অর্থজারী মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০৪): জারী মামলার কার্যধারাকে চ্যালেঞ্জ

আপনি জানেন কি- আপনার বিরুদ্ধে করা অর্থজারী মামলার কার্যধারাকে আপনি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন এবং প্রতিকার পেতে পারেন? আপনি কি জানেন যে- এই সংক্রান্তে হাইকোর্টে আসা এবং প্রতিকার চাওয়া আপনার একটি মৌলিক অধিকার? আর এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের? যদি না জানেন তবে আসুন জেনে নেই যে, অর্থজারী মামলার নোটিশ যথারীতি জারী না হলে, জারীর জন্য মামলা দাখিলের সময়সীমা লঙ্ঘন করা হলে, ২৮(৩) ধারার বিধান ও সোলেমানামা লঙ্ঘন হলে, নতুন জারী মামলা ছাড়া WA এর আদেশ হলে, এবং এক্সপোর্ট বিল সমন্বয় না করে অর্থজারী মামলা আপনার বিরুদ্ধে দায়ের করা হলে আপনি অর্থজারী মামলার কার্যধারাকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন এবং এই মর্মে প্রতিকার পেতে পারেন।

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর অধীনে মূল মামলা ডিক্রি হওয়ার পর ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডিক্রিকৃত টাকা আদায়ের জন্য 'জারী মামলা' দায়ের করে। এই পর্যায়ের কার্যধারা চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধির (CPC) চেয়ে অর্থ ঋণ আইনের বিশেষ বিধানগুলো বেশি কার্যকর। নিচে জারী মামলা চ্যালেঞ্জ করার প্রধান ভিত্তিগুলো আলোচনা করা হলো:

জারী মামলা চ্যালেঞ্জ করার প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ:
১. অর্থজারী মামলার নোটিশ যথারীতি জারী না হলে:
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ৩০ ধারায় নোটিশ জারীর বিধান করা হয়েছে। জারীকারকের মাধ্যমে এবং প্রাপ্তি স্বীকারসহ রেজিস্ট্রিকৃত ডাকযোগে নোটিশ পাঠাতে হবে। যদি ১৫ দিনের মধ্যে মধ্যে জারী হয়ে ফেরত না আসে, অথবা বিনা জারীতে ফেরত আসে, তাহলে আদালত, পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে বাদীর খরচে ১টি বহুল প্রচারিত বাংলা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়, এবং স্থানীয় ১টি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নোটিশ জারী করতে হবে। অর্থজারী মামলার নোটিশ যথারীতি জারী না হলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

২. জারীর জন্য মামলা দাখিলের সময়সীমা লঙ্ঘন:  
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ২৮ ধারায় বলা হয়েছে যে, ডিক্রী হওয়ার ১ বছরের মধ্যে জারীর জন্য আদালতে দরখাস্ত দাখিল করতে হবে। যদি ১ বছরের মধ্যে জারী মামলা করা না হয়,তবে আদালত মামলা খারিজ করে দিবেন। জারীর জন্য ২য় বা পরবর্তী মামলা, ১ম বা পূর্ববর্তী জারীর মামলা খারিজ বা নিষ্পত্তি হওয়ার পরবর্তী ১ বছর উত্তীর্ণ হওয়ার পরে দাখিল করলে তা তামাদিতে বারিত হবে। জারীর জন্য মামলা দাখিলের সময়সীমা লঙ্ঘন হলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

৩. ২৮(৩) ধারার বিধান ও সোলেমানামা লঙ্ঘন:
যদি ডিক্রি হওয়ার পর ব্যাংক এবং ঋণগ্রহীতার মধ্যে একটি আপস-মীমাংসা (Solenama) হয় এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়, কিন্তু ব্যাংক সেই আপস অমান্য করে জারী মামলা চালিয়ে যায়। ২৮(৩) ধারার অধীনে কিস্তি প্রদানের সুবিধা থাকা অবস্থায় জারী মামলার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা বেআইনি। ২৮(৩) ধারার বিধান ও সোলেমানামা লঙ্ঘন হলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

৪. নতুন জারী মামলা ছাড়া WA হয়:
যদি একটি জারী মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পর, ব্যাংক নতুন কোনো জারী মামলা (Fresh Execution Case) দায়ের না করেই সরাসরি আগের মামলা পুনরুজ্জীবিত করে গ্রেফতারি পরোয়ানা চায়। নতুন জারী মামলা ছাড়া WA আদেশ হলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

৫. এক্সপোর্ট বিল সমন্বয় না করা (Export Bill Adjustment):
যদি ব্যাংকের কাছে ঋণগ্রহীতার এক্সপোর্ট বিল বা লিয়েন করা এলসি (LC) জমা থাকে, কিন্তু ব্যাংক সেই টাকা সংগ্রহ বা সমন্বয় না করেই স্থাবর সম্পত্তি নিলামে তুলতে চায়। এক্সপোর্ট বিল সমন্বয় না করে বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে তুললে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যাবে এবং এই মর্মে প্রতিকার পাওয়া যাবে। 

বাস্তব উদাহরণ:
জনাব রহিমের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার ডিক্রি হয়েছে। জারী মামলায় আদালত তার ফ্যাক্টরি নিলামে তোলার আদেশ দিলেন। কিন্তু নিলামের বিজ্ঞপ্তিতে ফ্যাক্টরির তফসিল ভুল দেওয়া হলো এবং স্থানীয় একটি স্বল্প পরিচিত পত্রিকায় তা ছাপা হলো। জনাব রহিম হাইকোর্টে রিট করলেন এই গ্রাউন্ডে যে— ৩৩(১) ধারা অনুযায়ী যথাযথ প্রচারণা হয়নি, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি, এবং ব্যাংকের কাছে তার ১ কোটি টাকার এক্সপোর্ট বিল জমা আছে যা সমন্বয় করা হয়নি। হাইকোর্ট এক্ষেত্রে নিলামের ওপর স্থগিতাদেশ (Stay Order) প্রদান করে প্রকৃত পাওনা নির্ধারণের নির্দেশ দিতে পারেন।

হাইকোর্টে রিট পিটিশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রতিকার:
Stay of Execution- জারী মামলার সকল কার্যধারা বা নিলামের ওপর স্থগিতাদেশ, ১২ Equal Installments- হাইকোর্ট অনেক সময় সাম্যিক (Equitable) ক্ষমতা ব্যবহার করে পুরো পাওনা ১২টি সমান মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেন, এবং Restoration of Property- যদি বেআইনিভাবে সম্পত্তি দখল করা হয়, তবে তা ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com