রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রিট: নির্মাণাধীন ইমারত অপসারণের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ (পর্ব- ০৭)
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ইমারত নির্মাণের তদারকি করতে গিয়ে অনেক সময় নির্মাণাধীন ভবন বা সংস্কারকাজে বাধা প্রদান করে বা ভেঙে ফেলার নোটিশ দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নোটিশে The Building Construction Act, 1952-এর Section 5 (নির্মাণাধীন ইমারত অপসারণের ক্ষমতা) উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশ পেয়ে ভবন মালিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিন্তু এই ৫ ধারার ক্ষমতাটি রাজউকের হাতে কোনো 'জাদুদণ্ড' নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং বর্তমানে প্রায় অকার্যকর (Obsolete) একটি আইনি বিধান। ধারাটি আপাতদৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষের অত্যন্ত শক্তিশালী ক্ষমতা মনে হলেও, আইনের সুনির্দিষ্ট শব্দচয়ন এবং উপধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে (২০২৬ সালে) এই ধারার প্রয়োগ কার্যত অসম্ভব এবং ভিত্তিহীন। রাজউকের কোনো কর্মকর্তা যদি এই ধারার অধীনে কোনো নোটিশ প্রদান করেন, তবে তা সরাসরি বেআইনি (Ultra Vires) হবে এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করে খুব সহজেই এর প্রতিকার পেতে পারেন।
ঢাকা মহানগর ইমারত বধিমিালা, ২০২৫ এর ২১(১) বিধি মতে যেসব কারণে নির্মাণ কাজ স্থগিত করণ অথবা অননুমোদিত কাঠামো ভাঙ্গে দেওয়ার, ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের, সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করণের অথবা বিল্ডিং কাঠামো ভেঙ্গে দেওয়ার আদেশ প্রদান করা যেতে পারে, সেগুলো হলো-
(ক) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় করা হলে;
(খ) কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে ইমারত নির্মাণ কাজ করা হলে;
(গ) যেকোনো পর্যায়ে অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত নির্মাণ কাজ গোচরীভূত হলে;
(ঘ) কর্তৃপক্ষকে বিধি মোতাবেক অবহিতকরণ ব্যতিরেকে নির্মাণ কাজ আরম্ভ বা পরিচালনা করা হলে;
(ঙ) পরিকল্পনা অনুমোদনপত্র ও নির্মাণ অনুমোদনপত্রের নিয়ম ও শর্তসমূহ লঙ্ঘন করা হলে;
(চ) নির্মাণ কাজ চলাকালে পার্শ্ববর্তী জনগণের জীবন ও ধন-সম্পত্তির ক্ষতিসহ পরিবেশের জন্য হুমকি ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়।
২১ (৪) বিধিতে বলা হয়েছে, যে সকল ইমারতের অনুমোদিত নকশা বাতিল বা স্থগিত করা হয় সেই সকল ইমারতের কোনোরূপ সেবা প্রদান না করার জন্য অথবা ইতোমধ্যে প্রদত্ত সেবা প্রত্যাহার করার জন্য রাজউক কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করবে।
নিচে Section 5 এর উপধারা (১) ও (২), বাস্তব উদাহরণ এবং বিচারিক নজিরের আলোকে রিট দায়েরের প্রধান গ্রাউন্ডগুলো আলোচনা করা হলো:
১. টাইমলাইন গ্রাউন্ড: আইন কার্যকরের তারিখে নির্মাণাধীন হওয়া (Section 5(1)):
আইনি বিধান: Section 5(1) এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সীমাবদ্ধকারী বাক্যাংশটি হলো— "...the construction or excavation or cutting whereof is in progress on the date of the commencement of this Act..."। অর্থাৎ, এই ধারার অধীনে অথরাইজড অফিসার কেবল সেই নির্মাণাধীন ভবনের কাজ বন্ধ বা অপসারণের নির্দেশ দিতে পারবেন, যার নির্মাণকাজ "এই আইন কার্যকর হওয়ার তারিখে" (১৯৫৩ সালের ২১ মার্চ) চলমান ছিল।
আইনি যুক্তি: এই ধারাটি মূলত ১৯৫২ সালে আইনটি যখন কার্যকর হয়েছিল, তখনকার চলমান কাজগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি। বর্তমানে ২০২৬ সালে রাজউক যদি আধুনিক কোনো ভবনের ক্ষেত্রে Section 5 প্রয়োগ করে অপসারণের নির্দেশ দেয়, তবে তা একটি বড় আইনি ভুল হতে পারে। আধুনিক অবৈধ নির্মাণ বা নকশা বিচ্যুতির ক্ষেত্রে রাজউক সাধারণত Section 3B প্রয়োগ করে। ভুল ধারার প্রয়োগ বা 'Misapplication of Law' একটি শক্তিশালী রিট গ্রাউন্ড।
রিটের গ্রাউন্ড: এটি রিট করার সবচেয়ে অকাট্য (Absolute) গ্রাউন্ড। ১৯৫২ সালের এই আইনটি যখন পাস হয়, তখন চলমান কোনো বেআইনি নির্মাণ ঠেকানোর জন্য এই ধারাটি যুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমান সময়ে, অর্থাৎ ২০২৬ সালে কোনো ব্যক্তি যদি বাড়ি নির্মাণ করেন এবং রাজউক তাকে Section 5 এর অধীনে নির্মাণকাজ বন্ধ বা অপসারণের নোটিশ দেয়, তবে তা সরাসরি এখতিয়ার বহির্ভূত (Lack of Jurisdiction) এবং বাতিলযোগ্য (Void ab initio)।
বাস্তব উদাহরণ: আপনি বাড্ডায় আপনার নিজস্ব জমিতে ২০২৬ সালে একটি ভবনের কাজ শুরু করেছেন। রাজউক হঠাৎ Section 5 এর অধীনে নোটিশ দিয়ে বললো নির্মাণকাজ বন্ধ করে ভবনটি সরিয়ে নিতে। আপনি হাইকোর্টে রিট করে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন যে, যেহেতু আপনার ভবনের কাজ ১৯৫৩ সালে চলমান ছিল না, তাই এই ধারায় নোটিশ দেওয়ার কোনো আইনি ক্ষমতাই অথরাইজড অফিসারের নেই। বর্তমান সময়ের নির্মাণাধীন ভবনের জন্য Section 3B প্রযোজ্য, Section 5 নয়।
২. "স্বাভাবিক মেরামত" এর ক্ষেত্রে অব্যাহতি (Section 5(2)):
আইনি বিধান: Section 5(2) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছে— "The provision of sub-section (1) shall not apply to normal repairs to existing buildings." (উপধারা ১ এর বিধান বিদ্যমান ইমারতের স্বাভাবিক মেরামতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না)।
রিটের গ্রাউন্ড: আপনি যদি আপনার পুরনো ভবনে কেবল রং করা, পলেস্তারা (Plaster) খসে পড়া ঠিক করা, বা ছাদের ড্যাম্প প্রুফিংয়ের মতো 'স্বাভাবিক মেরামত' (Normal Repair) করেন এবং রাজউক এসে Section 5 বা অন্য কোনো ধারার দোহাই দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়, তবে তা সম্পূর্ণ বেআইনি।
বাস্তব উদাহরণ: পুরান ঢাকায় একটি ৩০ বছরের পুরনো ভবনের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছিল। মালিক তা মেরামতের কাজ শুরু করলে রাজউকের পরিদর্শক এসে কাজ বন্ধের নোটিশ দেন। এক্ষেত্রে হাইকোর্টে রিট করে Section 5(2) এর রক্ষাকবচ ব্যবহার করে স্থগিতাদেশ পাওয়া সম্ভব, কারণ আইনে স্বাভাবিক মেরামতের জন্য রাজউকের কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।
৩. ক্ষতিপূরণ প্রদানের পূর্বশর্ত:
আইনি বিধান: Section 5(1) অনুযায়ী, মালিককে ইমারত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে— "...on payment to him of such compensation, not exceeding the sum of two hundred and fifty rupees..." (যা আড়াইশো টাকার বেশি হবে না)।
রিটের গ্রাউন্ড: প্রথমত, ক্ষতিপূরণ প্রদান ছাড়া এই ধারায় উচ্ছেদ করা বেআইনি (Condition Precedent)। দ্বিতীয়ত, ১৯৫২ সালের প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা (তৎকালীন রুপি) হয়তো যৌক্তিক ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ে একটি নির্মাণাধীন ভবন ভাঙার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২৫০ টাকা নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদের (সম্পত্তির অধিকার ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ) সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বিচারিক নজির: সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, আইন যদি কোনো ক্ষতিপূরণের কথা বলে, তবে তা অবশ্যই বর্তমান বাজারমূল্য ও বাস্তবতার নিরিখে 'ন্যায্য ও যৌক্তিক' (Fair and Reasonable) হতে হবে। ক্ষতিপূরণ না দিয়ে বা নামমাত্র ২৫০ টাকা দিয়ে কারও সম্পত্তি ধ্বংস করা মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন, যা রিট এখতিয়ারে চ্যালেঞ্জযোগ্য।
৪. নির্ধারিত পদ্ধতিতে নোটিশ জারি না করা:
আইনি বিধান: Section 5(1) এ বলা আছে নোটিশ "served in the prescribed manner" (নির্ধারিত পদ্ধতিতে জারি) হতে হবে এবং অপসারণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দিতে হবে।
রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি যথাযথভাবে নোটিশ প্রদান না করে (যেমন- মালিককে ব্যক্তিগতভাবে না দিয়ে বা রেজিস্টার্ড ডাকযোগে না পাঠিয়ে) এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে হঠাৎ নির্মাণাধীন সাইটে পুলিশ নিয়ে হাজির হয়, তবে তা প্রশাসনিক আইনের 'অডি অল্টারাম পার্টেম' (অপর পক্ষকে শোনো) নীতির ঘোরতর লঙ্ঘন।
উপসংহার ও আইনি পরামর্শ:
The Building Construction Act, 1952 এর Section 5 মূলত একটি 'Transitionary' বা ক্রান্তিকালীন ধারা ছিল, যা আইনটি পাসের সময় চলমান নির্মাণকাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো ভবনের ক্ষেত্রে রাজউকের এই ধারাটি প্রয়োগ করার কোনো আইনি বৈধতা নেই।
করণীয়:
১. রাজউক থেকে কোনো কাজ বন্ধ বা অপসারণের নোটিশ পেলে প্রথমেই খেয়াল করুন নোটিশটি কোন ধারায় (Section 3B, 4 নাকি 5) ইস্যু করা হয়েছে।
২. নোটিশটি যদি Section 5 এর অধীনে হয়, তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কারণ এই ধারা প্রয়োগ করে বর্তমানে কোনো ভবন উচ্ছেদ করা আইনিভাবে প্রায় অসম্ভব।
৩. যদি দেখেন আপনি কেবল 'স্বাভাবিক মেরামত' (Normal Repair) করছেন, তাহলেও রাজউকের কাজ বন্ধের নির্দেশ বেআইনি।
৪. এমন এখতিয়ার বহির্ভূত নোটিশ পেলে বিলম্ব না করে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করুন। আদালত অতি সহজেই রাজউকের এই ধরনের এখতিয়ার বহির্ভূত (Without Jurisdiction) আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ (Stay) এবং রুল (Rule Nisi) জারি করবেন।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com