রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৮): ভোগদখলকারকে উচ্ছেদ আদেশ চ্যালেঞ্জ 

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যখন কোনো অবৈধ বা নকশা-বহির্ভূত ভবন অপসারণ বা ভাঙার উদ্যোগ নেয়, তখন সেই ভবনে বসবাসরত ভাড়াটিয়া বা দখলদারদের (Occupiers) ভবন খালি করার নির্দেশ প্রদান করে। The Building Construction Act, 1952 এর Section 6 (Eviction of occupier) এর অধীনে এই 'উচ্ছেদ আদেশ' বা নোটিশ দেওয়া হয়। 

রাজউক যখন বুলডোজার ও পুলিশ নিয়ে কোনো ভবন ভাঙতে বা দখলদারকে উচ্ছেদ করতে আসে, তখন নাগরিকরা চরম অসহায় বোধ করেন। রাজউকের এই উচ্ছেদ অভিযানের মূল আইনি হাতিয়ার হলো The Building Construction Act, 1952-এর Section 6 (Eviction of occupier বা দখলদার উচ্ছেদ)। এই ধারায় "সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে উচ্ছেদ" (summarily evicted) এবং "শক্তি প্রয়োগ" (use of force)-এর কথা বলা থাকায় এটি অত্যন্ত কঠোর শোনায়। কিন্তু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, ধারা ৬ কোনো স্বাধীন বা স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষমতা নয়; এটি পুরোপুরি শর্তযুক্ত। রাজউক যদি এই শর্তগুলো লঙ্ঘন করে গায়ের জোরে উচ্ছেদ করতে আসে, তবে ভুক্তভোগী নাগরিক বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে এই অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন।

Section 6(2) অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন না ছাড়লে রাজউক "প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ" (Use of necessary force) করে সামারি এভিকশন (Summary Eviction) বা তাৎক্ষণিক উচ্ছেদ করতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই ধারার অধীনে রাজউকের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ এবং দখলদারদের কোনো আইনি অধিকার নেই। কিন্তু আইনের সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির (Judicial Precedents) প্রমাণ করে যে, রাজউক চাইলেই খেয়ালখুশিমতো উচ্ছেদ করতে পারে না।

নিম্নে Section 6 এর উপধারাগুলোর বিশ্লেষণসহ হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়েরের প্রধান গ্রাউন্ডগুলো আলোচনা করা হলো:

১. ভিত্তিহীন উচ্ছেদ অভিযান:
বাস্তব উদাহরণ: জনাব 'শরীফ' একটি ফ্ল্যাটের বৈধ ক্রেতা এবং বসবাসকারী। রাজউক হঠাৎ একদিন মোবাইল কোর্ট নিয়ে এসে তাকে ধারা ৬-এর নোটিশ দেখিয়ে বলল, "বিল্ডিংয়ের নকশায় সমস্যা আছে, ২ ঘণ্টার মধ্যে ফ্ল্যাট খালি করুন, আমরা ভাঙব।"

আইনি প্রতিকার: জনাব শরীফ তাৎক্ষণিকভাবে তার আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টে রিট করবেন। তার প্রধান যুক্তি হবে—রাজউক তাকে বা ভবনের মূল মালিককে ধারা ৩বি-এর অধীনে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়নি। যেহেতু মূল আইনি প্রক্রিয়াই (Section 3B) অনুসরণ করা হয়নি, তাই সরাসরি Section 6 প্রয়োগ করে উচ্ছেদ করতে আসা চরম এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ। আদালত সাথে সাথে এই অভিযান স্থগিত করে দেবেন।

২. মূল আদেশের (Primary Order) বৈধতার অভাব (Doctrine of "Fruit of the Poisonous Tree"):
আইনি বিধান: Section 6(1) এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো উচ্ছেদ নোটিশটি জারি করতে হবে "simultaneously with the issue of an order under section 3B or a notice under section 4 or sub-section (1) of section 5..." (অর্থাৎ ধারা ৩বি এর অধীন আদেশ অথবা ধারা ৪ বা ৫(১) এর অধীন নোটিশের সাথে যুগপৎভাবে/একই সময়ে)।

এটি সবচেয়ে মোক্ষম আইনি যুক্তি। ধারা ৬ তখনই প্রয়োগ করা যায়, যখন ধারা ৩বি (বা ৪, ৫)-এর অধীন একটি বৈধ আদেশ থাকে। রাজউক যদি ধারা ৩বি-এর অধীনে মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়ে বা শুনানির সুযোগ না দিয়ে বেআইনিভাবে ভবন ভাঙার চূড়ান্ত আদেশ দেয়, তবে সেই বেআইনি আদেশের ওপর ভিত্তি করে ধারা ৬-এর অধীন দেওয়া উচ্ছেদ নোটিশও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেআইনি (Void ab initio) হয়ে যায়। গাছ বিষাক্ত হলে তার ফলও বিষাক্ত হবে—এই যুক্তিতে রিট করে উচ্ছেদ স্থগিত করা যায়।

রিটের গ্রাউন্ড: Section 6 কোনো স্বাধীন ধারা নয়; এটি একটি নির্ভরশীল ধারা (Dependent Provision)। রাজউক যদি ভবনের মালিকের বিরুদ্ধে Section 3B (নকশা লঙ্ঘন), Section 4 বা Section 5 এর অধীনে আইনানুগভাবে চূড়ান্ত কোনো আদেশ প্রদান না করেই, হঠাৎ দখলদারকে Section 6 এর নোটিশ দেয়, তবে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। হাইকোর্টে রিট করে চ্যালেঞ্জ করা যায় যে, যেহেতু মূল আদেশটিই (Primary Order) অবৈধ বা অস্তিত্বহীন, তাই তার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া Section 6 এর উচ্ছেদ আদেশটিও আইনত অচল (Void ab initio)।

৩. 'একই সাথে' (Simultaneously) নীতির লঙ্ঘন:
রাজউক যদি ভবন ভাঙার চূড়ান্ত আদেশ (Section 3B) দেওয়ার তিন বছর পর হঠাৎ করে এসে Section 6-এর নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ করতে চায়, তবে রিট পিটিশনে যুক্তি দেওয়া যায় যে, আইনের "Simultaneously" বা সমসাময়িক পদক্ষেপের বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে। দীর্ঘ বিলম্বের কারণে ওই আদেশের কার্যকারিতা তামাদি বা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

৪. যুগপৎ (Simultaneously) নোটিশ জারির শর্ত লঙ্ঘন, উচ্ছেদের নোটিশ ও সময়সীমা:
আইনি বিধান: আইনে স্পষ্টভাবে "simultaneously" (একই সাথে/যুগপৎভাবে) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। The Building Construction Act, 1952-এর Section 6 বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত পূর্ববর্তী ধারাগুলোর (৩বি, ৪ এবং ৫) একটি 'নির্বাহী বা প্রয়োগকারী' (Executing) ধারা: এই উপ-ধারায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ রয়েছে—"Simultaneously" (একই সাথে)। এর অর্থ হলো, রাজউক চাইলেই হঠাৎ করে কাউকে উচ্ছেদের নোটিশ দিতে পারে না। রাজউককে অবশ্যই ইমারত অপসারণের চূড়ান্ত আদেশ (Section 3B), অস্থায়ী ইমারত অপসারণের নোটিশ (Section 4), বা নির্মাণাধীন ইমারত অপসারণের নোটিশের (Section 5) সাথে সাথেই বা এর ওপর ভিত্তি করেই কেবল দখলদারকে ভবন খালি করার নোটিশ দিতে হবে। নোটিশে ভবন খালি করার একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে হবে।

রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি ভবনের মালিককে ৬ মাস আগে Section 3B এর নোটিশ দিয়ে থাকে এবং হঠাৎ করে আজ দখলদার বা ভাড়াটিয়াদের Section 6 এর নোটিশ দেয়, তবে তা আইনের পদ্ধতিগত লঙ্ঘন। উচ্ছেদ নোটিশ এবং মূল অপসারণ নোটিশ একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জারি হতে হবে। এই পদ্ধতিগত ত্রুটির (Procedural Flaw) কারণে হাইকোর্ট উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দিতে পারেন।

৫. অমানবিক ও অযৌক্তিক সময়সীমা (Unreasonable Time to Vacate):
আইনি বিধান: Section 6(1) এ বলা আছে নোটিশে ভবন খালি করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় (period mentioned therein) দিতে হবে।

রিটের গ্রাউন্ড: প্রশাসনিক আইনের অন্যতম মূলনীতি হলো কর্তৃপক্ষের যেকোনো সিদ্ধান্তকে 'যৌক্তিক' (Reasonable) হতে হবে। রাজউক যদি একটি বহুতল আবাসিক ভবন বা বড় হাসপাতাল/স্কুল খালি করার জন্য মাত্র ১২ ঘণ্টা বা ২৪ ঘণ্টার নোটিশ দেয়, তবে তা চরম অযৌক্তিক এবং অমানবিক।

ধারা ৬(১)-এ ইমারত খালি করার জন্য সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আইন নির্দিষ্ট সময় বেঁধে না দিলেও, প্রশাসনিক আইনের মূলনীতি হলো সময়টি 'যুক্তিসঙ্গত' (Reasonable) হতে হবে। একটি ৫ তলা আবাসিক ভবন বা একটি হাসপাতাল খালি করার জন্য রাজউক যদি মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময় দেয়, তবে তা চরম স্বেচ্ছাচারিতা (Arbitrariness) এবং রিট করে এই সময়সীমা চ্যালেঞ্জ করা যায়।

বাস্তব উদাহরণ: বনানীতে একটি ৫ তলা ভবনে ২০টি পরিবার বসবাস করে। রাজউক বৃহস্পতিবার বিকেলে নোটিশ টানিয়ে দিলো যে শুক্রবার সকাল ১০টার মধ্যে ভবন খালি করতে হবে। ঢাকা শহরের মতো জায়গায় এত অল্প সময়ে বাসা বদল করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে রিট দায়ের করা হলে, আদালত "Reasonableness" এর যুক্তিতে উচ্ছেদের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে ভবন খালি করার জন্য সম্মানজনক ও পর্যাপ্ত সময় (যেমন- ১ থেকে ৩ মাস) বেঁধে দেন।

অযৌক্তিক সময়সীমা:
একটি বেসরকারি স্কুল ভবনের একাংশে নকশার সামান্য ব্যত্যয় আছে। রাজউক স্কুল চলাকালীন সময়ে এসে ধারা ৬-এর নোটিশ দিয়ে বলল, "আগামীকাল সকালের মধ্যে ভবন খালি করতে হবে।"

আইনি প্রতিকার: স্কুল কর্তৃপক্ষ রিট করে ম্যান্ডামাস (Mandamus) চাইবেন। তাদের গ্রাউন্ড হবে—কয়েকশ শিক্ষার্থীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক রাতের মধ্যে স্থানান্তর বা খালি করা বাস্তবসম্মত নয়। এটি প্রশাসনিক ক্ষমতার অযৌক্তিক প্রয়োগ। আদালত সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করে উচ্ছেদের ওপর স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার আদেশ দেন এবং বিকল্প ব্যবস্থা করার জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় প্রদান করেন।

৬. দখলদার/ভাড়াটিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার (Audi Alteram Partem):
রিটের গ্রাউন্ড: অনেক সময় ভবনের মালিক রাজউকের সাথে যোগসাজশ করে বা নিজের গাফিলতির কারণে Section 3B এর কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দেন না। এর ফলে ভাড়াটিয়া বা দখলদাররা হঠাৎ করেই Section 6 এর উচ্ছেদ নোটিশ পান। যদিও Section 6 এ দখলদারদের শুনানির কথা সরাসরি বলা নেই, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী, কারও বৈধ ব্যবসা বা বসবাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে ন্যূনতম শুনানির সুযোগ দেওয়া বা নোটিশ দেওয়া ন্যায়বিচারের (Natural Justice) অংশ। ভাড়াটিয়া বা ভোগদখলকার রিট করে দাবি করতে পারেন যে, মালিকের ভুলের জন্য তাকে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে উচ্ছেদ করা বেআইনি।

৭. মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন (Section 6(2)):
আইনি বিধান: Section 6(2) অথরাইজড অফিসারকে উচ্ছেদের সময় "use... such force as may be deemed necessary" (প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের) ক্ষমতা দিয়েছে।

রিটের গ্রাউন্ড: "প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ" মানে এই নয় যে রাজউক সন্ত্রাসী কায়দায় ভাঙচুর করবে বা দখলদারদের ব্যক্তিগত মূল্যবান জিনিসপত্র নষ্ট করবে। রাজউক যদি উচ্ছেদের নামে আসবাবপত্র ছুড়ে ফেলে, নাগরিকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে বা অমানবিক আচরণ করে, তবে তা বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ (আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার) এবং ৩২ অনুচ্ছেদের (জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার) সরাসরি লঙ্ঘন। উচ্ছেদের সময় রাজউক যদি 'Proportionality' বা সমানুপাতিকতার নীতি ভঙ্গ করে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে, তবে তার বিরুদ্ধে রিট করে ক্ষতিপূরণ (Compensation) এবং বিচারিক তদন্ত দাবি করা যায়।

৮. 'Notwithstanding anything contained in any other law' এর অপপ্রয়োগ:
Section 6(2) তে একটি 'Non-obstante clause' আছে— "অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন"। রাজউক প্রায়ই এই বাক্যের অপব্যাখ্যা করে দাবি করে যে তারা যেকোনো সময় উচ্ছেদ করতে পারে। কিন্তু উচ্চ আদালত বারবার রায় দিয়েছেন যে, কোনো আইনই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে এই ধরনের 'Non-obstante clause' কর্তৃপক্ষকে রিট এখতিয়ার থেকে দায়মুক্তি (Immunity) দিতে পারে না।

৯. পদ্ধতিগত আন্তঃসম্পর্ক: 
ধারা ৩বি এবং ধারা ৬ এর অবিচ্ছেদ্য বন্ধনউচ্ছেদের আইনি বৈধতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝতে হলে ধারা ৬ কে অবশ্যই ধারা ৩বি এর সাথে একত্রে (Conjoint reading) পাঠ করতে হবে। রাজউকের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া মূলত একটি পদ্ধতিগত চেইন বা শৃঙ্খল, যার একটি রিং ভেঙে গেলে বা বাদ পড়লে পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটিই বেআইনি বা দূষিত (Vitiated) হয়ে যায়। ধারা ৩বি(১) ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয় যে, যদি কোনো ইমারত অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদিত নকশার শর্ত লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়, তবে তিনি মালিক বা দখলদারকে একটি নোটিশ দেবেন। এই নোটিশে নির্দেশ দেওয়া হবে যে, কেন ভবনটি বা এর অংশবিশেষ অপসারণ বা ভেঙে ফেলা হবে না (Why the building should not be removed or dismantled), তার কারণ দর্শাতে হবে। আইন স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, এই কারণ দর্শানোর জন্য ন্যূনতম ৭ দিন (Not being less than seven days) সময় দিতে হবে ।ধারা ৩বি(৩) অনুযায়ী, কারণ দর্শানোর পর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি সন্তুষ্ট না হন, তবে তিনি ভবনটি অপসারণের আদেশ দিতে পারেন। তবে, ধারা ৩বি(৫) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ প্রদান করে। এই উপধারা অনুযায়ী, কর্মকর্তা চাইলে ভবন ভেঙে ফেলার আদেশ না দিয়ে মালিককে একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে পারেন, যার মধ্যে মালিক অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত ফির দশগুণ পর্যন্ত জরিমানা (Fine up to ten times the prescribed fee) প্রদান করে ভবনটির নকশা অনুমোদন বা সংশোধন (Regularization) করিয়ে নিতে পারেন। ধারা ৩বি(৬) এ বলা হয়েছে, যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উপধারা (৫) এ উল্লিখিত জরিমানা প্রদান করতে বা অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হন, তবেই কেবল ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিখিত আদেশের মাধ্যমে (By an order in writing) ভবন বা এর অংশবিশেষ অপসারণ বা ভেঙে ফেলার চূড়ান্ত নির্দেশ দেবেন ।আইনের এই কাঠামো প্রমাণ করে যে, রাজউক চাইলেই সরাসরি বুলডোজার নিয়ে কোনো স্থাপনা ভাঙতে যেতে পারে না। ধারা ৬(১) এর অধীনে উচ্ছেদের নোটিশটি কেবল তখনই আইনসম্মত হবে, যখন তা ধারা ৩বি(৬) এর চূড়ান্ত লিখিত আদেশের সাথে "যুগপৎভাবে" (Simultaneously) জারি করা হবে । পদ্ধতিগত এই কঠোর ধারাবাহিকতা রক্ষা না করা হলে উচ্ছেদ আদেশটি আদালতে টিকবে না।

উপসংহার ও করণীয়:
Section 6 এর অধীনে রাজউকের 'সামারি এভিকশন' বা তাৎক্ষণিক উচ্ছেদের ক্ষমতা কখনোই স্বেচ্ছাচারী (Arbitrary) হতে পারে না। এই ক্ষমতা Section 3B, 4 বা 5 এর বৈধ আদেশের ওপর নির্ভরশীল।

করণীয়:
১. আপনার ভবনে বা প্রতিষ্ঠানে Section 6 এর উচ্ছেদ নোটিশ লাগানো হলে প্রথমে যাচাই করুন মালিককে Section 3B এর অধীনে কোনো বৈধ নোটিশ এবং শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।
২. যদি মালিকের সাথে রাজউকের কোনো মামলা চলমান থাকে, তবে ভাড়াটিয়া হিসেবে আপনিও সেই মামলায় পক্ষভুক্ত (Added Party) হওয়ার আবেদন করতে পারেন।
৩. যদি উচ্ছেদের জন্য দেওয়া সময়সীমা অত্যন্ত কম হয় (যেমন- ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টা), তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে 'স্ট্যাটাস কো' (Status Quo) বা স্থগিতাদেশ (Stay) প্রার্থনা করুন।
৪. মনে রাখবেন, ভাড়াটিয়া বা ভোগদখলকার হিসেবে আপনারও সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে এবং উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিলে আদালত কখনই আপনাকে অমানবিক পরিস্থিতিতে রাস্তায় ছুড়ে ফেলার অনুমতি দেবেন না।

মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com