বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-২৩): পণ্য বিক্রয় ও সেবা প্রদান চুক্তি (agreements for sale of goods or provision of services) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ

ভূমিকা:
যেকোনো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যবসা-বাণিজ্য, আর ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি হলো 'পণ্য কেনাবেচা' এবং 'সেবা প্রদান'। কাঁচামাল ক্রয় থেকে শুরু করে ডিলারশিপ, লজিস্টিকস কিংবা প্রফেশনাল সার্ভিস—সবকিছুই কোনো না কোনো চুক্তির অধীনে সম্পন্ন হয়। এসব চুক্তিতে যখন কোনো পক্ষ শর্ত ভঙ্গ করে, তখন তৈরি হয় বাণিজ্যিক বিরোধ।

বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৭)-তে সুস্পষ্টভাবে "পণ্য বিক্রয় বা সেবা প্রদান সংক্রান্ত চুক্তি"-কে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি সম্ভবত বাণিজ্যিক আদালতের সবচেয়ে সাধারণ এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ধারা। এই ধারার ফলে ব্যবসায়ীদের পাওনা টাকা আদায় বা সরবরাহকারীর চুক্তিভঙ্গের কারণে হওয়া ক্ষতির প্রতিকার এখন সাধারণ দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার হাত থেকে রেহাই পেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। সাধারণত সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতার (B2C) ছোটখাটো বিরোধ ভোক্তা অধিকারে গেলেও, কর্পোরেট বা বিটুবি (B2B) লেনদেনের বিরোধগুলো এই ধারার অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে বিচার্য।

নিচে পণ্য বিক্রয় বা সেবা প্রদান চুক্তির অধীনে সৃষ্ট প্রধান বাণিজ্যিক বিরোধসমূহ, মামলার সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ড (কারণ) এবং সেগুলোর বাস্তব উদাহরণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা বা বিলম্ব (Failure or Delay in Delivery of Goods):

সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিক্রেতা বা সরবরাহকারী (Supplier) যদি চুক্তিতে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারে, তবে ক্রেতার ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়া। (২) পণ্য সরবরাহে অযৌক্তিক বিলম্ব করা, যার ফলে ক্রেতার কারখানার উৎপাদন বা প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া। এবং (৩) সম্পূর্ণ চালানের (Consignment) বদলে আংশিক পণ্য সরবরাহ করে কাজ আটকে রাখা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (কাঁচামাল সরবরাহে ব্যর্থতা): 
একটি তৈরি পোশাক (RMG) কারখানা ইউরোপের একটি বায়ারের অর্ডার ধরার জন্য স্থানীয় একটি টেক্সটাইল মিলের সাথে ১০ টন সুতা সরবরাহের চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত ছিল ১৫ তারিখের মধ্যে সুতা ডেলিভারি দিতে হবে। কিন্তু টেক্সটাইল মিলটি সুতা ডেলিভারি দিতে ১ মাস দেরি করে ফেলে। ফলে পোশাক কারখানাটি বায়ারের অর্ডারটি হারায় এবং তাদের বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষ "পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ও চুক্তিভঙ্গের" কারণে বাণিজ্যিক আদালতে টেক্সটাইল মিলের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (উৎপাদন ব্যাহত): 
একটি তৈরি পোশাক (Garments) কারখানার সাথে একটি টেক্সটাইল মিলের চুক্তি হলো যে তারা ১৫ তারিখের মধ্যে ১০ টন সুতা সরবরাহ করবে, যাতে কারখানাটি বিদেশি বায়ারের শিপমেন্ট ধরতে পারে। কিন্তু টেক্সটাইল মিলটি ১৫ তারিখের বদলে ৩০ তারিখে সুতা দিল। এর ফলে শিপমেন্ট বাতিল হওয়ায় গার্মেন্টস কারখানার যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হলো, তা আদায়ের জন্য তারা ধারা ২(ঘ)(১৭) এর অধীনে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (মৌসুমি ব্যবসা): 
ঈদ উপলক্ষে একটি বুটিক হাউস একজন পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫,০০০ পিস থ্রি-পিস কেনার চুক্তি করল এবং অগ্রিম টাকা দিল। কিন্তু ব্যবসায়ী পণ্যগুলো ডেলিভারি দিল ঈদের পরদিন, যখন ওই পোশাকের আর কোনো চাহিদা নেই। বুটিক হাউসটি অগ্রিম টাকা ফেরত এবং ব্যবসার ক্ষতির জন্য মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (নির্মাণসামগ্রী সরবরাহে গাফিলতি): 
একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি তাদের মেগা প্রজেক্টের জন্য একটি সিমেন্ট কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু সিমেন্ট কোম্পানিটি বাজারের দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে চুক্তি অনুযায়ী আগের দামে সিমেন্ট সরবরাহ করা বন্ধ করে দেয়। রিয়েল এস্টেট কোম্পানিটি তখন "চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট মূল্যে পণ্য সরবরাহে অস্বীকৃতির" গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করে সরবরাহ চালুর আদেশ (Specific Performance) চাইতে পারবে।

২. ত্রুটিপূর্ণ, নিম্নমানের বা চুক্তির স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত পণ্য সরবরাহ (Supply of Defective or Substandard Goods):
'বিক্রয় চুক্তি' (Contract of Sale) অনুযায়ী ক্রেতা যে মানের পণ্য বা যে নমুনার (Sample) ভিত্তিতে অর্ডার করেন, বিক্রেতাকে ঠিক সেই মানের পণ্যই সরবরাহ করতে হয়। পণ্যের মান খারাপ হলে বা স্পেসিফিকেশন না মিললে তা বড় ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধের জন্ম দেয়।

মামলার প্রেক্ষাপট: ক্রেতা যে স্পেসিফিকেশন, স্যাম্পল (Sample) বা গুণগত মানের কথা বলে পণ্য অর্ডার করেন, বিক্রেতাকে ঠিক সেই মানের পণ্যই সরবরাহ করতে হয়। বিক্রেতা যদি নিম্নমানের, ভেজাল বা ত্রুটিপূর্ণ পণ্য সরবরাহ করেন যা ক্রেতার কোনো কাজে আসে না, তবে ক্রেতা ওই পণ্য প্রত্যাখ্যান করে মূল্য ফেরত বা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারেন।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) সরবরাহকৃত পণ্য চুক্তিতে উল্লেখিত মানের (Quality standard) না হওয়া। (২) নমুনার (Sample) ভিত্তিতে পণ্য অর্ডার করার পর, মূল ডেলিভারির পণ্যের সাথে নমুনার মিল না থাকা। এবং (৩) ড্যামেজড (Damaged) বা ত্রুটিপূর্ণ (Defective) পণ্য সরবরাহ করা এবং তা ফেরত নিতে অস্বীকার করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (নমুনার সাথে গরমিল): 
একজন চালের পাইকারি ব্যবসায়ী একটি অটো রাইস মিল থেকে 'মিনিকেট' চালের নমুনা দেখে ১০০ টন চালের অর্ডার দেন। কিন্তু ডেলিভারি পাওয়ার পর দেখা যায়, চালের বস্তার ওপরে ভালো চাল থাকলেও ভেতরে নিম্নমানের মোটা চাল মেশানো। রাইস মিল মালিক চাল ফেরত নিতে অস্বীকার করলে, পাইকারি ব্যবসায়ী "প্রতারণা ও নমুনার সাথে পণ্যের গরমিলের" গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে টাকা ফেরত চাইবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ত্রুটিপূর্ণ মেশিনারি): 
একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার জার্মানির একটি ব্র্যান্ডের লোকাল ডিস্ট্রিবিউটরের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা দিয়ে একটি এমআরআই (MRI) মেশিন কেনে। কিন্তু মেশিনটি ইন্সটল করার পর থেকেই ভুল রিপোর্ট দিতে থাকে এবং বারবার নষ্ট হয়ে যায়। ডিস্ট্রিবিউটর মেশিনটি বদলিয়ে দিতে রাজি না হলে, ডায়াগনস্টিক সেন্টার "ত্রুটিপূর্ণ পণ্য বিক্রয় ও স্পেসিফিকেশন লঙ্ঘনের" কারণে মামলা দায়ের করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (যন্ত্রপাতি সরবরাহ): 
একটি হাসপাতাল জার্মানি থেকে ৩টি আইসিইউ ভেন্টিলেটর আমদানি করার জন্য একটি লোকাল সাপ্লায়ারকে অর্ডার দিল। সাপ্লায়ার জার্মানির মেশিনের বদলে চীন থেকে আনা সস্তা ও ভিন্ন স্পেসিফিকেশনের মেশিন ডেলিভারি দিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই চুক্তিভঙ্গের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (নির্মাণ সামগ্রী): 
একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য '৬০ গ্রেড'-এর রড কেনার চুক্তি করল। কিন্তু ডেলিভারির পর ল্যাব টেস্টে দেখা গেল সাপ্লায়ার '৪০ গ্রেড'-এর নিম্নমানের রড দিয়েছে, যা ব্যবহার করলে ভবন ধসে পড়তে পারে। কনস্ট্রাকশন কোম্পানি চুক্তি বাতিল করে সাপ্লায়ারের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।

৩. পণ্যের মূল্য বা সেবার বিল পরিশোধে ব্যর্থতা (Non-payment or Delay in Payment of Invoices):
পণ্য বিক্রয় বা সেবা প্রদান চুক্তিতে সবচেয়ে বেশি যে বিরোধটি দেখা যায় তা হলো—পণ্য বা সেবা ঠিকমতো বুঝিয়ে পাওয়ার পরও ক্রেতা বা ক্লায়েন্ট কর্তৃক মূল্য পরিশোধ না করা।

মামলার প্রেক্ষাপট: বাণিজ্যের সবচেয়ে পরিচিত বিরোধ এটি। বিক্রেতা বা সেবা প্রদানকারী সফলভাবে পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার বা সেবা সম্পন্ন করার পর ক্রেতা বা ক্লায়েন্ট যদি ইনভয়েসের (Bill) টাকা দিতে অস্বীকার করে, আংশিক পেমেন্ট করে বা চুক্তিতে উল্লেখিত ক্রেডিটের সময় (যেমন- ৩০ বা ৬০ দিন) পার হওয়ার পরও টাকা আটকে রাখে, তবে পাওনাদার বকেয়া টাকা ও বিলম্ব ফিসহ (Interest) আদায়ের জন্য মামলা করতে পারে।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) ইনভয়েস (Invoice) বা বিল অনুযায়ী ক্রেডিট পিরিয়ড (যেমন: ৩০ বা ৯০ দিন) পার হওয়ার পরও টাকা পরিশোধ না করা। (২) পণ্য বিক্রির পর ক্রেতা কর্তৃক চেক প্রদান করা এবং তা বাউন্স (Dishonored) হওয়া (এটি এনআই অ্যাক্টের পাশাপাশি বাণিজ্যিক আদালতেও চুক্তিভঙ্গের মামলা হিসেবে চলতে পারে)। এবং (৩) অযৌক্তিক বা ঠুনকো কারণ দেখিয়ে সরবরাহকারীর বিল থেকে অন্যায়ভাবে টাকা কেটে রাখা (Unjustified deduction)।

বাস্তব উদাহরণ ১ (বকেয়া বিল আদায়): 
একটি পোলট্রি ফিড উৎপাদনকারী কোম্পানি কয়েকজন ডিলারকে বাকিতে (Credit) ১০ লাখ টাকার ফিড সরবরাহ করল। ডিলাররা বাজারে ফিড বিক্রি করে টাকা তুলে নিলেও কোম্পানিকে তাদের পাওনা টাকা দিচ্ছে না এবং নানা অজুহাত দেখাচ্ছে। কোম্পানিটি বকেয়া আদায়ের জন্য সরাসরি বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (সেবা প্রদানের বিল): 
একটি সিকিউরিটি সার্ভিস কোম্পানি একটি করপোরেট অফিসে ৫০ জন নিরাপত্তারক্ষী প্রদান করে। কিন্তু করপোরেট অফিসটি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই গত ৩ মাসের সার্ভিস বিল আটকে রেখেছে। সিকিউরিটি কোম্পানিটি তাদের প্রাপ্য বিল আদায়ে ধারা ২(ঘ)(১৭) এর অধীনে আইনি প্রতিকার চাইতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (সুপারশপের বকেয়া): 
একটি অ্যাগ্রো-ফার্ম (সরবরাহকারী) দেশের একটি বড় সুপারশপ চেইনে নিয়মিত তাজা শাকসবজি ও মাংস সরবরাহ করে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসের বিল পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করার কথা। কিন্তু সুপারশপটি পণ্য বিক্রি করে টাকা আয় করলেও সরবরাহকারীকে গত ৬ মাসের বিল (প্রায় ৫০ লাখ টাকা) পরিশোধ করছে না। সরবরাহকারী তখন তার "বকেয়া বিল আদায়ের" জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিল আটকে রাখা): 
একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা (Advertising Agency) একটি কর্পোরেট কোম্পানির জন্য একটি সফল টিভিসি (TVC) ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। ক্যাম্পেইন শেষে কোম্পানিটির বিক্রি বাড়লেও তারা বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে তাদের সেবার বিল (Service Fee) ২০ লাখ টাকা "বাজেট নেই" অজুহাতে আটকে রাখে। বিজ্ঞাপনী সংস্থাটি "সেবা প্রদানের পর মূল্য পরিশোধে ব্যর্থতার" গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবে।

৪. ত্রুটিপূর্ণ সেবা প্রদান বা সেবার মান লঙ্ঘন (Deficiency in Provision of Services):

শুধু পণ্য নয়, সেবা (Service) প্রদানের ক্ষেত্রেও সেবার মান (Standard of care) বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। লজিস্টিকস, কনসালটেন্সি, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, সিকিউরিটি সার্ভিস ইত্যাদি ক্ষেত্রে সেবার মান নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।

মামলার প্রেক্ষাপট: যখন কোনো প্রতিষ্ঠান পেশাদারি সেবার (Professional/Commercial Services) জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়, তখন তাদের কাজের একটি নির্দিষ্ট মান (Standard of Care) বজায় রাখতে হয়। সেবা প্রদানকারী যদি অদক্ষতা দেখায়, কাজ অসম্পূর্ণ রাখে বা তাদের অবহেলার কারণে ক্লায়েন্টের ক্ষতি হয়, তবে তা সেবা চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) চুক্তিতে উল্লেখিত মানে বা পেশাদারিত্বের সাথে (Professional skill and care) সেবা প্রদান করতে ব্যর্থ হওয়া। (২) সেবাদাতার চরম অবহেলা বা অদক্ষতার কারণে ক্লায়েন্টের আর্থিক বা ব্যবসায়িক ক্ষতি হওয়া। এবং (৩) মাঝপথে কাজ ফেলে চলে যাওয়া বা অসমাপ্ত সেবা প্রদান করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ইন্টেরিয়র ডিজাইনে গাফিলতি): 
একটি বহুজাতিক কোম্পানি তাদের নতুন করপোরেট অফিসের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের জন্য একটি ফার্মকে নিয়োগ দেয়। চুক্তিতে 'প্রিমিয়াম ফিটিংস' ব্যবহার করার কথা থাকলেও, ফার্মটি বেশি লাভের আশায় সস্তা ও নিম্নমানের ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে এবং কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল দাবি করে। কোম্পানিটি তখন "চুক্তিভঙ্গ ও সেবার মান লঙ্ঘনের (Deficiency in service)" গ্রাউন্ডে ফার্মটির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (লজিস্টিকস সেবায় অবহেলা): 
একটি কোল্ড চেইন লজিস্টিকস কোম্পানি একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন পরিবহনের দায়িত্ব নেয়। চুক্তিতে বলা ছিল গাড়ির তাপমাত্রা সবসময় ২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখতে হবে। কিন্তু পরিবহনকারী গাড়ির চালকের অবহেলায় এসি বন্ধ থাকায় লাখ টাকার ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে যায়। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিটি "সেবা প্রদানে অবহেলা এবং শর্তভঙ্গের" কারণে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করবে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (পরিবহন সেবা): 
একটি ওষুধ কোম্পানি তাদের জীবনরক্ষাকারী ইনসুলিন (যা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয়) সারা দেশে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি কোল্ড-চেইন ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির সাথে চুক্তি করল। কিন্তু ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির ফ্রিজার ভ্যান নষ্ট থাকায় লাখ টাকার ইনসুলিন নষ্ট হয়ে গেল। ওষুধ কোম্পানিটি এই সেবার ঘাটতির জন্য ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (ইন্টেরিয়র সেবা): 
একটি আইটি কোম্পানি তাদের নতুন অফিসের ইন্টেরিয়র করার জন্য একটি ফার্মকে দায়িত্ব দিল এবং ২ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার চুক্তি হলো। ফার্মটি টাকা নিয়ে অর্ধেক কাজ করার পর কাজ ফেলে রেখে চলে যায়। আইটি কোম্পানিটি অসম্পূর্ণ কাজের জন্য ক্ষতিপূরণ ও অগ্রিম অর্থ ফেরতের মামলা করতে পারে।

৫. ওয়ারেন্টি, এএমসি (AMC) এবং বিক্রয়োত্তর সেবা লঙ্ঘন (Breach of Warranty and After-Sales Service):

যন্ত্রপাতি বা ইলেকট্রনিক্স পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিক্রয়োত্তর সেবা বা গ্যারান্টি/ওয়ারেন্টি। বাণিজ্যিক চুক্তিতে অ্যানুয়াল মেইনটেন্যান্স কন্ট্রাক্ট (AMC) বা রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তিও এর আওতাভুক্ত।

মামলার প্রেক্ষাপট: অনেক সময় বাণিজ্যিক যন্ত্রপাতি বা ইলেকট্রনিক্স পণ্য বিক্রয়ের সময় ১ বা ২ বছরের ওয়ারেন্টি বা বিক্রয়োত্তর সেবার (After-sales Service) চুক্তি থাকে। ওয়ারেন্টি চলাকালীন পণ্যটি নষ্ট হলে বিক্রেতা যদি তা মেরামত বা পরিবর্তন করে দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ক্রেতা বাণিজ্যিক আদালতে যেতে পারেন।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) ওয়ারেন্টি পিরিয়ডের মধ্যে পণ্য নষ্ট হলে তা মেরামত বা প্রতিস্থাপন (Replace) করে দিতে অস্বীকার করা। (২) এএমসি (AMC) চুক্তির আওতায় নিয়মিত সার্ভিসিং বা রক্ষণাবেক্ষণ না করা। এবং (৩) মেরামতের জন্য দিনের পর দিন সময় নিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (এলিভেটর বা লিফট রক্ষণাবেক্ষণ): 
একটি ১৫ তলা কমার্শিয়াল ভবনের মালিক সমিতি একটি লিফট কোম্পানির সাথে বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি (AMC) করে। চুক্তি অনুযায়ী, লিফট নষ্ট হলে ৩ ঘণ্টার মধ্যে মেকানিক এসে ঠিক করে দেবে। কিন্তু একদিন ভবনের মূল লিফট নষ্ট হয়ে যায় এবং কোম্পানিকে বারবার কল দেওয়ার পরও তারা ৩ দিন ধরে কোনো লোক পাঠায়নি, ফলে ভবনের অফিসগুলোর চরম ক্ষতি হয়। মালিক সমিতি "AMC চুক্তি লঙ্ঘন ও সেবায় গাফিলতির" গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (জেনারেটরের ওয়ারেন্টি): 
একটি গার্মেন্টস কারখানা ৫ বছরের ওয়ারেন্টিসহ একটি বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল জেনারেটর কেনে। ২ বছরের মাথায় জেনারেটরের মূল পার্টস নষ্ট হয়ে যায়। ওয়ারেন্টি থাকা সত্ত্বেও সরবরাহকারী কোম্পানি পার্টস পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত টাকা দাবি করে। কারখানা কর্তৃপক্ষ "ওয়ারেন্টির শর্তভঙ্গ" করার কারণে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (লিফট সরবরাহ): 
একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি একটি সাপ্লায়ারের কাছ থেকে ৫টি কমার্শিয়াল লিফট কিনল, যার সাথে ২ বছরের পার্টস রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি ছিল। ৬ মাসের মাথায় দুটি লিফটের মাদারবোর্ড পুড়ে যায়। সাপ্লায়ার চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে মাদারবোর্ড পরিবর্তন করতে অস্বীকার করে নতুন করে টাকা দাবি করে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (অফিস ইকুইপমেন্ট): 
একটি বিপিও (BPO) ফার্ম তাদের অফিসের জন্য ১০০টি কম্পিউটার কিনল ১ বছরের সার্ভিস ওয়ারেন্টিসহ। কিন্তু বারবার কম্পিউটারগুলো হ্যাং করলেও সাপ্লায়ার কোনো সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার পাঠায় না। ফার্মটি তাদের সেবার মান ক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণে সাপ্লায়ারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।

৬. পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি বা অন্যায়ভাবে চুক্তি বাতিল (Refusal to Accept Goods or Wrongful Termination):

বিক্রেতা সঠিক পণ্য সঠিক সময়ে পাঠালেও অনেক সময় ক্রেতা হঠাৎ করে পণ্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বা মাঝপথে সেবার চুক্তি বাতিল করে দেয়।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) সঠিক ও মানসম্মত পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার পরও ক্রেতা কর্তৃক তা গ্রহণ করতে (Non-acceptance) অস্বীকৃতি জানানো। এবং (২) কোনো যৌক্তিক কারণ বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সেবাদাতার সাথে চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করা। 

বাস্তব উদাহরণ ১ (পচনশীল পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি): 
একজন সরবরাহকারী চুক্তি অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৫ ট্রাক আপেল ঢাকার একজন ফল আমদানিকারকের গোডাউনে নিয়ে আসে। কিন্তু আমদানিকারক হঠাৎ করে বাজারে আপেলের দাম কমে যাওয়ায় ওই আপেলের ট্রাকগুলো গোডাউনে ঢোকাতে দেয় না এবং চুক্তি বাতিল করে। আপেলগুলো পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হলে সরবরাহকারী ওই আমদানিকারকের বিরুদ্ধে "পণ্য গ্রহণে বেআইনি অস্বীকৃতি ও চুক্তিভঙ্গের" গ্রাউন্ডে ক্ষতিপূরণ মামলা করবে।

৭. বেআইনিভাবে বা পূর্ব নোটিশ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাতিলকরণ (Wrongful Termination of Long-term Supply/Service Contract):

মামলার প্রেক্ষাপট: ব্যবসা-বাণিজ্যে কাঁচামাল বা নিরবচ্ছিন্ন সেবার জন্য অনেক সময় ৩ বা ৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি (Long-term Contract) করা হয়। এই ধরনের চুক্তিতে সাধারণত বলা থাকে যে চুক্তি বাতিল করতে হলে অন্তত ৩ বা ৬ মাসের অগ্রিম নোটিশ দিতে হবে। কোনো পক্ষ যদি এই নিয়ম না মেনে হঠাৎ করে একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করে দেয়, তবে অপর পক্ষ মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (কাঁচামাল সরবরাহ বাতিল): 
একটি বেকারি কারখানার সাথে একটি ময়দা মিলের বাৎসরিক চুক্তি ছিল যে তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট দামে ১ টন ময়দা দেবে। হঠাৎ করে বাজারে গমের দাম বেড়ে যাওয়ায় ময়দা মিলটি কোনো নোটিশ ছাড়াই ময়দা দেওয়া বন্ধ করে দিল। এর ফলে বেকারির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। বেকারি কর্তৃপক্ষ চুক্তি বাতিল করার নিয়ম ভঙ্গের জন্য ময়দা মিলের বিরুদ্ধে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (আইটি মেইনটেন্যান্স বাতিল): 
একটি ব্যাংক একটি থার্ড-পার্টি আইটি ফার্মের সাথে ৫ বছরের সার্ভার মেইনটেন্যান্স চুক্তি করল। ২ বছর পর ব্যাংকটি কোনো কারণ দর্শানো বা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী '৯০ দিনের এক্সিট নোটিশ' না দিয়েই অন্য একটি ফার্মকে কাজ দিয়ে দিল। প্রথম আইটি ফার্মটি বেআইনি চুক্তি বাতিলের কারণে তাদের বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য লাভের ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।

উপসংহার:
একটি দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থা মূলত পণ্য ও সেবা বিনিময় চুক্তির ওপরই টিকে থাকে। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৭) এর অধীনে "পণ্য বিক্রয় বা সেবা প্রদান সংক্রান্ত চুক্তি"কে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী, ঠিকাদার এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো একটি বড় সুরক্ষা পেল। ক্রেতা কর্তৃক বিল আটকে রাখা বা বিক্রেতা কর্তৃক নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে দেওয়ার মতো নৈমিত্তিক বিরোধগুলো এখন প্রথাগত দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার বদলে বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হবে, যা দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ (Ease of Doing Business) উন্নত করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com