অর্থজারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ১০): দায়িকের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) কে চ্যালেঞ্জ

ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণে দায়িক (Judgment Debtor) বা ঋণগ্রহীতার বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা (travel ban) জারি করা একটি অতি পরিচিত ঘটনা। অনেক সময় ডিক্রীদার ব্যাংকের আবেদনের প্রেক্ষিতে অর্থ ঋণ আদালত সরাসরি ইমিগ্রেশন পুলিশকে চিঠি দিয়ে দায়িকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তবে একজন নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার হওয়ায়, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়।

নিচে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর প্রেক্ষাপটে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি, চ্যালেঞ্জের গ্রাউন্ড এবং বিচারিক নজিরসমূহ আলোচনা করা হলো:

অর্থ ঋণ আদালত আইনে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার বিধানঃ
প্রথমত একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন— অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এ এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা নেই যা আদালতকে সরাসরি ঋণগ্রহীতার পাসপোর্ট জব্দ করার বা বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। সাধারণত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জারী মামলায় ৩৪ ধারা (দেওয়ানি কারাগারে আটকাদেশ বা Arrest Warrant)-এর সাথে সম্পূরক আবেদন হিসেবে ৫৭ ধারার আশ্রয় নিয়ে অথবা দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারার (Inherent Power) আশ্রয় নিয়ে আদালতের কাছে আবেদন করে যে— "দায়িক বিদেশে পালিয়ে গেলে ডিক্রির টাকা আদায় অসম্ভব হয়ে পড়বে, তাই তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হোক।" আদালত এই আবেদনের প্রেক্ষিতে স্পেশাল পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর একটি পত্র ইস্যু করে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা চ্যালেঞ্জ করার প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ:
যেহেতু আইনে স্পষ্ট কোনো ধারা নেই, তাই এই আদেশের বিরুদ্ধে রিট করার অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে:


ক. মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন (Violation of Fundamental Rights):
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতা রয়েছে। একজন নাগরিককে কেবল আইন দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধের মাধ্যমেই আটকানো যায়। যেহেতু অর্থ ঋণ আইনে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই, তাই এই আদেশ সরাসরি সংবিধানের ৩৬ এবং ৩২ (ব্যক্তিগত স্বাধীনতা) অনুচ্ছেদের চরম লঙ্ঘন।

খ. ৫৭ ধারার এখতিয়ারের অতিরিক্ততা:
৫৭ ধারায় আদালতের যেই পরিপূরক আদেশ প্রদানের সহজাত ক্ষমতা বা supplementary order প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে সেটি অনাবশ্যক punitive restraint দেওয়ার লাইসেন্স নয়—এটি fact-sensitive। আদালত যদি সেই এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে ঋণগ্রহিতা/দায়িকের বিরুদ্ধে বিদেশ গমনে উপর travel ban দেন তবে তা end of justice এর লঙ্ঘন। বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা ৫৭ ধারার এখতিয়ারের অতিরিক্ততা লক্ষ্য করা গেলে তাকে চ্যালেঞ্জ করে তার বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে।

গ. দেওয়ানি দায় বনাম ফৌজদারি অপরাধ (Civil Liability vs. Criminal Offense)
ঋণ গ্রহণ করা এবং তা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া একটি 'দেওয়ানি দায়' (Civil Liability)। এটি কোনো রাষ্ট্রদ্রোহী বা জামিন অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ নয়। উচ্চ আদালতের মতে, শুধুমাত্র সিভিল লায়াবিলিটির কারণে একজন নাগরিকের চলাফেরার মৌলিক অধিকার হরণ করা যায় না।

ঘ. আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া (Violation of Natural Justice)
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আদালত বিবাদীকে কোনো শোকজ নোটিশ (Show Cause) না দিয়েই একতরফাভাবে (Ex-parte) বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ইমিগ্রেশনে চিঠি জানিয়ে দেন। কোনো নাগরিকের অধিকার খর্ব করার আগে তার বক্তব্য না শোনা Natural Justice এর পরিপন্থী।

ঙ. আইনগত কর্তৃত্বের অভাব (Absence of Statutory Power):
আদালত কেবল সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন যা আইনে স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে। অর্থ ঋণ আদালত আইনে সম্পত্তি ক্রোক, নিলাম বিক্রয় (৩৩ ধারা) এবং দেওয়ানি কারাগারে আটক (৩৪ ধারা)-এর কথা বলা থাকলেও 'দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা'-এর কথা বলা নেই। তাই আদালতের এই আদেশ এখতিয়ার বহির্ভূত (Ultra Vires)।

উদাহরণ ১ (ব্যবসায়িক কাজে বিদেশ যাত্রা):
জনাব 'এ' একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে অর্থ ঋণ আদালতে একটি জারী মামলা চলমান। তার কোম্পানিকে সচল রাখতে এবং বায়ারদের সাথে মিটিং করে রপ্তানি আদেশ (Export Order) আনতে তার ইউরোপ যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ব্যাংক জারী আদালতে আবেদন করে তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করাল।

প্রতিকার: জনাব 'এ' হাইকোর্টে রিট করে প্রমাণ করতে পারেন যে, বিদেশ গেলে তিনি ব্যবসা করে ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারবেন। দেশে আটকে রাখলে বরং ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং ব্যাংক টাকা পাবে না। হাইকোর্ট এক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত করে তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিতে পারেন।

উদাহরণ ২ (চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ যাত্রা):
একজন ঋণগ্রহীতার ওপেন হার্ট সার্জারি বা উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে বা সিঙ্গাপুরে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ইমিগ্রেশনে তাকে আটকে দেওয়া হলো কারণ অর্থ ঋণ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। এটি একটি শক্তিশালী মানবিক গ্রাউন্ড। হাইকোর্ট এ ধরনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত অধিকার (Right to Life) বিবেচনায় দ্রুত নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেন।

বিচারিক নজির- এস.এম বখতিয়ার মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছেন যে, "শুধুমাত্র ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণে কোনো নাগরিকের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।" আদালত বলেছেন, ব্যক্তির চলাফেরার স্বাধীনতা খর্ব করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান অর্থ ঋণ আইনে নেই।

সাঈদ নুরুল মামলায় উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, সরকার বা তার কোনো এজেন্সি (যেমন- পুলিশ বা ইমিগ্রেশন) আদালতের সুনির্দিষ্ট ও আইনানুগ নির্দেশ ছাড়া এবং কোনো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি ছাড়া কাউকে দেশত্যাগে বাধা দিতে পারে না।

এসিসি মামলায় আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, সুনির্দিষ্ট রুলস বা আইন ছাড়া যথেচ্ছভাবে বিদেশ গমনে বাধা দেওয়া নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী। অর্থ ঋণ আদালতের ক্ষেত্রেও একই আইনি নীতি প্রযোজ্য।

উপসংহার:
অর্থ ঋণ আদালত আইনে সম্পত্তি ক্রোক করা বা শেষ অস্ত্র হিসেবে জেলে পাঠানোর বিধান থাকলেও, নাগরিকের পাসপোর্ট আটকে রাখা বা দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়নি। তাই ব্যাংক যদি কেবল টাকা আদায়ের কৌশল হিসেবে আপনার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করায়, তবে কালক্ষেপণ না করে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করাই আপনার সাংবিধানিক অধিকার পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com