রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৩): ইমারত নির্মাণ ও জলধারা খননের ওপর বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ
কারণ দর্শানোর নোটিশ ব্যতিরেকে ইমারত নির্মাণ ও জলধারা খননের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে সংক্ষুব্ধ নাগরিক ও আবাসন নির্মাতারা হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করার মাধ্যমে রাজউকের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব । The Building Construction Act, 1952 এর Section 3 অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো ইমারত নির্মাণ বা জলধারা (পুকুর/ট্যাংক) খনন করা যায় না। কিন্তু এই বিধিনিষেধ যদি খেয়ালখুশিমতো, Natural Justice এর violation করে বা বেআইনিভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে সংক্ষুব্ধ নাগরিক বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে আইনি প্রতিকার পেতে পারেন।
নিম্নে The Building Construction Act, 1952 এর section 3- Restriction on construction of building and excavation of tank, ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫, The Town Improvement Act 1953, The Detailed Area Plan (DAP) 2022-2035 এর আলোকে রাজউকের ইমারত নির্মাণ ও জলধারা খননের উপর বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ করার সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ড ও উদাহরণ আলোচনা করা হলো:
কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান ও শুনানীর সুযোগের বাধ্যবাধকতা:
এই আইনের ধারা-৩ অনুযায়ী, পূর্বানুমোদন ব্যতীত কোনো ব্যক্তি কোনো ইমারত নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ বা কাঠামোগত পরিবর্তন করতে পারবেন না এবং কোনো পুকুর বা জলাধার খনন বা পুনঃখনন করতে পারবেন না । তবে এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা হলো, যদি কেউ ধারা ৩-এর বিধান লঙ্ঘন করে ইমারত নির্মাণ করে, তবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show-cause notice) প্রদান করবেন, যার সময়সীমা ৭ দিনের কম হতে পারবে না । এই নোটিশ প্রদান এবং শুনানির সুযোগ (Reasonable opportunity of being heard) প্রদান করা আইনত বাধ্যতামূলক। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হলে কেবল তখনই ইমারত ভেঙে ফেলার বা জলাধার ভরাট করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে । রাজউক যদি কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান ও শুনানীর সুযোগের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে তবে এই লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ: Jamuna Builders Ltd. বনাম Rajdhani Unnayan Kartripakkha মামলার ঘটনা- যমুনা বিল্ডার্স লিমিটেড তাদের একটি বৃহৎ প্রকল্পের জন্য সিভিল এভিয়েশন (CAAB) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সকল সরকারি সংস্থার প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র গ্রহণ করে রাজউকের কাছে ইমারতের নকশা অনুমোদনের আবেদন করে ও নির্ধারিত ফি জমা দেয়। কিন্তু রাজউক ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে নকশাটি অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান—কোনো সিদ্ধান্তই জানায়নি । দীর্ঘ ৮ মাসের বেশি সময় পার হওয়ার পর, যমুনা বিল্ডার্স আইনিভাবে ধরে নেয় যে রাজউকের কোনো আপত্তি নেই এবং তারা নির্মাণ কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে রাজউক আকস্মিকভাবে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ৩বি(৩) ধারার অধীনে ইমারতটিকে 'অননুমোদিত' আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা ভাঙার নোটিশ প্রদান করে ।
রিটের গ্রাউন্ড: যমুনা বিল্ডার্সের পক্ষে রিটে যুক্তি উপস্থাপন করা হয় যে, রাজউকের ৪৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত না জানানোটা চরম প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং এটি আইনি কর্তব্যের সুস্পষ্ট অবহেলা। তদুপরি, আইনের ৩বি(১)(বি) ধারা অনুযায়ী কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়েই সরাসরি ভবন ভাঙার নির্দেশ দেওয়াটা Principles of Natural Justice এর পরিপন্থী । রাজউকের বিলম্ব নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে (অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৪২) ক্ষুণ্ণ করেছে।
আদালতের রায় ও বিচারিক বিশ্লেষণ: হাইকোর্ট ডিভিশন রাজউকের উচ্ছেদ নোটিশটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি (Illegal), উদ্দেশ্যপ্রণোদিত (Mala fide) এবং এখতিয়ারবহির্ভূত (Without lawful authority) বলে ঘোষণা করেন । আদালত রায়ে উল্লেখ করেন যে, আবেদনকারী যদি সকল আইনি ও কারিগরি শর্ত পূরণ করে থাকেন, তবে নকশা অনুমোদন করা অথরাইজড অফিসারের একটি আইনি বাধ্যবাধকতা (Statutory duty)। প্রশাসনিক বিলম্ব বা আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়হীনতার অজুহাতে তিনি তা অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখতে পারেন না ।
আদালতের নির্দেশনা: হাইকোর্ট রাজউককে নির্দেশ দেন যেন- আইনের ৩বি(৫)(ডি) ধারা প্রয়োগ করে নির্ধারিত ফি-এর দশগুণ জরিমানা আদায় সাপেক্ষে নির্মাণাধীন ইমারতটিকে বৈধতা (Regularize) প্রদান করে এবং আগামী ২ মাসের মধ্যে নকশাটি অনুমোদন করে । এই রায়টি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে, প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে আদালত সরাসরি হস্তক্ষেপ করে নকশা অনুমোদনের নির্দেশ দিতে পারেন।
অধিগ্রহণ (Acquisition) না করে বিধিনিষেধ:
এই আইনের অধীনে রাজউক শহরের উন্নয়ন স্কিম, রাস্তা বা পার্কের জন্য জমি নির্ধারণ করে। কিন্তু আইন অনুযায়ী যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ (Acquisition) না করে, কেবল স্কিমের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর নির্মাণ বা খননে বাধা দেওয়া এই আইনের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। রাজউক প্রায়ই বলে, "ড্যাপ অনুযায়ী এখানে প্রস্তাবিত রাস্তা/পার্ক/লেক রয়েছে, তাই নির্মাণ বা খনন করা যাবে না।" আইন অনুযায়ী, সরকার বা রাজউক যদি কোনো জমি জনস্বার্থে ব্যবহার করতে চায়, তবে তা অধিগ্রহণ করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অধিগ্রহণ না করে অনন্তকাল ধরে নাগরিককে তার সম্পত্তিতে ইমারত নির্মাণে বাধা দেওয়া সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদের (সম্পত্তির অধিকার) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ড্যাপের ভুল ব্যাখ্যা এবং ড্যাপের নির্দেশনার বাইরে বিধিনিষেধ:
ড্যাপে হয়তো কোনো জমি 'মিশ্র ব্যবহার' বা 'আবাসিক' হিসেবে দেখানো আছে, কিন্তু রাজউকের পরিদর্শক ভিত্তিহীনভাবে দাবি করলেন যে এটি 'বন্যাপ্রবাহ এলাকা' (Flood Flow Zone) বা 'জলাশয়' এবং খনন বা নির্মাণে বিধিনিষেধ দিলেন। ড্যাপের সাথে সাংঘর্ষিক রাজউকের এমন যেকোনো প্রশাসনিক আদেশ 'Ultra Vires' (ক্ষমতাবহির্ভূত) হিসেবে রিটে চ্যালেঞ্জ করা যায়। ড্যাপে ভূমির ব্যবহার সুনির্দিষ্ট করা আছে (যেমন: সাধারণ আবাসিক, বন্যাপ্রবাহ এলাকা, জলাশয়, কৃষি)। ড্যাপের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে রাজউক নিজে থেকে নতুন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে না। মাস্টারপ্ল্যান বা ড্যাপে কোনো জমিকে রাস্তা, পার্ক বা লেক হিসেবে চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে জমির মালিকানা সরকারের হয়ে গেছে। সরকার যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিয়ে ওই জমি অধিগ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে মালিককে তার জমিতে ইমারত নির্মাণ থেকে বিরত রাখা যাবে না।
বিধিমালায় ভূমি ব্যবহার এবং নকশা অনুমোদনের সময়সীমা ও পদ্ধতি লঙ্ঘন:
এই বিধিমালায় ভূমি ব্যবহার এবং নকশা অনুমোদনের সময়সীমা ও পদ্ধতি বলা আছে। রাজউক এই পদ্ধতি লঙ্ঘন করে কোনো বিধিনিষেধ দিলে তা বেআইনি হবে।
Section 3-এর স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগ (Arbitrary Exercise of Power):
The Building Construction Act, 1952 এর Section 3 রাজউককে 'রেগুলেট' করার ক্ষমতা দিয়েছে, 'নিষেধ' করার ঢালাও ক্ষমতা দেয়নি। যদি আবেদনকারী খনন বা নির্মাণের সব শর্ত (যেমন: পাশের জমির ক্ষতি না করা, রিটেইনিং ওয়াল দেওয়া) মেনে আবেদন করেন, তবে যৌক্তিক কারণ ছাড়া (Speaking Order) অনুমতি না দেওয়া চরম স্বেচ্ছাচারিতা এবং রিটযোগ্য অপরাধ।
বৈষম্যমূলক আচরণ (Violation of Article 27 - Equality before Law):
একই দাগ বা খতিয়ানের জমিতে বা একই এলাকায় অন্য কাউকে ইমারত নির্মাণ বা জলধারা খননের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে দেওয়া হয়নি—এমন প্রমাণ থাকলে তা বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যায়।
বাস্তব উদাহরণ (প্রস্তাবিত রাস্তা এর অজুহাতে নির্মাণে বাধা):
জনাব 'শফিক' বাড্ডায় একটি ৫ তলা ভবনের নকশা জমা দিলেন। রাজউক জানাল, The Town Improvement Act 1953-এর অধীনে প্রণীত একটি স্কিম অনুযায়ী তার জমির ওপর দিয়ে ভবিষ্যতে একটি ৬০ ফুট রাস্তা যাবে, তাই নির্মাণ অনুমোদন দেওয়া যাবে না। অথচ গত ১০ বছরে জমিটি অধিগ্রহণের কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।
আইনি প্রতিকার: জনাব শফিক হাইকোর্টে রিট করে ম্যান্ডামাস (Mandamus) চাইবেন। গ্রাউন্ড হবে: "অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু না করে নিছক কাল্পনিক ভবিষ্যৎ স্কিমের কথা বলে সম্পত্তির ভোগদখলে বাধা দেওয়া অসাংবিধানিক।"
বাস্তব উদাহরণ (জলধারা বা পুকুর খননে বিধিনিষেধ):
জনাব 'আরিফ' ডেমরা এলাকায় তার নিজস্ব নিচু জমিতে মৎস্য খামারের জন্য একটি পুকুর (Tank) খনন করতে রাজউকের কাছে Section 3 অনুযায়ী অনুমতি চাইলেন। রাজউক তাকে চিঠি দিয়ে জানাল, "মাটি খনন করলে আশপাশের পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে, তাই অনুমতি দেওয়া হলো না।"
আইনি প্রতিকার: চিঠিতে কোনো সুনির্দিষ্ট কারিগরি বা পরিবেশগত ডেটা নেই। এটি একটি অস্পষ্ট (Vague) আদেশ। জনাব আরিফ রিট করে যুক্তি দেবেন যে, তিনি নিজ জমিতে রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে খনন করবেন, রাজউকের এই ঢালাও বিধিনিষেধ Section 3-এর অপপ্রয়োগ।
Speaking Order (যুক্তিনির্ভর আদেশ):
Section 3-এর অধীনে অনুমতি প্রত্যাখ্যান বা বিধিনিষেধ আরোপের আদেশটি অবশ্যই 'Speaking Order' হতে হবে। রাজউককে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে, প্রস্তাবিত নির্মাণ বা খনন ঠিক কোন আইনি বা কারিগরি কারণে ক্ষতিকর। কারণবিহীন নোটিশ হাইকোর্ট সরাসরি বাতিল (set aside) করে দেন।
উপসংহার:
রাজউকের ইমারত নির্মাণ এবং ভূমি বা জলধারা খনন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আইনের দ্বারা সীমাবদ্ধ। The Building Construction Act, 1952-এর Section 3 বা ড্যাপের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নাগরিককে হয়রানি করলে হাইকোর্টের রিট এখতিয়ার অত্যন্ত কার্যকর। রাজউকের যেকোনো বিধিনিষেধকে আইনি বৈধতার কষ্টিপাথরে যাচাই করে হাইকোর্ট সহজেই বেআইনি আদেশ বাতিল করতে পারেন।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৭১১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com