রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৪): ভূমি ও ইমারতের ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ 

রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় আবাসিক প্লট বা ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম (যেমন- রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, স্কুল বা অফিস) পরিচালনার দায়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রায়শই উচ্ছেদ অভিযান বা ইমারত সিলগালার নোটিশ প্রদান করে। অনেক ক্ষেত্রেই ভবন মালিক বা ভাড়াটিয়ারা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের সুযোগ না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। রাজউকের যেকোনো খেয়ালখুশিমতো বা বেআইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যখন কোনো ভূমি বা ইমারতের ব্যবহারকে ‘বেঠিক’ বা ‘অবৈধ’ (Improper Use) হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ প্রদান বা ব্যবহার বন্ধ বা অপসারণ বা উচ্ছেদ অভিযান চালায়, তখন অনেক ক্ষেত্রে তা সংক্ষুব্ধ নাগরিকের আইনি ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে। রাজধানী ঢাকায় আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা বা নকশায় উল্লেখিত উদ্দেশ্যের বাইরে ভবন ব্যবহার করার কারণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রায়শই অভিযান পরিচালনা করে বা নোটিশ প্রদান করে বন্ধ বা অপসারণ করার নির্দেশ দেয়। রাজউকের এই ক্ষমতাটি মূলত The Building Construction Act, 1952-এর Section 3A (ভূমি এবং ইমারতের অযথাযথ ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ) থেকে উৎসারিত। তবে, রাজউকের এই ক্ষমতা নিরঙ্কুশ বা সীমাহীন নয়। রাজউক যদি এই আইনি পদ্ধতি লঙ্ঘন করে, তবে ভুক্তভোগী নাগরিকরা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে কার্যকর আইনি প্রতিকার পেতে পারেন।

নিম্নে The Building Construction Act, 1952, ড্যাপ (২০২২-২০৩৫), বিধিমালা ২০২৫ এবং বাস্তব উদারহণসহ বিচারিক নজিরের আলোকে রাজউকের পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করার আইনি গ্রাউন্ড ও রূপরেখা তুলে ধরা হলো:

আইনি কাঠামো: Section 3A এর অন্তর্নিহিত রক্ষাকবচ:
The Building Construction Act, 1952 এর Section 3A রাজউককে ক্ষমতা দিলেও, এর উপ-ধারা (২)-এর 'শর্তাংশে' (Provisos) নাগরিকদের জন্য দুটি বিশাল রক্ষাকবচ রাখা হয়েছে, যা অনেকেই জানেন না:

বাধ্যতামূলক সময়সীমা (Statutory Timeframe): 
যদি কোনো ভবনের বর্তমান ব্যবহার মাস্টার প্ল্যানের (DAP) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হলেও রাজউক তাৎক্ষণিক তা বন্ধ করতে পারে না। ব্যবহার বন্ধের আদেশ কার্যকর করার আগে মালিক বা দখলদারকে অবশ্যই ৬ মাসের সময় দিতে হবে এবং ভবন ভাঙার আদেশের ক্ষেত্রে ১২ মাসের সময় দিতে হবে।

৬ ও ১২ মাস সময়সীমার বাধ্যবাধকতা: 
যদি কোনো জমি বা ইমারতের ব্যবহার মাস্টার প্ল্যানে নির্দেশিত ব্যবহার বা উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে রাজউক কর্মকর্তা লিখিত আদেশ দ্বারা জমি বা ইমারতের মালিক, দখলদার বা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে উক্ত ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারেন এবং ইমারতের ক্ষেত্রে, উক্ত ইমারত অপসারণ বা ভেঙে ফেলার নির্দেশও দিতে পারেন। তবে, রাজউক কর্মকর্তাকে এই ৬ ও ১২ মাসের সময়সীমার শর্ত পালন করতে হবে, অর্থাৎ জমি বা ইমারতের মালিক, দখলদার বা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে উক্ত ব্যবহার বন্ধ করার আদেশ কার্যকর করার পূর্বে ছয় মাস (৬ মাস) সময় প্রদান করতে হবে এবং ইমারত অপসারণ বা ভেঙে ফেলার আদেশ কার্যকর করার পূর্বে বারো মাস (১২ মাস) সময় প্রদান করতে হবে।

বাস্তব উদাহরণ (তাৎক্ষণিক উচ্ছেদের নোটিশ):
জনাব 'তারেক' তার অনুমোদিত আবাসিক ভবনের নিচতলায় একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর দিয়েছেন। রাজউক তাকে নোটিশ দিল: "আপনার আবাসিক ভবনে অবৈধ বাণিজ্যিক ব্যবহার হচ্ছে, আগামী ৭ দিনের মধ্যে তা বন্ধ করুন, অন্যথায় উচ্ছেদ করা হবে।"

আইনি প্রতিকার: জনাব তারেক হাইকোর্টে রিট দায়ের করে উচ্ছেদ স্থগিত করতে পারবেন। তার প্রধান যুক্তি হবে—রাজউকের নোটিশটি The Building Construction Act, 1952 এর Section 3A(2) এর প্রথম শর্তাংশের সরাসরি লঙ্ঘন, কারণ আইন তাকে এই ব্যবহার গুটিয়ে নেওয়ার জন্য ন্যূনতম ৬ মাস সময় পাওয়ার অধিকার দিয়েছে।

আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় প্রকার ব্যবহারের সুরক্ষা (Protection of Combined Use): 
The Building Construction Act, 1952 এর Section 3A এর দ্বিতীয় শর্তাংশে বলা হয়েছে, আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় প্রকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তা ঢালাওভাবে বন্ধ করা যাবে না। এটি তখনই বন্ধ করা যাবে যদি রাজউক সুনির্দিষ্টভাবে দেখাতে পারবে যে ওই বাণিজ্যিক কার্যক্রমটি Master Plan বা ওই এলাকার মূল বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী এবং প্রতিবেশীদের জন্য 'উপদ্রব' (Nuisance) সৃষ্টি করছে। যদি উক্ত মিশ্র ব্যবহার প্রতিবেশীদের জন্য উপদ্রব না হয় এবং মাস্টার প্ল্যানের ভূমি ব্যবহারের লক্ষ্যের সাথে অসামঞ্জস্য না হয়, তাহলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় প্রকার ব্যবহার করতে কোন অসুবিধা নাই।

বাস্তব উদাহরণ: গুলশান বা বনানী এলাকায় একটি ভবন ১৯৮০ সালে ‘আবাসিক’ হিসেবে অনুমোদন পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী ওই রাস্তাটি ‘বাণিজ্যিক সড়ক’ হিসেবে চিহ্নিত। মালিক ভবনটি বাণিজ্যিক কাজে ভাড়া দিয়েছেন। রাজউক এসে যদি বলে এটি ‘বেঠিক ব্যবহার’ এবং উচ্ছেদ করতে চায়, তবে মালিক চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। কারণ ড্যাপ-এর নতুন গেজেট অনুযায়ী ওই এলাকার ভূমি ব্যবহারের চরিত্র পরিবর্তিত হয়েছে এবং মালিক কনভার্সন ফি দিয়ে তা নিয়মিত করার অধিকার রাখেন।

বিধিবদ্ধ সময়সীমা লঙ্ঘন (Violation of Statutory Notice Period):
এটি সবচেয়ে মোক্ষম গ্রাউন্ড। রাজউক প্রায়ই আবাসিক ভবনে পরিচালিত রেস্তোরাঁ বা দোকানকে Section 3A এর অধীনে ৭ দিন বা ১৫ দিনের নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ করতে যায়। রিটে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা যায় যে, আইনের Section 3A(2) অনুযায়ী ৬ মাসের নোটিশ না দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এখতিয়ারবহির্ভূত (Without Lawful Authority)।

নতুন ড্যাপে 'মিশ্র ব্যবহার এলাকা' স্বীকৃতি:
নতুন ড্যাপে ঢাকার অনেক আবাসিক রাস্তাকে বা নির্দিষ্ট প্লটকে 'মিশ্র ব্যবহার এলাকা' (Mixed Use Zone) বা 'বাণিজ্যিক এলাকা' হিসেবে নতুন করে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রাজউক যদি পুরানো মাস্টারপ্ল্যানের দোহাই দিয়ে বা ড্যাপের নতুন বিন্যাস (Zoning) অগ্রাহ্য করে ব্যবহার বন্ধের নোটিশ দেয়, তবে তা সরাসরি ড্যাপের লঙ্ঘন হিসেবে চ্যালেঞ্জযোগ্য।

ড্যাপ-এর পরিবর্তনের প্রভাব (Change in Land Use Zoning):
ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী যদি আপনার এলাকাটি মিশ্র বা বাণিজ্যিক জোনের আওতাভুক্ত হয়, তবে রাজউক আপনাকে কেবল আবাসিক ব্যবহারের জন্য বাধ্য করতে পারে না। যদি তারা আপনার ‘কনভার্সন’ আবেদন গ্রহণ না করে বা ঝুলিয়ে রেখে ‘বেঠিক ব্যবহার’ বলে অভিযুক্ত করে, তবে তা Ultra Vires (ক্ষমতার বাইরে কাজ করা) হিসেবে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ এর এই নতুন বিধানগুলো আমলে না নিয়ে, পুরনো জোন ম্যাপ দেখিয়ে কোনো ভবনের মিশ্র ব্যবহারকে 'Improper Use' হিসেবে আখ্যায়িত করে, তবে তা রিট এখতিয়ারে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

বাস্তব উদাহরণ (ড্যাপের পরিবর্তনের সুফল থেকে বঞ্চনা):
বেগম 'রোকসানা'র বাড়িটি যে রাস্তার ওপর, তা ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) অনুযায়ী সম্প্রতি 'বাণিজ্যিক' হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছে। কিন্তু রাজউক তাকে নোটিশ পাঠিয়েছে যে, তার মূল নকশা যেহেতু 'আবাসিক' হিসেবে নেওয়া হয়েছিল, তাই সেখানে তিনি বুটিক শপ করতে পারবেন না।

আইনি প্রতিকার: তিনি রিট করে ম্যান্ডামাস (Mandamus) চাইতে পারেন যেন রাজউক ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি (Conversion fee) গ্রহণ করে তার আবাসিক নকশাটিকে বাণিজ্যিক বা মিশ্র ব্যবহারে রূপান্তরের (Change of Use) অনুমোদন দেয়।

বাস্তব উদাহরণ: মিরপুর বা উত্তরায় ড্যাপের নতুন ম্যাপ অনুযায়ী ১০০ ফুটের বেশি প্রশস্ত রাস্তার পাশের প্লটগুলো মিশ্র ব্যবহারের আওতাভুক্ত হতে পারে। সেখানে থাকা একটি কফি শপকে যদি রাজউক অবৈধ বলে নোটিশ দেয়, তবে ড্যাপের বিধান উল্লেখ করে রিট করা যাবে।

'উপদ্রব' প্রমাণের অভাব (Absence of Jurisdictional Fact - Nuisance):
ধরুন, আবাসিক ভবনের নিচতলায় একটি ছোট ফার্মেসি বা ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে, যা প্রতিবেশীদের কোনো ক্ষতি করছে না। রাজউক Section 3A(2)-এর দ্বিতীয় শর্তাংশ লঙ্ঘন করে যদি কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ (Objective evidence of nuisance) ছাড়াই এটিকে উপদ্রব বলে দাবি করে উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়, তবে সেই আদেশকে স্বেচ্ছাচারী (Arbitrary) হিসেবে রিট করা যায়।

The Building Construction Act, 1952 (Section 3A): এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ভূমি বা ইমারত যে উদ্দেশ্যে অনুমোদিত হয়েছে, তার বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।

Principal Natural Justice ও ধারা ৩ক এর লঙ্ঘন:
The Building Construction Act, 1952 এর Section 3A (Restriction on improper use of lands and buildings) ধারা অনুযায়ী, রাজউক যদি মনে করে কোনো ভবন তার অনুমোদিত নকশার বাইরে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে (যেমন- আবাসিকের জায়গায় বাণিজ্যিক) ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ দেবে। নোটিশে কারণ দর্শানোর (Show Cause) জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় দিতে হবে এবং প্রয়োজনে শুনানি করতে হবে।

রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে (যেমন- মাত্র ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার নোটিশ দিয়ে) সরাসরি ভবন সিলগালা বা উচ্ছেদ করতে আসে, তবে তা Section 3A এবং 'Audi Alteram Partem' (কাউকে না শুনে দণ্ডিত করা যাবে না) নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ: বনানীর একটি আবাসিক ভবনের নিচতলায় ৫ বছর ধরে একটি ফার্মেসি চলছে। রাজউক কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়েই হঠাৎ একদিন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে এসে দোকান ভেঙে দিল। এটি সরাসরি বেআইনি এবং রিটযোগ্য।

বিচারিক নজির: মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, উচ্ছেদ বা সিলগালার পূর্বে অবশ্যই যথাযথ কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে এবং লিখিত জবাব বিবেচনা করে একটি 'Speaking Order' (যুক্তিযুক্ত আদেশ) প্রদান করতে হবে।

কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদানে ব্যর্থতা এবং Violation of Natural Justice:
প্রশাসনিক আইন এবং বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'Principal of Natural Justice', যার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো 'Audi Alteram Partem' (অপর পক্ষকে শোনার অধিকার)। ইমারত নির্মাণ আইনের ধারা ৩বি(১)(বি) অনুযায়ী, কোনো ভবন অপসারণ বা ব্যবহার বন্ধের মতো চরম নির্দেশ দেওয়ার পূর্বে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে কমপক্ষে ৭ দিনের সময় দিয়ে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) প্রদান করা বাধ্যতামূলক।

বাস্তব উদাহরণ: রাজউক যথাযথ কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়েই সরাসরি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে উচ্ছেদ বা ভবন সিলগালার আদেশ জারি করে। আবার, যদি নোটিশ দেওয়াও হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় না, অথবা এমনভাবে নোটিশের ভাষা লেখা হয় যেন সিদ্ধান্ত পূর্বনির্ধারিত। এটি প্রশাসনিক আইনের মৌলিক নীতির চরম লঙ্ঘন। Jamuna Builders Ltd vs. RAJUK মামলায় হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছে যে, বাধ্যতামূলক কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান ব্যতীত উচ্ছেদ বা ভাঙার আদেশ সম্পূর্ণ বেআইনি। এই গ্রাউন্ডে রিট করে রাজউকের আদেশের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ (Stay Order) পাওয়া অত্যন্ত সহজ, কারণ আদালত কখনোই প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন বরদাশত করে না।

ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫ এর শর্তাবলি ও বৈষম্যমূলক আচরণ:
বিধিমালা অনুযায়ী ভবনের 'অকুপেন্সি সার্টিফিকেট' (ব্যবহার সনদ) বা ব্যবহারের ধরন পরিবর্তনের একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।

রিটের গ্রাউন্ড: যদি দেখা যায় একই এলাকার একই ধরনের রাস্তার পাশে অবস্থিত ১০টি ভবনের মধ্যে রাজউক কেবল একটি বা দুটি ভবনকে টার্গেট করে নোটিশ দিয়েছে এবং বাকিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, তবে এটি সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী ও বৈষম্যমূলক (Arbitrary and Discriminatory)। হাইকোর্ট এই ধরনের বৈষম্যমূলক 'পিক অ্যান্ড চুজ' (Pick and Choose) পলিসির বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ (Stay Order) দিয়ে থাকেন।

বৈধ প্রত্যাশা (Legitimate Expectation) এবং অর্জিত অধিকার (Vested Right):
আইনি ভিত্তি: The Town Improvement Act 1953 এর আওতাধীন পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সরকার আইনের অধীনে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান।

রিটের গ্রাউন্ড: অনেক সময় সিটি কর্পোরেশন নির্দিষ্ট ঠিকানায় বছরের পর বছর ট্রেড লাইসেন্স দেয়, কমার্শিয়াল হারে হোল্ডিং ট্যাক্স, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আদায় করে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা যখন একটি বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতি দিয়ে রাজস্ব আদায় করে, তখন নাগরিকের মনে একটি 'বৈধ প্রত্যাশা'র সৃষ্টি হয়। রাজউক হঠাৎ করে সেই কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করলে তা এই নীতির পরিপন্থী হয়।

বিচারিক নজির: বিভিন্ন রিট মামলায় (যেমন- ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বা উচ্ছেদ সংক্রান্ত) হাইকোর্ট এই মর্মে রায় দিয়েছেন যে, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যখন দীর্ঘমেয়াদে কোনো ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি বা সুবিধা দেয়, তখন নাগরিকের পেশা বা বৃত্তির অধিকার (সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ) এবং সম্পত্তির অধিকার (৪২ অনুচ্ছেদ) রক্ষার্থে হঠাৎ করে কোনো চরম পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা বা রূপান্তরের সময় দেওয়া বাধ্যতামূলক।

বাস্তব উদাহরণ এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ (Real-world Scenarios):
আইনি তাত্ত্বিক দিকগুলো বাস্তবে কীভাবে রিট মোকদ্দমার রূপ নেয়, তা বুঝতে রাজউকের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে তিনটি প্রাসঙ্গিক দৃশ্যপট (Scenario) বিশ্লেষণ করা হলো।

দৃশ্যপট ১: আবাসিক-বাণিজ্যিক মিশ্র এলাকায় রেস্তোরাঁ বা রিটেইল শপ উচ্ছেদঘটনার বিবরণ: 
ধানমন্ডি, বনানী বা উত্তরার মতো এলাকায়, যেখানে মূলত আবাসিক প্লট হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এবং মূল সড়কের পাশে হওয়ার কারণে এলাকাটি মিশ্র বা বাণিজ্যিক রূপ লাভ করেছে (যেমন- ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়ক বা বনানী ১১ নম্বর সড়ক) । একজন রেস্তোরাঁ মালিক সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র এবং ভ্যাট নিবন্ধন নিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। হঠাৎ একদিন রাজউক ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২-এর ধারা ৩এ উল্লেখ করে ৭ দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ করার চূড়ান্ত নোটিশ প্রদান করে।

রিটের যৌক্তিকতা ও গ্রাউন্ড:
১. রাজউক ধারা ৩এ(২)-এর শর্তাংশ (Proviso) লঙ্ঘন করেছে, কারণ এই রেস্তোরাঁটি উক্ত এলাকার জন্য কীভাবে 'উপদ্রব' (nuisance) সৃষ্টি করছে তা নোটিশে প্রমাণ করা হয়নি, এবং ঐ এলাকার বর্তমান 'মূল বৈশিষ্ট্য' যে এখন আর কেবল আবাসিক নেই, তা অস্বীকার করা হয়েছে ।

২. সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদের অধীনে পেশা ও ব্যবসার স্বাধীনতায় রাজউক অযৌক্তিকভাবে এবং বিকল্প ব্যবস্থা না রেখেই হস্তক্ষেপ করেছে ।

৩. রাজউকের নোটিশে ব্যবহার বন্ধের জন্য আইনে উল্লেখিত পর্যাপ্ত সময় (৬ মাস) প্রদান করা হয়নি, যা আইনের সুস্পষ্ট পদ্ধতিগত লঙ্ঘন ।

৪. ট্রেড লাইসেন্স এবং অন্যান্য সরকারি ছাড়পত্র থাকার ফলে আবেদনকারীর যে "বৈধ প্রত্যাশা" (Legitimate Expectation) তৈরি হয়েছিল, রাজউক তা ক্ষুণ্ন করেছে ।

দৃশ্যপট ২: নতুন ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) এর অধীনে পূর্ববর্তী অনুমোদিত নকশার বৈধতা সংকটঘটনার বিবরণ: 
একজন রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার ২০২১ সালে রাজউক থেকে একটি ১০ তলা ভবনের নকশা (Plan) অনুমোদন লাভ করেন এবং নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে নতুন ড্যাপ এবং ২০২৫ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর রাজউক নোটিশ দেয় যে, নতুন নিয়মানুযায়ী ওই সড়কের প্রশস্ততা এবং নতুন এফএআর (FAR) ইনডেক্স বিবেচনায় সেখানে কেবল ৬ তলা ভবন নির্মাণ করা যাবে এবং ১০ তলার নির্মাণ কাজ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করতে হবে।

রিটের যৌক্তিকতা ও গ্রাউন্ড:
১. এটি আইনের সম্পূর্ণ ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ (Retrospective application), যা বিচারিক নজির অনুযায়ী বেআইনি। সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, পূর্বে আইনিভাবে অর্জিত অধিকার (Vested Rights) নতুন বিধিমালা দ্বারা খর্ব করা যায় না ।

২. ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ এর ক্লজ ৩.৬.৫ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ড্যাপ প্রকাশের পূর্বের চুক্তি ও নকশা পূর্ববর্তী নিয়ম অনুযায়ী আইনি সুরক্ষা পাবে । রাজউকের নোটিশ এই রক্ষাকবচ ক্লজের সরাসরি পরিপন্থী।

৩. ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২-এর ধারা ৩বি অনুযায়ী পর্যাপ্ত সময় দিয়ে শুনানির সুযোগ (Audi Alteram Partem) প্রদান না করেই কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের চরম লঙ্ঘন ।

দৃশ্যপট ৩: ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫-এর এসটিপি বাধ্যবাধকতার ভূতাপেক্ষ প্রয়োগঘটনার বিবরণ: 
একটি ১৫ বছর পুরনো আবাসিক ভবনের মালিককে রাজউক ২০২৫ সালের বিধিমালার আওতায় নোটিশ প্রদান করে যে, আগামী এক বছরের মধ্যে ভবনে নিজস্ব সুয়্যারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (STP) স্থাপন না করলে ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বাতিল করা হবে এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে । পুরোনো ভবনে কাঠামোগতভাবে এসটিপি বসানোর কোনো জায়গা নেই।

রিটের যৌক্তিকতা ও গ্রাউন্ড:
১. এই নোটিশটি অযৌক্তিক এবং বাস্তবায়নের অযোগ্য (Unreasonable and unimplementable)।

২. পূর্ববর্তী আইনের অধীনে নির্মিত ভবনে নতুন বিধিমালার এমন শাস্তিমূলক প্রয়োগ সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদের (সম্পত্তির অধিকার) লঙ্ঘন।

৩. এটি আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগের আরেকটি ধ্রুপদী উদাহরণ, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের ওপর অসম্ভব আর্থিক ও কাঠামোগত বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, যা রিট আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য।

বিচারিক নজির (Judicial Precedents):
উচ্চ আদালত এ ধরনের রিট মামলায় প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের (Administrative Justice) পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন:

Procedural Ultra Vires (পদ্ধতিগত ত্রুটি): প্রশাসনিক আইনের একটি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো, আইন যদি কোনো কাজ করার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি বাতলে দেয়, তবে তা সেভাবেই করতে হবে, নতুবা করা যাবে না (Rule in Taylor v Taylor). উচ্চ আদালত বারবার রায় দিয়েছেন যে, Section 3A-এর অধীনে ৬ মাস বা ১২ মাসের সময়সীমা বাধ্যতামূলক (Mandatory)। এই সময় না দিয়ে রাজউকের দেওয়া যেকোনো নোটিশ আদালত বাতিল করে দেন।

Principle of Proportionality (আনুপাতিক শাস্তির নীতি): আদালত নজির স্থাপন করেছেন যে, যদি কোনো ভবনের আংশিক বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে এলাকার সাধারণ চরিত্র ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ না হয়, তবে ঢালাওভাবে উচ্ছেদ করা ক্ষমতার অপব্যবহার।

Right to Hearing (শুনানির অধিকার): 'উপদ্রব' (Nuisance) ঘোষণা করার আগে রাজউককে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক বা দখলদারকে শুনানির সুযোগ (Audi Alteram Partem) দিতে হবে। একতরফাভাবে আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক স্থাপনাকে উপদ্রব ঘোষণা করা বেআইনি।

উপসংহার ও আইনি পরামর্শ:
রাজউকের 'ইমারতের বেঠিক ব্যবহার' সংক্রান্ত যেকোনো নোটিশ পেলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। নোটিশের আইনি ভিত্তি এবং আপনার ভবনের অবস্থান ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) অনুযায়ী কোন জোনে পড়েছে তা পর্যালোচনা করা জরুরি।

নোটিশ পাওয়ার পর প্রথম কাজ হলো একজন আইনজীবীর মাধ্যমে রাজউকের নোটিশের যথোপযুক্ত লিখিত জবাব (Reply to Show Cause) দাখিল করা। রাজউক যদি সেই জবাব বিবেচনা না করে বা জবাব দেওয়ার পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই উচ্ছেদ বা সিলগালার আদেশ দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে রাজউকের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ (Stay) এবং রুল (Rule Nisi) চাওয়া উচিত। একটি আইনি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কোনো কর্তৃপক্ষই আইনের উর্ধ্বে নয়।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com