বাণিজ্যিক আদালতে ব্যবসায়িকদের অধিকার (পর্ব- ২৯): “পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪ এর অধীন কোনো লেনদেন” সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ ও প্রতিকার
আধুনিক অর্থব্যবস্থায় ডিজিটাল লেনদেন এবং আন্তঃব্যাংক বা আন্তঃপ্রতিষ্ঠান পরিশোধ ব্যবস্থা (Payment and Settlement Systems) একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। 'পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪' (Payment and Settlement Systems Act, 2024) বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার, কার্ড পেমেন্ট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (RTGS)-এর মতো ব্যবস্থার আইনি কাঠামো প্রদান করে।
বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিশাল অংশ নগদ টাকার বদলে ডিজিটাল মাধ্যমে—যেমন পেমেন্ট গেটওয়ে, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS), ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) এবং রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (RTGS)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশে এই ডিজিটাল লেনদেন খাতটি 'পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪' (Payment and Settlement Systems Act, 2024) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
এই ডিজিটাল লেনদেনের প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি, জালিয়াতি বা সিস্টেমের ব্যর্থতা হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই বাণিজ্যিক আদালত আইনের ধারা ২(ঘ)(২৩)-এ "পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪ এর অধীন কোনো লেনদেন" (Transactions under the Payment and Settlement Systems Act, 2024)-কে সুনির্দিষ্টভাবে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬-এর ধারা ২(ঘ)(২৩) এই আইনের অধীন উদ্ভূত যেকোনো বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বাণিজ্যিক আদালতকে একচ্ছত্র এখতিয়ার প্রদান করেছে। নিচে এই ধারার অধীন উদ্ভূত বিরোধসমূহ, মামলার গ্রাউন্ড বা কারণ এবং বাস্তব উদাহরণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
পেমেন্ট গেটওয়ে এবং মার্চেন্ট সেটেলমেন্ট (Payment Gateway & Merchant Settlement) বিরোধ:
ই-কমার্স, এফ-কমার্স বা ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (মার্চেন্ট) গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণের জন্য পেমেন্ট গেটওয়ে বা পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (PSP)-এর সহায়তা নেয়। গ্রাহক পেমেন্ট করার পর সেই টাকা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত T+1 বা T+2 দিনে) মার্চেন্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা (Settle) হওয়ার কথা।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
সেটেলমেন্টে বিলম্ব বা অর্থ আটকে রাখা: পেমেন্ট গেটওয়ে কোম্পানি যদি গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা কেটে নেওয়ার পরও চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে তা মার্চেন্টকে বুঝিয়ে না দেয়।
অযৌক্তিক চার্জব্যাক (Chargeback) বা ফি কর্তন: কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই বা মার্চেন্টকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে পেমেন্ট গেটওয়ে কর্তৃক গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া (Chargeback) বা অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ কেটে রাখা।
সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন বা API ত্রুটির কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতি: পেমেন্ট গেটওয়ের সার্ভার ডাউন থাকা বা কারিগরি ত্রুটির কারণে ক্রেতারা পেমেন্ট করতে না পারায় মার্চেন্টের যে সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ (সেটেলমেন্ট বিরোধ): দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান 'ই-বাজার' ঈদ ক্যাম্পেইনে 'পে-ফাস্ট' নামক একটি পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে। চুক্তির শর্ত ছিল লেনদেনের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে টাকা ই-বাজারের অ্যাকাউন্টে জমা হবে। কিন্তু 'পে-ফাস্ট' কারিগরি ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে ১৫ দিন ধরে টাকা আটকে রাখে। ফলে ই-বাজার তাদের সাপ্লায়ারদের টাকা দিতে ব্যর্থ হয় এবং তাদের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ই-বাজার এই সেটেলমেন্ট ব্যর্থতার দায়ে ধারা ২(ঘ)(২৩) এর অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে পেমেন্ট গেটওয়ের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করতে পারবে।
মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS) এবং কর্পোরেট পার্টনারদের মধ্যকার বিরোধ:
বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো MFS প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, ইউটিলিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (যেমন- ডেসকো, ওয়াসা) এবং রাইড-শেয়ারিং অ্যাপের বড় বড় আর্থিক লেনদেনের চুক্তি থাকে।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
সংগৃহীত বিল বা ফান্ড হস্তান্তরে ব্যর্থতা: MFS অপারেটর যদি গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বা পানির বিল সংগ্রহ করার পর তা মূল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে (যেমন ডেসকো) সময়মতো বুঝিয়ে না দেয়।
রেভিনিউ শেয়ারিং (Revenue Sharing) বা কমিশন বিরোধ: টেলিকম অপারেটর (যাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়) এবং MFS অপারেটরের মধ্যে USSD সেশনের চার্জ বা আয়ের ভাগাভাগি নিয়ে চুক্তি ভঙ্গ।
অ্যাকাউন্ট বা ওয়ালেট হ্যাকের দায়বদ্ধতা: সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে যদি কোনো মার্চেন্ট বা কর্পোরেট ডিস্ট্রিবিউটরের এমএফএস ওয়ালেট হ্যাক হয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরি যায়।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ (কর্পোরেট ফান্ড কালেকশন বিরোধ): একটি জনপ্রিয় রাইড-শেয়ারিং কোম্পানি 'চলো' তাদের চালকদের পেমেন্ট নেওয়ার জন্য 'ডিজি-ক্যাশ' (একটি MFS) এর সাথে চুক্তি করেছে। সিস্টেমের একটি বাগের (Bug) কারণে এক মাসে চালকদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কাটা গেলেও 'চলো'-এর কর্পোরেট অ্যাকাউন্টে সেই টাকা জমা হয়নি। ডিজি-ক্যাশ এই টাকার দায় নিতে অস্বীকার করছে। এই সিস্টেম ব্যর্থতা এবং অর্থ পরিশোধ না করার বিরোধটি বাণিজ্যিক আদালতে বিচার্য হবে।
আন্তঃব্যাংক ক্লিয়ারিং এবং রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (RTGS/EFT) ব্যর্থতা:
বড় বড় কর্পোরেট ডিল, জমি কেনাবেচা বা আন্তর্জাতিক এলসি (LC) মার্জিন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিশোধ ব্যবস্থা (যেমন- RTGS, BEFTN, BACH) ব্যবহার করে। এই সিস্টেমে কোনো কারিগরি বা প্রক্রিয়াগত ভুলের কারণে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
ভুল অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর: এক ব্যাংকের ভুলে অন্য কোনো অননুমোদিত অ্যাকাউন্টে বিপুল অংকের কর্পোরেট ফান্ড চলে যাওয়া এবং তা উদ্ধারে ব্যাংকের অসহযোগিতা।
লেনদেন সম্পাদনে অযৌক্তিক বিলম্ব: RTGS (যা তাৎক্ষণিক হওয়ার কথা) বা EFT-তে ব্যাংকের নিজস্ব সিস্টেমের গাফিলতির কারণে টাকা পাঠাতে বিলম্ব হওয়া, যার ফলে গ্রাহকের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়া।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ (RTGS ব্যর্থতায় ব্যবসায়িক ক্ষতি): 'মেগা বিল্ডার্স लिमिटेड' একটি জমি কেনার জন্য তাদের ব্যাংক 'ক'-কে নির্দেশ দেয় ব্যাংক 'খ'-তে বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে ৫০ কোটি টাকা RTGS করতে। ব্যাংক 'ক' মেগা বিল্ডার্সের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেয়, কিন্তু তাদের আইটি সিস্টেমের গাফিলতির কারণে ওই দিন আর সেটেলমেন্টটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারে পাঠায়নি। ফলশ্রুতিতে নির্দিষ্ট সময়ে টাকা না পাওয়ায় বিক্রেতা চুক্তি বাতিল করে দেয় এবং মেগা বিল্ডার্সের ৫ কোটি টাকার বায়নার টাকা বাজেয়াপ্ত হয়। এই 'পরিশোধ ব্যবস্থা'র ত্রুটির কারণে যে ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে, তা আদায়ের জন্য মেগা বিল্ডার্স ব্যাংক 'ক'-এর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (PSO) কর্তৃক সাইবার নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স লঙ্ঘন:
'পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪' অনুযায়ী পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের (যেমন- ভিসা, মাস্টারকার্ড, বা লোকাল সুইচিং নেটওয়ার্ক) নির্দিষ্ট সাইবার সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ড (যেমন- PCI-DSS) মেনে চলতে হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণসমূহ:
নিরাপত্তাজনিত অবহেলা (Gross Negligence in Security): পেমেন্ট অপারেটরের সিস্টেমে দুর্বলতার কারণে হ্যাকাররা যদি কার্ডের তথ্য বা টোকেন (Token) চুরি করে মার্চেন্টের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেয়।
সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট (SLA) ভঙ্গ: চুক্তিতে উল্লেখিত "৯৯.৯% আপটাইম (Uptime)" নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া, যার ফলে উৎসবের মৌসুমে (যেমন- ঈদের আগে) ট্রানজেকশন ফেইল হয়ে মার্চেন্টদের কোটি টাকার বিক্রি নষ্ট হওয়া।
বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ (সাইবার নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা বিরোধ): একটি পেমেন্ট এগ্রিগেটর কোম্পানির সিস্টেমে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) ঠিকমতো কাজ না করায় হ্যাকাররা একটি নামকরা সুপারশপের অনলাইন স্টোর থেকে ভুয়া কার্ড দিয়ে ১০ কোটি টাকার পণ্য কিনে নেয়। সুপারশপ কর্তৃপক্ষ জানতে পারে যে, পেমেন্ট কোম্পানিটি ২০২৪ সালের আইনের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি গাইডলাইন পুরোপুরি মেনে চলেনি। এই অবহেলার কারণে সুপারশপ তাদের ক্ষতিপূরণ চেয়ে পেমেন্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করবে।
রিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থার ব্যর্থতা সংক্রান্ত বিরোধ (Settlement Failure Disputes):
বিরোধের প্রকৃতি: আন্তঃব্যাংক বা আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেনের ক্ষেত্রে যখন অর্থ এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে 'নিষ্পত্তি' (Settlement) প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: চুক্তিবদ্ধ দায়বদ্ধতা পালন না করা (Breach of Contractual Duty) এবং সেবার ব্যর্থতা (Failure of Service)।
বাস্তব উদাহরণ:
'ব্যাংক ক' থেকে 'ব্যাংক খ'-তে RTGS বা BEFTN-এর মাধ্যমে একটি বড় করপোরেট পেমেন্ট পাঠানো হলো। 'ব্যাংক ক' থেকে অর্থ ডেবিট হয়েছে, কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে 'ব্যাংক খ' তা গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে গ্রাহকের ব্যবসায়িক লিকুইডিটি সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংক দুটির মধ্যে কারিগরি বা অপারেশনাল দায় নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে।
অননুমোদিত লেনদেন ও নিরাপত্তা ত্রুটি সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা (Liability for Unauthorized Transactions):
বিরোধের প্রকৃতি: পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (PSO) বা পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (PSP) এর প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে গ্রাহক বা মার্চেন্টের আর্থিক ক্ষতির ঘটনা।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: অবহেলা (Negligence), 'ডিউটি অফ কেয়ার' বা সতর্কতার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা এবং অনিরাপদ সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ।
বাস্তব উদাহরণ:
একটি পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডারের সিস্টেম হ্যাক হওয়ার কারণে শত শত মার্চেন্টের একাউন্ট থেকে অর্থ অননুমোদিতভাবে অন্যত্র চলে গেছে। পেমেন্ট গেটওয়ে দায় নিতে অস্বীকার করছে এবং বলছে এটি সিস্টেমের ত্রুটি নয়, বরং ইউজারের পাসওয়ার্ড লিক। এখানে নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে চলা হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করা যাবে।
অপারেশনাল সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট (SLA) লঙ্ঘন:
বিরোধের প্রকৃতি: ব্যাংক, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান এবং পেমেন্ট সিস্টেম প্রোভাইডারদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি বা SLA অনুযায়ী সেবা প্রদানে ব্যর্থতা।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: চুক্তির শর্তভঙ্গ (Breach of Warranty/Condition)।
বাস্তব উদাহরণ:
একটি ব্যাংক ডিজিটাল ওয়ালেট সেবা দেওয়ার জন্য একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করেছে। চুক্তিতে বলা আছে, সিস্টেমের 'আপটাইম' থাকতে হবে ৯৯.৯%। কিন্তু কারিগরি দুর্বলতার কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে সিস্টেম দীর্ঘক্ষণ ডাউন থাকে, ফলে ব্যাংকের হাজার হাজার গ্রাহক লেনদেন করতে ব্যর্থ হয় এবং ব্যাংকের সুনাম ও ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়। ব্যাংক ওই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
নিষ্পত্তি চূড়ান্ততা (Finality of Settlement) সংক্রান্ত বিরোধ:
বিরোধের প্রকৃতি: পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪ অনুযায়ী, একবার সেটেলমেন্ট সম্পন্ন হয়ে গেলে তা অপরিবর্তনীয় (Irrevocable)। যদি কোনো পক্ষ সম্পন্ন হওয়া লেনদেনকে চ্যালেঞ্জ করে বা বেআইনিভাবে ফেরত (Chargeback) পাওয়ার চেষ্টা করে, তবে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: আইনের সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন (Statutory Non-compliance) এবং আইনি নিশ্চয়তা প্রদান।
বাস্তব উদাহরণ: একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিস্টেম অনুযায়ী তা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। পরবর্তীতে ওই কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ভুল স্বীকার করে ব্যাংককে বাধ্য করছে সেটেলমেন্ট রিভার্সাল বা চার্জব্যাক করতে। কিন্তু ব্যাংক আইন অনুযায়ী সেটেলমেন্ট চূড়ান্ত হওয়ায় তা রিভার্স করতে পারছে না। ফলে কর্পোরেট গ্রাহক ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করে। এক্ষেত্রে ব্যাংক বাণিজ্যিক আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করে আইনি সুরক্ষা নিতে পারে।
প্রবিধান ও লাইসেন্সিং সংক্রান্ত বাণিজ্যিক বিরোধ:
বিরোধের প্রকৃতি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম বা লাইসেন্সিং শর্তাবলী মেনে চলার ক্ষেত্রে পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের মধ্যে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড: নিয়মবহির্ভূত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের বাজার নষ্ট করা (Unfair Trade Practices)।
বাস্তব উদাহরণ:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার অপব্যবহার করে একটি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার বাজার দখলের জন্য অবৈধভাবে ফি কাঠামো কমিয়ে দেয় (Predatory Pricing), যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ভারসাম্য নষ্ট করে। প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে যে, এটি সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রবিধানের পরিপন্থী। এই অসম প্রতিযোগিতার কারণে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন পক্ষ বাণিজ্যিক আদালতে প্রতিকার চাইতে পারে।
উপসংহার:
ডিজিটাল ইকোনমির এই যুগে 'পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা' সংক্রান্ত বিরোধগুলো অত্যন্ত দ্রুত এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার সাথে সমাধান করা প্রয়োজন। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬-এর ধারা ২(ঘ)(২৩) এই ধরনের বিরোধের দ্রুত বিচারের পথ প্রশস্ত করেছে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই আদালতে মামলা করার সময় প্রযুক্তিগত লগ, অডিট ট্রেইল এবং এসএলএ (SLA) চুক্তিপত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক স্বার্থ সুরক্ষিত করা সম্ভব।
ফিনটেক (FinTech) কোম্পানি, মোবাইল ব্যাংকিং, এবং পেমেন্ট গেটওয়ের মতো খাতগুলো অত্যন্ত কারিগরি এবং এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এখানে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে সাধারণ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা পুরো ই-কমার্স ও ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে স্থবির করে দিতে পারে। এই ধারার অন্তর্ভুক্তির ফলে, 'পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪'-এর অধীন যেকোনো কারিগরি ত্রুটি, সেটেলমেন্ট ফেইলিয়র বা চুক্তিভঙ্গের মামলাগুলো এখন বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুততম সময়ে (Fast-track) নিষ্পত্তি হবে, যা ডিজিটাল ব্যবসায়ীদের আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি করবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com