অর্থজারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১৪): ৫০ ধারার সুদ, মুনাফা সম্পর্কিত বিধান সংক্রান্তে চ্যালেঞ্জ

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ৫০ ধারা ঋণগ্রহীতাদের (দায়িকের) জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি রক্ষাকবচ। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চক্রবৃদ্ধি ও দণ্ড সুদের চাপে যখন ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়ে যায়, তখন ঋণগ্রহীতাকে আইনি উপায়ে 'সুদ মওকুফ' (Interest Waiver) বা 'এককালীন পরিশোধ' (One Time Settlement - OTS) সুবিধা পাওয়ার অধিকার দেয় এই ধারা। যদি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অমান্য করে এই সুবিধা দিতে অস্বীকার করে, অথবা অর্থ ঋণ আদালত এই ধারার ক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থ হন, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করে ব্যাংকের ওপর এই সুবিধা প্রদানে আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে পারেন।

নিচে ৫০ ধারার ১ থেকে ৪ উপ-ধারার বিধান, রিট করার গ্রাউন্ড, বাস্তব উদাহরণ এবং বিচারিক নজিরসমূহ আলোচনা করা হলো:

ক. ৫০(১) ধারা: আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ক্ষমতা (Discretion to Waive):
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাইলে মামলা দায়েরের পূর্বে বা পরে, অথবা ডিক্রি হওয়ার পর যেকোনো সময় তাদের নিজস্ব বিবেচনায় ঋণের ওপর আরোপিত স্বাভাবিক সুদ বা দণ্ড সুদ (Penal Interest) আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করতে পারে। মূল কথা হল- এটি ব্যাংকের নিজস্ব ক্ষমতা। তবে ব্যাংক এই ক্ষমতার অপব্যবহার করে বৈষম্য করতে পারবে না।

খ. ৫০(২) ধারা: বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার মানার বাধ্যবাধকতা (Mandatory Compliance):
বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে সুদ মওকুফ, এককালীন এক্সিট সুবিধা বা ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ (Rescheduling) সংক্রান্ত যেসব সার্কুলার বা প্রজ্ঞাপন জারি করবে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তা মানতে বাধ্য থাকিবে। মূল কথা হল- এটি ঋণগ্রহীতার জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ঐচ্ছিক নয়, বরং আইনত বাধ্যতামূলক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার লঙ্ঘনে রিট (Violation of Section 50(2)):
গ্রাউন্ড: বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার (যেমন- BRPD Circular) জারি করে ঘোষণা দিল যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউনপেমেন্ট দিলে দণ্ড সুদ মওকুফ করে এককালীন এক্সিট (OTS) দেওয়া হবে। ঋণগ্রহীতা সেই অনুযায়ী আবেদন করার পরও ব্যাংক যদি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তা নামঞ্জুর করে মামলা বা নিলাম চালিয়ে যায়, তবে রিট অব ম্যান্ডামাস দায়ের করে ব্যাংককে সার্কুলার মানতে বাধ্য করা যায়।

উদাহরণ (সার্কুলার থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের প্রত্যাখ্যান):
জনাব 'এ' একজন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক। কভিড মহামারীর কারণে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী সুদ মওকুফসহ 'ওয়ান টাইম সেটেলমেন্ট' (OTS)-এর আবেদন করেন। তিনি শর্ত অনুযায়ী ১০% টাকা জমাও দেন। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকটি বেশি লাভের আশায় তার আবেদন বাতিল করে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করে।

রিটের কারণ: ৫০(২) ধারা অনুযায়ী ব্যাংক ওই সার্কুলার মানতে বাধ্য। জনাব 'এ' হাইকোর্টে রিট করে মূল মামলার ওপর স্থগিতাদেশ আনতে পারেন এবং সার্কুলারের সুবিধা দেওয়ার জন্য আদালতের নির্দেশ (Mandamus) পেতে পারেন।

গ. ৫০(৩) ধারা: আদালতের হস্তক্ষেপের ক্ষমতা (Power of the Adalat):
অর্থ ঋণ আদালতের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সার্কুলারের সুবিধা পাওয়ার অধিকার বিবাদী-দায়িকের রয়েছে, তবে আদালত ডিক্রীদার ব্যাংককে উক্ত সার্কুলার অনুযায়ী দাবি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিতে পারবেন। মূল কথা হল- ব্যাংক যদি সার্কুলার মানতে না চায়, তবে আদালত সরাসরি ব্যাংককে তা মানতে নির্দেশ দিতে পারেন।

অর্থ ঋণ আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থতা (Failure of Section 50(3)):
গ্রাউন্ড: ঋণগ্রহীতা বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের রেফারেন্স দিয়ে অর্থ ঋণ আদালতে ৫০(৩) ধারায় আবেদন করলেন। কিন্তু আদালত যদি বলেন যে "সুদ মওকুফ ব্যাংকের নিজস্ব ব্যাপার, এখানে আদালতের কিছু করার নেই" এবং আবেদনটি যান্ত্রিকভাবে খারিজ করে দেন, তবে এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা যায়।

উদাহরণ (আদালত কর্তৃক ৫০-৩ ধারার আবেদন নামঞ্জুর):
জারী মামলা চলাকালে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার দিল যে, আসল টাকা পরিশোধ করলে সুদের অংশ মওকুফ হবে। দায়িক ব্যক্তি অর্থ ঋণ আদালতে ৫০(৩) ধারায় আবেদন করলেন ব্যাংককে এই নির্দেশ দেওয়ার জন্য। আদালত ব্যাংকের কথায় প্রভাবিত হয়ে আবেদন খারিজ করলেন।

রিটের কারণ: যেহেতু অর্থ ঋণ আইনের ৪৪ ধারার কারণে এই অন্তর্বর্তী আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন চলে না, তাই বিকল্প প্রতিকার না থাকায় সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে এই সুবিধা আদায় করা যায়।

ঘ. ৫০(৪) ধারা: ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা (Islamic Banking):
ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই আইনের যেখানে "সুদ" শব্দটি আছে, সেখানে ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী "মুনাফা" (Profit) বা "ভাড়া" (Rent) শব্দটি ব্যবহৃত হবে।

ঙ. বৈষম্যমূলক আচরণ (Discriminatory Treatment / Article 27):
গ্রাউন্ড: ৫০(১) ধারায় ব্যাংককে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক যদি একই ধরনের খেলাপি হওয়া একজন প্রভাবশালী গ্রাহককে বিপুল পরিমাণ সুদ মওকুফ করে দেয়, অথচ সাধারণ একজন গ্রাহকের অনুরূপ আবেদন খারিজ করে দেয়, তবে তা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) সরাসরি লঙ্ঘন এবং রিট এখতিয়ারে চ্যালেঞ্জযোগ্য।


উপসংহার:
অর্থ ঋণ আদালত আইনের ৫০ ধারাটি ঋণগ্রহীতার জন্য একটি ঢালস্বরূপ, যা ব্যাংকের একচেটিয়া ও অবিচারমূলক সুদের থাবা থেকে নাগরিকদের রক্ষা করে। যদি আপনি দেখেন যে আপনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সার্কুলারের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু আপনার ব্যাংক তা মানছে না বা অর্থ ঋণ আদালত আপনাকে সহযোগিতা করছে না, তবে কালক্ষেপণ না করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করাই আপনার আইনি ও আর্থিক অধিকার রক্ষার সর্বোত্তম হাতিয়ার। ৪৯ ধারা মূলত দায়িককে একটি "Breathing Space" বা নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেয় যাতে সে দেউলিয়া না হয়ে ঋণ শোধ করতে পারে। যদি অর্থ ঋণ আদালত ৪৯ ধারার অধীনে কিস্তি মঞ্জুর করতে অস্বীকার করেন বা এমন কিস্তি দেন যা অবাস্তব, তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সরাসরি রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। বিশেষ করে যেখানে আপিল করার মতো টাকা দায়িকের হাতে থাকে না, সেখানে আইনের পদ্ধতিগত ত্রুটি (Procedural Irregularity) দেখিয়ে রিট করা একটি অত্যন্ত কার্যকর আইনি পথ।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com