অর্থজারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১৩): ৪৯ ধারার ঋণের কিস্তি সংক্রান্তে চ্যালেঞ্জ
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৪৯ ধারা ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটি অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক বা 'Breathing Space' প্রদানকারী বিধান। ৪৯ ধারা আদালতকে একটি বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করে, যার মাধ্যমে আদালত ডিক্রিকৃত টাকা পরিশোধের জন্য দায়িককে (Borrower) নির্দিষ্ট কিস্তি (Installments) নির্ধারণ করে দিতে পারেন। কোনো কারণে ঋণগ্রহীতা এককালীন সম্পূর্ণ ডিক্রিকৃত টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে, এই ধারার অধীনে আদালত তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিস্তিতে (Installment Facility) টাকা পরিশোধের সুযোগ দিতে পারেন। যদি অর্থ ঋণ বা জারী আদালত যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকা সত্ত্বেও এই কিস্তি সুবিধা দিতে অস্বীকার করেন, অথবা ব্যাংক যদি আপস-মীমাংসার শর্ত ভঙ্গ করে তড়িঘড়ি করে নিলাম বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করায়, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।
নিচে ৪৯ ধারার ১ থেকে ৩ উপ-ধারার বিধান:
ক. এক বছরের কিস্তি সুবিধা (Court's Discretionary Power)- ৪৯(১) ধারা:
ডিক্রি প্রদানের পর বা জারী মামলা চলাকালীন আদালত যদি ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন মনে করেন, তবে ডিক্রিকৃত টাকা পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ১ (এক) বছর পর্যন্ত সময় দিতে পারবেন। এই টাকা এককালীন অথবা কিস্তিতে (সাধারণত ১২টি মাসিক কিস্তিতে) পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া যায়। মূল কথা হল- এটি আদালতের নিজস্ব ক্ষমতা (Discretionary Power)। ব্যাংক রাজি না থাকলেও আদালত চাইলে ঋণগ্রহীতাকে সর্বোচ্চ ১ বছরের কিস্তি সুবিধা দিতে পারেন।
কিস্তির আবেদন বিবেচনার বাধ্যবাধকতা (Section 49(1)):
৪৯(১) উপধারা অনুযায়ী, দায়িক যদি ডিক্রিকৃত টাকা কিস্তিতে পরিশোধের জন্য প্রার্থনা করেন, তবে আদালত ডিক্রি প্রদানের সময় বা পরবর্তীতে কিস্তি মঞ্জুর করতে পারেন।
রিট গ্রাউন্ড: দায়িক যদি তার আর্থিক অসচ্ছলতা বা ব্যবসার মন্দাভাব প্রমাণ করে কিস্তির আবেদন করেন এবং আদালত কোনো কারণ ছাড়াই সেই আবেদন সরাসরি খারিজ (Reject) করে দেন, তবে তা 'ন্যায়বিচারের পরিপন্থী' হিসেবে চ্যালেঞ্জ করে রিট করা যায়।
খ. ধারা: আপসের ভিত্তিতে কিস্তি সুবিধা (Facility by Mutual Agreement)- ৪৯(২):
ডিক্রীদার ব্যাংক এবং বিবাদী-দায়িক যদি নিজেদের মধ্যে আপস-মীমাংসা (Solenama/Compromise) করেন, তবে তাদের উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে আদালত যেকোনো পরিমাণ সময়ের জন্য এবং যেকোনো সংখ্যক কিস্তিতে টাকা পরিশোধের আদেশ দিতে পারবেন। মূল কথা হল- এখানে ১ বছরের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ব্যাংক ও গ্রাহক চাইলে ৫ বা ১০ বছরের কিস্তি সুবিধাও নিতে পারেন।
অযৌক্তিক বা অসম্ভব কিস্তি নির্ধারণ (Unreasonable Installments):
কিস্তি নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো ঋণ আদায় করা, দায়িককে ধ্বংস করা নয়।
রিট গ্রাউন্ড: যদি আদালত এমন কোনো কিস্তি নির্ধারণ করেন যা দায়িকের আয়ের তুলনায় একেবারেই অসম্ভব (যেমন—কোটি টাকার ডিক্রিতে মাসে মাত্র ১ লাখ টাকা আয় করা ব্যক্তির জন্য ১০ লাখ টাকার কিস্তি), তবে সেই 'স্বেচ্ছাচারী' আদেশের বিরুদ্ধে রিট করা যায়।
গ. ধারা: কিস্তি খেলাপের পরিণতি (Consequence of Default)- ৪৯(৩):
যদি দায়িক ৪৯(১) বা ৪৯(২) ধারায় মঞ্জুরকৃত কিস্তি প্রদানে ব্যর্থ হন বা শর্ত ভঙ্গ করেন, তবে উক্ত কিস্তি সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তখন ব্যাংক অবশিষ্ট অপরিশোধিত টাকা আদায়ের জন্য সরাসরি আইনানুগ ব্যবস্থা (নিলাম বা গ্রেফতার) গ্রহণ করতে পারবে।
নিচে ৪৯ ধারার ১ থেকে ৩ উপ-ধারার বিধান সংক্রান্তে রিট করার গ্রাউন্ড, বাস্তব উদাহরণ এবং বিচারিক নজিরসমূহ আলোচনা করা হলো:
ক. ৪৯(১) ধারার সুবিধা থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চনা:
গ্রাউন্ড: দায়িক ব্যক্তি যদি তার সদিচ্ছা (Bona fide intent) প্রমাণের জন্য ডিক্রিকৃত টাকার একটি অংশ (যেমন- ১০% বা ২০%) আদালতে জমা দিয়ে অবশিষ্ট টাকা এক বছরে ১২টি কিস্তিতে পরিশোধের জন্য ৪৯(১) ধারায় আবেদন করেন, কিন্তু জারী আদালত কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই তা নামঞ্জুর করে সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা (WA) জারি করেন। এটি আদালতের বিচারিক মন (Judicial Mind) প্রয়োগ না করার শামিল, যা রিটযোগ্য।
খ. আপস-মীমাংসা বা সোলেমানামা লঙ্ঘন (Violation of Section 49(2)):
গ্রাউন্ড: যদি ব্যাংক এবং গ্রাহকের মধ্যে কিস্তি পরিশোধের আপস (Solenama) হয় এবং গ্রাহক নিয়মিত কিস্তি দিয়ে আসছেন, কিন্তু ব্যাংক গোপনে বা হঠাৎ করে জারী মামলায় নিলাম ডাকার বা ওয়ারেন্ট ইস্যু করার পদক্ষেপ নেয়। এটি বিশ্বাসভঙ্গ এবং ৪৯(২) ধারার সরাসরি লঙ্ঘন।
গ. কিস্তি খেলাপের ফলে কঠোর আদেশ (Section 49(3)):
৪৯(৩) উপধারা অনুযায়ী, যদি দায়িক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তবে ডিক্রিদার ব্যাংক সরাসরি ডিক্রি জারির আবেদন করতে পারে।
রিট গ্রাউন্ড: যদি দায়িক অনিবার্য কারণে (যেমন—অসুস্থতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ) এক বা দুটি কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন এবং আদালত তাকে অতিরিক্ত সময় না দিয়ে সরাসরি কঠোর আদেশ (যেমন—গ্রেফতারি পরোয়ানা বা সম্পত্তি নিলাম) দেন, তবে মানবিক কারণে রিট করে সময় প্রার্থনা করা যায়।
ঘ. ডিক্রি পরবর্তী সুদের সাথে কিস্তির সমন্বয় (Section 49(2)):
৪৯(২) ধারা অনুযায়ী, কিস্তি নির্ধারণের সময় আদালত ডিক্রি পরবর্তী সুদ (সর্বোচ্চ ১২%) বিবেচনায় নেবেন।
রিট গ্রাউন্ড: যদি কিস্তি নির্ধারণের সময় আদালত সুদের হিসাব ভুল করেন বা ৪৯(২) ধারার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যান, তবে তা আইনগত ত্রুটি হিসেবে রিটযোগ্য।
ঙ. হাইকোর্টের Equitable Jurisdiction:
গ্রাউন্ড: অনেক সময় জারী আদালত আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে কিস্তি দিতে পারেন না। তখন ব্যবসা বাঁচানোর অধিকার (Right to Profession/Business) এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার্থে (Right to Life) হাইকোর্ট বিভাগে রিট করে 'Equitable Relief' হিসেবে ১২ বা তার বেশি কিস্তির সুবিধা চাওয়া যায়।
বাস্তব উদাহরণ-১ (আদালত কর্তৃক ৪৯-১ এর আবেদন নামঞ্জুর):
জনাব 'এ' একজন ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা। তার বিরুদ্ধে ২ কোটি টাকার ডিক্রি হয়েছে। তিনি জারী আদালতে ২০ লাখ টাকা জমা দিয়ে বাকি ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের জন্য ৪৯(১) ধারায় আবেদন করলেন। কিন্তু আদালত ব্যাংকের আপত্তিতে তা নামঞ্জুর করে তার ফ্যাক্টরি নিলামে তুলে দিলেন।
রিটের কারণ: জনাব 'এ' একজন জেনুইন ব্যবসায়ী। এককালীন পুরো টাকা দিলে তার ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি হাইকোর্টে রিট করে নিম্ন আদালতের নিলাম স্থগিত করে ১২ কিস্তিতে টাকা পরিশোধের নির্দেশ আনতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ-২ (সোলেমানামা থাকা সত্ত্বেও ওয়ারেন্ট):
জনাব 'বি' ব্যাংকের সাথে আপস করে (৪৯-২ ধারায়) ৫ বছরের কিস্তিতে টাকা দিচ্ছেন। হঠাৎ তৃতীয় বছরে ব্যাংক জারী মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করাল।
রিটের কারণ: যেহেতু ৪৯(৩) ধারা অনুযায়ী তিনি কিস্তি খেলাপ করেননি, তাই ব্যাংকের এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ বেআইনি। রিটের মাধ্যমে এই ওয়ারেন্ট তাৎক্ষণিক বাতিল করা সম্ভব।
উপসংহার:
অর্থ ঋণ আদালত আইনের ৪৯ ধারাটি ঋণগ্রহীতার জন্য এক পশলা বৃষ্টির মতো। ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ একটি সর্বজনীন স্বীকৃত অধিকার। জারী আদালত বা ব্যাংক যদি আপনাকে এই যৌক্তিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সরাসরি নিলাম বা গ্রেফতারের দিকে এগোয়, তবে দ্রুত হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে কিস্তির সুবিধা আদায় করে নেওয়া আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আইনি পদক্ষেপ।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com