বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-১৫): বাণিজ্যিক এজেন্সি এবং বাণিজ্যিক রীতিনীতি সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ

ভূমিকা:
দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ 'এজেন্ট' মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ব্রোকার, কমিশন এজেন্ট, ডিলার, অকশনার (নিলামকারী), বায়িং হাউস বা ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (C&F) এজেন্ট—এরা সবাই 'বাণিজ্যিক এজেন্সি' (Mercantile Agency) এর আওতাভুক্ত। অন্যদিকে, প্রতিটি ব্যবসা বা নির্দিষ্ট বাজারে দীর্ঘদিনের অনুশীলনের ফলে কিছু অলিখিত নিয়ম বা প্রথা তৈরি হয়, যাকে 'বাণিজ্যিক রীতিনীতি' বা (Mercantile Usage/Trade Custom) বলা হয়।  এছাড়া প্রতিটি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কিছু নিজস্ব অলিখিত নিয়ম বা প্রথা থাকে, যাকে "বাণিজ্যিক রীতিনীতি" (Mercantile Usage) বলা হয়।

বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৩) অনুযায়ী "বাণিজ্যিক এজেন্সি এবং বাণিজ্যিক রীতিনীতি" সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধকে 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর মানে হলো, প্রিন্সিপাল (মূল মালিক) এবং এজেন্টের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বা প্রচলিত ব্যবসায়িক প্রথা লঙ্ঘনজনিত কারণে সৃষ্ট ক্ষতিপূরণের দাবিগুলো এখন বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৩) অনুযায়ী "বাণিজ্যিক এজেন্সি এবং বাণিজ্যিক রীতিনীতি" (mercantile agency and mercantile usage) থেকে উদ্ভূত বিরোধগুলো বাণিজ্যিক আদালতের আওতাভুক্ত।

নিচে এই ধারার অধীনে সৃষ্ট বাণিজ্যিক বিরোধসমূহ, মামলার গ্রাউন্ড বা কারণ এবং সেগুলোর বাস্তব উদাহরণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. কমিশন, ব্রোকারেজ বা পারিশ্রমিক প্রদানে ব্যর্থতা (Non-payment of Commission or Brokerage):
মামলার গ্রাউন্ড: বাণিজ্যিক এজেন্সির মূল ভিত্তি হলো কমিশন বা পারিশ্রমিক। একজন এজেন্ট বা ব্রোকার তার প্রিন্সিপালের জন্য ক্রেতা বা বিক্রেতা জোগাড় করে দিলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সে নির্দিষ্ট হারে কমিশন পাওয়ার অধিকারী হয়। প্রিন্সিপাল যদি চুক্তি সফল হওয়ার পরও এজেন্টকে তার প্রাপ্য কমিশন বা ব্রোকারেজ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা মামলার অন্যতম প্রধান গ্রাউন্ড।

বাস্তব উদাহরণ ১ (গার্মেন্টস বায়িং হাউস): 
ঢাকার একটি বায়িং হাউস (এজেন্ট) জার্মানির একটি বড় ব্র্যান্ডের (বায়ার) সাথে দেশীয় একটি তৈরি পোশাক কারখানার (প্রিন্সিপাল) ৫ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার কনফার্ম করে দিল। চুক্তি অনুযায়ী বায়িং হাউসের ৫% কমিশন পাওয়ার কথা। কিন্তু ফ্যাক্টরি মালিক গোপনে সরাসরি বায়ারের সাথে যোগাযোগ করে মাল শিপমেন্ট করে দিল এবং বায়িং হাউসকে কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানাল। বায়িং হাউসটি বকেয়া কমিশনের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (রিয়েল এস্টেট ব্রোকার): 
একজন রিয়েল এস্টেট ব্রোকার একটি কোম্পানির জন্য উপযুক্ত জমি খুঁজে দিল এবং জমির মালিকের সাথে চুক্তি করিয়ে দিল। কিন্তু কোম্পানি জমি রেজিস্ট্রি করার পর ব্রোকারের ২% কমিশন আটকে দিল। ব্রোকার ধারা ২(ঘ)(১৩) এর অধীনে মামলা দায়ের করতে পারবেন।

২. কমিশন বা পারিশ্রমিক প্রদানে অস্বীকৃতি (Non-payment of Remuneration):
এজেন্ট তার কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার পর প্রিন্সিপালের দায়িত্ব হলো চুক্তি অনুযায়ী তাকে কমিশন বা পারিশ্রমিক প্রদান করা। প্রিন্সিপাল তা দিতে অস্বীকার করলে বিরোধ তৈরি হয়।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার পরও প্রিন্সিপাল কর্তৃক কমিশন দিতে অস্বীকৃতি। (২) এজেন্ট ক্রেতা জোগাড় করার পর প্রিন্সিপাল নিজে সরাসরি ক্রেতার সাথে চুক্তি করে এজেন্টকে পাশ কাটিয়ে (Bypass) যাওয়া। এবং (৩) ডেল ক্রেডারে এজেন্টের (Del Credere Agent) অতিরিক্ত গ্যারান্টি কমিশন আটকে রাখা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (এজেন্টকে পাশ কাটানো):
একজন কমার্শিয়াল স্পেস ব্রোকার একটি আইটি কোম্পানির জন্য একটি বিশাল অফিস ফ্লোর খুঁজে দেন এবং মালিকের সাথে আইটি কোম্পানির মিটিং করিয়ে দেন। চুক্তি অনুযায়ী স্পেস ভাড়া হলে ব্রোকার এক মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ টাকা কমিশন পাবেন। কিন্তু বাড়িওয়ালা এবং আইটি কোম্পানি ব্রোকারকে কমিশন থেকে বঞ্চিত করার জন্য গোপনে নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে নেয়। ব্রোকার তখন "ন্যায্য পাওনা ও কমিশন থেকে বঞ্চিত করার" গ্রাউন্ডে ওই বাড়িওয়ালা ও আইটি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ডেল ক্রেডারে কমিশন): 
ডেল ক্রেডারে এজেন্ট হলেন এমন এজেন্ট যিনি বাড়তি কমিশনের বিনিময়ে ক্রেতার পেমেন্ট না করার ঝুঁকি (Guarantee) নিজে নেন। একজন এজেন্ট সফলভাবে পণ্য বিক্রি করলেন এবং ক্রেতা টাকাও পরিশোধ করল। কিন্তু মূল কোম্পানি (প্রিন্সিপাল) তাকে সাধারণ কমিশন দিলেও প্রতিশ্রুত 'ডেল ক্রেডারে কমিশন' দিতে অস্বীকার করে। এজেন্ট পাওনা আদায়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।

৩. এজেন্ট কর্তৃক এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ (Exceeding Authority):
একজন এজেন্টকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। যখন কোনো এজেন্ট প্রিন্সিপালের দেওয়া ক্ষমতার বাইরে গিয়ে তৃতীয় পক্ষের সাথে চুক্তি করে, তখন প্রিন্সিপাল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

মামলার ব্যাকগ্রাউন্ড: একজন বাণিজ্যিক এজেন্টকে তার প্রিন্সিপাল যে পরিমাণ ক্ষমতা বা অধিকার দেন, তাকে ঠিক সেই গণ্ডির মধ্যেই কাজ করতে হয়। এজেন্ট যদি প্রিন্সিপালের অনুমতি ছাড়া অধিকারবহির্ভূত কোনো কাজ করে (যেমন- নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে মাল বিক্রি করা, বা অননুমোদিত বাকিতে মাল দেওয়া) এবং এর ফলে প্রিন্সিপালের আর্থিক ক্ষতি হয়, তবে প্রিন্সিপাল এজেন্টের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।

মামলার কারণ; (১) এজেন্ট কর্তৃক প্রিন্সিপালের স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে চুক্তি করা। (২) অনুমোদিত সীমার বাইরে গিয়ে তৃতীয় পক্ষকে বাকিতে পণ্য সরবরাহ করা। এবং (৩) প্রিন্সিপালের অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো সাব-এজেন্ট (Sub-agent) নিয়োগ দিয়ে ক্ষতি সাধন করা।

বাস্তব উদাহরণ ১: 
ঢাকার একজন গার্মেন্টস মালিক (প্রিন্সিপাল) তার বায়িং এজেন্টকে নির্দেশ দেন যে ইউরোপের কোনো ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে অবশ্যই লেটার অব ক্রেডিট (L/C) বা অগ্রিম পেমেন্ট নিতে হবে। কিন্তু এজেন্ট বেশি কমিশন পাওয়ার লোভে একজন নতুন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ক্রেতাকে "ধারে" (Credit) ১ লাখ ডলারের শার্ট বিক্রি করে দেয়। ওই ক্রেতা পরে দেউলিয়া হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে প্রিন্সিপাল "এজেন্ট কর্তৃক নির্দেশ অমান্য ও এখতিয়ার বহির্ভূত কাজের" কারণে ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (অটোমোবাইল ডিলারশিপ): 
একটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান (প্রিন্সিপাল) তাদের ডিলারকে (এজেন্ট) নির্দেশ দিয়েছিল যে কোনো অবস্থাতেই গাড়ির দাম ১০% এর বেশি ছাড়ে বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু ডিলার নিজের বিক্রির টার্গেট পূরণ করতে একটি কর্পোরেট ক্লায়েন্টকে ২০% ছাড়ে ১০টি গাড়ি বিক্রি করে দিল। এতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের যে আর্থিক ক্ষতি হলো, তা তারা ডিলারের কাছ থেকে আদায়ের জন্য মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (স্টক ব্রোকার): 
একজন বিনিয়োগকারী তার স্টক ব্রোকারকে শুধুমাত্র 'A' ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার লিখিত নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রোকার বেশি ব্রোকারেজ পাওয়ার লোভে ওই বিনিয়োগকারীর ফান্ড ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ 'Z' ক্যাটাগরির শেয়ার কিনে লোকসান করল। বিনিয়োগকারী তার আর্থিক ক্ষতির জন্য ব্রোকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২: 
একজন শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারী তার স্টকব্রোকারকে (এজেন্ট) শুধুমাত্র 'এ' ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার ক্ষমতা দেন। কিন্তু ব্রোকার নিজের ইচ্ছেমতো ঝুঁকিপূর্ণ 'জেড' ক্যাটাগরির শেয়ার কিনে বড় অংকের লস করেন। বিনিয়োগকারী এই ক্ষমতা বহির্ভূত কাজের গ্রাউন্ডে ব্রোকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারবেন।

৪. গোপন মুনাফা অর্জন, স্বার্থের সংঘাত এবং বিশ্বস্ততা ভঙ্গ এবং গোপন মুনাফা অর্জন (Breach of Fiduciary Duty & Secret Profits):
এজেন্ট যদি প্রিন্সিপালকে না জানিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছ থেকে ঘুষ, উপঢৌকন বা গোপন মুনাফা (Secret Profit) অর্জন করে, অথবা প্রিন্সিপালের প্রতিযোগী হিসেবে কাজ করে, তবে তা চরম চুক্তিভঙ্গ। মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) প্রিন্সিপালকে না জানিয়ে লেনদেন থেকে এজেন্টের ব্যক্তিগত বা গোপন মুনাফা (Secret Profit) অর্জন। (২) এজেন্টের নিজস্ব স্বার্থ এবং প্রিন্সিপালের স্বার্থের মধ্যে সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি হওয়া। এবং (৩) প্রিন্সিপালের ব্যবসার গোপন তথ্য ব্যবহার করে এজেন্ট কর্তৃক নিজে লাভবান হওয়া।

বাস্তব উদাহরণ ১ (গোপন মুনাফা): 
একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক তার ব্রোকারকে ১০ কাঠা জমি ৫ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার দায়িত্ব দেন। ব্রোকার নিজে একজন বেনামি ক্রেতা সাজিয়ে ওই জমি ৫ কোটি টাকায় কিনে নেয় এবং এক মাস পর অন্য একজন প্রকৃত ক্রেতার কাছে ৭ কোটি টাকায় বিক্রি করে ২ কোটি টাকা গোপন মুনাফা করে। মালিক বিষয়টি জানতে পারলে "বিশ্বস্ততা ভঙ্গ ও গোপন মুনাফা অর্জনের" সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ডে মামলা করে ওই ২ কোটি টাকা ফেরত চাইতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (কমিশন বাণিজ্য/Kickbacks): 
একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির পারচেজ এজেন্ট (Purchase Agent) বাজার থেকে রড কেনার দায়িত্ব পায়। সে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে রড কেনে, কারণ ওই কোম্পানিটি এজেন্টকে গোপনে প্রতি টনে ২ হাজার টাকা ঘুষ বা 'কিকব্যাক' দেয়। কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এই অসাধু লেনদেনের প্রমাণ পেলে এজেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ক্রয় এজেন্ট বা Purchasing Agent): 
একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি রড ও সিমেন্ট কেনার জন্য একজন এজেন্ট নিয়োগ দিল। এজেন্ট বাজার থেকে সবচেয়ে ভালো রেটে মাল না কিনে, যে সাপ্লায়ার তাকে গোপনে প্রতি টনে ৫০০ টাকা 'কাট-মানি' বা ঘুষ দিয়েছে, তার কাছ থেকে নিম্নমানের মাল কিনল। কোম্পানি বিষয়টি জানতে পারলে এজেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ ও গোপন মুনাফা ফেরত চাওয়ার মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (শিপিং এজেন্ট): 
একজন এক্সপোর্ট এজেন্টের দায়িত্ব ছিল প্রিন্সিপালের পণ্য সবচেয়ে ভালো দামে বিদেশি বায়ারের কাছে বিক্রি করা। কিন্তু এজেন্ট নিজে বেনামে একটি কোম্পানি খুলে অত্যন্ত কম দামে প্রিন্সিপালের পণ্য সেখানে বিক্রি করে দিল এবং পরে সেই পণ্য চড়া দামে বায়ারের কাছে বিক্রি করে পুরো মুনাফা নিজে নিয়ে নিল। প্রিন্সিপাল এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।

৫. এজেন্টের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা (Negligence and Lack of Skill):
এজেন্টকে তার কাজ করার সময় যুক্তিসঙ্গত সতর্কতা ও দক্ষতা (Reasonable care and skill) প্রয়োগ করতে হয়। অবহেলার কারণে প্রিন্সিপালের ক্ষতি হলে এজেন্ট দায়ী থাকেন।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) এজেন্টের চরম অবহেলা বা অদক্ষতার কারণে পণ্যের ক্ষতি বা আর্থিক লোকসান হওয়া। (২) যথাসময়ে প্রিন্সিপালকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে ব্যর্থ হওয়া।

বাস্তব উদাহরণ ১ (সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের অবহেলা): 
একজন আমদানিকারক তার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাঁচামাল ছাড় করানোর জন্য একটি সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্ট নিয়োগ করেন। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কাস্টমসে জমা দিতে অযৌক্তিক দেরি করে। ফলশ্রুতিতে পণ্য বন্দরে ১৫ দিন পড়ে থাকে এবং আমদানিকারককে বিশাল অংকের ডেমারেজ (Demurrage) বা বিলম্ব মাসুল গুনতে হয়। আমদানিকারক "এজেন্টের পেশাগত অবহেলা ও অদক্ষতার" কারণে ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (বীমা ব্রোকারের ভুল): 
একটি শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজের বীমা নবায়ন করার দায়িত্ব একজন ইন্স্যুরেন্স ব্রোকারকে দেয়। ব্রোকার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রিমিয়ামের টাকা জমা দিতে ভুলে যান। এর দুদিন পর জাহাজটি ঝড়ে ডুবে যায়। যেহেতু ব্রোকারের অবহেলায় বীমা পলিসিটি বাতিল হয়ে গিয়েছিল, তাই শিপিং কোম্পানিটি ব্রোকারের বিরুদ্ধে অবহেলার গ্রাউন্ডে পুরো ক্ষতির জন্য মামলা করতে পারবে।

৬. দেল ক্রেদেরে (Del Credere) এজেন্টের দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন:
মামলার গ্রাউন্ড: 'দেল ক্রেদেরে এজেন্ট' হলো এমন এক বিশেষ ধরনের এজেন্ট যে অতিরিক্ত কমিশনের বিনিময়ে প্রিন্সিপালকে এই গ্যারান্টি দেয় যে, সে যাদের কাছে পণ্য বিক্রি করবে তারা যদি টাকা না দেয়, তবে এজেন্ট নিজে সেই টাকা পরিশোধ করবে (Guarantor of payment)। কোনো বায়ার পেমেন্ট ডিফল্ট করলে এবং দেল ক্রেদেরে এজেন্ট টাকা দিতে অস্বীকার করলে প্রিন্সিপাল মামলা করতে পারেন।

বাস্তব উদাহরণ ১ (পাট রফতানি): 
বাংলাদেশের একজন পাট রফতানিকারক ইউরোপের বাজারে মাল বিক্রির জন্য একজন দেল ক্রেদেরে এজেন্ট নিয়োগ করল। এজেন্ট ইউরোপের একটি কোম্পানির কাছে মাল বাকিতে বিক্রি করল। কোম্পানিটি পরবর্তীতে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় পেমেন্ট করতে পারল না। চুক্তি অনুযায়ী এজেন্টের এই টাকা রফতানিকারককে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও সে তা দিচ্ছে না। রফতানিকারক এজেন্টের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (পাইকারি বাজার): 
চালের আড়তে একজন কমিশন এজেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে মিল মালিকের চাল খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বাকিতে দিল। খুচরা ব্যবসায়ীরা টাকা মেরে পালিয়ে গেলে, দেল ক্রেদেরে প্রথা অনুযায়ী ওই এজেন্ট মিল মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। তা না দিলে মিল মালিক বাণিজ্যিক আদালতে যেতে পারবেন।

৭. বাণিজ্যিক রীতিনীতি বা প্রথা (Mercantile Usage/Custom) লঙ্ঘন:
অনেক সময় ব্যবসায়িক চুক্তিতে সব কথা লেখা থাকে না, বরং ওই নির্দিষ্ট বাজারের দীর্ঘদিনের প্রচলিত 'বাণিজ্যিক রীতিনীতি' বা প্রথা দ্বারাই লেনদেন নিয়ন্ত্রিত হয়। যদি কোনো পক্ষ এমন কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত ট্রেড কাস্টম বা রীতিনীতি অমান্য করে যা ওই শিল্পের সবাই মেনে চলে, এবং এর ফলে অপর পক্ষের ক্ষতি হয়, তবে তা বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে গণ্য হবে।

বাণিজ্যিক রীতিনীতি বা প্রথা (Mercantile Usage) হলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এমন কোনো নিয়ম, যা লিখিত না হলেও চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ধরে নেওয়া হয় (যতক্ষণ না তা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বাতিল করা হয়)। এই প্রথাগুলো লঙ্ঘন করলে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

মামলার গ্রাউন্ড/কারণ; (১) নির্দিষ্ট বাজারের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক প্রথা বা ট্রেড কাস্টম মেনে চলতে অস্বীকৃতি। এবং (২) প্রথাগত ছাড় (Customary Allowance), প্যাকেজিং বা ডেলিভারির নিয়ম অমান্য করা।

বাস্তব উদাহরণ ১ (পাট ব্যবসায়ের প্রথা): 
নারায়ণগঞ্জের পাট ব্যবসায়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক প্রথা (Mercantile usage) আছে যে, কাঁচা পাট বিক্রির সময় ওজনের মধ্যে আর্দ্রতার (Moisture) জন্য নির্দিষ্ট শতকরা হারে ছাড় বা ওজন সমন্বয় (Weight allowance) করতে হয়। একজন নতুন পাট সরবরাহকারী এই প্রথা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পুরো ওজনের টাকা দাবি করে এবং মাল ডেলিভারি আটকে দেয়। ক্রেতা তখন "প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক রীতিনীতি লঙ্ঘনের" গ্রাউন্ডে সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ২ (পেমেন্ট প্রথা): 
পাইকারি টেক্সটাইল বাজারে একটি প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক প্রথা হলো, পণ্য ডেলিভারির পর ইনভয়েস পরিশোধের জন্য সাধারণত ৩০ দিনের 'ক্রেডিট পিরিয়ড' (Credit Period) দেওয়া হয়। চুক্তিতে পেমেন্টের সময় উল্লেখ না থাকলে এই প্রথাই কার্যকর হয়। কিন্তু একজন মিল মালিক পণ্য ডেলিভারির পরের দিনই টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দেওয়ায় পাইকারের বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ পাঠান। পাইকার তখন এই "Trade Custom বা বাণিজ্যিক প্রথা অমান্য করার" গ্রাউন্ডে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এবং হয়রানির জন্য পাল্টা মামলা দায়ের করতে পারবেন।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (খাতুনগঞ্জের কমোডিটি মার্কেট): 
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ভোগ্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘদিনের প্রথা হলো, টেলিফোনে মুখের কথায় (Verbal Commitment) কোটি টাকার ডিল কনফার্ম হয়ে যায় এবং ডেলিভারি অর্ডার (DO) হাতবদল হয়। একজন ব্যবসায়ী ফোনে ১০০ টন সয়াবিন তেল কেনার কনফার্মেশন দেওয়ার পর দাম কমে যাওয়ায় মাল নিতে অস্বীকার করল। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বাজারের এই প্রতিষ্ঠিত 'বাণিজ্যিক রীতিনীতি' ভঙ্গের কারণে আর্থিক ক্ষতির মামলা করতে পারেন।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (সুতা বা ইয়ার্ন মার্কেট): 
নারায়ণগঞ্জের সুতার বাজারে প্রথা হলো, মাল ডেলিভারি হওয়ার পর পেমেন্ট ক্লিয়ার করার জন্য অন্তত ৩০ দিনের ক্রেডিট (বাকি) সময় দেওয়া হয়। কিন্তু একজন নতুন সরবরাহকারী মাল ডেলিভারি দেওয়ার পরদিনই প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে জোরপূর্বক ক্যাশ টাকা দাবি করল এবং টাকা না পেয়ে গুদামে তালা ঝুলিয়ে দিল। ক্রেতা এই রীতিনীতি পরিপন্থি আচরণের কারণে সৃষ্ট ব্যবসায়িক ব্যাঘাতের জন্য আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।

৮. এজেন্টকে ক্ষতিপূরণ বা ব্যয়ভার প্রদানে প্রিন্সিপালের ব্যর্থতা (Failure to Indemnify the Agent):
মামলার গ্রাউন্ড: এজেন্ট যদি প্রিন্সিপালের নির্দেশে এবং আইনসম্মতভাবে কাজ করতে গিয়ে নিজের পকেট থেকে কোনো খরচ করে বা কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতায় পড়ে, তবে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব হলো এজেন্টকে সেই অর্থ বা ক্ষতিপূরণ (Indemnity) প্রদান করা। প্রিন্সিপাল তা না দিলে এজেন্ট মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (C&F এজেন্ট): 
একজন আমদানিকারকের জরুরি মেশিনারি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালে, কাস্টমসের কোনো ঝামেলার কারণে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা ডিউটি চলে আসে। আমদানিকারকের মৌখিক নির্দেশে C&F এজেন্ট নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে মাল ছাড়িয়ে আনে যাতে কারখানার প্রোডাকশন বন্ধ না হয়। পরে আমদানিকারক ওই ৫ লাখ টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করলে, এজেন্ট ধারা ২(ঘ)(১৩) এর অধীনে মামলা করতে পারবে।


উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৩) প্রিন্সিপাল ও এজেন্টের মধ্যকার জটিল আইনি সম্পর্ক এবং বিভিন্ন বাজারের নিজস্ব বাণিজ্যিক প্রথাগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। এর ফলে ব্রোকার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের অধিকার নিশ্চিত হবে। এজেন্টদের অবহেলা বা জালিয়াতির কারণে প্রিন্সিপালরা যেমন সুরক্ষা পাবেন, তেমনি এজেন্টরাও তাদের ন্যায্য কমিশন আদায়ে এই আদালতের আশ্রয় নিতে পারবেন। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(১৩) প্রিন্সিপাল এবং এজেন্ট উভয়ের অধিকারকে আইনি বৈধতা দিয়েছে এবং বাজারের অলিখিত 'বাণিজ্যিক রীতিনীতি'গুলোকে আইনের চোখে বিচারযোগ্য করে তুলেছে।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com