অর্থঋণ মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রীট (পর্ব- ০২): সমন যথারীতি জারী না হওয়া মামলাকে চ্যালেঞ্জ

 আপনি জানেন কি- অর্থঋণ মামলায় সমন যথারীতি জারী না হলে অর্থঋণ মামলার এই আইনগত ত্রুটিকে চ্যালেঞ্জ করে আপনি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। আপনি কি জানেন যে- এই সংক্রান্তে হাইকোর্টে আসা ও প্রতিকার চাওয়া আপনার একটি মৌলিক অধিকার? আর এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের? যদি না জানেন, তবে আসুন জেনে নেই যে, যদি আপনার ওপর যথাযথভাবে সমন জারী না হয়, তাহলে আপনি মূল অর্থঋণ মামলার কার্যধারাকে চ্যালেঞ্জ করে কিভাবে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন;

নিচে এই বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করার প্রধান গ্রাউন্ডগুলো আলোচনা করা হলো:

১) যথারীতি সমন জারী না হওয়া:
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ৭ ধারা অনুযায়ী বিবাদীর ওপর যথাযথভাবে সমন জারি করতে হয়। এই সমন জারী যথারীতি না হলে মূল অর্থঋণ মামলার কার্যধারাকে চ্যালেঞ্জ করা যায়। 
 
ধারা-৭ এ বলা হয়েছে, “৭(১) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বাদী আদালতের জারীকারক কর্তৃক এবং প্রাপ্তি স্বীকারসহ রেজিষ্ট্রীকৃত ডাকযোগে প্রেরণের নিমিত্ত, আরজির সহিত সমন জারীর জন্য সমুদয় তলবনামা আদালতে দাখিল করিবেন, এবং আদালত অবিলম্বে উহাদের একযোগে জারীর ব্যবস্থা করিবেন, এবং যদি সমন ইস্যুর ১৫ (পনের) দিবসের মধ্যে জারী হইয়া ফেরত না আসে, অথবা তৎপূর্বেই বিনা জারীতে ফেরত আসে, তাহা হইলে আদালত উহার পরবর্তী ১৫ (পনের) দিবসের মধ্যে বাদীর খরচায় যে কোন একটি বহুল প্রচারিত বাংলা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়, এবং তদুপরি একটি স্থানীয় পত্রিকায়, যদি থাকে, এবং আদালত যদি ন্যায় বিচারের স্বার্থে প্রয়োজনীয় মনে করে, বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে সমন জারী করাইবেন, এবং অনুরূপ জারী আইনানুগ জারী মর্মে গণ্য হইবে।
 
(২) উপ-ধারা (১) এর বিধান এর অতিরিক্ত হিসাবে বাদী যদি নিজ খরচায় কোন সমন ও নোটিশ বিবাদীর উপর জারী করাইতে ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে আদালত পূর্ববর্তী উপ-ধারায় আদালতের জারীকারক কর্তৃক সমন জারীকরণের প্রথমোক্ত ব্যবস্থাটির অতিরিক্ত এই ব্যবস্থাটিও কার্যকর করিবে৷
(৩) জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে সমন জারীর আগাম ব্যবস্থা হিসাবে বাদী আরজি দাখিলের সময় আদালতে আরজির সহিত একটি নমুনা বিজ্ঞাপন দাখিল করিবেন, এবং আদালত পূর্ববর্তী উপ-ধারার বিধান অনুযায়ী করণীয় হইলে, উক্ত বিজ্ঞাপনটি প্রয়োজনীয় সংশোধন বা পরিবর্তন সাপেক্ষে, তাৎক্ষণিকভাবে জারীকরণের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করিবেন।“

উপরোক্ত ৭ ধারার শর্তগুলো যেমন- ডাকযোগে প্রাপ্তি স্বীকারসহ, জারীকারকের মাধ্যমে, ১৫ দিবসের মধ্যে জারীতে বা বিনা জারীতে ফেরত, পরবর্তী ১৫ দিবসের মধ্যে ১টি বহুল প্রচারিত বাংলা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এবং ১টি স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে সমন জারী, সমন জারীর অতিরিক্ত ব্যবস্থা ও আগাম ব্যবস্থা কার্যকর করা, ইত্যাদি কার্যক্রমে কোন আইনগত ক্রটি করলে সমন যথাযথভাবে জারী হয়নি বলে ধরা হবে। যদি সমনে ভুল ঠিকানা দেয়া হয়, জারী না হয়, পত্রিকায় বিজ্ঞাপনে অপপ্রয়োগ করা হয়, কিংবা সমন না দিয়েই ex parte proceeding করা হয়, তাহলে যেই আইনগত ব্যত্যয় ঘটবে তাকে ভিত্তিতে বা সেই গ্রাউন্ডে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করে মূল অর্থঋণ মামলার কার্যধারাকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে।

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৭ ধারায় সমন জারির সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বর্ণিত আছে। যদি কোনো বিবাদী বা ঋণগ্রহীতাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বা সমন জারি না করেই ডিক্রি প্রদান করা হয়, তবে তাকে "Ex-parte Decree" বা একতরফা ডিক্রি হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু যদি এই সমন জারির প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি বা পদ্ধতিগত ভুল থাকে, তবে সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যায়।

২( কেন এটি রিটযোগ্য? (Constitutional Basis):
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার অধিকার সবার আছে। সমন জারি না করে কাউকে দেনাদার সাব্যস্ত করা "Audi Alteram Partem" (কাউকে না শুনে দণ্ড দেওয়া যাবে না) নীতির পরিপন্থী। যেহেতু অর্থ ঋণ আইনে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিকার সীমিত, তাই রিট পিটিশনই একমাত্র কার্যকর পথ।

৩) অত্মপক্ষ সমর্থন বা শুনানীর সুযোগ:
যদি আপনর উপর সমন যথারীতি জারী না হয় তবে আপনি অর্থঋণ আদালতে উপস্থিত হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। এমনকি আপনি নিজে নিজেই আদালতে উপস্থিত হলেও আদালত যদি আপনাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তড়িঘড়ি করে একতরফা ডিক্রির দিকে এগোয় বা সমন জারি না করেই জারি মামলার ধাপ শুরু করে, তাহলে আপনি অর্থঋণ আদালতের এই পদক্ষেপসহ মামলার কার্যধারাকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন। আইনের একটা মূলনীতি আছে, সেটা হল- 'Audi Alteram Partem' (কারো কথা না শুনে তাকে দণ্ডিত করা যাবে না)। উচ্চ আদালত হোসেন বুলু মামলায় বলেন, সমন যথারীতি জারী না করে বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ডিক্রি প্রদান করা হলে তা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ।

৪) সমন জারিতে অনিয়মের প্রধান গ্রাউন্ডসমূহ (Grounds for Challenge):
৭ ধারা অনুযায়ী সমন জারির তিনটি মাধ্যম বাধ্যতামূলক; ১) আদালতের জারিকারকের মাধ্যমে, ২) রেজিস্ট্রার্ড ডাকযোগে (AD-সহ), এবং ৩) জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। যদি ব্যাংক বা আদালত এর কোনো একটি ধাপ এড়িয়ে যায় বা ত্রুটিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করে, তবে তা চ্যালেঞ্জযোগ্য।

৪.১) জারিকারকের মিথ্যা রিপোর্ট (Fraudulent Report of Process Server):
বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, জারিকারক বিবাদীর ঠিকানায় না গিয়েই 'বিবাদীকে পাওয়া গেল না' বা 'বিবাদী সমন নিতে অস্বীকার করেছেন' মর্মে মিথ্যা রিপোর্ট দেন। একে "False Return" বলা হয়। 

৪.২) ভুল ঠিকানায় সমন প্রেরণ:
ব্যাংক যদি ঋণগ্রহীতার বর্তমান ঠিকানা (last known address) এর পরিবর্তে এমন কোনো ঠিকানায় সমন পাঠায় যেখানে তিনি দীর্ঘদিন যাবত বসবাস করেন না, তবে সমন "যথারীতি জারি" হয়েছে বলে গণ্য হবে না।

৪.৩) সংবাদপত্র বিজ্ঞপ্তিতে অনিয়ম: 
আইন অনুযায়ী, বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়। যদি কোনো স্থানীয় বা নামসর্বস্ব পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় যা বিবাদীর নজরে আসা অসম্ভব, তবে তা ৭ ধারার লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ (Practical Example):
জনাব 'ক' চট্টগ্রাম শহরে ব্যবসা করেন। ব্যাংক তার বিরুদ্ধে মামলা করার সময় সমন পাঠিয়েছে তার পৈত্রিক ভিটায় (গ্রামের ঠিকানায়), যেখানে তিনি গত ২০ বছর যাবত যান না। জারিকারক সেখানে গিয়ে কাউকে না পেয়ে বাড়িতে সমন লটকে দিয়ে রিপোর্ট দিলেন। এরপর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো একটি অখ্যাত দৈনিকে। জনাব 'ক' কিছুই জানলেন না এবং তার বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার ডিক্রি হয়ে গেল। জারি মামলায় যখন তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা (WA) আসলো, তখন তিনি বিষয়টি জানলেন।

এক্ষেত্রে জনাব 'ক' হাইকোর্টে রিট করে সমন জারির প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন এবং ডিক্রির ওপর স্থগিতাদেশ (Stay Order) পেতে পারেন।

বিচারিক নজির (Judicial Precedents):
উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে সমন জারির বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছেন:
হোসেন বুলু মামলায় ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্টে বলা হয়েছে যে, সমন জারি না করে বা বিবাদীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো আদেশ প্রদান করা হলে তা আইনের দৃষ্টিতে বাতিল (Nullity)।

কাজী আব্দুর রউফ মামলায় বলা হয়েছে, সমন জারির ক্ষেত্রে জারীকারকের রিপোর্ট বা সার্ভিস রিটার্ন অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। যদি এতে জালিয়াতির গন্ধ থাকে, তবে সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

৫) Natural Justice Principle: 
উচ্চ আদালতের মতে, অর্থ ঋণ আদালত একটি বিশেষ আদালত হতে পারে, কিন্তু এটি principle of natural justice এর উর্ধ্বে নয়। যথাযথ সমন ব্যতিরেকে ডিক্রি কার্যকর করা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

৫) রিট পিটিশনের মাধ্যমে অধিকার ও প্রতিকার:
যদি সমন জারিতে অনিয়ম হয়, তবে হাইকোর্ট পিটিশনারকে নিম্নোক্ত প্রতিকার দিতে পারেন: 
Stay of execution বা জারি মামলার কার্যক্রম স্থগিত করতে পারেন এবং setting aside the decree বা একতরফা ডিক্রি বাতিল করে মামলাটি পুনরায় শুনানির (Remand) নির্দেশ দিতে পারেন।  

অতএব, সমন যথারীতি জারি না হওয়া কেবল একটি পদ্ধতিগত ভুল নয়, এটি ন্যায়বিচারের মূলে কুঠারাঘাত। যদি আপনি ব্যাংক বা আদালতের পক্ষ থেকে সমন পাননি বলে নিশ্চিত হন, তবে সময় নষ্ট না করে আপনার পাসপোর্টের কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা বসবাসের প্রমাণপত্র নিয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা উচিত। 


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com