রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১০): রাজউক অভিযানকে চ্যালেঞ্জ

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যখন ইমারত নির্মাণ আইনের ধারা ৩বি, ৪ বা ৫ এর অধীনে কোনো ভবন বা এর অংশ অপসারণের নোটিশ দেয় এবং মালিক তা নিজ দায়িত্বে ভাঙতে ব্যর্থ হন, তখন রাজউক নিজেই বুলডোজার নিয়ে অপসারণ বা ভাঙার কাজ শুরু করে। সাধারণ মানুষের চোখে এটি রাজউকের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা। আইনের ভাষায় এটি হলো 'Execution' বা আদেশ বাস্তবায়ন পর্যায়, যা The Building Construction Act, 1952 এর Section 7 (Removal of building, etc.) এর ক্ষমতা বলে করা হয়।

এই পর্যায়ে রাজউক শুধু ভবনই ভাঙে না, বরং ভাঙার খরচও (Cost) মালিকের ওপর চাপিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ মনে করেন, রাজউক যখন বুলডোজার নিয়ে চলেই এসেছে, তখন আর আইনের আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু Section 7 এর উপধারা (১) ও (২) এর সূক্ষ্ম আইনি বিশ্লেষণ এবং উচ্চ আদালতের নজির প্রমাণ করে যে, এই চূড়ান্ত পর্যায়েও হাইকোর্টে রিট দায়ের করে উচ্ছেদ অভিযান থামানো বা স্থগিতাদেশ (Stay) আনা সম্ভব।

ঢাকা মহানগর ইমারত বধিমিালা, ২০২৫ এর ২১(১) বিধি মতে যেসব কারণে নির্মাণ কাজ স্থগিত করণ অথবা অননুমোদিত কাঠামো ভাঙ্গে দেওয়ার, ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের, সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করণের অথবা বিল্ডিং কাঠামো ভেঙ্গে দেওয়ার আদেশ প্রদান করা যেতে পারে, সেগুলো হলো-
(ক) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় করা হলে;
(খ) কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে ইমারত নির্মাণ কাজ করা হলে;
(গ) যেকোনো পর্যায়ে অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত নির্মাণ কাজ গোচরীভূত হলে;
(ঘ) কর্তৃপক্ষকে বিধি মোতাবেক অবহিতকরণ ব্যতিরেকে নির্মাণ কাজ আরম্ভ বা পরিচালনা করা হলে;
(ঙ) পরিকল্পনা অনুমোদনপত্র ও নির্মাণ অনুমোদনপত্রের নিয়ম ও শর্তসমূহ লঙ্ঘন করা হলে;
(চ) নির্মাণ কাজ চলাকালে পার্শ্ববর্তী জনগণের জীবন ও ধন-সম্পত্তির ক্ষতিসহ পরিবেশের জন্য হুমকি ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়।
২১ (৪) বিধিতে বলা হয়েছে, যে সকল ইমারতের অনুমোদিত নকশা বাতিল বা স্থগিত করা হয় সেই সকল ইমারতের কোনোরূপ সেবা প্রদান না করার জন্য অথবা ইতোমধ্যে প্রদত্ত সেবা প্রত্যাহার করার জন্য রাজউক কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করবে।

নিম্নে Section 7 এর বিধানগুলোর বিশ্লেষণসহ হাইকোর্টে রিট দায়েরের প্রধান গ্রাউন্ডগুলো আলোচনা করা হলো:

১. মূল আদেশের (Foundation Order) অবৈধতা: 'Sublato Fundamento Cadit Opus'
আইনি বিধান: Section 7(1) প্রয়োগ করা হয় যদি কোনো ব্যক্তি Section 3B এর অধীন দেওয়া নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হন। একইভাবে Section 7(2) প্রয়োগ করা হয় যদি ব্যক্তি Section 4 বা 5(1) এর নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হন।

রিটের গ্রাউন্ড: আইনি ভাষায় একটি সুপরিচিত ল্যাটিন ম্যাক্সিম রয়েছে— Sublato Fundamento Cadit Opus (ভিত্তি ধ্বংস হলে ইমারতও ধসে পড়ে)। Section 7 হলো একটি 'বাস্তবায়নকারী ধারা' (Executing Provision)। রাজউক যদি Section 3B এর অধীনে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (যেমন- আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, শুনানির সুযোগ, বা জরিমানা দিয়ে বৈধকরণের সুযোগ) অনুসরণ না করেই চূড়ান্ত অপসারণের নির্দেশ দেয়, তবে সেই অবৈধ আদেশের ওপর ভিত্তি করে Section 7 এর অধীনে পরিচালিত অভিযানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেআইনি হয়ে যায়।

বাস্তব উদাহরণ: রাজউক আপনাকে Section 3B এর অধীনে কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়েই সরাসরি Section 7 এর দোহাই দিয়ে ভবন ভাঙতে চলে এলো। হাইকোর্টে রিট করে আপনি প্রমাণ করতে পারবেন যে, যেহেতু মূল আইনি ধাপই মানা হয়নি, তাই Section 7 এর প্রয়োগ এখতিয়ার বহির্ভূত (Without Jurisdiction)।

বাস্তব উদাহরণ (আইনের সময়সীমার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি):
জনাব 'আহসান'-কে রাজউক Section 3B-এর অধীনে একটি চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে বলল, "আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আপনার ভবনের বর্ধিত অংশ ভেঙে ফেলুন।" কিন্তু মাত্র ১৫ দিনের মাথায় রাজউক Section 7-এর ক্ষমতা বলে বুলডোজার নিয়ে হাজির হলো।

আইনি প্রতিকার: জনাব আহসান হাইকোর্টে রিট করবেন। তার অকাট্য যুক্তি হলো, Section 7 প্রয়োগ করার পূর্বশর্ত হলো মালিককে দেওয়া "নির্ধারিত সময় পার হওয়া"। সময় পার হওয়ার আগেই রাজউকের অভিযান সম্পূর্ণ অবৈধ এবং আদালত সাথে সাথে এর ওপর স্থগিতাদেশ (Stay order) দেবেন।

বাস্তব উদাহরণ (ভিত্তিহীন মূল আদেশের ওপর বুলডোজার):
বেগম 'রোকেয়া'-র বাড়িতে রাজউক একদিন এসে সরাসরি Section 7-এর কথা বলে ভবনের দেয়াল ভাঙা শুরু করল। রাজউক দাবি করল তারা আগেই নোটিশ দিয়েছিল, কিন্তু রোকেয়া বেগম কখনোই Section 3B-এর কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ পাননি (নোটিশ সঠিকভাবে জারি হয়নি)।

আইনি প্রতিকার: তিনি রিট করে চ্যালেঞ্জ করবেন যে, Section 7-এর উচ্ছেদ প্রক্রিয়া একটি আইনি শূন্যতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু তাকে Section 3B-এর অধীনে শুনানির কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি (প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন), তাই Section 7-এর চূড়ান্ত উচ্ছেদ ক্ষমতা প্রয়োগ করা চরম স্বেচ্ছাচারিতা।


২. নির্ধারিত সময়সীমা (Period Fixed) শেষ হওয়ার আগেই অভিযান:
আইনি বিধান: Section 7(1) এবং 7(2) উভয় উপধারায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো— "within the period fixed therefore" (তজ্জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে)। অর্থাৎ, রাজউক মালিককে ভবন সরানোর জন্য যে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছিল, কেবল সেই সময় পার হওয়ার পরই রাজউক নিজে এসে ভাঙতে পারবে।

রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি নোটিশে ১৫ দিন সময় দেয়, কিন্তু ১০ দিনের মাথায় ম্যাজিস্ট্রেট ও বুলডোজার নিয়ে ভাঙতে শুরু করে, তবে তা Section 7 এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। হাইকোর্ট এই ধরনের তড়িঘড়ি ও বেআইনি অভিযানের ওপর তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ (Stay Order) প্রদান করেন।

৩. উচ্ছেদের খরচ আদায়  এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC 386) অপপ্রয়োগ:
আইনি বিধান: Section 7(1) এর একটি ভয়ানক দিক হলো, রাজউক নিজে ভবন ভেঙে সেই ভাঙার খরচ (Cost incurred) মালিকের কাছ থেকে আদায় করতে পারবে। আর এই আদায় প্রক্রিয়া হবে Code of Criminal Procedure, 1898 এর Section 386 (জরিমানা আদায়ের পদ্ধতি) অনুযায়ী।

রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক চাইলেই মনগড়া বা কাল্পনিক কোনো খরচ মালিকের ওপর চাপাতে পারে না। ভাঙার খরচের একটি স্বচ্ছ ও যৌক্তিক হিসাব (Assessment) থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, CrPC 386 অনুযায়ী জরিমানা আদায় করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে (যেমন- স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের পরোয়ানা জারি করা)। রাজউক যদি কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের যথাযথ পরোয়ানা ছাড়াই সরাসরি মালিককে আটকে রেখে জোরপূর্বক ব্ল্যাংক চেকে সই নেয় বা টাকা দাবি করে, তবে তা রিট এখতিয়ারে চ্যালেঞ্জযোগ্য। এটি চাঁদাবাজির সমতুল্য এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

৪. ক্ষতিপূরণ বাজেয়াপ্ত করার অবৈধ ক্ষমতা (Section 7(2)):
আইনি বিধান: Section 7(2) অনুযায়ী, যদি অস্থায়ী ইমারত (Section 4) বা ১৯৫২ সালের নির্মাণাধীন ইমারত (Section 5) সরাতে মালিক ব্যর্থ হন, তবে রাজউক নিজ খরচে তা সরাবে এবং মালিক "shall not be any more entitled to any compensation" (আর কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন না)।

রিটের গ্রাউন্ড: আমরা পূর্ববর্তী কলামগুলোতে দেখেছি যে বর্তমান সময়ে (২০২৬ সালে) Section 4 ও 5 এর প্রয়োগ কার্যত অসম্ভব, কারণ ওই ধারাগুলো ১৯৫২ সালের প্রেক্ষাপটে তৈরি। সুতরাং, রাজউক যদি বর্তমান সময়ের কোনো ভবনকে জোরপূর্বক 'অস্থায়ী' আখ্যা দিয়ে Section 4 এর অধীনে উচ্ছেদ করতে যায় এবং Section 7(2) এর দোহাই দিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা সরাসরি সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদের (সম্পত্তির অধিকার ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ) সাথে সাংঘর্ষিক। রিট করে এই ক্ষতিপূরণ বাতিলের সিদ্ধান্ত অকার্যকর করা যায় এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায়।

৫. "প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ" (Necessary Force) এর নামে মাত্রাতিরিক্ত ধ্বংসযজ্ঞ:
আইনি বিধান: Section 7(1) রাজউককে ক্ষমতা দিয়েছে "using or causing to be used such force as may be deemed necessary" (প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হতে পারে এমন বলপ্রয়োগ)।

রিটের গ্রাউন্ড: 'প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ' মানে এই নয় যে উচ্ছেদের সময় রাজউক ভবনের বৈধ ও অনুমোদিত অংশও ভেঙে ফেলবে, মূল্যবান সামগ্রী লুট হতে দেবে বা মালিক/দখলদারদের শারীরিক হেনস্তা করবে। এটি 'সমানুপাতিকতার নীতি' (Doctrine of Proportionality) এর পরিপন্থী। রাজউক যদি উচ্ছেদের নামে বিদ্বেষমূলকভাবে (Malafide) ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তবে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনি অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে হাইকোর্টে রিট করে রাজউকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ (Tortious Liability) আদায়ের মামলা করা যায়।

উপসংহার ও করণীয়:
Section 7 হলো রাজউকের ক্ষমতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ, যেখানে বুলডোজার সরাসরি নাগরিকের সম্পত্তির ওপর আঘাত হানে। তবে এই ক্ষমতাও আইনের নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা।

করণীয়:
১. রাজউকের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার আভাস পাওয়ামাত্রই বা ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত হলে প্রথমেই যাচাই করুন যে পূর্ববর্তী আইনি ধাপগুলো (Section 3B বা অন্যান্য ধারার নোটিশ ও শুনানির সুযোগ) সঠিকভাবে পালিত হয়েছে কি না।
২. যদি রাজউক আপিল বা শুনানির সুযোগ না দিয়ে হঠাৎ Section 7 এর দোহাই দিয়ে উচ্ছেদে আসে, তবে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে হবে।
৩. এই ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে হাইকোর্টে 'Motion' আকারে মামলা উপস্থাপন করে তাৎক্ষণিক 'Status Quo' (স্থিতাবস্থা) বা উচ্ছেদের ওপর 'Stay Order' (স্থগিতাদেশ) আনা সম্ভব, যা মুহূর্তের মধ্যে বুলডোজারের চাকা থামিয়ে দিতে পারে।

আইনের শাসন ব্যবস্থায় কোনো কর্তৃপক্ষই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী নয়; সংবিধান ও উচ্চ আদালত সর্বদা নাগরিকের সম্পত্তিকে বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করতে প্রস্তুত।

মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com