রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০২): ইমারতের নকশা অনুমোদন (Building Plan Sanction) বা নির্মাণ অনুমোদন (Construction Permit) প্রদানে অস্বীকৃতিকে চ্যালেঞ্জ 

ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধানত দুই ধাপে অনুমোদন নিতে হয়: প্রথমত, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র (Planning Permit) এবং দ্বিতীয়ত, নির্মাণ অনুমোদন (Construction Permit)। রাজউকের এখতিয়ারাধীন প্রায় ১,৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ইমারত নির্মাণের জন্য ‘ইমারতের নকশা’(Building Plan) বা ‘নির্মাণ অনুমোদন’(Construction Permit) নেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক । তবে, এই আইনি বাধ্যবাধকতা পালনের ক্ষেত্রে নাগরিক এবং আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই ব্যাপক কাঠামোগত জটিলতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্মুখীন হন। ফলশ্রুতিতে, আইনি সব শর্ত পূরণ করার পরও অনেক সময় "ইমারতের নকশা অনুমোদন (Building Plan Sanction)" বা "নির্মাণ অনুমোদন (Construction Permit)" লাভে ব্যর্থ হতে হয়। অনেক সময় সব শর্ত পূরণ করার পরও রাজউক নকশা অনুমোদন ঝুলিয়ে রাখে বা অযৌক্তিক কারণে তা বাতিল করে দেয়। আপনার নকশাটি The Building Construction Act 1952 এবং ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫-এর শর্তপূরণ করে, তবে অনুমোদন পাওয়া আপনার আইনি অধিকার। যখন রাজউক বা এর নিযুক্ত অথরাইজড অফিসার (Authorised Officer) কোনো বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া, দুর্নীতির আশ্রয় নিতে, আইনের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে, অথবা নিছক প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে নকশা অনুমোদন প্রদানে অস্বীকৃতি জানান বা অযৌক্তিক বিলম্ব করেন, তখন তা সরাসরি নাগরিকের এই মৌলিক অধিকারগুলোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে পরিগণিত হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন ।

যেসব কারণে নির্মাণ অনুমোদনপত্র স্থগিত বা বাতিল হতে পারে:
ঢাকা মহানগর ইমারত বধিমিালা, ২০২৫ এর ২১ (২) বিধিতে বলা হয়েছে যে;
(ক) জমি বা প্লটের বিষয়ে কোনো আইনগত জটিলতা দেখা দিলে;
(খ) অনুমোদনের শর্তাবলি ভঙ্গ হলে;
(গ) আবেদনপত্র বা অন্যান্য প্রযোজ্য ফরমসমূহে ভুল অথবা মিথ্যা তথ্য দিলে;
(ঘ) অনুমোদন গ্রহণের পর ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন করা হলে;
(ঙ) নির্মাণ কাজ চলাকালে পার্শ্ববর্তী জনগণের জীবন ও ধন-সম্পত্তির ক্ষতিসহ পরিবেশের জন্য হুমকি ও ঝুঁকিপূর্ণ হলে।
২১ (৪) বিধি মতে, যে সকল ইমারতের অনুমোদিত নকশা বাতিল বা স্থগিত করা হয় সেই সকল ইমারতের কোনোরূপ ইউটিলিটি সেবা প্রদান না করার জন্য অথবা ইতোমধ্যে প্রদত্ত সেবা প্রত্যাহার করার জন্য রাজউক কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করবে।


নিচে The Building Construction Act 1952, ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫, The Town Improvement Act 1953 এবং DAP (2022-2035)-এর আলোকে রাজউকের এহেন পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করার আইনি গ্রাউন্ড, বাস্তব উদাহরণ ও বিচারিক নজির বিশ্লেষণ করা হলো:

The Building Construction Act, 1952 এর বিধান লঙ্ঘন:
এই আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো আবেদনকারী আইনের সকল কারিগরি ও আইনি শর্ত পূরণ করেন, নকশা আইনের পরিপন্থী না হয়, মাস্টার প্ল্যান বা DAP এর সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, , তবে অথরাইজড অফিসার অনুমোদন দিতে আইনত বাধ্য থাকেন। বিনা কারণে অনুমোদন না দেওয়া এই আইনের মূল উদ্দেশ্যের সরাসরি লঙ্ঘন। আইনের বাইরে গিয়ে ধারা-৩ লঙ্ঘন করে কোনো বে-আইনি ‘শর্ত’আরোপ করে নকশা অনুমোদন না দেওয়া অবৈধ।

ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধান লঙ্ঘন:
এই হালনাগাদ বিধিমালায় নকশা অনুমোদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (Timeline) বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং FAR (Floor Area Ratio), সেটব্যাক (Setback) বা পার্কিংয়ের সুস্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। এই Setback, FAR, MGC ও পার্কিংয়ের নিয়ম মেনে যদি কেউ আবেদন করেন, তবে রাজউক তা অনুমোদন দিতে বাধ্য। এই বিধিমালার সবচেয়ে বড় দিক হলো, নকশায় কোনো ত্রুটি থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে আবেদনকারীকে জানাতে হবে। কোনো আবেদনকারী যদি ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০২৫ এর – ধারার বিধান মতে সকল শর্তাবলী পূরণ করেন, নকশা DAP এর সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তবে নকশার অনুমোদন প্রদান করা আইনত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিনা কারণে অনুমোদন না দেওয়া এই আইনের মূল উদ্দেশ্যের সরাসরি লঙ্ঘন। রাজউক যদি নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও সিদ্ধান্ত না দেয় বা "কমিটির সিদ্ধান্তে বাতিল" এমন অস্পষ্ট কথা লেখে, তবে তা এই বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নকশা বা নির্মাণ অনুমোদন প্রত্যাখ্যাত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আপিল কমিটির (Appeal Committee) কাছে আবেদন করতে পারেন। আপিল কমিটির রায় প্রশাসনিকভাবে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হলেও, তা কোনোভাবেই বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার (Judicial Review) ঊর্ধ্বে নয় ।

The Detailed Area Plan (DAP) 2022-2035 এর অপব্যাখ্যা:
নতুন ড্যাপে এলাকাভিত্তিক FAR, ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন প্রণোদনা (Block Development Incentive) এবং ভবনের উচ্চতার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড দেওয়া আছে। ড্যাপ-এর নতুন নিয়ম অনুযায়ী ‘ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ’ (Density Control) এবং ‘ভূমি ব্যবহারের’ নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। এই মহাপরিকল্পনায় রাস্তার প্রশস্ততা এবং এলাকার নাগরিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা FAR নির্ধারণ করা হয়েছে। আবেদনকারীর স্থপতি যদি ড্যাপ (২০২২-২০৩৫)-এর নিয়ম মেনেই নকশা প্রণয়ন করেন, তবে রাজউকের কোনো সাব-কমিটি ড্যাপের বাইরে গিয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্তে সেই নকশা বা উচ্চতা কমিয়ে দেওয়ার বা বাতিল করার এখতিয়ার রাখে না। এটি করলে তা হবে ‘Ultra Vires’ বা ক্ষমতাবহির্ভূত। যদি রাজউক ড্যাপ-এর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নকশা প্রত্যাখ্যান করে, তবে তা রিটের মাধ্যমে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জযোগ্য। নতুন ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার (২৩ আগস্ট ২০২২) পূর্বে যদি ভূমির মালিক এবং ডেভেলপারের মধ্যে কোনো রেজিস্টার্ড চুক্তি থেকে থাকে, তবে সেই ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ড্যাপ (২০১০-২০২২) এবং ২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালার FAR প্রযোজ্য হবে । রাজউক প্রায়শই এই ধারাটির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বা অবজ্ঞা করে নকশা প্রত্যাখ্যান করে, যা সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

The Town Improvement Act, 1953 এর বিধান লঙ্ঘন:
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং টঙ্গী এলাকার উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (DIT) বা বর্তমান রাজউক প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হলো এই আইন । এই আইনটি রাজউককে ভূমি অধিগ্রহণ, রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং শহরের দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করে।এই আইনের ধারা ৭৩ এবং ৭৪ অনুযায়ী, রাজউক শহরের জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান (Master Plan) প্রণয়ন করবে এবং ইমারত নির্মাণ আইনের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত অথরাইজড অফিসার সেই মাস্টার প্ল্যানের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন । রাজউক কর্তৃক মাস্টার প্ল্যান একবার অনুমোদিত হওয়ার পর, অথরাইজড অফিসার কোনো যুক্তিসঙ্গত আইনি ভিত্তি ছাড়া রাজউকের অনুমোদিত প্ল্যানকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না ।

এই আইনের ধারা ৭৩-৭৫ অনুযায়ী রাজউককে মাস্টার প্ল্যান (DAP) বাস্তবায়ন করতে হয়। যদি ড্যাপ-এর জোনিং ম্যাপ অনুযায়ী আপনার জমিটি নির্মাণের উপযোগী হয়, তবে রাজউক নকশা অনুমোদন না দিয়ে ড্যাপ-এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে বলে গণ্য হবে। 


হাইকোর্টে রিট দায়েরের সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ডসমূহ (Grounds for Writ):
রাজউকের অবৈধ বা কারণবিহীন প্রত্যাখ্যান আদেশ বাতিল এবং নকশা অনুমোদনের নির্দেশ চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা যায়। যখন রাজউক বা এর দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরাইজড অফিসার ইমারতের নকশা অনুমোদন প্রদানে অস্বীকৃতি জানান, মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখেন, অথবা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কোনো ইমারত অপসারণের নোটিশ প্রদান করেন, তখন সংক্ষুব্ধ আবেদনকারী সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি গ্রাউন্ডে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। Writ of Mandamus-এর মাধ্যমে আদালত রাজউককে তার ওপর অর্পিত আইনি দায়িত্ব (যেমন- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নকশা অনুমোদন করা) পালনের নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, Writ of Certiorari-এর মাধ্যমে রাজউকের বেআইনি বা এখতিয়ারবহির্ভূত কোনো আদেশ (যেমন- কারণ দর্শানো ছাড়া উচ্ছেদ নোটিশ) বাতিল করেন। নিচে সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ডগুলো তুলে ধরা হল:

 

বিধিবদ্ধ দায়িত্বের ব্যর্থতা ও অযৌক্তিক বিলম্ব (Failure to Perform Statutory Duty and Unreasonable Delay):
ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী, দাখিলকৃত নকশা আইনি ও কারিগরি দিক থেকে সঠিক কিনা তা যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া বা সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখপূর্বক তা প্রত্যাখ্যান করা অথরাইজড অফিসারের একটি সুস্পষ্ট 'বিধিবদ্ধ দায়িত্ব' (Statutory Duty)। এই দায়িত্ব পালনে কর্তৃপক্ষের কোনো যথেচ্ছ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা (Arbitrary Discretion) নেই। 

রিটের গ্রাউন্ড: একজন আবেদনকারী যদি ড্যাপ (২০২২-২০৩৫), ইমারত বিধিমালা ২০২৫ ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC 2020) এর সকল কারিগরি মানদণ্ড (Technical criteria) পূরণ করে সম্পূর্ণ নিখুঁত ড্রয়িং (Architectural, Structural, Plumbing, Electrical) ECPS পোর্টালে বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জমা দেন, তবে রাজউক অনির্দিষ্টকালের জন্য সেই ফাইলটি ঝুলিয়ে রাখতে পারে না। ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার (সাধারণত ৪৫ দিন) মধ্যে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

আইনি যুক্তি: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজউক সিদ্ধান্ত প্রদানে ব্যর্থ হলে তা ক্ষমতার চরম অপব্যবহার (Abuse of power) এবং প্রশাসনিক অবহেলা হিসেবে গণ্য হয়। এই ধরনের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা (Administrative inaction) নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার (সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদ) এবং পেশা বা ব্যবসার অধিকার (সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ) সরাসরি ক্ষুণ্ণ করে। এমন ক্ষেত্রে আবেদনকারী 'Mandamus' বা পরমাদেশ চেয়ে রিট পিটিশন করতে পারেন, যাতে হাইকোর্ট রাজউককে অবিলম্বে আইন মোতাবেক নকশা অনুমোদনের নির্দেশ দেন । 

বাস্তব উদাহরণ (Real-life Scenario):
প্রেক্ষাপট: জনাব 'আহমেদ' মিরপুরে তার প্লটের জন্য ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) অনুযায়ী নির্ধারিত FAR ২.৫ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫-এর সকল ফায়ার সেফটি ও সেটব্যাক রুলস মেনে একটি ৮ তলা ভবনের নকশা রাজউকে জমা দেন।

রাজউকের পদক্ষেপ: দীর্ঘ ৬ মাস আবেদনটি আটকে রাখার পর রাজউক একটি চিঠি দিয়ে জানায়, "কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনা কমিটির পর্যালোচনায় আপনার প্রস্তাবিত নকশাটি অত্র এলাকার ঘনত্বের সাপেক্ষে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বিধায় নামঞ্জুর করা হলো।"

আইনি পদক্ষেপ (রিট): জনাব আহমেদ এই প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট দায়ের করবেন। তার যুক্তি হবে: ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) নিজেই এলাকার ঘনত্ব হিসাব করে FAR নির্ধারণ করেছে। রাজউকের কমিটি ড্যাপের ঊর্ধ্বে নয়। বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না দেওয়া বেআইনি। চিঠিটিতে সুনির্দিষ্ট কোনো ত্রুটির কথা বলা হয়নি (Not a Speaking Order)। আদালত এই রিটের প্রেক্ষিতে রাজউকের আদেশ স্থগিত করে নকশা অনুমোদনের রুল জারি করতে পারেন।

স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘন (Violation of Principles of Natural Justice):
প্রশাসনিক আইনের অন্যতম প্রধান ও সার্বজনীন মূলভিত্তি হলো 'Audi Alteram Partem' বা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি। এর অর্থ হলো, কারো বক্তব্য না শুনে বা তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক বা ক্ষতিকারক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না। যখন আবেদনকারী যদি FAR (Floor Area Ratio), সেটব্যাক (Setback) বা পার্কিংয়ের বিধি বিধান বা সকল শর্তাবলী পূরণ করে নকশা অনুমোদনের আবেদন করা সত্ত্বেও আবেদনকারীকে শুনানীর সুযোগ না দিয়ে আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং আপীলও না-মঞ্জুর করা হয়, তখন Principles of Natural Justice এর violation হয়। এর ফলে আবেনকারী সেই violation কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন। 

বাস্তব উদাহরণ (Practical Scenario):
মিস্টার 'এক্স' ধানমন্ডি এলাকায় ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী নির্ধারিত FAR (Floor Area Ratio) মেনে রাজউকে ১০ তলা ভবনের নকশা জমা দিলেন। রাজউক জানালো যে, পার্শ্ববর্তী একটি সরকারি প্রকল্পের কারণে তারা আপাতত ওই এলাকায় নকশা অনুমোদন দিচ্ছে না। অথচ ওই প্রকল্পটি এখনো গেজেটভুক্ত হয়নি বা জমি অধিগ্রহণও করা হয়নি।আইনি প্রতিকার: এক্ষেত্রে মিস্টার 'এক্স' হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। কারণ, বিধিমালা ২০২৫ বা ড্যাপ-এ ‘ভবিষ্যৎ প্রকল্পের’ দোহাই দিয়ে বর্তমান নকশা আটকে রাখার কোনো বিধান নেই। এটি তার সম্পত্তির অধিকার (Right to Property) সরাসরি খর্ব করে।

স্বেচ্ছাচারিতা, বৈষম্য এবং অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত (Arbitrariness, Discrimination, and Mala Fide Actions):
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষা লাভের অধিকারী। রাজউকের কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যদি বৈষম্য বা স্বেচ্ছাচারিতা পরিলক্ষিত হয়, তবে তা সরাসরি চ্যালেঞ্জযোগ্য।

রিটের গ্রাউন্ড: বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই এলাকার (যেমন- একই ড্যাপ ব্লকের বা সাব-জোনের) একই মাপের রাস্তার পাশের একটি প্লটে রাজউক হয়তো ১০ তলা ভবনের নকশা অনুমোদন দিচ্ছে, কিন্তু ঠিক পার্শ্ববর্তী বা সমতুল্য অপর একটি প্লটের ক্ষেত্রে ড্যাপের কঠোর ব্যাখ্যার দোহাই দিয়ে মাত্র ৫ তলার অনুমোদন দিচ্ছে বা আবেদনটি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছে । এই ধরনের দ্বৈত নীতি সুস্পষ্ট বৈষম্য।

আইনি যুক্তি: অনেক সময় অভিযোগ ওঠে যে, রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা প্রভাবশালীদের বা দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের (Vested quarters) স্বার্থ রক্ষার্থে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে (Mala fide) সাধারণ নাগরিকদের নকশা আটকে রাখেন বা আইনের ভুল ব্যাখ্যা দেন । প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি 'পাবলিক ট্রাস্ট'; এটি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায় না। হাইকোর্ট বিভাগ এ ধরনের অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বৈষম্যমূলক এবং অযুক্তিক (Unreasonable) প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারেন এবং সমতার ভিত্তিতে নকশা অনুমোদনের নির্দেশ দিতে পারেন।

অর্জিত অধিকার ও প্রতিশ্রুতিমূলক প্রতিবন্ধকতার নীতি (Doctrine of Vested Rights and Promissory Estoppel):
প্রশাসনিক আইন অনুযায়ী, সরকারি সংস্থা কোনো নাগরিককে প্রতিশ্রুতি দিলে এবং নাগরিক সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তার অবস্থান পরিবর্তন করলে (যেমন- অর্থ বিনিয়োগ করলে), সরকার পরবর্তীতে সেই প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে আসতে পারে না। এটি 'Promissory Estoppel' নামে পরিচিত।

রিটের গ্রাউন্ড: যদি রাজউক একজন আবেদনকারীকে প্রথমে 'ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র' (Land Use Clearance বা Planning Permit) প্রদান করে এবং সেই ছাড়পত্রের ভিত্তিতে আবেদনকারী সিভিল এভিয়েশন (CAAB), পরিবেশ অধিদপ্তর, ট্রাফিক বিভাগ এবং ফায়ার সার্ভিস প্রভৃতির অনাপত্তিপত্র (NOC) সংগ্রহ করার জন্য বিপুল অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করেন, তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে রাজউক ঠুনকো বা অযৌক্তিক কারণে 'নির্মাণ অনুমোদন' (Construction Permit) প্রত্যাখ্যান করতে পারে না ।

আইনি যুক্তি: এই ধরনের পরিস্থিতিতে আবেদনকারীর অনুকূলে একটি আইনি 'অর্জিত অধিকার' (Vested Right) সৃষ্টি হয়। একবার অনুমোদন দেওয়ার পর বা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর, রাজউক হঠাৎ করে 'ভুল' (Mistake) বা 'তথ্য গোপন' (Misrepresentation)-এর মনগড়া দোহাই দিয়ে অনুমোদন বাতিল করতে পারে না। এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন অত্যন্ত কার্যকর, যেখানে আদালত রাজউককে তার পূর্ববর্তী অনুমোদনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেন।

প্রশাসনিক অক্ষমতা বা প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার কারণে নাগরিক অধিকার হরণ (Administrative Paralyzation or Technological Failure):
আধুনিক যুগে ই-গভর্ন্যান্সের যুগে প্রযুক্তিগত বিভ্রাট একটি বাস্তব সমস্যা, কিন্তু এর দায় সাধারণ নাগরিকের ওপর চাপানো যায় না।

রিটের গ্রাউন্ড: সম্প্রতিকালে একটি নজিরবিহীন ঘটনায়, রাজউকের ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম (ECPS) হ্যাকারদের সাইবার আক্রমণের শিকার হয়। এর ফলে রাজউকের সার্ভার মাসের পর মাস অকার্যকর ছিল, যার কারণে প্রায় ৪,৫০০ নকশা অনুমোদন এবং ৫০০-এর বেশি ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের আবেদন সম্পূর্ণ আটকে যায়। এই দীর্ঘস্থায়ী প্রযুক্তিগত অচলাবস্থার কারণে রিয়েল এস্টেট খাতের হাজার হাজার ডেভেলপার, ভূমির মালিক এবং লক্ষাধিক নির্মাণ শ্রমিক বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন এবং অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়।

আইনি যুক্তি: রাষ্ট্রের বা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা দুর্বলতার দায় কোনোভাবেই সাধারণ নাগরিকের ওপর চাপানো আইনি বা যৌক্তিক হতে পারে না। সার্ভার ডাউন থাকার কারণে মাসের পর মাস নকশা অনুমোদন না পাওয়ায় আবেদনকারী যদি ব্যাংক লোন খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন বা নির্মাণ সামগ্রী নষ্ট হয়ে যায়, তবে তিনি হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। এই রিটের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য বিকল্প বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে নকশা অনুমোদনের আদেশ প্রার্থনা করা যায় এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে হওয়া ক্ষতির প্রতিকার চাওয়া যায় ।

ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) এর পূর্বকালীন প্রয়োগ এবং চুক্তির অধিকার ক্ষুণ্ণ করা (Retrospective Application of DAP):
আইনের সাধারণ নীতি হলো, কোনো আইন বা নীতিমালার ভূতাপেক্ষ বা অতীতমুখী (Retrospective) প্রয়োগ করা যাবে না, যা নাগরিকের পূর্বে অর্জিত অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে।

রিটের গ্রাউন্ড: ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) কার্যকর হওয়ার (২৩ আগস্ট ২০২২) পূর্বেই যদি কোনো ভূমির মালিক এবং ডেভেলপারের মধ্যে আইনসম্মত রেজিস্টার্ড চুক্তি (Joint Venture Agreement) স্বাক্ষরিত হয়ে থাকে, তবে নতুন ড্যাপের কঠোর নিয়ম (যেমন- কম FAR বা হ্রাসকৃত উচ্চতা) তাদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।

আইনি যুক্তি: ড্যাপ গেজেট হওয়ার আগে রেজিস্টার্ড চুক্তি থাকলে, সেই ভবনের নকশার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ড্যাপ (২০১০-২০২২) এবং ২০০৮ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী FAR এবং অন্যান্য সুবিধা প্রযোজ্য হবে । রাজউক যদি এই সুনির্দিষ্ট বিধির অপব্যাখ্যা করে বা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নতুন ড্যাপ অনুযায়ী নকশা প্রত্যাখ্যান করে, তবে তা সরাসরি রিট পিটিশনের মাধ্যমে বাতিল করা সম্ভব।


বিচারিক নজির (Judicial Precedents):
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের উচ্চ আদালত এ ধরনের রিট মামলায় বেশ কিছু যুগান্তকারী নীতি প্রতিষ্ঠিত করেছেন:

Speaking Order Principle: 
উচ্চ আদালত বারবার বলেছেন যে, রাজউক বা যেকোনো সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষের প্রত্যাখ্যান আদেশ অবশ্যই 'Speaking Order' হতে হবে। অর্থাৎ, আদেশের ভেতরেই আইনি কারণ লেখা থাকতে হবে। কারণবিহীন প্রত্যাখ্যানকে আদালত সব সময়ই অবৈধ ঘোষণা করে পুনরায় আইন অনুযায়ী আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।

মাস্টারপ্ল্যানের শ্রেষ্ঠত্ব (Supremacy of DAP): 
আদালতের প্রতিষ্ঠিত নজির হলো, ব্যক্তিবিশেষ বা কোনো সাব-কমিটির মতামতের চেয়ে গেজেটভুক্ত মাস্টারপ্ল্যান (যেমন ড্যাপ) বা বিধিমালা অগ্রাধিকার পাবে। নাগরিক যদি বিধিমালার প্রতিটি ইঞ্চি মেনে নকশা জমা দেন, রাজউকের তা নাকচ করার কোনো আইনি অধিকার নেই।

অযৌক্তিক কালক্ষেপণ (Unreasonable Delay): 
নকশা অনুমোদনে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করাকে আদালত নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল বলে রায় দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে আদালত নির্দিষ্ট সময়সীমা (যেমন ৩০ বা ৬০ দিন) বেঁধে দিয়ে নকশা অনুমোদনের জন্য Writ of Mandamus (পরমাদেশ) জারি করেছেন।

উপসংহার:
রাজউকের ‘ইমারতের নকশা অনুমোদন’ করার ক্ষমতা মূলত একটি রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতা। এর উদ্দেশ্য নিরাপদ নির্মাণ নিশ্চিত করা, নাগরিককে তার নিজস্ব জমিতে বাড়ি করতে বাধা দেওয়া নয়। ড্যাপ ও বিধিমালার সব শর্ত পূরণ করার পরও যদি রাজউক নকশা অনুমোদন না করে, তবে প্রশাসনিক এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রিট এখতিয়ারই নাগরিকের চূড়ান্ত রক্ষাকবচ।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৭১১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com