রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৬): অস্থায়ী ইমারত অপসারণের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) শহরের বিভিন্ন স্থানে মাস্টার প্ল্যান বা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য নাগরিকদের সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা অস্থায়ী স্থাপনা, আধাপাকা ইমারত, অস্থায়ী বিল্ডিং বা টিনশেড ঘর অপসারণের জন্য মাঝে মাঝেই নোটিশ প্রদান করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে The Building Construction Act, 1952 এর Section 4 (Power of removal of temporary building) এর অধীনে এই অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে, সাধারণ নাগরিকরা প্রায়শই জানেন না যে আইনের এই ৪ নম্বর ধারাটি রাজউককে ঢালাওভাবে যেকোনো টিনশেড বা অস্থায়ী ঘর ভাঙার ক্ষমতা দেয় না। এই ধারার ভেতরেই এমন কিছু কঠোর আইনি শর্ত (Condition Precedent) জুড়ে দেওয়া আছে, যা পূরণ না করে রাজউক কোনো নোটিশ দিলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি (Ultra Vires) হিসেবে গণ্য হবে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
নিচে Section 4 এর আইনি বিধান, বাস্তব উদাহরণ এবং বিচারিক নজিরের আলোকে রিট দায়েরের প্রধান গ্রাউন্ডগুলো আলোচনা করা হলো:
১. নোটিশ যথাযথ পদ্ধতিতে জারি না করা এবং পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া:
আইনি বিধান: আইনে বলা আছে নোটিশ "served in the prescribed manner" (নির্ধারিত পদ্ধতিতে জারি) হতে হবে এবং অপসারণের জন্য নোটিশে একটি "period" (সময়কাল) উল্লেখ থাকতে হবে।
ধারা ৪-এর বিধান অনুযায়ী নোটিশটি অবশ্যই "served in the prescribed manner" হতে হবে । 'ঢাকা মহানগরী ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০২৫'-এর ৭৪(১) বিধিতে নোটিশ জারির নির্দিষ্ট পদ্ধতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করা আছে। রিটকারী গ্রাউন্ড হিসেবে দেখাতে পারেন যে, রাজউকের জারি করা নোটিশটি বিধিমালার দ্বারা নির্ধারিত ফরমেট বা ছক অনুযায়ী ছিল না। অথবা, নোটিশটি যথাযথভাবে মালিক বা দখলদারের বরাবর সরাসরি জারি (Personal Service) করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজউক নোটিশে অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত ও যুক্তিসঙ্গত সময় (Reasonable time) প্রদান করে না, যা বিধিমালা ও আইনি চর্চার পরিপন্থী। আইনানুগ পদ্ধতি ও পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তড়িঘড়ি করে জারি করা নোটিশ 'পদ্ধতিগত ত্রুটি' বা 'Procedural Impropriety'-এর কারণে উচ্চ আদালতে বাতিলযোগ্য।
রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি মালিককে ব্যক্তিগতভাবে নোটিশ না দিয়ে বা ডাকযোগে না পাঠিয়ে শুধু মাইকিং করে উচ্ছেদ করতে আসে, অথবা নোটিশে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় (যেমন মাত্র কয়েক ঘণ্টা/এক-দুই দিন) দেয়, তবে তা Principal of Natural Justice এর লঙ্ঘন।
বিচারিক নজির: মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, সরকার বা কর্তৃপক্ষ কারও সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে চাইলে অবশ্যই তাকে পূর্ব নোটিশ ও পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। হঠকারী উচ্ছেদ সর্বদা বেআইনি।
২. ক্ষতিপূরণ প্রদান না করা (Condition Precedent লঙ্ঘন):
আইনি বিধান: Section 4 এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- "...and the owner thereof shall, on payment to him of such compensation as the Authorised Officer thinks fair and reasonable, remove it..." অর্থাৎ, মালিক তখনই ইমারতটি সরাবেন যখন তাকে "ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ক্ষতিপূরণ" প্রদান করা হবে। ক্ষতিপূরণ প্রদান এখানে একটি পূর্বশর্ত বা Condition Precedent।
রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি কোনো অস্থায়ী ইমারত সরাতে বলে কিন্তু নোটিশে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো উল্লেখ না থাকে বা ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করেই বুলডোজার নিয়ে উচ্ছেদ করতে আসে, তবে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ছাড়া কারও সম্পত্তি (এমনকি অস্থায়ী হলেও) অধিগ্রহণ বা অপসারণ করা যায় না। ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করে উচ্ছেদ অভিযান চালালে হাইকোর্ট তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ (Stay Order) প্রদান করবেন।
৩. ক্ষতিপূরণের পরিমাণ "ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত" না হওয়া:
আইনি বিধান: আইনে বলা আছে ক্ষতিপূরণ হতে হবে "fair and reasonable" (ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত)।
রিটের গ্রাউন্ড: অথরাইজড অফিসার যদি ইচ্ছামাফিক অত্যন্ত সামান্য বা হাস্যকর কোনো অঙ্কের টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে নির্ধারণ করেন, তবে তা রিট এখতিয়ারে চ্যালেঞ্জযোগ্য। প্রশাসনিক যেকোনো সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক (Reasonable) হতে হয়। ক্ষতিপূরণ যদি বাস্তবসম্মত না হয়, তবে আদালত তা বাতিল করে পুনরায় সঠিক মূল্যায়নের (Assessment) নির্দেশ দিতে পারেন।
৪. স্থায়ী ইমারতকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে "অস্থায়ী" আখ্যা দেওয়া:
আইনি বিধান: Section 4 শুধুমাত্র "Temporary Building" বা অস্থায়ী ইমারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
রিটের গ্রাউন্ড: আপনার ইমারতটি যদি ইটের গাঁথুনি, আরসিসি পিলার বা স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো থাকে, কিন্তু রাজউক উচ্ছেদ ত্বরান্বিত করার জন্য সেটিকে "অস্থায়ী ইমারত" হিসেবে দেখিয়ে Section 4 এর অধীনে নোটিশ দেয়, তবে আপনি রিট করতে পারবেন। আদালত তখন স্থপতির রিপোর্ট বা বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে রাজউকের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেবেন, কারণ স্থায়ী ভবনের জন্য Section 3B বা অন্যান্য ধারা প্রযোজ্য, Section 4 নয়।
৫. অস্থায়ী বনাম স্থায়ী ইমারতের ভুল শ্রেণিবিন্যাস:
যেহেতু ধারা ৪ কেবলমাত্র অস্থায়ী ইমারতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সেহেতু কাঠামোর প্রকৃতি নির্ধারণ করা একটি মুখ্য আইনি প্রশ্ন। ধারা ২(জি) অনুযায়ী অথরাইজড অফিসারকে সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে যে এটি অস্থায়ী প্রকৃতির ।অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজউক ইটের গাঁথুনি, আরসিসি পিলার বা স্থায়ী ফাউন্ডেশনযুক্ত সেমি-পাকা বা এমনকি পাকা স্থাপনাকেও তড়িঘড়ি উচ্ছেদ করার অসৎ উদ্দেশ্যে "অস্থায়ী" আখ্যা দিয়ে নোটিশ জারি করে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নজিরে এটি স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, কোনো ইমারত স্থায়ী না অস্থায়ী তা নির্ভর করে এর নির্মাণশৈলী, উপাদানের স্থায়িত্ব এবং ভূমির সাথে এর সংযুক্তির ওপর । রিটকারী কাঠামোগত প্রকৌশলীর রিপোর্ট, ছবি বা অন্যান্য দলিলের মাধ্যমে আদালতে প্রমাণ করতে পারেন যে, তার স্থাপনাটি মোটেও অস্থায়ী নয়, বরং এটি একটি স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী স্থাপনা। এছাড়া যদি রাজউক উক্ত স্থাপনার জন্য পূর্বে কোনো অনুমোদন ফি গ্রহণ করে থাকে বা সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করে থাকে, তবে তা কাঠামোর স্থায়ীত্বের স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। যেহেতু ভবনটি সংজ্ঞাগতভাবে অস্থায়ী নয়, তাই তার ওপর ধারা ৪-এর প্রয়োগ সম্পূর্ণ অবান্তর এবং বেআইনি।
৬. অস্থায়ী ইমারতের ঘোষণাপত্র (Declaration of Temporary Building):
ধারা ৪ এর প্রয়োগক্ষেত্র কেবল এবং শুধুমাত্র "অস্থায়ী ইমারত"-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ । পূর্বে উল্লেখিত ধারা ২(জি) অনুযায়ী, কোনো ইমারত নিজে থেকে অস্থায়ী হিসেবে পরিগণিত হয় না, বরং এটিকে অথরাইজড অফিসার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে অস্থায়ী প্রকৃতির বলে ঘোষণা করতে হয় । আইনি ব্যাখ্যায় এর অর্থ হলো, রাজউক চাইলেই ইট-সিমেন্টের তৈরি কোনো স্থায়ী বা আধা-পাকা ভবনকে রাতারাতি অস্থায়ী আখ্যা দিয়ে ধারা ৪ প্রয়োগ করতে পারে না। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নজিরে দেখা যায় যে, কোনো ইমারত স্থায়ী না অস্থায়ী, তা নির্ভর করে এর নির্মাণশৈলী, ভিত্তির প্রকৃতি এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর । উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ভবনের বারান্দায় অ্যাসবেস্টস শিট দিয়ে গ্রিল লাগানো হয়, তবে আদালত বিবেচনা করে যে এটি কাঠামোর মৌলিক রূপ পরিবর্তন করে কি না। রাজউক যদি এমন কোনো স্থায়ী কাঠামোকে ধারা ৪ এর অধীনে 'অস্থায়ী' আখ্যা দিয়ে অপসারণের নোটিশ দেয়, তবে তা আইনের অপপ্রয়োগ এবং আইনি বিভ্রান্তি (Misdirection in Law) হিসেবে বিবেচিত হবে।
৭. স্থাপনাটি ১৯৫২ সালের পূর্বে নির্মিত না হওয়া (টাইমলাইন গ্রাউন্ড):
আইনি বিধান: Section 4 অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছে যে, অথরাইজড অফিসার কেবল সেই অস্থায়ী ইমারতের মালিককেই অপসারণের নির্দেশ দিতে পারবেন যা "erected prior to the date of the coming into force of this Act" (এই আইন কার্যকর হওয়ার আগে নির্মিত)। The Building Construction Act কার্যকর হয় ১৯৫২ সালে।
৮. সময়গত এখতিয়ারের লঙ্ঘন এবং Substantive Ultra Vires:
রিট পিটিশনের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অকাট্য আইনি গ্রাউন্ড হলো ধারা ৪-এর এখতিয়ারগত বা সময়গত সীমাবদ্ধতার লঙ্ঘন। পূর্বেই বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে যে, ধারা ৪ সুনির্দিষ্টভাবে কেবল সেই সব অস্থায়ী ইমারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যা "erected prior to the date of the coming into force of this Act" অর্থাৎ ১৯৫৩ সালের ২১ মার্চের পূর্বে নির্মিত হয়েছিল । রিটকারী আদালতে এই অকাট্য যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন যে, রাজউক যে অস্থায়ী ইমারতটি অপসারণের নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করেছে, তা সাম্প্রতিক সময়ে (যেমন- ১৯৯০, ২০১০ বা ২০২২ সালে) নির্মিত হয়েছে। যেহেতু ভবনটি ১৯৫৩ সালের পূর্বে নির্মিত নয়, তাই রাজউক বা তার অথরাইজড অফিসার কোনোভাবেই ধারা ৪ প্রয়োগ করে কোনো নোটিশ জারি করতে পারেন না। এমন নোটিশ জারি করা প্রশাসনিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ এখতিয়ার বহির্ভূত (Ultra vires the Act) এবং 'আইনগত কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে' (Without lawful authority) করা হয়েছে বলে পরিগণিত হবে । আদালত সহজেই এই ধরনের নোটিশকে শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio) বলে ঘোষণা করতে পারেন।
রিটের গ্রাউন্ড: এটি রিট করার সবচেয়ে মোক্ষম গ্রাউন্ড। রাজউক যদি ১৯৮০, ২০০০ বা হালের কোনো অস্থায়ী ইমারত ভাঙার জন্য Section 4 এর অধীনে নোটিশ দেয়, তবে তা সরাসরি এখতিয়ার বহির্ভূত (Lack of Jurisdiction) হবে।
বাস্তব উদাহরণ: মিরপুরে আপনার নিজস্ব জায়গায় আপনি ১৯৯০ সালে একটি টিনশেড (অস্থায়ী) গোডাউন বানিয়েছেন। রাজউক হঠাৎ Section 4 এর দোহাই দিয়ে সেটি ভাঙার নোটিশ দিলো। আপনি হাইকোর্টে রিট করে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন যে, যেহেতু স্থাপনাটি ১৯৫২ সালের পরে নির্মিত, তাই এই ধারায় নোটিশ দেওয়ার কোনো আইনি এখতিয়ারই রাজউকের নেই।
উপসংহার ও আইনি পরামর্শ:
রাজউকের Section 4 এর অধীনে নোটিশ দেখলেই মনে করার কারণ নেই যে আপনার সব শেষ। এই ধারাটির প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে ১৯৫২ সালের শর্ত এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের পূর্বশর্ত রাজউকের জন্য এই ধারাটির যথেচ্ছ প্রয়োগ কঠিন করে তুলেছে।
করণীয়:
১. নোটিশ পাওয়ামাত্রই দেখতে হবে আপনার স্থাপনাটি কবে নির্মিত এবং তা অস্থায়ী কি না।
২. নোটিশে ক্ষতিপূরণ (Compensation) এর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না তা যাচাই করুন।
৩. যদি দেখেন স্থাপনাটি ১৯৫২ সালের পরের, অথবা রাজউক কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই উচ্ছেদ করতে আসছে, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করুন।
৪. রিট আবেদনে রাজউক যে এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে (Without Jurisdiction) এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে উচ্ছেদের চেষ্টা করছে, তা তুলে ধরে স্থগিতাদেশ (Stay) প্রার্থনা করুন। আইন ও সংবিধান নাগরিকদের সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় সদা জাগ্রত।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৭১১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com