রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রিট (পর্ব- ১৪): নির্মাণ কাজ স্থগিত করা, অননুমোদিত কাঠামো ভেঙ্গে দেওয়া, ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, বিল্ডিং কাঠামো ভেঙ্গে দেওয়া, অথবা নির্মাণ অনুমোদন স্থগিত বা বাতিল করার আদেশ” কে চ্যালেঞ্জ
সম্প্রতি প্রণীত ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০২৫ এর মাধ্যমে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) ইমারত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অভাবনীয় ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এই বিধিমালার ২১(১), ২১(২) এবং ২১(৪) বিধি রাজউককে যেকোনো সময় নির্মাণ কাজ স্থগিত করা, কাঠামো ভেঙে দেওয়া, ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি) সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং নির্মাণ অনুমোদন বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।
আইনের এই ধারাগুলো পড়লে মনে হতে পারে ভবন মালিকদের আর কোনো আইনি সুরক্ষা নেই এবং রাজউকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু প্রশাসনিক আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি (Administrative Law Principles) এবং বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজউক চাইলেই এই ক্ষমতাগুলোর যথেচ্ছ বা স্বেচ্ছাচারী (Arbitrary) প্রয়োগ করতে পারে না। রাজউক যদি এই বিধিমালার অপপ্রয়োগ করে, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে কার্যকর প্রতিকার (যেমন- স্থগিতাদেশ বা আদেশের বাতিল) পেতে পারেন।
নিম্নে বিধি ২১(১), ২১(২) এবং ২১(৪)-এর চুলচেরা বিশ্লেষণ, রিটের সুনির্দিষ্ট আইনি গ্রাউন্ড, বাস্তব উদাহরণ এবং বিচারিক নজির নিয়ে একটি বিস্তারিত আইনি কলাম তুলে ধরা হলো:
১. The Building Construction Act, 1952 এর বিধান পালন আবশ্যক:
ঢাকা মহানগর ইমারত বধিমিালা, ২০২৫ প্রণীত হয়েছে মূলত The Building Construction Act, 1952 এর ১৮ ধারার অধীনে এবং এই আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করাই (for carrying out the purposes of this Act) হল এই বিধিমালার কাজ। এই বিধিমালা (ঢাকা মহানগর ইমারত বধিমিালা, ২০২৫) তার মূল আইনের (The Building Construction Act, 1952) এখতিয়ারের বাইরে যেতে পারবে না, বিধান লঙ্ঘন করতে পারবে না। ঢাকা মহানগর ইমারত বধিমিালা, ২০২৫ এর ২১(১)(২)(৪) বিধির বিধান The Building Construction Act, 1952 এর ৩, ৩ক, ৩খ, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯ ও ১৫ ধারার বিধানের সাপেক্ষে বা প্রতিপালন করে বাস্তবায়ন করতে হবে। আইনে সেই বিধানগুলো হল- নির্মাণ/ইমারত অপসারণের নির্দেশর পূর্বে নোটিশ দেওয়া, ন্যূনতম ৭ দিনের সময় দিয়ে নোটিশ দেওয়া, শুনানীর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ (reasonable opportunity of being heard) দেওয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া, অনুসন্ধান (enquiry) করা, কারণ উল্লেখপূর্বক লিখিত আদেশ দেওয়া, ইমারত অপসারণ/ভেঙ্গে ফেলা/কাজ বন্ধ করার নির্দেশ খুবই সুনির্দিষ্ট হওয়া, ১৫ দিনের মধ্যে আদেশ প্রদান করা এবং আপীলে সুযোগ দেওয়া।
The Building Construction Act, 1952 এর 3B(1)(b) ধারা মোতাবেক কারণ দর্শানোর নোটিশ দিবেন, নোটিশে কমপক্ষে সাত দিনের সময় উল্লেখ করবেন, এবং 3B(1)(b)(i)(ii)(iii) অনুযায়ী বিষয়গুলো সংক্রান্তে কারণ দর্শানোর কথা নোটিশে উল্লেখ থাকতে হবে। নোটিশে 3B(1)(b)(i) মতে ইমারত বা এর কোনো অংশ, তা নির্মিত হোক বা নির্মাণাধীন হোক, যা নোটিশে নির্দিষ্ট করা থাকবে, তা কেন অপসারণ বা ভেঙে ফেলা হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর কথা উল্লেখ করতে হবে; অথবা 3B(1)(b)(ii) মতে নোটিশে নির্দিষ্টকৃত পুকুর বা এর কোনো অংশ, তা খননকৃত হোক বা খননাধীন হোক, কেন তা ভরাট করা হবে নামর্মে কারণ দর্শানোর কথা উল্লেখ করতে হবে; 3B(1)(b)(iii) মতে নোটিশে ইমারতের অধিকতর নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, পরিবর্ধন বা পরিবর্তন, পুকুরের অধিকতর খনন বা পুনঃখনন কেন বন্ধ করা হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর কথা উল্লেখ করতে হবে; 3B(1) মতে নোটিশে ৭ দিনের কম সময় দিতে হবে; 3B(1)(b)(i)(ii)(iii) মতে দর্শানো কারণ বিবেচনায় নিতে হবে; এবং 3B(3) মোতাবেক কারণ দর্শানো ব্যক্তিকে শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ প্রদান করতে হবে (reasonable opportunity of being heard) এবং ১৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (Order) প্রদান করতে হবে।। রাজউক ঢাকা মহানগর ইমারত বধিমিালা, ২০২৫ এর ২১(১)(২)(৪) বিধির কোন বিধান বাস্তবায়ন করতে গিয়ে The Building Construction Act, 1952 এর ৩, ৩ক, ৩খ, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯ ও ১৫ ধারার কোন বিধান বা উপরোক্ত প্রক্রিয়া বা প্রক্রিয়ার কোন স্তর লঙ্ঘন করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন এবং সেমতে প্রতিকার পেতে পারেন।
২. Principles of Natural Justice ও শুনানির অধিকার লঙ্ঘন (Audi Alteram Partem):
আইনের বিধান: বিধি ২১-এ রাজউকের ক্ষমতাগুলোর কথা বলা হলেও, সরাসরি কোনো 'কারণ দর্শানোর নোটিশ' (Show Cause) বা 'শুনানির' কথা উল্লেখ নেই।
রিটের গ্রাউন্ড: সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অসংখ্য নজির রয়েছে যে, আইনে সরাসরি শুনানির কথা বলা না থাকলেও, যখন কোনো কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার বা অর্জিত অধিকার (Vested Right) ক্ষুণ্ণ হয়, তখন তাকে অবশ্যই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
বাস্তব উদাহরণ: রাজউক বিধি ২১(১)(ক) [নকশার ব্যত্যয়] এর দোহাই দিয়ে আপনার নির্মাণ কাজ স্থগিত করলো বা কাঠামো ভাঙার নির্দেশ দিলো, কিন্তু এর আগে কোনো নোটিশ দিয়ে আপনার বক্তব্য শুনলো না। এটি Principles of Natural Justice এর ঘোরতর লঙ্ঘন এবং হাইকোর্ট এ ধরনের একতরফা (Ex-parte) আদেশের ওপর সহজেই স্থগিতাদেশ দিয়ে থাকেন।
৩. ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং মৌলিক অধিকারের দ্বন্দ্ব (বিধি ২১(১) ও ২১(৪)):
আইনের বিধান: বিধি ২১(১) রাজউককে সরাসরি ইউটিলিটি লাইন কাটার ক্ষমতা দিয়েছে এবং ২১(৪) বিধি অনুযায়ী রাজউক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে (যেমন- ডেসকো, তিতাস, ওয়াসা) সেবা প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দিতে পারে।
রিটের গ্রাউন্ড: পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ কেবল ইমারতের বিষয় নয়, এটি নাগরিকের জীবন ধারণের অধিকারের (Right to Life - সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ) সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। রাজউক যদি চূড়ান্তভাবে কোনো বিচ্যুতি প্রমাণ করার আগেই বা আপিল চলাকালীন সময়ে জবরদস্তিমূলকভাবে (Coercive measure) পানি বা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, তবে তা মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। রিট করে দাবি করা যায় যে, ইমারতের নকশাজনিত ত্রুটির কারণে একটি পরিবারকে পানি বা বিদ্যুৎ ছাড়া অমানবিক অবস্থায় রাখা অসাংবিধানিক।
বিশ্লেষণ ও নজির: এই গ্রাউন্ডের ওপর ভিত্তি করে গত ০৭/১২/২০২৫ইং তারিখে রিহ্যাব (REHAB) কর্তৃক রীট পিটিশন নং ২১১৭১/২০২৫ দায়ের করা হয়। বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী এবং বিচারপতি রাজিউদ্দিন আহমেদ-এর বেঞ্চ গত ১৭/১২/২০২৫ইং তারিখে একটি রুল নিশি জারি করেন এবং একই সাথে একটি অন্তবর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রদানের মাধ্যমে রাজউকসহ সকল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রাজউক নিয়ন্ত্রিত এলাকার নির্মাণাধীন ভবনের পানি, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা প্রদান করেন। রিহ্যাবের যুক্তি ছিল যে, রাজউক, ডেসকো এবং অন্যান্য সংস্থার সহায়তায় ১২০০ এরও বেশি বিদ্যুৎ মিটার বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, যার ফলে নির্মাণ প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, শ্রমিকরা বেকার হয়েছেন এবং ফ্ল্যাট ক্রেতারা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। হাইকোর্ট (বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী এবং বিচারপতি রাজিউদ্দিন আহমেদ-এর বেঞ্চ) এই রিটের প্রেক্ষিতে মানবিক দিক, পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনের নির্ভরতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে ওয়াসা, ডেসকো, ডিপিডিসি এবং রাজউককে পরবর্তী ৬ মাসের জন্য যেকোনো নির্মাণাধীন বা আংশিক নির্মিত ভবনের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ওপর অন্তবর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রদান করেন। এই অবস্থায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে রাজউক কর্তৃক সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ৪১৮/২০২৬ দায়ের করা হয়। যার প্রেক্ষিতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত অদ্য ০৩/০২/২০২৬ইং তারিখের আদেশের মাধ্যমে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের আদেশটি স্থগিত করেন। এর ফলে রাজউক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে পানি, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপর কোন আইনী বাধা রইলো না।
উদাহরণ (সামান্য ব্যত্যয়ে ইউটিলিটি বিচ্ছিন্ন):
বেগম 'রাবেয়া'র ৫ তলা ভবনে রাজউক পরিদর্শক এসে দেখলেন তিনি পার্কিংয়ের জায়গায় একটি ছোট পাহারাদারের কক্ষ বানিয়েছেন। এটি বিধি ২১(১)(ক)-এর আওতাভুক্ত নকশার ব্যত্যয়। রাজউক কোনো শুনানি ছাড়াই বিধি ২১(৪) প্রয়োগ করে ডেসকোকে চিঠি দিয়ে ভবনের বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিল।
আইনি প্রতিকার: তিনি রিট করে ম্যান্ডামাস (Mandamus) চাইবেন। যুক্তি হলো—ব্যত্যয়টি কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নয়। জরিমানা করে কক্ষটি ভাঙার সুযোগ না দিয়ে পুরো ভবনের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া আনুপাতিক শাস্তির নীতি এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের চরম লঙ্ঘন।
৪. "আইনগত জটিলতা" এর অপব্যাখ্যা (বিধি ২১(২)(ক) এর অপপ্রয়োগ):
আইনের বিধান: বিধি ২১(২)(ক) অনুযায়ী, জমি বা প্লটের বিষয়ে "কোনো আইনগত জটিলতা দেখা দিলে" রাজউক নকশা অনুমোদন স্থগিত বা বাতিল করতে পারে।
রিটের গ্রাউন্ড: এটি অত্যন্ত অস্পষ্ট (Vague) একটি বিধান এবং রিট করার অন্যতম বড় গ্রাউন্ড। আপনার জমির মালিকানা নিয়ে যদি প্রতিবেশী শুধু একটি দেওয়ানি মামলা (Civil Suit) ঠুকে দেয়, রাজউক তাকেই "আইনগত জটিলতা" আখ্যা দিয়ে আপনার নির্মাণ অনুমোদন বাতিল করতে পারে না।
বিচারিক নজির: উচ্চ আদালতের নজির অনুযায়ী, দেওয়ানি আদালত থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ইনজাংকশন বা নিষেধাজ্ঞা (Injunction) না আসা পর্যন্ত রাজউক নিজে নিজে দেওয়ানি আদালতের ভূমিকা পালন করতে পারে না। নিছক অভিযোগ বা ভিত্তিহীন মামলার অজুহাতে নকশা বাতিল করলে তা রিট এখতিয়ারে সরাসরি এখতিয়ার বহির্ভূত (Without Jurisdiction) হিসেবে বাতিলযোগ্য।
বাস্তব উদাহরণ (দেওয়ানি মামলার দোহাই দিয়ে অনুমোদন বাতিল):
জনাব 'হাসান' বৈধভাবে জমি কিনে রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন করান। কাজ শুরুর পর এক ব্যক্তি এসে দাবি করেন তিনি ওই জমির পূর্বতন মালিকের ওয়ারিশ এবং একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। রাজউক এই মামলার নোটিশ পেয়ে বিধি ২১(২)(ক) প্রয়োগ করে হাসানের নির্মাণ অনুমোদন স্থগিত করে দেয়।
আইনি প্রতিকার: জনাব হাসান হাইকোর্টে রিট করবেন। তার গ্রাউন্ড হবে—আদালত তাকে কাজ করতে কোনো নিষেধাজ্ঞা (Injunction) দেয়নি। রাজউক নিজে থেকে দেওয়ানি বিচারকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। আদালত রাজউকের ওই স্থগিতাদেশ বাতিল করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেবেন।
৫. সমানুপাতিকতার নীতি (Doctrine of Proportionality) লঙ্ঘন:
আইনের বিধান: বিধি ২১(১)(ক) [নকশার ব্যত্যয়] বা ২১(২)(খ) [শর্ত ভঙ্গ] এর কারণে রাজউক কাঠামো ভাঙা বা অনুমোদন বাতিলের নির্দেশ দিতে পারে।
রিটের গ্রাউন্ড: ধরুন, আপনার ১০ তলা ভবনে আপনি রাজউকের শর্তের ৯৫% পালন করেছেন, কেবল একটি ফ্লোরে জানালার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। এর জন্য যদি রাজউক বিধি ২১(২)(খ) প্রয়োগ করে আপনার পুরো ভবনের নকশাই বাতিল করে দেয়, তবে তা 'সমানুপাতিকতার নীতি'র লঙ্ঘন। ছোটখাটো বিচ্যুতির (Minor Deviation) জন্য জরিমানা বা সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি চরম শাস্তি (Extreme Penalty) দেওয়া বেআইনি এবং তা হাইকোর্টে রিট করে চ্যালেঞ্জ করা যায়।
৬. 'হুমকি বা ঝুঁকিপূর্ণ' দাবির সপক্ষে বিশেষজ্ঞ প্রমাণের অভাব (বিধি ২১(১)(চ) ও ২১(২)(ঙ)):
আইনের বিধান: বিধি ২১(১)(চ) এবং ২১(২)(ঙ) অনুযায়ী, নির্মাণ কাজ যদি পরিবেশ বা প্রতিবেশীর জন্য "হুমকি ও ঝুঁকিপূর্ণ" হয়, তবে কাজ বন্ধ বা নকশা বাতিল করা যায়।
রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক কেবল একজন সাধারণ পরিদর্শকের (Inspector) সাবজেক্টিভ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে একটি ভবনকে 'ঝুঁকিপূর্ণ' আখ্যা দিতে পারে না। এর জন্য বুয়েট বা অনুমোদিত কোনো থার্ড-পার্টি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের বিশেষজ্ঞ কারিগরি প্রতিবেদন (Expert Technical Report) প্রয়োজন। উপযুক্ত কারিগরি প্রমাণ ছাড়া নিছক প্রতিবেশীর মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে কাজ বন্ধ করা বা নকশা বাতিল করাকে হাইকোর্টে 'Arbitrary and Malafide' (স্বেচ্ছাচারী ও বিদ্বেষপূর্ণ) হিসেবে চ্যালেঞ্জ করা যায়।
৭. 'যুক্তিযুক্ত আদেশ' (Speaking Order) প্রদানে ব্যর্থতা:
রিটের গ্রাউন্ড: আপনি রাজউককে আপনার স্বপক্ষে কাগজপত্র দেখালেন, কিন্তু রাজউক বিধি ২১(২)(গ) এর দোহাই দিয়ে বললো "আপনি ভুল তথ্য দিয়েছেন, তাই নকশা বাতিল করা হলো।" কিন্তু ঠিক কোন তথ্যটি ভুল এবং তার সপক্ষে রাজউকের কাছে কী প্রমাণ আছে— তা নোটিশে উল্লেখ করলো না। আইনি ভাষায় কারণ উল্লেখ ছাড়া প্রদত্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে 'Non-Speaking Order' বলা হয়, যা আইনের দৃষ্টিতে অচল এবং রিটযোগ্য।
৮. Mala Fide Intent বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা:
প্রশাসনিক আদেশের বিরুদ্ধে রিটের একটি সাধারণ গ্রাউন্ড হলো 'ম্যালা ফাইড' বা অসৎ উদ্দেশ্য। অনেক সময় রাজউকের কর্মকর্তারা অসৎ উদ্দেশ্যে, দুর্নীতির বশবর্তী হয়ে, বা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই নকশা অনুমোদনে দীর্ঘ বিলম্ব করেন । ২০২৫ সালের বিধিমালা অনুযায়ী আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা ১৮০ দিন করা হয়েছে । কিন্তু এই সময়সীমা পার হওয়ার পরও যখন রাজউক সিদ্ধান্ত দেয় না, তখন ভবন মালিক বাধ্য হয়ে নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে রাজউক অননুমোদিত নির্মাণের অজুহাতে ভাঙার আদেশ দেয়।বিশ্লেষণ ও নজির: এই ধরনের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি রিটের একটি শক্তিশালী গ্রাউন্ড। Jamuna Builders মামলায় আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, রাজউকের সীমাহীন বিলম্ব এবং পরবর্তীতে কোনো নোটিশ ছাড়াই ভাঙার নির্দেশ প্রদান সম্পূর্ণ 'ম্যালা ফাইড' (Mala fide) ছিল । রিটে এই নজির উল্লেখ করে প্রমাণ করা যায় যে, রাজউক তার নিজের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে উল্টো নাগরিকের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার খড়গ চাপিয়ে দিতে পারে না। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রমাণ করতে পারলে যে রাজউকের পদক্ষেপটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বৈষম্যমূলক, তবে হাইকোর্ট সেই আদেশ বাতিল করবে।
উপসংহার ও আপনার করণীয়:
ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০২৫ রাজউককে অভাবনীয় ক্ষমতা দিলেও, মনে রাখবেন এটি একটি 'Subordinate Legislation' বা অধীনস্থ আইন। এটি মূল আইন বা সংবিধানকে ডিঙিয়ে যেতে পারে না।
করণীয়:
১. বিধি ২১ এর অধীনে রাজউকের কাছ থেকে কোনো কাজ বন্ধ, নকশা বাতিল বা ইউটিলিটি কাটার নোটিশ পেলে প্রথমেই লিখিতভাবে তার বিস্তারিত ও যৌক্তিক জবাব দাখিল করুন এবং শুনানির (Hearing) দাবি জানান।
২. যদি দেখেন রাজউক আপনার জবাব আমলে না নিয়ে তড়িঘড়ি করে বিদ্যুৎ বা পানির লাইন কাটার জন্য চিঠি পাঠিয়েছে বা ভাঙার লোক নিয়ে এসেছে, তবে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করুন।
৩. রিট পিটিশনে অবশ্যই আপনার সাংবিধানিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩২, ৪০ ও ৪২) লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরুন এবং জরুরি ভিত্তিতে 'Status Quo' (স্থিতাবস্থা) বা আদেশের কার্যকারিতা স্থগিতের (Stay) প্রার্থনা করুন।
আইন যত কড়াকড়িই হোক না কেন, পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা (Procedural Fairness) ছাড়া নেওয়া রাজউকের যেকোনো পদক্ষেপই উচ্চ আদালতে বাতিলযোগ্য।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com