অর্থজারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১১): অন্তবর্তীকালীন আদেশকে চ্যালেঞ্জ
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৪৪ ধারা এই আইনের অন্যতম একটি কঠোর বিধান। এই ধারার মূল উদ্দেশ্য হলো—মামলার মাঝপথে বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন করে বিবাদী যেন মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এই ধারার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় নিম্ন আদালত যদি এমন কোনো বেআইনি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন যা বিবাদীর অপূরণীয় ক্ষতি করে, তবে তার বিরুদ্ধে একমাত্র এবং চূড়ান্ত আইনি প্রতিকার হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করা।
নিচে ৪৪ ধারার বিধান, রিট করার আইনি ভিত্তি, বাস্তব উদাহরণ এবং উচ্চ আদালতের নজিরসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
৪৪ ধারায় আদালত যেসব অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিতে পারে:
আদালত বিবাদীর সম্পত্তি রক্ষা, সংরক্ষণ বা transfer বন্ধে অন্তবর্তী আদেশ দিতে পারেন। আদালত সম্পত্তির attachment, receiver নিয়োগ বা অন্যান্য protective ব্যবস্থা নিতে পারেন। আদালত মনে করলে অন্য যেকোনো “just and proper” interim order দিতে পারেন। কিন্তু অর্থঋণ আদালতের এই ক্ষমতা অসীম নয়, এটি “judicial discretion”, যা আইন ও সংবিধানের সীমার মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। এখানে অর্থঋণ আদালত সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করলে তা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে writ petition দায়ের করে প্রতিকার চাওয়া যায়।
৪৪ ধারার আদেশের বিরুদ্ধে রিট করার গ্রাউন্ডসমূহ:
যেহেতু ৪৪ ধারা আপিল ও রিভিশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, তাই এই ধারাই মূলত রিট দায়ের করার সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের মূল শর্তই হলো— যদি অন্য কোনো বিকল্প ও কার্যকরী আইনি প্রতিকার (Alternative Efficacious Remedy) না থাকে, তবেই রিট করা যাবে।
আপিল অযোগ্য আদেশের ক্ষেত্রে রিট (No Statutory Appeal):
অর্থ ঋণ আদালত আইনের ৪১ ও ৪২ ধারা অনুযায়ী কেবল চূড়ান্ত রায় বা ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন করা যায়। ৪৪ ধারা অনুযায়ী অন্তবর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিলের সুযোগ থাকে না। যেহেতু ৪৪ ধারার অন্তবর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে আইনে কোনো "বিকল্প কার্যকর প্রতিকার" (Equally efficacious remedy) নেই, তাই সরাসরি রিট পিটিশন দায়ের করা যায়।
উদাহরণ (ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (Freeze) করা): একটি চলমান মামলায় ব্যাংক দাবী করল যে দায়িক তার টাকা সরিয়ে ফেলছেন। আদালত ৪৪ ধারার অধীনে দায়িকের সকল ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার আদেশ দিলেন। এর ফলে দায়িকের শত শত শ্রমিকের বেতন বন্ধ হয়ে গেল। দায়িক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি কোনো টাকা সরাচ্ছেন না এবং এই আদেশের ফলে তার ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তবে তিনি হাইকোর্টে রিট করে এই অন্তবর্তীকালীন আদেশটি স্থগিত করতে পারেন।
বিকল্প আইনি প্রতিকারের অভাব (Absence of Alternative Remedy):
যেহেতু ৪৪(১) ধারা রিভিশনের পথ রুদ্ধ করেছে এবং ৪৪(২) ধারা অনুযায়ী চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করলে বিবাদীর অপূরণীয় ক্ষতি (Irreparable Loss) হয়ে যাবে, তাই দ্রুত ও কার্যকরী প্রতিকারের অভাবে রিট পিটিশন দায়ের করা মেইনটেইনেবল (Maintainable)।
উদাহরণ (সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ): মামলা চলাকালীন আদালত ৪৪ ধারার অধীনে দায়িকের এমন কোনো সম্পত্তি ক্রোক (Attachment) করার আদেশ দিলেন যা এই ঋণের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় বা যা বন্ধক দেওয়া নেই। দায়িক এই আদেশের বিরুদ্ধে রিট করতে পারেন এই গ্রাউন্ডে যে, আদালত ৪৪ ধারার ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার (Article 42 of the Constitution) লঙ্ঘন করেছেন।
এখতিয়ার বহির্ভূত আদেশ (Order Without Jurisdiction):
আদালত যদি এমন কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন যা দেওয়ার ক্ষমতা আইনে তাকে দেওয়া হয়নি। উদাহরণস্বরূপ: মামলা চলমান অবস্থায় বিবাদীর ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কোনো কারণ ছাড়া 'ফ্রিজ' (Freeze) করে দেওয়া।
পদ্ধতিগত ত্রুটি ও শুনানীর সুযোগ না দেওয়া:
৪৪(২) উপধারা অনুযায়ী, অন্তবর্তীকালীন আদেশের ফলে কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারলে তাকে শুনানির সুযোগ দেওয়া বা অন্তবর্তীকালীন আদেশটি কেন চূড়ান্ত করা হবে না তার কারণ দর্শাতে বলা হয়। যদি আদালত প্রতিপক্ষকে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ (Injunction) বা ক্রোকের আদেশ দেন, তবে তা Natural Justice পরিপন্থী।
আইনের প্রকাশ্য ভুল (Error of Law Apparent on the Face of the Record):
যখন কোনো আদেশে আদালত আইনের সুস্পষ্ট বিধানকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন। যেমন: তামাদিতে বারিত (Time-barred) হওয়া সত্ত্বেও আরজি খারিজের আবেদন (Order 7 Rule 11) নামঞ্জুর করা।
পক্ষভুক্ত হওয়ার আবেদন নামঞ্জুর :
জনাব 'এ'-এর জমি জাল দলিলের মাধ্যমে জনাব 'বি' ব্যাংকে বন্ধক রেখেছেন। ব্যাংক মামলা করলে জনাব 'এ' জানতে পেরে মামলায় পক্ষভুক্ত (Added Party) হওয়ার জন্য আবেদন করলেন (Order 1 Rule 10)। কিন্তু অর্থ ঋণ আদালত তা খারিজ করে দিলেন।
প্রতিকার: ৪৪ ধারার কারণে রিভিশন করা যাবে না। তাই জনাব 'এ' তার মৌলিক সম্পত্তির অধিকার রক্ষার্থে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে উক্ত আদেশ বাতিল ও নিজেকে পক্ষভুক্ত করার নির্দেশ চাইতে পারেন।
আরজি খারিজের আবেদন নামঞ্জুর:
ব্যাংক ১২ ধারার বিধান (নিলামের চেষ্টা) না মেনেই অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করল। বিবাদী দেওয়ানি কার্যবিধির ৭ অর্ডারের ১১ রুল অনুযায়ী 'আরজি খারিজ' (Rejection of Plaint) করার জন্য আবেদন করলেন। কিন্তু আদালত সেটি নামঞ্জুর করে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিলেন।
প্রতিকার: যেহেতু ৪৪ ধারা অনুযায়ী এই নামঞ্জুর আদেশের বিরুদ্ধে জেলা জজ বা হাইকোর্টে 'রিভিশন' করা যাবে না, তাই বিবাদী সরাসরি হাইকোর্টে রিট দায়ের করে বলবেন— "১২ ধারা না মানায় মামলাটি অচল, অথচ আদালত ভুলভাবে আমার আবেদন নামঞ্জুর করেছেন।" হাইকোর্ট রিট শুনে মামলার কার্যক্রমে স্টে অর্ডার (Stay Order) দিতে পারেন।
ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন (Violation of Natural Justice):
বিবাদীকে কোনো নোটিশ না দিয়ে বা তার বক্তব্য না শুনেই একতরফাভাবে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ (যেমন- ক্রোকাদেশ) জারি করা।
উপসংহার:
অর্থ ঋণ আইনের ৪৪ ধারা মূলত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তৈরি হলেও, এটি নিম্ন আদালতের বিচারকদের অবাধ বা স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেয় না। যদি কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ আইনের দৃষ্টিতে ভুল হয় এবং তা আপনার মৌলিক অধিকার বা আইনি অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে, তবে বিকল্প প্রতিকার না থাকার গ্রাউন্ড দেখিয়ে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশন দায়ের করাই আপনার সর্বোত্তম আইনি অধিকার। ৪৪ ধারার অন্তবর্তীকালীন আদেশ মূলত মামলার প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করার জন্য দেওয়া হয়। তবে উপধারা (২) ও (৩)-এর সঠিক প্রয়োগ না হলে এটি বিচারপ্রার্থীর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদি অর্থ ঋণ আদালত ৪৪ ধারার অধীনে কোনো অযৌক্তিক, নোটিশবিহীন বা এখতিয়ার বহির্ভূত আদেশ প্রদান করেন, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধান প্রদত্ত রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে দ্রুত প্রতিকার পেতে পারেন। আদেশের ফলে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক ক্ষতি (Irreparable loss) রিট পিটিশনে প্রমাণের প্রধান বিষয় হয়ে থাকে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com