রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রিট (পর্ব- ১৩): ইমারত অপসারণ বা ভাঙার নোটিশ (Removal and Demolition Notice) কে চ্যালেঞ্জ
রাজধানী ঢাকা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা (Approved Plan) থেকে বিচ্যুতি বা অনুমোদনহীন নির্মাণের অভিযোগে রাজউক প্রায়শই ভবন বা এর অংশবিশেষ ভেঙে ফেলার জন্য “ইমারত অপসারণ বা ভাঙার নোটিশ (Removal and Demolition Notice)” প্রদান করে। অনেক সময় দেখা যায়, রাজউকের ম্যাজিস্ট্রেট ও উচ্ছেদকারী দল বুলডোজার নিয়ে হঠাৎ হাজির হয়ে ভবনের একাংশ গুঁড়িয়ে দেয়।
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, রাজউকের ভবন ভাঙার এই ক্ষমতা হয়তো নিরঙ্কুশ এবং এর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নেই। কিন্তু The Building Construction Act, 1952 এর Section 3B এবং Section 7 পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি ভবন ভাঙার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়ার আগে রাজউক বা অথরাইজড অফিসারকে বেশ কিছু কঠোর আইনি ও পদ্ধতিগত ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এই ধাপগুলোর সামান্যতম লঙ্ঘন ঘটলে, বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে উচ্ছেদ বা ভাঙার নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ (Stay Order) পাওয়া সম্ভব।
ঢাকা মহানগর ইমারত বধিমিালা, ২০২৫ এর ২১(১) বিধি মতে যেসব কারণে নির্মাণ কাজ স্থগিত করণ অথবা অননুমোদিত কাঠামো ভাঙ্গে দেওয়ার, ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের, সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করণের অথবা বিল্ডিং কাঠামো ভেঙ্গে দেওয়ার আদেশ প্রদান করা যেতে পারে, সেগুলো হলো-
(ক) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় করা হলে;
(খ) কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে ইমারত নির্মাণ কাজ করা হলে;
(গ) যেকোনো পর্যায়ে অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত নির্মাণ কাজ গোচরীভূত হলে;
(ঘ) কর্তৃপক্ষকে বিধি মোতাবেক অবহিতকরণ ব্যতিরেকে নির্মাণ কাজ আরম্ভ বা পরিচালনা করা হলে;
(ঙ) পরিকল্পনা অনুমোদনপত্র ও নির্মাণ অনুমোদনপত্রের নিয়ম ও শর্তসমূহ লঙ্ঘন করা হলে;
(চ) নির্মাণ কাজ চলাকালে পার্শ্ববর্তী জনগণের জীবন ও ধন-সম্পত্তির ক্ষতিসহ পরিবেশের জন্য হুমকি ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়।
২১ (৪) বিধিতে বলা হয়েছে, যে সকল ইমারতের অনুমোদিত নকশা বাতিল বা স্থগিত করা হয় সেই সকল ইমারতের কোনোরূপ সেবা প্রদান না করার জন্য অথবা ইতোমধ্যে প্রদত্ত সেবা প্রত্যাহার করার জন্য রাজউক কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করবে।
নিম্নে আইনের সুনির্দিষ্ট উপধারা, বাস্তব উদাহরণ ও বিচারিক নজিরের (Judicial Precedents) আলোকে রিট দায়েরের প্রধান গ্রাউন্ডগুলো আলোচনা করা হলো:
১. ন্যূনতম ৭ দিনের নোটিশ না দেওয়া (Section 3B(1) এর লঙ্ঘন):
আইনের বিধান: Section 3B(1) অনুযায়ী, কোনো ইমারত যদি অনুমোদন ছাড়া বা নকশার শর্ত ভঙ্গ করে নির্মিত হয়, তবে অথরাইজড অফিসার সংশ্লিষ্ট মালিককে ভবনটি কেন ভেঙে ফেলা হবে না— মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবেন। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, এই নোটিশের সময়সীমা হবে "not being less than seven days" (৭ দিনের কম নয়)।
রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি নোটিশে ৭ দিনের কম সময় দেয় (যেমন- ২৪, ৪৮ বা ৭২ ঘণ্টা) এবং এর পরই বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়, তবে তা Section 3B(1) এর সরাসরি লঙ্ঘন। এটি রিট করার একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী পদ্ধতিগত গ্রাউন্ড (Procedural flaw)।
বাস্তব উদাহরণ: ধানমন্ডিতে একজন মালিককে বৃহস্পতিবার নোটিশ দিয়ে বলা হলো রোববারের মধ্যে নিজ দায়িত্বে নকশা-বহির্ভূত অংশ ভেঙে ফেলতে। এখানে ৭ দিনের আইনি সময়সীমা মানা হয়নি বিধায় এই নোটিশটি এখতিয়ার বহির্ভূত (Without Jurisdiction) হিসেবে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জযোগ্য।
২. আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া (Violation of Natural Justice):
আইনের বিধান: Section 3B(3) অনুযায়ী, মালিক যদি কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দেন, তবে অথরাইজড অফিসারকে অবশ্যই সেই জবাব বিবেচনা করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে "শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ" (reasonable opportunity of being heard) দিতে হবে।
রিটের গ্রাউন্ড: নোটিশের জবাব দাখিল করার পরও যদি রাজউক কোনো ব্যক্তিগত শুনানি (Personal Hearing) না করে গৎবাঁধা নির্দেশে ভবন ভাঙার চূড়ান্ত আদেশ দেয়, তবে তা ন্যায়বিচারের 'Audi Alteram Partem' (অপর পক্ষকে শোনো) নীতির চরম লঙ্ঘন। সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী, সম্পত্তি ভাঙার মতো চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুনানি প্রদান বাধ্যতামূলক।
৩. কারণবিহীন বা 'যুক্তিযুক্ত আদেশের' অভাব (Absence of Speaking Order):
আইনের বিধান: Section 3B(3) তে আরও বলা হয়েছে, ভবন অপসারণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজউককে লিখিতভাবে কারণ উল্লেখ করতে হবে (by an order in writing stating reasons therefore)।
রিটের গ্রাউন্ড: আপনি হয়তো দালিলিক প্রমাণসহ দেখালেন যে আপনার ভবনে কোনো বিচ্যুতি নেই। কিন্তু রাজউক আপনার কোনো যুক্তি খণ্ডন না করে কেবল এক লাইনে লিখলো— "আপনার জবাব গ্রহণযোগ্য নয়, ৩ দিনের মধ্যে ইমারতটি অপসারণ করুন।" এটি একটি 'Non-Speaking Order'। উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট আইনি ও বাস্তব কারণ বিশ্লেষণ করে আদেশ দিতে হবে। কারণবিহীন অপসারণ নির্দেশ রিট করে সরাসরি বাতিলযোগ্য।
৪. উচ্ছেদ 'শেষ বিকল্প': বৈধকরণের সুযোগ না দেওয়া (Section 3B(5) এর লঙ্ঘন):
আইনের বিধান: Section 3B(5) হলো ভবন মালিকদের জন্য সবচেয়ে বড় আইনি রক্ষাকবচ। এতে বলা হয়েছে, কোনো ভবন ভাঙার নির্দেশ দেওয়া যাবে না যদি না বিচ্যুতিটি মাস্টার প্ল্যানের পরিপন্থী হয়, বা তা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর Proviso (শর্তাংশ)। আইন বলছে, রাজউক ভাঙার নির্দেশ দেওয়ার আগে মালিককে জরিমানা ও ফি দিয়ে ভবন বৈধ করার সুযোগ দেবে:
(i) ৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা জরিমানা প্রদান,
(ii) প্রয়োজনীয় সংশোধন করা, এবং
(iii) নির্ধারিত ফির ১০ গুণ ফি দিয়ে অনুমোদন নেওয়া (Regularization)।
Section 3B(6) অনুযায়ী, ব্যক্তি যদি এই শর্তগুলো পূরণে ব্যর্থ হন, কেবল তখনই ভবন অপসারণ বা ভাঙার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া যাবে।
রিটের গ্রাউন্ড ও বিচারিক নজির: এটি রিট করার সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রাউন্ড। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নজির থেকে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, উচ্ছেদ বা ডিমোলিশন হলো 'Last Resort' (শেষ বিকল্প)। বিচ্যুতিটি যদি মাস্টার প্ল্যানের সরাসরি পরিপন্থী না হয় এবং রাস্তা দখল করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে (Minor Deviation), তবে জরিমানা ও ফি আদায়ের মাধ্যমে তা বৈধ (Regularize) হওয়ার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি ভাঙতে আসা সম্পূর্ণ বেআইনি। রাজউক প্রায়শই এই জরিমানার সুযোগটি এড়িয়ে যায়, যা রিট করে চ্যালেঞ্জ করা যায়।
৫. সমানুপাতিকতার নীতি (Doctrine of Proportionality) লঙ্ঘন:
রিটের গ্রাউন্ড: ধরুন, আপনার ১০ তলা একটি ভবনে ৯৯% কাজ নকশা অনুযায়ী হয়েছে, কেবল কার্নিশে বা সেটব্যাকে সামান্য কিছু বিচ্যুতি রয়েছে। রাজউক এর জন্য পুরো ভবন বা একটি বিশাল অংশ ভাঙার নোটিশ দিলো। আইনি ভাষায় একে বলে 'মশা মারতে কামান দাগানো'। প্রশাসনিক আইন অনুযায়ী যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অপরাধের সমানুপাতিক হতে হবে। সামান্য বিচ্যুতির জন্য বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানো 'সমানুপাতিকতার নীতি'র পরিপন্থী এবং হাইকোর্ট এ ধরনের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে থাকেন।
৬. মূল আদেশের অবৈধতা ও Section 7 এর অপপ্রয়োগ (Sublato Fundamento Cadit Opus):
আইনের বিধান: মালিক নিজে ভবন না ভাঙলে রাজউক Section 7 এর অধীনে বুলডোজার নিয়ে নিজে ভাঙতে আসে এবং ভাঙার খরচও মালিকের ওপর চাপায়।
রিটের গ্রাউন্ড: আইনি ম্যাক্সিম রয়েছে— Sublato Fundamento Cadit Opus (ভিত্তি ধ্বংস হলে ইমারতও ধসে পড়ে)। রাজউক যদি Section 3B এর নোটিশ, শুনানি এবং জরিমানার সুযোগ দেওয়ার মতো প্রাথমিক আইনি ধাপগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ না করেই হঠাৎ Section 7 এর দোহাই দিয়ে বুলডোজার নিয়ে আসে, তবে সেই অভিযান পুরোটাই বেআইনি। মূল আদেশ অবৈধ হলে, তার বাস্তবায়নের (Execution) অভিযানও হাইকোর্টে রিট করে তাৎক্ষণিক থামানো সম্ভব।
উপসংহার ও করণীয়:
রাজউকের "ভবন অপসারণ বা ভাঙার নোটিশ" পেলে আতঙ্কিত হয়ে ভবন খালি করার বা নিজে থেকে ভাঙা শুরু করার আগে আইনি সুরক্ষাগুলো যাচাই করা উচিত।
আপনার করণীয়:
১. নোটিশ পাওয়া মাত্রই (ন্যূনতম ৭ দিনের মধ্যে) একজন দক্ষ আইনজীবীর মাধ্যমে নকশা ও অন্যান্য দালিলিক প্রমাণসহ একটি শক্ত 'Show Cause Reply' রাজউকে দাখিল করুন।
২. জবাবে Section 3B(5) এর বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, ১০ গুণ ফি ও জরিমানার বিনিময়ে বিচ্যুতিটুকু নিয়মিত (Regularize) করার আবেদন করুন।
৩. রাজউক যদি আপনার জবাব ও বৈধকরণের আবেদন আমলে না নিয়ে, শুনানি না দিয়ে বা যুক্তিসঙ্গত কারণ উল্লেখ ছাড়াই (Without a Speaking Order) চূড়ান্ত ভাঙার নোটিশ দেয় বা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে আসে, তবে এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করুন।
৪. এ ধরনের জরুরি ক্ষেত্রে হাইকোর্টে 'Motion' আকারে মামলা উপস্থাপন করে তাৎক্ষণিক 'Status Quo' (স্থিতাবস্থা) বা উচ্ছেদের ওপর 'Stay Order' (স্থগিতাদেশ) আনা সম্ভব।
মনে রাখবেন, একটি গণতান্ত্রিক ও আইনভিত্তিক রাষ্ট্রে কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদ আপনার সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করেছে, যা কোনো স্বেচ্ছাচারী বা ত্রুটিপূর্ণ আদেশের মাধ্যমে ছিনিয়ে নেওয়া যায় না।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com