অর্থঋণ ও জারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১৮): Coram non judice কে চ্যালেঞ্জ
'Coram Non Judice' অর্থ হলো "এমন একজন বিচারকের সামনে যা বিচারিক ক্ষমতার বাইরে" যার অর্থ হলো— "Not before a judge" বা "এমন কোনো আদালতের বিচারিক কার্যক্রম যার উক্ত বিষয়ে বিচার করার কোনো এখতিয়ার বা আইনি ক্ষমতা নেই।" সহজ কথায়, যদি কোনো আদালত তার আইনি ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনো আদেশ দেন, তবে সেই আদেশটি শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio) বলে গণ্য হয়। অর্থ ঋণ আদালত একটি বিশেষ আদালত হওয়ায় একে কঠোরভাবে আইনের সীমানার মধ্যে কাজ করতে হয়।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত বারবার সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যদি তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে (Without Jurisdiction) কোনো আদেশ বা ডিক্রি প্রদান করে, তবে সেই আদেশটি আইনের দৃষ্টিতে "Nullity" (সম্পূর্ণ বাতিল বা অস্তিত্বহীন)। অর্থ ঋণ আদালত যদি তার এই আইনি এখতিয়ার অতিক্রম করে কোনো আদেশ দেয়, তবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করে তা চ্যালেঞ্জ করা যায়।
নিচে অর্থ ঋণ আদালতের প্রেক্ষাপটে Coram non judice বা এখতিয়ারবিহীন আদেশের প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ, বাস্তব উদাহরণ ও বিচারিক নজির আলোচনা করা হলো:
অর্থ ঋণ আদালতের এখতিয়ার মূলত তিনভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে:
ক. বিষয়বস্তুগত এখতিয়ারের অভাব (Lack of Subject-Matter Jurisdiction)
অর্থ ঋণ আদালত শুধুমাত্র আইনের ২(ক) ধারায় সংজ্ঞায়িত "আর্থিক প্রতিষ্ঠান" (Financial Institution) কর্তৃক ২(গ) ধারায় সংজ্ঞায়িত "ঋণ" (Loan) আদায়ের মামলা বিচার করতে পারে।
রিটের রিট গ্রাউন্ড: যদি ব্যাংক এমন কোনো পাওনার জন্য মামলা করে যা এই আইনের ২(গ) ধারায় বর্ণিত 'ঋণ'-এর সংজ্ঞায় পড়ে না (যেমন—ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ বা মানহানি), এবং আদালত তা গ্রহণ করে ডিক্রি দেয়, তবে সেই ডিক্রি 'Coram Non Judice' হিসেবে রিটযোগ্য।
রিটের গ্রাউন্ড: যদি এমন কোনো প্রতিষ্ঠান (যেমন- কোনো সাধারণ এনজিও বা সমবায় সমিতি, যা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রজ্ঞাপিত নয়) এই আদালতে মামলা করে, অথবা কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক পাওনা (যা ঋণ নয়) আদায়ের জন্য এখানে মামলা হয়, তবে আদালতের সেই মামলার বিচার করার কোনো 'Subject-matter Jurisdiction' থাকে না।
রিটের গ্রাউন্ড: আবাসন কোম্পানি অর্থ ঋণ আইনের ২(ক) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়। তাই এই মামলার বিচার করার কোনো এখতিয়ার (Jurisdiction) অর্থ ঋণ আদালতের নেই। ডিক্রিটি একটি Coram non judice এবং সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য।
বাস্তব উদাহরণ (আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয় এমন বাদীর মামলা):
একটি আবাসন কোম্পানি (Real Estate Company) তাদের একজন ক্রেতার কাছে কিস্তির টাকা পাবে। তারা এটিকে 'ঋণ' দেখিয়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করল এবং আদালত তা গ্রহণ করে ডিক্রি দিয়ে দিলেন।
বাস্তব উদাহরণ (অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মামলা):
একটি সমবায় সমিতি (Co-operative Society) যা আইনের ২(ক) ধারায় 'আর্থিক প্রতিষ্ঠান' হিসেবে তালিকাভুক্ত নয়, তারা অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করল। আদালত তা গ্রহণ করে ডিক্রি দিল। এখানে আদালত 'Subject Matter' বা বিষয়গতভাবে এখতিয়ারহীন। বিবাদী সরাসরি রিট করে এই পুরো ডিক্রি বাতিল করতে পারেন।
খ. আইনি সময়সীমা বা তামাদি অতিক্রান্ত হওয়া (Lack of Jurisdiction due to Limitation):
অর্থ ঋণ আইনের ২৮ ধারায় জারী মামলা (Execution Case) দায়ের করার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা (যেমন- ডিক্রির পর ১ বছর বা ক্ষেত্রবিশেষে ৬ বছর) দেওয়া আছে।
রিটের গ্রাউন্ড: যদি ব্যাংক তামাদির মেয়াদ পার হওয়ার পর জারী মামলা দায়ের করে এবং আদালত কোনো আইনি ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই 'Time-barred' মামলা গ্রহণ করে নিলাম বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন, তবে তামাদি অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে আদালত উক্ত মামলা পরিচালনার এখতিয়ার হারিয়ে ফেলেন। এটি একটি Coram non judice আদেশ।
রিটের গ্রাউন্ড: জারী মামলাটি আইনের ২৮ ধারায় বারিত (Time-barred)। তামাদি উত্তীর্ণ হওয়ার পর আদালতের আর কোনো এখতিয়ার থাকে না। এই গ্রেফতারি পরোয়ানাটি Coram non judice।
উদাহরণ (তামাদি বারিত জারী মামলা):
ব্যাংক ২০০৫ সালে একটি ডিক্রি পেয়েছে। তারা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বা রিভাইভ্যাল লেটার ছাড়াই ১৫ বছর পর ২০২০ সালে সেই ডিক্রি তামিল করার জন্য জারী মামলা করল। আদালত তা গ্রহণ করে বিবাদীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেন।
গ. দেওয়ানি স্বত্বের জটিল প্রশ্ন নিষ্পত্তি (Settling Complex Title Dispute):
যদি বন্ধকী সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষের সাথে জটিল দেওয়ানি স্বত্বের প্রশ্ন (Complex Title Dispute) দেখা দেয়, তবে তা সাধারণ দেওয়ানি আদালতে (Civil Court) বিচার্য। অর্থ ঋণ আদালত যদি এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এই জটিল স্বত্বের প্রশ্ন নিষ্পত্তি করে মালিকানা ঘোষণা করে, তবে তা Coram non judice।
ঘ. বিধিবদ্ধ নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন (Statutory Embargo Violation):
আইনের ৪৭(২) ও (৩) ধারা অনুযায়ী আদালত মামলা চলাকালীন বা ডিক্রির পর কোনো চক্রবৃদ্ধি সুদ (Compound interest) মঞ্জুর করতে পারবেন না। যদি আদালত ডিক্রিতে চক্রবৃদ্ধি সুদ দেওয়ার আদেশ দেন, তবে তা আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত বা 'Ultra Vires' আদেশ।
বাস্তব উদাহরণ (সম্পত্তি নিলামে পদ্ধতিগত ভুল):
ধারা ৩৩(৩) অনুযায়ী দুটি জাতীয় দৈনিকে নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেওয়া বাধ্যতামূলক। আদালত মাত্র একটি স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ব্যাংককে সম্পত্তির সনদ (Certificate) দিয়ে দিলেন। এই আদেশটি 'Coram Non Judice' কারণ আদালত আইনের বাধ্যতামূলক পদ্ধতি অনুসরণ না করে তার এখতিয়ার হারিয়েছেন।
ঙ. General Principle of Writ Jurisdiction:
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিস হলো, যেখানে নিম্ন আদালতের আদেশে 'Error of law apparent on the face of the record' (রেকর্ডের ওপর দৃশ্যমান আইনের ভুল) থাকে বা আদালত এমন কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করেন যা আইন তাকে দেয়নি (Excess of Jurisdiction), সেখানে অনুচ্ছেদ ১০২-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগ 'Writ of Certiorari' জারি করে সেই আদেশ সাথে সাথে বাতিল করে দেন।
উপসংহার:
'Coram non judice' হলো আইনি লড়াইয়ের সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র বা 'ব্রহ্মাস্ত্র'। অর্থ ঋণ আদালত যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন, তার ক্ষমতা আইনের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ব্যাংক বা আদালত যদি সেই দেয়াল টপকে আপনার সম্পত্তি বা স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করতে চায়, তবে বিকল্প আইনি প্রতিকারের আশায় বসে না থেকে, সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে উক্ত সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়াটিকে 'Nullity' বা বাতিল ঘোষণা করানোই সবচেয়ে বিচক্ষণ আইনি পদক্ষেপ।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com