অর্থঋণ ও জারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১৫): due process বা legal process বিষয়ে চ্যালেঞ্জ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী— "আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনো নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার।" এই সাংবিধানিক রক্ষাকবচকেই আইনি ভাষায় 'Due Process of Law' বা 'যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া' বলা হয়।

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ ঋণ আদায়ের একটি কঠোর ও দ্রুতগামী আইন হলেও, এর নিজস্ব একটি সুনির্দিষ্ট 'Legal Process' বা আইনি কাঠামো রয়েছে। কোনো ব্যাংক বা আদালত যদি পাওনা আদায়ের অতি-উৎসাহে আইনের এই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার (Natural Justice) লঙ্ঘন করে, তবে সেই বিচারিক প্রক্রিয়াকে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

নিচে 'Due Process' বা 'Legal Process' লঙ্ঘনের প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ, বাস্তব উদাহরণ ও বিচারিক নজির আলোচনা করা হলো:

'Due Process' বা আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ:
অর্থ ঋণ মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে 'Due Process' লঙ্ঘিত হতে পারে। রিট করার প্রধান ভিত্তিগুলো নিম্নরূপ:

ক. Natural Justice লঙ্ঘন- সমন ও শুনানি:
'Due Process'-এর প্রথম শর্তই হলো— Audi Alteram Partem (কাউকে না শুনে দণ্ড দেওয়া যাবে না)। আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী বিবাদীর ওপর যথাযথভাবে সমন বা শোকজ নোটিশ জারি না করে একতরফা (Ex-parte) ডিক্রি প্রদান করা। সমন জারির ক্ষেত্রে পত্রিকা বিজ্ঞপ্তি, ডাকযোগ বা জারীকারকের প্রতিবেদনে তঞ্চকতা থাকলে তা আইনি প্রক্রিয়ার চরম লঙ্ঘন।

উদাহরণ (শুনানির অধিকার থেকে বঞ্চনা):
জনাব রহমান এর ঠিকানায় কোনো সমন বা আদালতের নোটিশ যায়নি। ব্যাংক জারীকারকের সাথে যোগসাজশ করে 'বিবাদীকে পাওয়া যায়নি' মর্মে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে একতরফা ৫ কোটি টাকার ডিক্রি নিয়ে নিল।

রিটের গ্রাউন্ড: এখানে জনাব রহমানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা 'Due Process of Law' এর সবচেয়ে বড় লঙ্ঘন। হাইকোর্ট এই গ্রাউন্ডে পুরো ডিক্রি বা জারী প্রক্রিয়া স্থগিত করে মামলাটি পুনরায় শুনানির নির্দেশ (Remand) দিতে পারেন।

উদাহরণ (সমন বা নোটিশ গোপন করা):
ব্যাংক এবং আদালতের জারি কারক (Process Server) যোগসাজশ করে একটি জাল সমন জারির রিপোর্ট তৈরি করল যে দায়িককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। দায়িক কিছুই জানলেন না এবং তার বিরুদ্ধে কোটি টাকার একতরফা ডিক্রি হয়ে গেল। দায়িক যখন জানলেন তখন তার সম্পত্তি নিলামের পথে। এক্ষেত্রে দায়িক হাইকোর্টে রিট করে প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি কোনো সমন পাননি এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (Due Process) অনুসরণ না করেই ডিক্রি দেওয়া হয়েছে।

খ. নিলামের বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ এড়িয়ে যাওয়া- ধারা ১২ ও ৩৩:
আইনে নিলামের জন্য সুনির্দিষ্ট 'Legal Process' দেওয়া আছে (যেমন- ১৫ দিনের সময় দেওয়া, দুটি জাতীয় দৈনিকে প্রচার ইত্যাদি)। যদি ব্যাংক বা আদালত এই ধাপগুলো (Procedural Requirements) প্রতিপালন না করে, শর্টকাট করে বা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করলে, তবে তা 'Due Process' এর সরাসরি লঙ্ঘন। আইনি বিধান এড়িয়ে ব্যাংককে সরাসরি ৩৩(৭) ধারায় মালিকানাস্বত্ত্বের সনদপত্র দেওয়া হলে তা বাতিলযোগ্য।

উদাহরণ (নিলাম প্রক্রিয়ায় শর্টকাট বা Fraud on Statute):
ব্যাংক জারী মামলায় ৩৩(১) ধারায় প্রথম নিলাম ডাকার পর কোনো ক্রেতা না পেয়ে, ৩৩(৪) ধারার দ্বিতীয় নিলামের 'আইনি প্রক্রিয়া' অনুসরণ না করেই সরাসরি ৩৩(৫) ধারায় সম্পত্তি নিজেদের দখলে নেওয়ার সার্টিফিকেট পেয়ে গেল।

রিটের গ্রাউন্ড: আইনে উল্লেখিত ধারাবাহিক ধাপ বা 'Sequence' না মানা Due Process এর লঙ্ঘন। হাইকোর্ট এই সার্টিফিকেট বাতিল করতে পারেন।

উদাহরণ (সম্পত্তি মূল্যায়নে ত্রুটি):
ধারা ৩৩(৭) অনুযায়ী ব্যাংককে সম্পত্তি দেওয়ার আগে যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। আদালত কোনো সার্ভেয়ার নিয়োগ না করে বা ভুল মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংককে বেশি মূল্যের সম্পত্তি দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করে দিলে তা পদ্ধতিগত অনিয়ম হিসেবে রিটযোগ্য।

গ. সম্পত্তি নিলাম না করেই সরাসরি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণ- ধারা ৩৪:
আইনের ৩৪(৯) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যে, অন্তত একটি নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কাউকে জেলে (দেওয়ানি কারাগারে) পাঠানো যাবে না। এই আইনি প্রক্রিয়া বা 'Due Process' লঙ্ঘন করে যদি আদালত সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা (WA) জারি করেন, তবে তা সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ (ব্যক্তিগত স্বাধীনতা) এবং অর্থ ঋণ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ঘ. মালিকানা যাচাই না করে সম্পত্তি ন্যস্তকরণ- ধারা ৩৩(৭খ):
৩৩(৭) ধারায় ব্যাংকের নামে সম্পত্তির মালিকানা দেওয়ার আগে আদালতকে ৩৩(৭খ) অনুযায়ী রেকর্ড যাচাই করতে হয়। এই যাচাই-বাছাইয়ের 'Legal Process' অনুসরণ না করে যদি ভুল বা বন্ধক-বহির্ভূত সম্পত্তি ব্যাংকের নামে ডিক্রি করে দেওয়া হয়, তবে তা এখতিয়ার বহির্ভূত (Ultra Vires)।

ঙ. আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া অধিকার হরণ- বিদেশ যাত্রায় বাধা:
অর্থ ঋণ আইনে দায়িকের পাসপোর্ট জব্দ করা বা বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কোনো ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়নি। আইনগত কর্তৃত্ব বা সুনির্দিষ্ট 'Legal Process' ছাড়া ইমিগ্রেশনে চিঠি পাঠিয়ে দেশত্যাগে বাধা দেওয়া সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ (চলাফেরার স্বাধীনতা)-এর লঙ্ঘন।

এখতিয়ার বহির্ভূত আদেশ (Lack of Jurisdiction/Coram Non Judice):

আদালতকে অবশ্যই আইনের নির্ধারিত সীমার মধ্যে কাজ করতে হবে। যদি অর্থ ঋণ আদালত এমন কোনো আদেশ দেয় যা এই আইনে নেই (যেমন—ফৌজদারি আদালতের মতো শাস্তি প্রদান বা আইনের সময়সীমা লঙ্ঘন), তবে সেই আদেশ 'Void' বা বাতিলযোগ্য এবং সরাসরি রিট করা যায়।

বৈষম্যমূলক আচরণ (Violation of Article 27):
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান। যদি একই পরিস্থিতিতে আদালত এক পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেয় (যেমন—ব্যাংককে কোনো প্রমাণ ছাড়াই সময় দেওয়া) এবং অপর পক্ষকে (দায়িককে) আত্মপক্ষ সমর্থনের যৌক্তিক সময় না দিয়ে দ্রুত মামলা শেষ করে দেয়, তবে তা যথাযথ প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন।

যান্ত্রিক বা বিচারিক বুদ্ধিহীন আদেশ (Non-application of Judicial Mind):
আদালত যখন কোনো আদেশ দেবেন, তখন তাকে অবশ্যই নথিপত্র এবং আইনের ধারা বিশ্লেষণ করতে হবে। যদি আদালত কোনো আদেশের পেছনে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ (Reasoned Order) না দেখান অথবা শুধুমাত্র ব্যাংকের আবেদনের ওপর ভিত্তি করে 'যান্ত্রিকভাবে' (Mechanically) পরোয়ানা বা ক্রোকের আদেশ সই করেন, তবে তা যথাযথ প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে।

প্রমাণের অসামঞ্জস্যতা (Procedural Irregularity):
ডিক্রি দেওয়ার আগে আদালতকে অবশ্যই ব্যাংকের দেওয়া 'Statement of Accounts' এবং দায়িকের দেওয়া কিস্তির রসিদ মিলিয়ে দেখতে হয়। যদি ব্যাংক কোনো ভুল বা জালিয়াতিপূর্ণ তথ্য দেয় এবং দায়িক তা চ্যালেঞ্জ করা সত্ত্বেও আদালত তা আমলে না নিয়ে ডিক্রি জারি করেন, তবে তা যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।

উপসংহার:
'Due Process of Law' কেবল একটি আইনি শব্দগুচ্ছ নয়, এটি একটি ঢাল যা নাগরিকদের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে রক্ষা করে। অর্থ ঋণ আদালত যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন, তাকে অবশ্যই আইনের ছকে বাঁধা পথ ধরেই হাঁটতে হবে। যদি সেই পথে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটে, তবে বিকল্প প্রতিকার না থাকার গ্রাউন্ডে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশন দায়ের করাই আপনার আইনি ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কার্যকর উপায়।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com