ্রাউন্ড: রিট দায়েরের একটি প্রধান শর্ত হলো "বিকল্প ও কার্যকর আইনি প্রতিকারের অভাব" (Absence of Efficacious Alternative Remedy)। যেহেতু আইনে দেওয়ানি আদালতে মামলা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আপিলের পরে আইনে আর কোনো রিভিশন বা রিভিউয়ের সুযোগ নেই, তার মানে আপীলের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত এমনটি নয়। এমতবস্থায়, হাইকোর্টে রিট দায়ের করতে পারেন এবং প্রতিকার পেতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ: রাজউকের আপিল কর্তৃপক্ষ আপনার নকশা বাতিলের (Section 9) আদেশ বহাল রাখলো। আপনি যদি দেওয়ানি আদালতে যান, তবে তারা Section 15 দেখিয়ে মামলা খারিজ করে দেবে। এই আইনি সীমাবদ্ধতাই আপনার রিট করার অধিকারকে (Maintainability) প্রতিষ্ঠিত করে।
৪. বিধিবদ্ধ চূড়ান্ততা বনাম সাংবিধানিক সর্বোচ্চতা (Constitutional Supremacy):
Section 15-এ আপিল কর্তৃপক্ষের আদেশকে "চূড়ান্ত" (Final) বলা হয়েছে। কিন্তু, সাধারণ আইনের কোনো ধারা দিয়ে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার (Judicial Review) ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায় না। আপিল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যদি বেআইনি, এখতিয়ার বহির্ভূত (Ultra Vires) বা বিদ্বেষমূলক (Malafide) হয়, তবে হাইকোর্ট তা অনায়াসেই বাতিল করতে পারেন।
৫. তামাদির (Limitation) ভুল ও আদেশের কপি না পাওয়া:
Section 15 অনুযায়ী, আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে।
রিটের গ্রাউন্ড: অনেক সময় রাজউক মূল আদেশের কপি মালিককে সরাসরি দেয় না। মালিক কপি পাওয়ার পর আপিল করলে, আপিল কর্তৃপক্ষ "৩০ দিন পার হয়ে গেছে" এই যুক্তিতে আপিল খারিজ করে দেয়। কিন্তু আইনি নীতি হলো, আদেশের তারিখ বলতে "আদেশ সম্পর্কে বৈধভাবে অবগত হওয়ার বা কপি পাওয়ার তারিখ" বোঝায়। তামাদির এই ভুল ব্যাখ্যার কারণে আপিল খারিজ হলে তা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যায়।
৬. আইনের দৃশ্যমান ভুল (Error of Law Apparent on the Face of the Record):
আপিল কর্তৃপক্ষ যদি আইনের ভুল ব্যাখ্যা দেয়। ধরুন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী কোনো একটি নকশার সামান্য ব্যত্যয় জরিমানা দিয়ে বৈধ করা যায় (Compounding)। কিন্তু আপিল কর্তৃপক্ষ তা অগ্রাহ্য করে ইমারত ভাঙার আদেশ বহাল রাখল। রেকর্ডের ওপর দৃশ্যমান এই আইনি ভুলের কারণে রিট দায়ের করা যায়।
রিটের গ্রাউন্ড: আপিল কর্তৃপক্ষ যদি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা ড্যাপ (DAP) এর কোনো বিধান চরম ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে রায় দেয়, তবে রিট জারির মাধ্যমে (Writ of Certiorari) ওই ভুল সিদ্ধান্তটি বাতিল করে হাইকোর্ট সঠিক আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ: ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী আপনার স্থাপনাটি বৈধ হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আপিল কর্তৃপক্ষ যদি পুরনো কোনো আইনের দোহাই দিয়ে উচ্ছেদ বহাল রাখে, তবে সেটি 'Error of Law' হিসেবে রিটযোগ্য।
বাস্তব উদাহরণ ও আইনি ব্যাখ্যা: ইমারত নির্মাণ আইনের ৩বি(৫)(ঘ)(i) এবং (iii) ধারায় অননুমোদিত নির্মাণের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে একটি বিকল্প রাখা হয়েছে। যদি কোনো নির্মাণ নকশা ব্যতিরেকে হয়, তবে তৎক্ষণাৎ তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার পূর্বে রাজউক নির্ধারিত ফি এর দশ গুণ (Ten times) পর্যন্ত জরিমানা (Fine) আদায়ের মাধ্যমে নির্মাণটিকে বৈধতা বা নিয়মিতকরণ (Regularization) করার সুযোগ দিতে পারে (যদি তা পরিবেশগত বা মাস্টার প্ল্যানের মারাত্মক কোনো ক্ষতি না করে) । Jamuna Builders মামলায় মহামান্য আদালত আইনের এই বিধানটির চমৎকার ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ৩বি(৬) ধারার অধীনে ভবন অপসারণ বা ধ্বংসের (Demolition) নির্দেশটি হলো রাজউকের সর্বশেষ আইনি পদক্ষেপ (Ultimate action)। প্রথম আইনি পদক্ষেপ হওয়া উচিত জরিমানা আরোপ করা এবং তা পরিশোধের সুযোগ দেওয়া। যদি ব্যক্তি জরিমানা দিতে ব্যর্থ হন বা নিয়মিতকরণের সুযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানান, তবেই কেবল ৩বি(৬) ধারার অধীনে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে ।
সুতরাং, রাজউকের আপিল কর্তৃপক্ষ যদি আইনের এই সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা (Sequence of actions) উপেক্ষা করে সরাসরি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবন ভেঙে ফেলার আদেশ বহাল রাখে, তবে ওই সিদ্ধান্তে 'Error of law apparent on the face of the record' রয়েছে মর্মে রিট অব সার্টিওরারি দায়ের করা সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং আইনসম্মত হবে ।
৭. এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ (Without Lawful Authority):
যে মূল আদেশের (যেমন Section 3B) বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে, সেই মূল আদেশটিই যদি বেআইনি বা এখতিয়ারবহির্ভূত হয়, এবং আপিল কর্তৃপক্ষ সেটি যাচাই না করে অন্ধভাবে তা বহাল (Confirm) রাখে, তবে ওই আপিল রায়টিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেআইনি হয়ে যায়।
বাস্তব উদাহরণ: ইমারত নির্মাণ আইনের ৩বি (3B) ধারার অধীনে রাজউকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অননুমোদিত নির্মাণ বা শর্ত ভঙ্গ করে নির্মিত স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দিতে পারেন। কিন্তু রাজউক যদি এমন কোনো গ্রাউন্ডে ভবন ভাঙার নির্দেশ দেয় যা ওই ধারায় বা সংশ্লিষ্ট বিধিমালার কোথাও স্পষ্টভাবে বলা নেই, তবে তা এখতিয়ার বহির্ভূত হবে।
বিচারিক নজির: A. Rouf Chowdhury & Anr Vs. Bangladesh & Ors. (8 BLT HCD-277) মামলায় রাজউক একটি ভবনের উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ এই আদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রিটে পর্যবেক্ষণ দেন যে, ইমারত নির্মাণ আইনের ৩বি ধারার বিধানাবলির অধীনে শুধুমাত্র "ভবনের উচ্চতা" (Height)-এর গ্রাউন্ডে রাজউককে কোনো নির্মাণ অপসারণ বা ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। যেহেতু মূল আইনে উচ্চতার কারণে ভবন ভাঙার ক্ষমতা দেওয়া নেই, তাই এই ধরনের নির্দেশ সম্পূর্ণ এখতিয়ার বহির্ভূত। যদি আপিল কর্তৃপক্ষ রাজউকের এমন এখতিয়ার বহির্ভূত আদেশকে বৈধতা দেয়, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রিট পিটিশন দায়ের করে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবেন ।
৮. বিদ্বেষপ্রসূত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত (Mala Fide, Arbitrariness and Colorable Exercise of Power):
রাজউক বা তার আপিল কর্তৃপক্ষ যদি কোনো বৈধ কারণ ছাড়া, ব্যক্তিগত আক্রোশবশত, রাজনৈতিক প্রভাবে বা অসৎ উদ্দেশ্যে (Mala fide) কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে তা রিট এখতিয়ারে সরাসরি বাতিলযোগ্য । আইনি পরিভাষায় একে Colorable Exercise of Power বা ক্ষমতার অপব্যবহার বলা হয়। 'মালা ফাইড' আদেশ মূলত আইনের চোখে একটি প্রতারণা (Fraud on the statute) এবং এটি কোনোভাবেই 'ওস্টার ক্লজ' দ্বারা সুরক্ষিত হতে পারে না ।
বাস্তব উদাহরণ ও বিচারিক নজির: বিচারিক নজির: Jamuna Builders Ltd. vs. RAJUK (যমুনা ফিউচার পার্ক মামলা) একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এই মামলায় যমুনা বিল্ডার্স একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ও আবাসিক কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে রাজউকের নিকট ভবন নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদনের জন্য আবেদন করে। তারা সিভিল এভিয়েশন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দপ্তরের অনাপত্তিপত্রও দাখিল করে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬ এর ৭(৫) বিধি অনুযায়ী রাজউকের আইনি দায়িত্ব হলো ৪৫ দিনের মধ্যে প্ল্যান অনুমোদন করা অথবা সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করা । কিন্তু রাজউক প্রায় ৮ মাসেরও বেশি সময় যাবত কোনো সিদ্ধান্ত না জানিয়ে আবেদনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেলে রাখে। পিটিশনার নির্মাণকাজ শুরু করলে, রাজউক হঠাৎ করেই নির্মাণকাজটিকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং ৭ দিনের মধ্যে বিশাল কাঠামোটি ভেঙে ফেলার (Dismantling) নোটিশ জারি করে ।
মহামান্য হাইকোর্ট এই মর্মে রায় দেন যে, রাজউকের এই নোটিশটি ছিল সম্পূর্ণ 'মালা ফাইড' (Mala fide), অবৈধ এবং স্বেচ্ছাচারী । আদালত গভীর পর্যবেক্ষণ দেন যে, রাজউক তার নিজস্ব সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য প্ল্যান আটকে রেখে স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়েছে । আপিল কর্তৃপক্ষ যদি রাজউকের এমন চরম স্বেচ্ছাচারী ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজকে সমর্থন করে রায় প্রদান করে, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট করে প্রতিকার পেতে পারেন।
উপসংহার ও করণীয়:
The Building Construction Act, 1952-এর Section 15 অনুযায়ী আপিলের রায় সাধারণ দেওয়ানি আদালতের দরজা বন্ধ করে দিলেও, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ সেই দরজা নাগরিকের জন্য সর্বদা খোলা রেখেছে। রাজউকের আপিল কর্তৃপক্ষ বেআইনিভাবে কোনো আপিল খারিজ করে দেয়, তবে হাইকোর্টের রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে সেই অবিচারের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি লড়াই করা সম্পূর্ণ সম্ভব। আপিলের রায়কে শেষ পরিণতি না ভেবে, এর আইনি ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করাই হলো রিট পিটিশনের মূল চাবিকাঠি। Section 15 অনুযায়ী আপিল দায়ের করা একটি বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ। আপিল না করে সরাসরি রিট করলে হাইকোর্ট সাধারণত গ্রহণযোগ্য হয়না।
আপনার করণীয়:
১. রাজউকের যেকোনো আদেশের বিরুদ্ধে অবশ্যই ৩০ দিনের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল দায়ের করুন এবং শুনানির জন্য লিখিত আবেদন করুন।
২. আপিল কর্তৃপক্ষ যদি আপনার আপিল খারিজ করে দেয়, তবে "দেওয়ানি আদালতে যাওয়া যাবে না" কথাটি দেখে হতাশ হবেন না।
৩. আপিল খারিজের আদেশের সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করে দ্রুত একজন আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করুন।
মনে রাখবেন, একটি আইনি রাষ্ট্রে কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই সংবিধানের বিচারিক পর্যালোচনার (Judicial Review) বা হাইকোর্টের রিট এখতিয়ারের ঊর্ধ্বে নয়।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com