রাজউক সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০১): “ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র” প্রদানে অস্বীকৃতিকে চ্যালেঞ্জ

ইমারত নির্মাণের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাপ হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে ‘ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র’(Land Use Clearance) বা পরিকল্পনা অনুমোদন (Planning Permit) নেওয়া। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যদি কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই আপনার ‘ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র’ বা পরিকল্পনা অনুমোদন আটকে দেয় বা প্রত্যাখান করে, নানা অজুহাতে বা অস্পষ্ট কারণে এই ছাড়পত্র প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় বা আবেদন ঝুলিয়ে রাখে, তবে সেটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। অনেক সময়ই দেখা যায়, জমির মালিক সকল বৈধ কাগজপত্র দাখিল করার পরও রাজউক কোনো সুনির্দিষ্ট বা যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই ছাড়পত্র প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় বা মাসের পর মাস আবেদন ঝুলিয়ে রাখে কিংবা প্রত্যাখান করে এবং The Building Construction Act, 1952 আইনের ১৫ ধারার বিধান মতে আপীল করেও ‘ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র’ বা পরিকল্পনা অনুমোদন না পাওয়া যায় বা প্রত্যাখ্যাত হয়, এমতাবস্থায় একজন সংক্ষুব্ধ নাগরিক সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করে আইনি প্রতিকার পেতে পারেন।

রাজউকের আওতাধীন যেকোনো স্থানে ইমারত নির্মাণের একেবারে প্রথম ও আবশ্যিক পদক্ষেপ হলো ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র বা প্ল্যানিং পারমিট গ্রহণ করা । এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রস্তাবিত ভূমিতে আবেদনকারী যে ধরনের ইমারত (আবাসিক, বাণিজ্যিক, মিশ্র বা শিল্প) নির্মাণ করতে চাইছেন, তা ওই এলাকার জন্য নির্ধারিত ড্যাপ বা মাস্টার প্ল্যানের জোনিং নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা । ড্যাপ (DAP - Detailed Area Plan) অনুযায়ী জমিটি আবাসিক, বাণিজ্যিক নাকি মিশ্র ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত, তা যাচাই করে এই ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ছাড়পত্রটি ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা ২০২৫ এর বিধি ৫ ও ৬ অনুযায়ী প্রদান করা হয় । এই আইন কানুনসহ সকল বিধি বিধান মেনে আবেদনপত্রের সাথে প্রয়োজনীয় দলিলাদি কাগজপত্র জমা দেওয়াসহ সকল শর্ত পূরণ করার পরও যদি “ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র” পাওয়া না যায় বা রাজউক উক্ত ছাড়পত্র দিতে অস্বীকার করে বা অস্বাভাবিক বিলম্ব করে বা গড়িমসি করে বা দুর্নীতি বা অবৈধ পন্থা অবলম্বন করতে বলে, এমতাবস্থায় একজন সংক্ষুব্ধ নাগরিক সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করে আইনি প্রতিকার পেতে পারেন।

উদাহরণ: একজন ব্যক্তি তার জমিতে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করতে চান। রাজউক যাচাই করে দেখবে যে- ওই এলাকাটি আবাসিক নাকি মিশ্র বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। যদি এলাকাটি শুধু আবাসিক হিসেবে চিহ্নিত থাকে, তবে রাজউক সেখানে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য "ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র" দেবে না। যদি এলাকাটি বাণিজ্যিক বা  মিশ্র এলাকা হিসেবে চিহ্নিত থাকে, তাহলে রাজউক তাকে 'ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র' প্রদান করবে।
বাস্তব উদাহরণ: জনাব 'ক' পূর্বাচলে একটি প্লট কিনেছেন। সেখানে তিনি একটি ১০ তলা আবাসিক ভবন করতে চান। রাজউক প্রথমে যাচাই করবে ড্যাপ অনুযায়ী ঐ এলাকাটি আবাসিক কি না। সব ঠিক থাকলে রাজউক তাকে 'ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র' প্রদান করবে।

নিম্নে The Building Construction Act 1952, ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫, The Town Improvement Act 1953 এবং DAP (2022-2035)-এর আলোকে রাজউকের এহেন পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করার সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ড, উদাহরণ ও নজির আলোচনা করা হলো:

ড্যাপ (DAP) 2022-2035 এর অপব্যাখ্যা এবং এখতিয়ারবহির্ভূত সিদ্ধান্ত:
The Town Improvement Act, 1953 এর ৭৩ ধারা অনুযায়ী প্রণীত মাস্টার প্ল্যান বা Detailed Area Plan (DAP) একটি আইনি দলিল (Statutory Document)। ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ এর ভূমি ব্যবহার মানচিত্রে (Land Use Zoning Map) যদি কোনো ব্যক্তির জমি ‘আবাসিক’ (Urban Residential), ‘মিশ্র ব্যবহার’ (Mixed Use) বা ‘বাণিজ্যিক’ হিসেবে চিহ্নিত থাকে, তবে সেমতে রাজউক সেখানে সেই প্রকারের ভবন নির্মাণের জন্য ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র দিতে আইনত বাধ্য। যদি ড্যাপ অনুযায়ী কোনো নাগরিকের জমি ‘আবাসিক এলাকা’ (Urban Residential Zone) হিসেবে চিহ্নিত থাকে, অথচ রাজউক সেখানে আবাসিক ভবনের জন্য ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা ড্যাপের সরাসরি লঙ্ঘন এবং রাজউকের ‘Ultra Vires’ (ক্ষমতাবহির্ভূত) কাজ হিসেবে গণ্য হবে। যদি ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বা এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে (Without lawful authority) প্ল্যানিং পারমিট বাতিল করে, তবে রিট দায়ের করে সেই প্রত্যাখ্যান আদেশটি বাতিল করা যায়।

ড্যাপের সাথে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত: সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রাউন্ড হলো— রাজউকের সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের প্রণীত ও গেজেটভুক্ত ড্যাপের পরিপন্থী। ড্যাপে যা অনুমোদিত, রাজউকের কোনো সাব-কমিটি বা কর্মকর্তা তা বাতিল করতে পারেন না।

রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি ড্যাপের জোনিংয়ের বাইরে গিয়ে নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে ছাড়পত্র আটকে দেয়, তবে তা সরাসরি ড্যাপের নির্দেশনার লঙ্ঘন এবং রিটযোগ্য অপরাধ।

বাস্তব উদাহরণ (Real-life Scenario):
প্রেক্ষাপট: জনাব 'হাসান'-এর বাড্ডায় ৫ কাঠা জমি রয়েছে। DAP (2022-2035) অনুযায়ী ওই এলাকাটি 'সাধারণ আবাসিক এলাকা' হিসেবে চিহ্নিত। তিনি একটি ৭ তলা আবাসিক ভবনের জন্য রাজউকে 'ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র' চেয়ে আবেদন করেন।

রাজউকের পদক্ষেপ: ৩ মাস পর রাজউক একটি চিঠি দিয়ে জানায়, "উক্ত প্লটের পাশ দিয়ে ভবিষ্যতে একটি প্রস্তাবিত সড়ক যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় আপনার ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের আবেদনটি সাময়িকভাবে নামঞ্জুর করা হলো।"

আইনি পদক্ষেপ (রিট): জনাব হাসান হাইকোর্টে রিট দায়ের করবেন। তার আইনজীবী যুক্তি দেবেন যে: ড্যাপ (২০২২-২০৩৫)-এ উক্ত জমিতে প্রস্তাবিত কোনো সড়ক নেই। জমিটি সরকার বা রাজউক এল.এ কেস (L.A Case) মূলে অধিগ্রহণ করেনি বা কোনো নোটিশ দেয়নি। অধিগ্রহণ না করে নিছক কাল্পনিক বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দোহাই দিয়ে নাগরিককে তার মৌলিক অধিকার (সম্পত্তি ভোগ) থেকে বঞ্চিত করা The Town Improvement Act 1953 এবং সংবিধানের পরিপন্থী।

The Town Improvement Act, 1953 এর লঙ্ঘন:
এই আইনের Section 73, 74 ও 75 অনুযায়ী মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন রাজউকের দায়িত্ব। এই আইনের উদ্দেশ্য হলো পরিকল্পিত উন্নয়ন করা, নাগরিককে হয়রানি করা নয়। ক্ষমতা প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা (Arbitrariness) এই আইনের চেতনার বিরোধী। যদি রাজউক মাস্টার প্ল্যানের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়, তবে সেটি ক্ষমতার অপব্যবহার (Excess of Jurisdiction) হিসেবে গণ্য হবে। 

Master Plan এর বিরুদ্ধ কোন কাজে কোন জমি ব্যবহার করতে চাইলে সেই ব্যক্তিকে The Town Improvement Act, 1953 এর ৭৫(১) ধারা অনুযায়ী রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে। চেয়ারম্যান উক্ত লিখিত আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে ৬০ দিনের মধ্যে রাজউক কর্তৃপক্ষের বরাবরে আপিল করতে হবে। আপিল না-মঞ্জুর হলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

Building Construction Act, 1952 এর ৩ ধারা লঙ্ঘন:
এই আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী ইমারত নির্মাণের জন্য অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনুমোদন না দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত কারণ দর্শাতে হবে। এই আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত মেনে ইমারত নির্মাণের অধিকার নাগরিকের রয়েছে। আইনানুগ কারণ ছাড়া এই অনুমতি (যা ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র দিয়ে শুরু হয়) প্রদানে বাধা দেওয়া আইনের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা:
বিধি ৬(১) অনুযায়ী রাজউক ৩০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে আইনত বাধ্য। যদি রাজউক কোনো যৌক্তিক কারণ বা তথ্যের ঘাটতির নোটিশ না দিয়েই মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখে, তবে এটি তাদের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্বের (Statutory Duty) চরম অবহেলা। এই নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে রাজউককে দ্রুত অনুমোদন প্রদানের নির্দেশ দেওয়ার প্রার্থনা করা যায়।

রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়া বা "ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য জমিটি অধিগ্রহণ করা হতে পারে" এমন কাল্পনিক বা অনিশ্চিত কারণ দেখিয়ে আবেদন বাতিল করে, তবে তা এই আইনের স্পিরিটের পরিপন্থী (Ultra Vires)। অধিগ্রহণের চূড়ান্ত নোটিশ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তির মালিকানা ও ব্যবহারে বাধা দেওয়া বেআইনি।

বিচারিক নজির: Jamuna Builders Ltd. v. Rajdhani Unnayan Kartripakkha (57 DLR 762) মামলায় মাননীয় হাইকোর্ট সুস্পষ্টভাবে রায় দিয়েছেন যে, আবেদনকারী যদি আইনের সব শর্ত পূরণ করেন, তবে রাজউকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনুমোদন দিতে বাধ্য। কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য অনুমোদন আটকে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি, এখতিয়ার বহির্ভূত এবং এটি অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত (Mala fide) হিসেবে গণ্য হবে ।

ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধান অমান্য করা:
বিধিমালায় আবেদন নিষ্পত্তির একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং আবেদন বাতিলের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কারণ লিখিতভাবে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, রাজউককে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (ক্ষেত্রবিশেষে ৩০/৪৫/৬০ দিন) ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের আবেদন নিষ্পত্তি করতে হয়। যদি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়, তবে তার সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট ও আইনানুগ কারণ আবেদনকারীকে লিখিতভাবে জানাতে হয়। কারণ ছাড়া, অস্পষ্ট নোটিশে বা নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও সিদ্ধান্ত না দেওয়া এই বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ৬(১) অনুযায়ী, পরিকল্পনা অনুমোদনের আবেদন দাখিলের ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখাকে আবেদনটি নিষ্পত্তি (অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান) করতে হবে। The Town Improvement Act, 1953 মতে যদি রাজউক চেয়ারম্যান আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে, তবে এই আইনের ধারা ৭৫(১) অনুযায়ী আবেদনকারী রাজউক কর্তৃপক্ষের কাছে ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফি প্রদানপূর্বক আপিল করতে পারেন।

রিটের গ্রাউন্ড: রাজউক যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না জানায় (Colorable exercise of power) অথবা বিধিমালার কোনো সুনির্দিষ্ট বিধির উল্লেখ না করে ঢালাওভাবে আবেদন বাতিল করে, তবে তা রিট পিটিশনের একটি শক্তিশালী গ্রাউন্ড হবে। 

সংবিধানের ৪২ ও ৩১ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন (সম্পত্তির অধিকার):
অযৌক্তিকভাবে পরিকল্পনা অনুমোদন (Planning Permit) প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো মূলত নাগরিকের সম্পত্তির অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। Jamuna Builders মামলায় আবেদনকারী সফলভাবে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন যে, রাজউকের এ ধরনের খামখেয়ালিপনা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ৩১ (আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার), ৪০ (পেশা ও বৃত্তির অধিকার) এবং ৪২ (সম্পত্তির অধিকার)-এর সাথে সাংঘর্ষিক ।

রিটের গ্রাউন্ড: যুক্তিসঙ্গত আইনি কারণ ছাড়া ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র না দেওয়া মানে একজন নাগরিককে তার নিজের সম্পত্তি উপভোগে বাধা দেওয়া, যা সরাসরি মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

যুক্তির অভাব বা অস্পষ্ট কারণ (Non-speaking Order): 
প্রশাসনিক আদেশে অবশ্যই প্রত্যাখ্যানের সুনির্দিষ্ট কারণ (যেমন: রাস্তার প্রশস্ততা কম, বা জমিটি অধিগ্রহণের আওতাধীন) থাকতে হবে। "কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে না-মঞ্জুর" বা "যৌক্তিক নয়"—এমন অস্পষ্ট কারণে ছাড়পত্র বাতিল করা আইনত অবৈধ (Procedural Impropriety)।

বাস্তব উদাহরণ: ধরা যাক, মিস্টার 'ক' বাড্ডা এলাকায় ১০ কাঠা জমিতে একটি বহুতল ভবন করতে চান। ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী ওই এলাকাটি ‘Mixed Use’ জোন। কিন্তু রাজউক কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই জানালো সেখানে ছাড়পত্র দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে মিস্টার 'ক' রাজউকের এই 'Letter of Rejection'-কে চ্যালেঞ্জ করে রিট করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ: ধরা যাক, ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী আপনার জমিটি 'সাধারণ আবাসিক এলাকায়' অবস্থিত এবং আপনি সব সঠিক কাগজপত্রসহ 'পরিকল্পনা অনুমোদনের' (Planning Permit) আবেদন করেছেন ``। কিন্তু কোনো কারণ না দর্শিয়ে অথবা এলাকার কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপে রাজউক আপনার জমিটিকে ভুলভাবে 'জলাধার' বা 'রাস্তার প্রস্তাবিত জায়গা' দেখিয়ে ছাড়পত্র প্রত্যাখ্যান করল। আপিলও প্রত্যাখ্যান হল। এক্ষেত্রে, হাইকোর্টে রিট করে রাজউকের ওই প্রত্যাখ্যান আদেশটি বাতিল করে ছাড়পত্র প্রদানের নির্দেশনা চাইতে পারেন।

ভবিষ্যৎ অধিগ্রহণের অজুহাত:
অনেক সময় রাজউক বলে, "ভবিষ্যতে এখান দিয়ে রাস্তা যেতে পারে, তাই এখন ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না।" কিন্তু জমি আইনসম্মতভাবে অধিগ্রহণ (Acquisition) করার আগে, নিছক ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনার কথা বলে নাগরিককে বছরের পর বছর তার জমি ব্যবহারে বাধা দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।

বাস্তব উদাহরণ: ধরা যাক, ঢাকার বাড্ডা বা পূর্বাচল সংলগ্ন এলাকায় জনাব 'ক'-এর একটি নিষ্কণ্টক জমি আছে। ড্যাপ (DAP) 2022-2035 অনুযায়ী তার জমিটি ‘সাধারণ আবাসিক এলাকা’হিসেবে চিহ্নিত। তিনি ‘ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ অনুসরণ করে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের আবেদন করলেন। কিন্তু রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ (Town Planner) আবেদনটি বাতিল করে চিঠিতে লিখলেন, "উক্ত এলাকায় রাজউকের একটি প্রস্তাবিত সড়ক বা প্রকল্প যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ছাড়পত্র দেওয়া গেল না।"

আইনি বিশ্লেষণ: এখানে রাজউকের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ বেআইনি। কারণ, কোনো "প্রস্তাবিত" বা "সম্ভাব্য" প্রকল্পের অজুহাতে (যেখানে ভূমি অধিগ্রহণের কোনো গেজেট বা নোটিশ হয়নি) ড্যাপে উল্লিখিত আবাসিক জমির ছাড়পত্র আটকে রাখার ক্ষমতা রাজউকের নেই। জনাব 'ক' এই বাতিল আদেশের চিঠিটি সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিট করলে সহজেই আদেশটি স্থগিত (Stay) করে ছাড়পত্র প্রদানের জন্য রাজউককে নির্দেশ (Mandamus) এনে দিতে পারবেন।

উপসংহার:
রাজউক “ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র” প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে বা অহেতুক কালক্ষেপণ করলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল করতে হবে। যদি প্রতিকার না পাওয়া যায়, তবে রাজউক বরাবরে একটি লিগ্যাল নোটিশ (Demand for Justice Notice) পাঠাতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পেলে বা ছাড়পত্র না দিলে, সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে হবে। রাজউকের ‘ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র’ প্রদানের ক্ষমতাটি কোনো স্বেচ্ছাধীন বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতা (Absolute Discretion) নয়। রাজউক যদি আইনের বিধানাবলির অপপ্রয়োগ বা অপব্যাখ্যা করে নাগরিকদের হয়রানি করে, অযৌক্তিক বা বে-আইনি কারণে রাজউক এই ছাড়পত্র আটকে রাখলে, হাইকোর্টে রিট পিটিশনই হচ্ছে নাগরিকের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও দ্রুত আইনি ঢাল। রিট পিটিশন দায়ের করার মাধ্যমে নাগরিকদের আইনগত ও সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com