অর্থঋণ মামলা সংক্রান্তে হাইকোর্টে রিট (পর্ব- ০১): আসল ঋণের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা দাবীর মামলাকে চ্যালেঞ্জ

পনি জানেন কি- আপনার বিরুদ্ধে করা অর্থঋণ মামলার কয়েকটি বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করে আপনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন? সেই বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হল- ব্যাংক যখন আসল ঋণের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা দাবী করে মামলা অর্থঋণ আদালতে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করবে তখন আপনি সেই আসল ঋণের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা দাবীর মামলাকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। আপনি কি জানেন যে- এই সংক্রান্তে হাইকোর্টে আসা ও প্রতিকার চাওয়া আপনার একটি মৌলিক অধিকার? আর এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের? যদি না জানেন, তবে আসুন জেনে নেই যে, মূল অর্থঋণ মামলার কার্যধারা চ্যালেঞ্জ করে কখন কিভাবে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করা যায়।

আপনি জানেন কি- ব্যাংক আপনার বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকে প্রকৃত দাবির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দেখিয়ে মামলা করলে কিংবা ব্যাংক আসল ঋণের টাকার চেয়ে ৩গুণের বেশি টাকা দাবী করে অর্থঋণ মামলা দায়ের করলে আপনি বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন? আপনি কি জানেন যে- এই সংক্রান্তে হাইকোর্টে আসা ও প্রতিকার চাওয়া আপনার একটি মৌলিক অধিকার? আর এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের? যদি না জানেন, তবে আসুন জেনে নেই যে, আসল ঋণের চেয়ে ৩গুণের বেশি টাকা দাবী করে অর্থাৎ ২০০% (১০০+২০০=৩০০ টাকা) এর অধিক টাকা দাবী করে আপনার বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের হলে আপনি সেই অর্থঋণ মামলার কার্যধারা চ্যালেঞ্জ করে কখন কিভাবে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারেন;

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকের প্রকৃত পাওনা আদায় করা। কিন্তু অনেক সময় ব্যাংক ঋণের আসলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা দাবি করে মামলা করে, যা ন্যায়বিচার পরিপন্থি। এই ধরনের Excessive Claim চ্যালেঞ্জ করার আইনি ভিত্তিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১) ব্যাংকের প্রকৃত দাবির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দেখিয়ে মামলা করা (Excessive Plaint Valuation):

ব্যাংক যদি ঋণের আসল টাকা এবং আইনত অনুমোদিত সুদের বাইরে অতিরিক্ত বা দণ্ড সুদ (Compound Interest) যোগ করে মামলার মূল্য (Plaint Valuation) বাড়িয়ে দেখায় বা ব্যাংক প্রকৃত পাওনার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে, তবে তা চ্যালেঞ্জযোগ্য। আদালত যদি statement of accounts যাচাই না করে whimsically মামলা গ্রহন করেন, কিংবা আইনের প্রকাশ্য ভুল (Error of law apparent on the face of the record) থাকে। ব্যাংক অনেক সময় ডিক্রি পাওয়ার আশায় আসলের ওপর চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ (Compound Interest) বা পেনাল ইন্টারেস্ট যোগ করে মামলার দাবি (Plaint Valuation) অনেক বাড়িয়ে দেখায়। এ ক্ষেত্রে আপনি Plaint Valuation, arbitrary valuation, Inflated claim, Compound Interest, Illegal interest calculation এগুলোকে mala fide বা abuse of process হিসাবে চিহ্নিত করে এবং চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন এবং প্রতিকার পেতে পারেন। 

২) মামলার দাবী আসল ঋণের চেয়ে ৩গুণের বেশি হলে মামলা অগ্রহণযোগ্য:
অর্থ ঋণ আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী সুদ আরোপের সীমাবদ্ধতা আছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সিডিউল রেটের বাইরে অতিরিক্ত সুদ দাবি করা যাবে না।

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ৪৭ ধারায় বলা হয়েছে, “৪৭(১) বর্তমানে প্রচলিত অন্য কোন আইন বা পক্ষগণের মধ্যে সম্পাদিত সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে যাহাই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে, কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোন ঋণ গ্রহীতাকে প্রদত্ত আসল ঋণের উপর দায় এমনভাবে আরোপ করিয়া আদালতে মামলা দায়ের করিবে না, যাহাতে আদালতে উত্থাপিত উক্ত সমুদয় দাবী আসল ঋণ অপেক্ষা ২০০% (১০০+২০০=৩০০ টাকা) এর অধিক হয়৷ (২) উপ-ধারা (১) এ বর্ণিত মতে আসল ঋণ অপেক্ষা ২০০% এর অধিক অনুরূপ দাবী আদালত কর্তৃক গ্রহণযোগ্য হইবে না৷”

উদাহরণ: ঋণের আসল ১০০ টাকা, ব্যাংক সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা দাবী করে অর্থঋণ মামলা দায়ের করতে পারবে। কিন্তু, ব্যাংক আইনের বিধানে বাইরে গিয়ে ৪০০ টাকা দাবি করে মামলা করল, তাহলে তা হবে Mala fide বা abuse of process। এই ক্ষেত্রে আপনি এই inflated valuation, penal charges, interest calculation কে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন এবং প্রতিকার পেতে পারেন।

২.১) আইনের ৪৭ ধারার লঙ্ঘন:
অর্থ ঋণ আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী, ব্যাংক কেবল চুক্তিবদ্ধ সুদ এবং আইনগত খরচ দাবি করতে পারে। ব্যাংক যদি চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত 'দণ্ড সুদ' (Penal Interest) বা অবৈধ 'সার্ভিস চার্জ' যোগ করে দাবীর টাকা বাড়িয়ে দেখায়, তবে তা এই আইনের পরিপন্থী।

২.২) চক্রবৃদ্ধি সুদের অবৈধ প্রয়োগ (Illegal Compound Interest):
অনেক ব্যাংক সাধারণ সুদের পরিবর্তে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ (Interest on Interest) যোগ করে টাকা দাবির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া চক্রবৃদ্ধি সুদ আরোপ করা অবৈধ। এটি আরজির দাবীর সত্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে, এই অর্থঋণ মামলাকে হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে আপনি প্রতিকার পেতে পারেন।

২.৩) কিস্তি বা পেমেন্ট বা বিল সমন্বয় না করা (Non-adjustment of Payments):
বিবাদী যদি মামলার আগে কোনো টাকা বা কিস্তি বা বিল জমা দিয়ে থাকেন এবং ব্যাংক যদি সেই টাকা adjust না করে বা বাদ না দিয়েই পূর্ণ দাবীর ওপর মামলা করে, তবে আরজির মূল্যায়ন (Valuation) ভুল হিসেবে গণ্য হবে। ফলে, এই অর্থঋণ মামলাকে হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে আপনি প্রতিকার পেতে পারেন।

উদাহরণ:
রহমান সাহেব ব্যাংক থেকে ১ কোটি টাকা লোন নিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে ৫০ লাখ টাকা কিস্তি হিসেবে পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ব্যাংক মামলা করার সময় সেই ৫০ লাখ টাকা সমন্বয় (Adjust) না করেই ২ কোটি টাকা (অতিরিক্ত সুদসহ) দাবি করে মামলা ফাইল করল।

এক্ষেত্রে রহমান সাহেবের কাজ হল: 
আরজিতে উল্লিখিত 'Statement of Accounts' চ্যালেঞ্জ করা। কিস্তি পরিশোধের রসিদ দাখিল করে প্রমাণ করা যে আরজির দাবি অতিরঞ্জিত। হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে মামলার কার্যক্রম স্থগিত চাওয়া, যেহেতু আদালত অত্র দাবির সত্যতা যাচাই না করেই মামলা গ্রহণ করেছেন। এই অর্থঋণ মামলাকে হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে স্থগিত করা এবং মূল অর্থ ঋণ মামলার set aside চাওয়া। 

বিচারিক নজির (Judicial Precedents): 
উচ্চ আদালত বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, ব্যাংক যা দাবি করবে আদালত চোখ বন্ধ করে তা মেনে নিতে বাধ্য নন। অর্থ ঋণ আদালত ব্যাংকের দেওয়া 'Statement of Accounts' যান্ত্রিকভাবে (Mechanically) গ্রহণ করতে পারে না। আদালতকে অবশ্যই দেখতে হবে যে দাবিটি আইনসম্মত কি না। ন্যাশনাল ব্যাংক মামলায় দেখা গেছে ব্যাংক সুদের ওপর সুদ যোগ করে দাবির পরিমাণ বাড়িয়েছিল। হাইকোর্ট উক্ত অতিরঞ্জিত দাবি সংশোধন না করা পর্যন্ত মামলার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। উচ্চ আদালতের মতে, ঋণ গ্রহীতাকে কেবল সেই পরিমাণ টাকাই দিতে বাধ্য করা যাবে যা তিনি আইনত ঋণী। অতিরিক্ত দাবি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

৩) বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার লঙ্ঘন: 
বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে ঋণের সুদ মওকুফ বা নির্দিষ্ট হারে সুদ আরোপের সার্কুলার জারি করে। ব্যাংক যদি সেই সার্কুলার অমান্য করে অতিরিক্ত দাবি করে, তবে তা রিট করার শক্তিশালী গ্রাউন্ড। ফলে, এই অর্থঋণ মামলাকে হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে আপনি প্রতিকার পেতে পারেন।

৪) Due process violation:
ব্যাংক যদি অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ৪৭ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে তবে তা হবে abuse of process বা due process violation. আর process violation হলে বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১নং অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন হবে এবং ৪২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপনার fundamental rights violation হবে। আপনার fundamental rights violation হলে আপনি মহামান্য হাইকোর্টের নিকট প্রতিকার চাওয়া অধিকারী হবেন, অধিকার হিসাবে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিকার চাইতে পারবেন। 

আপনি হাইকোর্টে যে বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জ করবেন, সেগুলো হল- Arbitrary Valuation অর্থাৎ আরজির মূল্যায়নটি খেয়ালি, Non-Application of Judicial Mind অর্থাৎ নিম্ন আদালত আরজি গ্রহণের সময় গাণিতিক ভুল বা অতিরিক্ত সুদের বিষয়টি বিবেচনা করেননি, এবং Violation of Fundamental Rights অর্থাৎ ভুল দাবির কারণে বিবাদীর সম্পত্তি নিলাম হওয়ায় সম্পত্তির অধিকারের লঙ্ঘন।    

ব্যাংক যখন প্রকৃত দাবির চেয়ে অনেক বেশি টাকা চেয়ে মামলা করে, তখন বিবাদীর উচিত দ্রুত আইনজীবীর মাধ্যমে ব্যাংকের 'Statement of Accounts' নিরীক্ষা (Audit) করা। যদি সেখানে অবৈধ সুদ বা অ-সমন্বয়কৃত টাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে উচ্চ আদালতে রিট করে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা, প্রকৃত পাওনা নির্ধারণের নির্দেশনা চাওয়া, সর্বপরি নিজের অধিকার আদায়ে অর্থ ঋণ মামলার set aside চাওয়া।

অতএব, ব্যাংক তার প্রকৃত দাবির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দেখিয়ে মামলা করলে কিংবা ব্যাংকের মামলার দাবী আসল ঋণের চেয়ে ৩গুণের বেশি হলে আপনি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে বিষয়টাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন এবং এই মর্মে প্রতিকার পেতে পারেন।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮ ০১৭১১ ৯৯ ৩৬ ৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com