বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-২১): শিল্প-নকশা (Industrial Design) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ
ভূমিকা:
বাংলাদেশ শিল্প-নকশা আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ‘শিল্প-নকশা’বলতে মূলত শিল্পোৎপাদিত কোনো পণ্যের বৈশিষ্ট্যজনিত আকৃতি, রেখা, রং, গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস, ক্যালিগ্রাফি ইত্যাদির অলংকরণের নান্দনিক দৃশ্যমানতা কে বোঝায়।
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৬)-তে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিল্প-নকশা (Industrial Design) থেকে উদ্ভূত অধিকার লঙ্ঘনজনিত যেকোনো বিরোধ একটি 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে 'শিল্প-নকশা' (Industrial Design) অর্থাৎ কোনো পণ্যের বাহ্যিক রূপ, আকৃতি (Shape), প্যাটার্ন (Pattern), রেখা (Lines) বা রঙ, যা সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য (Visual appeal) এইসব নকশা চুরির মতো ঘটনাগুলোর বিচার এখন সাধারণ দেওয়ানি আদালতের পরিবর্তে বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুততর সময়ে সম্পন্ন হবে।
নিচে শিল্প-নকশার আলোকে যেসব কারণে বা গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়, তা একাধিক বাস্তব উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. প্রতারণামূলক অনুকরণ বা নকলকরণ (Fraudulent or Obvious Imitation):
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: অনেক সময় নকলকারীরা হুবহু কপি না করে নিবন্ধিত নকশার সাথে খুব সামান্য বা অগুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন করে বাজারে ছাড়ে, যাতে সাধারণ ক্রেতারা প্রথম দেখায় (Visual impression) বুঝতে না পারে যে এটি নকল। একে বলা হয় প্রতারণামূলক অনুকরণ (Fraudulent Imitation)। এই গ্রাউন্ডেও বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করা যায়।
বাস্তব উদাহরণ ১ (প্যাকেজিং বা বোতলের আকৃতি):
একটি কোমল পানীয় (Beverage) কোম্পানি তাদের বোতলের জন্য একটি বিশেষ বাঁকানো আকৃতির (যেমন- কোকাকোলার ক্লাসিক বোতল) নকশা নিবন্ধন করল, যা ক্রেতাদের কাছে খুব জনপ্রিয়। অন্য একটি জুস কোম্পানি তাদের বোতলের আকৃতি প্রায় একই রকম রাখল, শুধু গায়ে ছোট ছোট কিছু ডট বা দাগ বসিয়ে দিল, যা দূর থেকে বোঝা যায় না। এটি 'প্রতারণামূলক অনুকরণ' এবং মূল কোম্পানি এর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (গহনার নকশা):
একটি স্বনামধন্য জুয়েলারি ব্র্যান্ড একটি গলার হারের (Necklace) এক্সক্লুসিভ নকশা নিবন্ধন করল। অন্য একটি দোকান হারের মূল নকশাটি ঠিক রেখে শুধু লকেটের আকার সামান্য পরিবর্তন করে বিক্রি শুরু করল। ক্রেতারা বিভ্রান্ত হয়ে সেটি কিনতে থাকলে জুয়েলারি ব্র্যান্ডটি বাণিজ্যিক বিরোধের মামলা করতে পারে।
২. নিবন্ধিত নকশার সরাসরি লঙ্ঘন (Infringement of Registered Design):
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তাদের তৈরি করা নতুন এবং মৌলিক (New and Original) কোনো পণ্যের নকশা পেটেন্ট ও ডিজাইন অধিদপ্তরে নিবন্ধন (Register) করেন, তবে ওই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নকশাটি ব্যবহারের একচেটিয়া অধিকার তাদের থাকে। মালিকের পূর্বানুমতি বা লাইসেন্স ছাড়া অন্য কেউ যদি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হুবহু সেই নকশা ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করে, তবে তা নকশা অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ফার্নিচার বা আসবাবপত্র):
দেশীয় একটি স্বনামধন্য ফার্নিচার কোম্পানি (যেমন- হাতিল বা ব্রাদার্স) তাদের সোফার জন্য একটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও অনন্য 'আকৃতি' (Shape) তৈরি করে তার শিল্প-নকশা নিবন্ধন করল। কিছুদিন পর দেখা গেল, স্থানীয় ছোট কিছু ফার্নিচার কারখানা হুবহু একই আকৃতির সোফা তৈরি করে বাজারে অনেক কম দামে বিক্রি করছে। মূল কোম্পানিটি তাদের নিবন্ধিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগে ওই কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে উৎপাদন বন্ধের ইনজাংশন চাইতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (টেক্সটাইল ও পোশাক):
একটি বিখ্যাত ফ্যাশন হাউস শাড়ির পাড়ের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন জ্যামিতিক 'প্যাটার্ন' ডিজাইন করে তা নিবন্ধন করল। অন্য একটি টেক্সটাইল মিল সেই একই প্যাটার্ন কপি করে হাজার হাজার শাড়ি ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ল। ফ্যাশন হাউসটি শিল্প-নকশা আইনে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবে।
৩. নকশার অবৈধ আমদানি (Unauthorized Importation of Protected Design)
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: শিল্প-নকশা আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোনো নকশা মালিকের সম্মতি ছাড়া দেশে তৈরি করা যেমন বেআইনি, তেমনি বিদেশ থেকে ওই একই নকশাযুক্ত পণ্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানি (Import) করাও সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো আমদানিকারক এমন কাজ করলে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে।
বাস্তব উদাহরণ ১ (সিরামিক পণ্য):
বাংলাদেশের একটি সিরামিক কোম্পানি তাদের ডিনার সেটের প্লেটের ওপর একটি বিশেষ ফ্লোরাল (ফুল ও পাতার) নকশা নিবন্ধন করল। কয়েক মাস পর দেখা গেল, ঢাকার একজন আমদানিকারক চীন থেকে ঠিক একই ফ্লোরাল নকশাযুক্ত সস্তা ডিনার সেট আমদানি করে দেশের বাজারে বিক্রি করছে। সিরামিক কোম্পানিটি ওই আমদানিকারকের বিরুদ্ধে এবং অবৈধভাবে আনা পণ্যগুলো জব্দের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
৪. লাইসেন্সিং এবং রয়্যালটি চুক্তি ভঙ্গ (Breach of Licensing and Royalty Agreements):
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: শিল্প-নকশার স্বত্বাধিকারী অনেক সময় নিজে পণ্য উৎপাদন না করে চুক্তির মাধ্যমে অন্য কোনো প্রস্তুতকারককে (Manufacturer) নির্দিষ্ট রয়্যালটির (Royalty) বিনিময়ে নকশাটি ব্যবহারের লাইসেন্স দেন। লাইসেন্স গ্রহীতা যদি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে, নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি পণ্য উৎপাদন করে, বা রয়্যালটি পরিশোধ না করে, তবে তা একটি বাণিজ্যিক বিরোধ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (পাদুকা বা জুতা শিল্প):
একজন স্বাধীন ডিজাইনার একটি স্নিকার্স (Sneakers) জুতার দারুণ একটি নকশা তৈরি করে একটি বড় জুতা প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে ২ বছরের জন্য লাইসেন্স দিলেন। শর্ত ছিল প্রতি জোড়া জুতা বিক্রির আয়ের ৫% রয়্যালটি দিতে হবে। ২ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোম্পানিটি ওই নকশার জুতা উৎপাদন ও বিক্রি চালিয়ে গেল এবং রয়্যালটি দেওয়া বন্ধ করে দিল। ডিজাইনার চুক্তিভঙ্গ এবং অবৈধ ব্যবহারের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (অটোমোবাইল পার্টস):
একটি প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেলের হেলমেটের একটি নতুন বায়বীয় (Aerodynamic) আকৃতির নকশা করে তা অন্য একটি কোম্পানিকে উৎপাদনের অনুমতি দিল। কিন্তু লাইসেন্স গ্রহীতা কোম্পানি ওই নকশা সাব-কন্ট্রাক্টে অন্য থার্ড-পার্টিকে দিয়ে তৈরি করাতে শুরু করল, যা চুক্তিতে নিষেধ ছিল। এটি লাইসেন্স চুক্তির লঙ্ঘন।
৫. শিল্প-নকশার মালিকানা ও স্বত্ব নিয়ে বিরোধ (Disputes over Ownership and Authorship):
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: কোনো নকশা যদি একাধিক ব্যক্তি মিলে তৈরি করেন, অথবা কোনো চাকরিজীবী তার চাকরিরত অবস্থায় কোম্পানির নির্দেশে কোনো নকশা তৈরি করেন, তবে সেই নকশার প্রকৃত স্বত্বাধিকারী কে হবেন তা নিয়ে বিরোধ দেখা দিতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ ১ (চাকরিদাতা বনাম ডিজাইনার):
একটি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির একজন ফুল-টাইম প্রোডাক্ট ডিজাইনার কোম্পানির ল্যাবে বসে একটি নতুন 'স্মার্টওয়াচ'-এর কেসিংয়ের নকশা করলেন। আইন অনুযায়ী এর মালিক হওয়ার কথা কোম্পানির। কিন্তু ডিজাইনার চাকরি ছেড়ে যাওয়ার সময় ওই নকশাটি নিজের নামে নিবন্ধন করার জন্য আবেদন করলেন। কোম্পানি তাদের মালিকানা (Ownership) দাবি করে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (যৌথ রচয়িতা):
দুজন ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার মিলে একটি স্মার্ট হোমের কন্ট্রোল প্যানেলের বাহ্যিক নকশা তৈরি করলেন। পরে একজন ডিজাইনার অপরজনকে না জানিয়ে একাই একটি কোম্পানির কাছে পুরো নকশার স্বত্ব বিক্রি করে দিলেন। বঞ্চিত ডিজাইনার তার অধিকার ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আদালতে যেতে পারবেন।
৬. পূর্ব-প্রকাশনা ও নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ (Challenge to Validity/Prior Publication):
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: শিল্প-নকশা নিবন্ধনের মূল শর্ত হলো এটি 'নতুন' হতে হবে। যদি কেউ এমন কোনো নকশা নিবন্ধন করে ফেলে যা আগেই অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল (Prior Publication) বা বাজারে প্রচলিত ছিল, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সেই নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তা বাতিলের (Cancellation) জন্য মামলা করতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণ ১ (বিদ্যমান নকশা নিজের বলে দাবি করা):
একটি সিরামিক টাইলস কোম্পানি হঠাৎ করে দাবি করল যে, বাজারে প্রচলিত একটি সাধারণ জ্যামিতিক নকশার টাইলস তাদের নিবন্ধিত শিল্প-নকশা এবং তারা অন্য সব কোম্পানিকে নোটিশ পাঠাল উৎপাদন বন্ধ করার জন্য। অন্যান্য কোম্পানিগুলো তখন প্রমাণসহ বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে যে, এই নকশাটি গত ১০ বছর ধরে বাজারে ওপেন সোর্স হিসেবে আছে এবং ওই কোম্পানির নিবন্ধনটি বাতিলযোগ্য।
৭. নকশার অভিনবত্বহীনতা এবং বাতিলকরণের আবেদন (Lack of Novelty and Cancellation of Registration)
শিল্প-নকশা নিবন্ধনের প্রধান শর্ত হলো নকশাটিকে সম্পূর্ণ "নতুন এবং অভিনব" (New and Original) হতে হবে। কেউ যদি আগে থেকেই প্রচলিত বা অন্যের তৈরি কোনো নকশা নিজের নামে নিবন্ধন করে নেয়, তখন প্রকৃত মালিক বা প্রতিযোগী কোম্পানিগুলো তা বাতিলের জন্য মামলা করে।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) নিবন্ধিত নকশাটি নতুন নয় এবং নিবন্ধনের আগেই তা বাংলাদেশের বা বিদেশের বাজারে প্রকাশিত হয়েছে (Prior Publication)। (২) নকশাটি কোনো বিদ্যমান ঐতিহ্যবাহী বা প্রথাগত নকশার (Traditional Design) সামান্য রূপান্তর মাত্র, এতে কোনো মৌলিকতা নেই। এবং (৩) জালিয়াতি বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে নকশাটি নিবন্ধন করা হয়েছে।
বাস্তব উদাহরণ ১ (বিদেশি ক্যাটালগ থেকে চুরি):
একজন ব্যবসায়ী চীন বা ইতালির একটি ক্যাটালগ থেকে একটি আধুনিক বেসিনের (Wash basin) ডিজাইন হুবহু কপি করে বাংলাদেশে নিজের নামে 'শিল্প-নকশা' নিবন্ধন করে নেন। এরপর তিনি অন্য সব স্যানিটারি ব্যবসায়ীদের ওই ডিজাইন ব্যবহার করতে নিষেধ করেন। অন্য ব্যবসায়ীরা তখন প্রমাণসহ বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করবেন যে, "নকশাটি অভিনব নয় এবং আগেই বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে", তাই এই বেআইনি নিবন্ধন বাতিল করতে হবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (ঐতিহ্যবাহী নকশা আত্মসাৎ):
একজন ব্যক্তি কুমিল্লার বিখ্যাত খাদি কাপড়ের শতবর্ষ পুরনো একটি ঐতিহ্যবাহী মোটিফ সামান্য এদিক-সেদিক করে নিজের নামে শিল্প-নকশা হিসেবে নিবন্ধন করে নেয়। এরপর সে সাধারণ তাঁতিদের ওই কাপড় বুনতে বাধা দেয়। তাঁতিদের সমিতি তখন "মৌলিকত্বহীন ও প্রথাগত নকশার বেআইনি নিবন্ধনের" গ্রাউন্ডে তা বাতিল চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
উপসংহার:
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি সুন্দর 'ডিজাইন' বা 'নকশা' পণ্যের বিক্রি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শিল্প-নকশা শুধু একটি শৈল্পিক কাজ নয়, এটি একটি অত্যন্ত মূল্যবান বাণিজ্যিক সম্পদ। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(১৬) ধারার মাধ্যমে শিল্প-নকশা সংক্রান্ত বিরোধগুলোকে বাণিজ্যিক আদালতের এখতিয়ারে আনায় এখন ডিজাইনার এবং মূল কোম্পানিগুলো তাদের সৃজনশীল কাজের দ্রুত আইনি সুরক্ষা পাবেন। এটি দেশে নকল ও পাইরেসি রোধ করে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com