বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-১৭): প্রযুক্তি উন্নয়ন চুক্তি (Technology Development Agreements) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ
ভূমিকা:
সফটওয়্যার, মোবাইল অ্যাপ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ব্লকচেইন বা কাস্টমাইজড আইটি সিস্টেম প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসার প্রয়োজনে আইটি ফার্ম বা ডেভেলপারদের সাথে প্রযুক্তি নির্মাণের জন্য যে চুক্তি করে, তাকেই 'প্রযুক্তি উন্নয়ন চুক্তি' (Technology Development Agreement) বলা হয়।
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৫)-তে "প্রযুক্তি উন্নয়ন চুক্তি" থেকে উদ্ভূত যেকোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধকে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের চুক্তিগুলো সাধারণত অত্যন্ত জটিল হয় এবং এর সাথে সোর্স কোড, মেধাস্বত্ব ও বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ জড়িত থাকে। এই ধারার ফলে ক্লায়েন্ট এবং টেকনোলজি কোম্পানি—উভয় পক্ষই এখন চুক্তি ভঙ্গের কারণে দ্রুততর সময়ে বাণিজ্যিক আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রতিকার পাবেন।
নিচে প্রযুক্তি উন্নয়ন চুক্তির ক্ষেত্রে যেসব কারণে বা গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়, তা একাধিক বাস্তব উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ না করা, ত্রুটিপূর্ণ প্রযুক্তি সরবরাহ, প্রকল্পের স্পেসিফিকেশন ও মান লঙ্ঘন (Breach of Technical Specifications and Quality):
একটি প্রযুক্তি উন্নয়ন চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো 'সফটওয়্যার রিকোয়ারমেন্ট স্পেসিফিকেশন' (SRS) বা কারিগরি মানদণ্ড। ডেভেলপার যদি চুক্তিতে উল্লেখিত ফিচার বা কোয়ালিটি অনুযায়ী প্রযুক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে বড় ধরনের বিরোধের সৃষ্টি হয়।
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: প্রযুক্তি উন্নয়ন চুক্তির সাথে সাধারণত একটি 'সফটওয়্যার রিকয়ারমেন্ট স্পেসিফিকেশন' (SRS) যুক্ত থাকে, যেখানে সফটওয়্যারটি কী কী কাজ করবে তা বিস্তারিত লেখা থাকে। ডেভেলপার যদি চুক্তিতে উল্লেখিত ফিচার বা ফাংশনগুলো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, অথবা সরবরাহকৃত সিস্টেমে এমন গুরুতর 'বাগ' (Bug) বা ত্রুটি থাকে যার কারণে এটি ব্যবহারযোগ্য না হয়, তবে ক্লায়েন্ট ক্ষতিপূরণ বা সংশোধনের জন্য মামলা করতে পারে।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) তৈরি করা সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিতে মারাত্মক ত্রুটি (Critical Bugs) থাকা এবং তা কাজ না করা। (২) ইউজার অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্টিং (UAT) বা চূড়ান্ত পরীক্ষায় সফটওয়্যারটি চুক্তির শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়া। এবং (৩) নির্দিষ্ট লোড বা ট্রাফিক (Scalability) নিতে না পারা, যা চুক্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছিল।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ই-কমার্স অ্যাপ):
একটি সুপারশপ তাদের অনলাইন বিক্রির জন্য একটি আইটি ফার্মকে মোবাইল অ্যাপ বানানোর কাজ দিল। চুক্তিতে বলা ছিল অ্যাপটি একসাথে ১০,০০০ ইউজারের লোড নিতে পারবে। কিন্তু অ্যাপ লঞ্চ করার পর মাত্র ৫০০ ইউজার ঢুকলেই অ্যাপটি ক্র্যাশ করে এবং পেমেন্ট গেটওয়েতে টাকা আটকে যায়। এটি SRS এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সুপারশপটি ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (সফটওয়্যার ক্র্যাশ):
একটি সুপারশপ চেইন তাদের ইনভেন্টরি ও বিলিং সিস্টেম ডিজিটালাইজ করার জন্য একটি আইটি ফার্মকে ৫ কোটি টাকার চুক্তিতে নিয়োগ দেয়। কিন্তু সিস্টেমটি ডেলিভারি দেওয়ার পর দেখা যায়, প্রতিদিন সন্ধ্যায় যখন কাস্টমারের চাপ বাড়ে, তখন সিস্টেমটি ক্র্যাশ করে। এর ফলে সুপারশপের বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়। সুপারশপ কর্তৃপক্ষ "কারিগরি স্পেসিফিকেশন পূরণে ব্যর্থতা ও ত্রুটিপূর্ণ প্রযুক্তির" গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (ইআরপি সিস্টেম):
একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি তাদের ইনভেন্টরি ও প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্টের জন্য একটি কাস্টমাইজড ERP সিস্টেম বানানোর চুক্তি করল। কিন্তু ডেলিভারির পর দেখা গেল, সিস্টেমটি সুতার মজুত সঠিকভাবে হিসাব করতে পারছে না, যার ফলে প্রোডাকশন ব্যাহত হচ্ছে। ডেভেলপার ত্রুটি সারিয়ে না দিলে ফ্যাক্টরি মালিক ধারা ২(ঘ)(১৫) এর অধীনে আদালতে যেতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ৪ (অ্যালগরিদম ফেইলিওর):
একটি হাসপাতাল রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য একটি এআই (AI) ডেভেলপার ফার্মকে এক্স-রে বিশ্লেষণের একটি মডেল তৈরির কাজ দেয়। চুক্তিতে বলা ছিল এর নির্ভুলতার হার (Accuracy rate) হবে ৯৫%। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে দেখা যায় এটি মাত্র ৭০% নির্ভুল এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুল রিপোর্ট দিচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ "প্রতিশ্রুত মান লঙ্ঘনের" গ্রাউন্ডে চুক্তি বাতিল ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা দায়ের করতে পারবে।
২. প্রজেক্ট ডেলিভারিতে বিলম্ব বা সময়সীমা লঙ্ঘন (Delay in Project Delivery and Missing Milestones)
প্রযুক্তি খাতে "Time to Market" বা সঠিক সময়ে পণ্য বাজারে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেভেলপাররা যদি চুক্তিতে নির্ধারিত মাইলফলক (Milestones) বা চূড়ান্ত ডেলিভারির সময়সীমা পার করে ফেলে, তবে ক্লায়েন্ট আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: প্রযুক্তি উন্নয়নে 'সময়' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (Time is of the essence)। চুক্তিতে প্রজেক্টের বিভিন্ন ধাপ (Milestones) এবং চূড়ান্ত ডেলিভারির সময় নির্দিষ্ট করা থাকে। ডেভেলপার যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রযুক্তি বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়, এবং এর ফলে ক্লায়েন্টের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ভেস্তে যায় বা আর্থিক ক্ষতি হয়, তবে ক্লায়েন্ট চুক্তি বাতিল ও ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রজেক্ট বা এমভিপি (MVP - Minimum Viable Product) ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হওয়া। এবং (২) অকারণে কাজের ধীরগতি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রজেক্ট শেষ করতে না পারার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া।
বাস্তব উদাহরণ ১ (মার্কেট টাইমিং মিস করা):
একটি ফিনটেক (FinTech) স্টার্টআপ আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে একটি পেমেন্ট অ্যাপ তৈরির জন্য একটি ফার্মকে দায়িত্ব দেয়, যাতে ঈদের সময় তারা বিপুল ট্রানজেকশন ধরতে পারে। কিন্তু ফার্মটি ঈদের ৩ মাস পর অ্যাপটি ডেলিভারি দেয়। এর ফলে স্টার্টআপটি তাদের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক সুযোগটি (Peak Season) হারায়। এই "সময়সীমা লঙ্ঘন ও ব্যবসায়িক ক্ষতির" গ্রাউন্ডে স্টার্টআপটি মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (এডুটেক প্ল্যাটফর্ম):
একটি এডুটেক (EdTech) স্টার্টআপ জানুয়ারি মাসে স্কুল সেশন শুরুর আগে তাদের নতুন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LMS) লঞ্চ করার জন্য একটি এজেন্সির সাথে চুক্তি করল। কিন্তু এজেন্সিটি ফেব্রুয়ারি মাস পেরিয়ে গেলেও সফটওয়্যার জমা দিতে পারল না। এর ফলে স্টার্টআপটি ওই বছরের জন্য কোনো নতুন ছাত্র ভর্তি করাতে পারল না। স্টার্টআপটি তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (মাইলস্টোন বিলম্ব):
একটি মোবাইল গেম ডেভেলপমেন্ট চুক্তিতে শর্ত ছিল, প্রতি ২ মাস অন্তর গেমের একটি করে নতুন লেভেল বা মডিউল বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ডেভেলপার ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রথম লেভেলই শেষ করতে পারেনি। ক্লায়েন্ট তখন "মাইলস্টোন পূরণে ব্যর্থতার" কারণে চুক্তি বাতিল করে অগ্রিম টাকা ফেরতের দাবিতে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৪ (মোবাইল গেম ডেভেলপমেন্ট):
একটি গেমিং কোম্পানি কোরবানির ঈদকে টার্গেট করে একটি গেম বানানোর চুক্তি করল। কিন্তু ডেভেলপার ঈদের এক মাস পর গেমটি ডেলিভারি দিল, যখন গেমটির মূল বাজার আবেদন আর নেই। কোম্পানিটি বিলম্বের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি আদায়ের মামলা করতে পারে।
৩. মেধাস্বত্ব (IP) এবং সোর্স কোড মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over IP Ownership and Source Code):
প্রযুক্তি চুক্তিতে সোর্স কোড (Source Code), ডিজাইন, অ্যালগরিদম এবং ডেটাবেসের মালিকানা কার হবে—ক্লায়েন্টের না ডেভেলপারের, তা নিয়ে সবচেয়ে জটিল বিরোধ তৈরি হয়। সাধারণত "Work for hire" হিসেবে টাকা দিলে ক্লায়েন্ট আইপির মালিক হয়, কিন্তু অনেক ডেভেলপার তা মানতে চায় না।
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: প্রযুক্তি উন্নয়ন চুক্তির অন্যতম প্রধান বিরোধ হলো—"সফটওয়্যারের আসল মালিক কে?" চুক্তিতে যদি লেখা থাকে যে পুরো পেমেন্ট পাওয়ার পর সোর্স কোড এবং ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) রাইটস ক্লায়েন্টকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, কিন্তু ডেভেলপার তা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায় বা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে, তবে ক্লায়েন্ট মামলা করতে পারে।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) ডেভেলপার কর্তৃক সোর্স কোড বা অ্যাডমিন প্যানেলের অ্যাক্সেস ক্লায়েন্টকে বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি (Holding Code Hostage)। (২) ক্লায়েন্টের অর্থে তৈরি করা সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদম ডেভেলপার কর্তৃক অন্য কোনো কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া। এবং (৩) ডেভেলপার সফটওয়্যারে এমন কোনো থার্ড-পার্টি লাইসেন্স (Open source violation) ব্যবহার করেছে, যার ফলে ক্লায়েন্ট লিগ্যাল নোটিশ পেয়েছে।
বাস্তব উদাহরণ ১ (সোর্স কোড আটকে রাখা):
একটি স্টার্টআপ একটি আইটি ফার্মকে দিয়ে তাদের ফিনটেক অ্যাপ বানিয়ে পুরো বিল পরিশোধ করল। কিন্তু আইটি ফার্মটি অ্যাপটির 'সোর্স কোড' ও 'ডেটাবেস অ্যাক্সেস' স্টার্টআপকে বুঝিয়ে না দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করল যে, তাদের কাছ থেকেই আজীবন মেইনটেন্যান্স নিতে হবে, নইলে কোড দেওয়া হবে না। স্টার্টআপটি অবিলম্বে সোর্স কোড উদ্ধারের জন্য আদালতে যেতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (সোর্স কোড জিম্মি করা):
একটি ই-কমার্স কোম্পানি তাদের পুরো প্ল্যাটফর্ম বানানোর পর আইটি ফার্মকে চুক্তির ১০০% টাকা পরিশোধ করে। কিন্তু আইটি ফার্মটি ই-কমার্স কোম্পানিকে শুধুমাত্র "অ্যাডমিন প্যানেল" বুঝিয়ে দেয়, এবং মূল "সোর্স কোড" (Source Code) দিতে অস্বীকার করে বলে যে "কোড তাদের সম্পত্তি"। সোর্স কোড ছাড়া ক্লায়েন্ট অন্য কোনো ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে সাইট আপডেট করতে পারে না। এই "সোর্স কোড জিম্মি করা ও আইপি মালিকানা লঙ্ঘনের" গ্রাউন্ডে ক্লায়েন্ট মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (কোডের অবৈধ ব্যবহার):
একজন ক্লায়েন্ট একটি এআই (AI) ডেভেলপারকে দিয়ে একটি বিশেষ ট্রেডিং অ্যালগরিদম বানিয়ে নিল। চুক্তিতে শর্ত ছিল এই কোড অন্য কোথাও ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু ডেভেলপার সেই একই অ্যালগরিদম সামান্য পরিবর্তন করে ক্লায়েন্টেরই এক প্রতিযোগীর কাছে বিক্রি করে দিল। ক্লায়েন্ট আইপি রাইটস লঙ্ঘনের জন্য নিষেধাজ্ঞা (Injunction) চেয়ে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৪ (প্রতিযোগীর কাছে কোড বিক্রি):
একটি রাইড-শেয়ারিং স্টার্টআপ একটি ডেভেলপমেন্ট ফার্মকে দিয়ে একটি অত্যাধুনিক রুট-অপটিমাইজেশন অ্যালগরিদম তৈরি করায়। ফার্মটি পরবর্তীতে অর্থের লোভে ঠিক একই কোড ওই স্টার্টআপের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগীর কাছে বিক্রি করে দেয়। স্টার্টআপটি তাদের "মেধা স্বত্ব চুরি এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের" গ্রাউন্ডে ইনজাঙ্কশন (নিষেধাজ্ঞা) ও ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করবে।
৪. কাজের পরিধি বৃদ্ধি (Scope Creep) এবং পেমেন্ট বিরোধ (Scope Creep & Payment Disputes):
প্রযুক্তি উন্নয়নের সময় ক্লায়েন্টরা প্রায়ই চুক্তির বাইরের নতুন ফিচার যোগ করতে চায় (Scope Creep), কিন্তু এর জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে চায় না। অন্যদিকে, ডেভেলপাররা অনেক সময় অহেতুক 'হিডেন চার্জ' দাবি করে কাজ বন্ধ করে দেয়।
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: অনেক সময় ক্লায়েন্ট চুক্তিতে উল্লেখিত ফিচারের বাইরেও কাজ চলাকালীন বারবার নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করতে বলে (Scope Creep), কিন্তু এর জন্য অতিরিক্ত পেমেন্ট দিতে রাজি হয় না। আবার বিপরীতভাবে, ডেভেলপার কাজ শেষ করে বুঝিয়ে দেওয়ার পরও ক্লায়েন্ট বিনা কারণে বিল আটকে রাখে। এই ধরনের আর্থিক বিরোধগুলো ধারা ২(ঘ)(১৫) এর অধীনে বিচারযোগ্য।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) ক্লায়েন্ট কর্তৃক প্রজেক্ট ডেলিভারি নেওয়ার পরও চুক্তিকৃত অর্থ (Milestone payment) পরিশোধ না করা। (২) ডেভেলপার কর্তৃক মূল চুক্তির বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ফি দাবি করা এবং টাকা না দিলে সার্ভার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া। এবং (৩) প্রজেক্টের "Scope of Work" বা কাজের পরিধি নিয়ে দ্বিমত।
বাস্তব উদাহরণ ১ (অতিরিক্ত কাজের চাপ):
একটি চুক্তি ছিল শুধু ওয়েবসাইট বানানোর। কাজ চলাকালীন ক্লায়েন্ট জোরাজুরি শুরু করল যে, এই একই বাজেটের মধ্যে একটি আইওএস (iOS) অ্যাপও বানিয়ে দিতে হবে, নইলে তারা ওয়েবসাইটেরও বিল দেবে না। ডেভেলপার এই অন্যায্য চাপের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের মামলা করতে পারবেন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (অযৌক্তিক অতিরিক্ত দাবি):
একটি লজিস্টিক কোম্পানি একটি অ্যাপ তৈরি করাচ্ছে। প্রজেক্টের মাঝামাঝি সময়ে ডেভেলপার ফার্ম দাবি করে যে, গুগল ম্যাপস এপিআই (API) ইন্টিগ্রেশন মূল চুক্তির আওতায় ছিল না, তাই এর জন্য অতিরিক্ত ১০ লাখ টাকা দিতে হবে, অন্যথায় তারা কাজ বন্ধ করে দেবে। চুক্তিতে যদি লোকেশন ট্র্যাকিংয়ের কথা স্পষ্ট লেখা থাকে, তবে ক্লায়েন্ট এই "চুক্তিভঙ্গ ও ব্ল্যাকমেইলিং"-এর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (পেমেন্ট আটকে রাখা):
একটি সফটওয়্যার ফার্ম ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী একটি কাস্টম সিআরএম (CRM) শতভাগ সফলভাবে ডেলিভারি দেয় এবং ক্লায়েন্ট সেটি ব্যবহারও শুরু করে। কিন্তু যখন ফার্মটি তাদের শেষ কিস্তির (Final Invoice) ২০ লাখ টাকা দাবি করে, তখন ক্লায়েন্ট "ডিজাইনের কালার পছন্দ হয়নি" এমন ঠুনকো ও অবৈজ্ঞানিক অজুহাত দেখিয়ে টাকা আটকে দেয়। ফার্মটি তাদের পাওনা আদায়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করবে।
বাস্তব উদাহরণ ৪ (ক্লায়েন্ট কর্তৃক বিল আটকে রাখা):
একটি সফটওয়্যার কোম্পানি ৬ মাসের পরিশ্রমে একটি হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বানিয়ে সফলভাবে ইনস্টল করে দিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শেষ মাইলস্টোনের ৩০% বিল আটকে রেখে বলল, "যতদিন না আমরা নতুন একটি মডিউল ফ্রিতে পাচ্ছি, ততদিন বিল দেওয়া হবে না।" সফটওয়্যার কোম্পানিটি বকেয়া বিল আদায়ের জন্য মামলা করতে পারে।
৫. গোপনীয়তা (Confidentiality), ট্রেড সিক্রেট (Trade Secrets) এবং Data সুরক্ষা লঙ্ঘন:
প্রযুক্তি উন্নয়নের সময় ক্লায়েন্ট তাদের ইউনিক আইডিয়া, বিজনেস লজিক বা কাস্টমার ডেটা ডেভেলপারের সাথে শেয়ার করে। নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (NDA) থাকার পরও ডেভেলপার যদি এসব তথ্য ফাঁস করে দেয়, তবে তা বড় আইনি অপরাধ।
মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: প্রযুক্তি উন্নয়নের সময় ক্লায়েন্টকে তার ব্যবসার গোপন তথ্য, ক্লায়েন্ট লিস্ট বা এপিআই কি (API Keys) ডেভেলপারের সাথে শেয়ার করতে হয়। এর সুরক্ষায় এনডিএ (NDA) সই করা হয়। ডেভেলপার যদি অসতর্কতাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে এই ডেটা ফাঁস করে দেয় বা হ্যাক হওয়ার মতো দুর্বল সিস্টেম বানায়, তবে ক্লায়েন্ট মামলা করতে পারে।
মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) পেটেন্ট করার আগেই ক্লায়েন্টের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বা আইডিয়া অন্য কারও কাছে প্রকাশ করে দেওয়া। এবং, (২) দুর্বল সিকিউরিটি আর্কিটেকচার তৈরির কারণে ক্লায়েন্টের ডেটাবেস হ্যাক হওয়া।
বাস্তব উদাহরণ ১ (গোপন অ্যালগরিদম ফাঁস):
একটি লজিস্টিকস কোম্পানি তাদের ডেলিভারি রুট অপটিমাইজ করার গোপন ফর্মুলা ডেভেলপারকে দিয়েছিল। ডেভেলপারের এক কর্মী সেই ফর্মুলাটি ইন্টারনেটে একটি ওপেন-সোর্স ফোরামে শেয়ার করে দেয়। এটি গোপনীয়তা চুক্তির চরম লঙ্ঘন।
বাস্তব উদাহরণ ২ (রোগীর ডেটা ফাঁস):
একটি হেলথ-টেক স্টার্টআপের অ্যাপ বানানোর সময় ডেভেলপার ফার্মটি টেস্টিংয়ের জন্য আসল রোগীদের ডেটাবেস ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ফার্মের সাইবার নিরাপত্তার অভাবে সেই ডেটাবেস হ্যাকারদের হাতে চলে যায় এবং ডার্ক ওয়েবে বিক্রি হয়। স্টার্টআপটি ডেটা সুরক্ষায় অবহেলার জন্য ডেভেলপার ফার্মের বিরুদ্ধে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (আইডিয়া চুরি):
কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিলে একটি ড্রোন-ডেলিভারি কনসেপ্ট তৈরি করে এবং একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মকে ড্রোনের হার্ডওয়্যার প্রোটোটাইপ তৈরির দায়িত্ব দেয়। ফার্মটি ওই গোপন আইডিয়াটি চুরি করে নিজেদের নামে পেটেন্ট ফাইলিং করে ফেলে। শিক্ষার্থীরা "NDA লঙ্ঘন এবং ট্রেড সিক্রেট চুরির" গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৪ (নিরাপত্তা ত্রুটি):
একটি ব্যাংকের জন্য তৈরি করা কোর-ব্যাংকিং মডিউলে ডেভেলপার ইচ্ছাকৃতভাবে বা অবহেলাবশত একটি 'ব্যাকডোর' (Backdoor) রেখে দেয়। পরবর্তীতে এই ব্যাকডোর ব্যবহার করে হ্যাকাররা ব্যাংকের কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। চুক্তিতে উল্লেখিত "সর্বোচ্চ সাইবার নিরাপত্তা মান" নিশ্চিত না করার কারণে ব্যাংকটি ওই ডেভেলপারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে।
৬. হস্তান্তর-পরবর্তী সাপোর্ট ও মেইনটেন্যান্স প্রদানে ব্যর্থতা (Failure to Provide Post-deployment Support):
মামলার গ্রাউন্ড: প্রযুক্তি উন্নয়ন চুক্তির শেষ ধাপে সাধারণত ৩ থেকে ১২ মাসের একটি ফ্রি বাগ-ফিক্সিং (Bug fixing) বা সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট (SLA) থাকে। সফটওয়্যার লাইভ হওয়ার পর যদি সিস্টেমে কোনো সমস্যা দেখা দেয় এবং ডেভেলপার চুক্তি অনুযায়ী সাপোর্ট দিতে অস্বীকার করে, তবে তা বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে গণ্য হবে।
বাস্তব উদাহরণ ১ (রাইড শেয়ারিং সিস্টেম ডাউন):
একটি রাইড-শেয়ারিং কোম্পানির সার্ভার বৃষ্টির দিনে ট্রাফিক বেশি থাকায় হঠাৎ ডাউন হয়ে গেল। চুক্তিতে ২৪/৭ টেকনিক্যাল সাপোর্টের কথা উল্লেখ থাকলেও, ডেভেলপার কোম্পানির সাপোর্ট টিম ফোন রিসিভ করল না এবং ২ দিন ধরে সিস্টেম বন্ধ থাকল। কোম্পানির যে ব্যবসায়িক ক্ষতি হলো, তার জন্য তারা ডেভেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (সিকিউরিটি প্যাচ আপডেট):
একটি ব্যাংক তাদের সাইবার সিকিউরিটি সফটওয়্যার প্রদানকারীকে একটি নতুন ম্যালওয়্যারের হাত থেকে বাঁচার জন্য চুক্তিমতো সিকিউরিটি প্যাচ (Patch) আপডেট করতে বলল। কিন্তু ভেন্ডর কোম্পানি বলল, এর জন্য নতুন করে ৫ লাখ টাকা দিতে হবে। ব্যাংকটি এই চুক্তিভঙ্গের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
উপসংহার:
সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির কাজ অত্যন্ত বিমূর্ত (Abstract) হওয়ায় প্রথাগত আদালতে এই বিরোধগুলো প্রমাণ করা এবং দ্রুত বিচার পাওয়া কঠিন ছিল। এই ধারার অধীনে এখন সোর্স কোড মালিকানা, সফটওয়্যারের বাগ (Bug), বা ডেলিভারি বিলম্বের মতো জটিল টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান আইটি ইন্ডাস্ট্রি এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিকাশকে আরও নিরাপদ করবে। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৫) প্রযুক্তি খাতের এই জটিল বিরোধগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় এনেছে। এর ফলে সোর্স কোড চুরি বা বিল আটকে রাখার মতো অপসংস্কৃতি দূর হবে এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিন্তে বাংলাদেশে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও চুক্তি করতে পারবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com