বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-১২): শেয়ারহোল্ডার চুক্তি (shareholders agreements) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ

ভূমিকা:
একটি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের পারষ্পরিক অধিকার, দায়িত্ব, শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের শর্ত এবং কোম্পানির পরিচালনা পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট করার জন্য যে চুক্তি করা হয়, তাকে "শেয়ারহোল্ডার চুক্তি" (Shareholders Agreement) বলা হয়। এটি মূলত কোম্পানির সংঘবিধি (Articles of Association) ছাড়াও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যকার একটি ব্যক্তিগত চুক্তি। যখন কোম্পানিতে একাধিক বিনিয়োগকারী, ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বা প্রতিষ্ঠাতা (Founders) থাকেন, তখন তাদের স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এই চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে নিরাপদ করতে প্রণীত 'বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬' এর ধারা ২(ঘ)(১১)-এ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, "শেয়ারহোল্ডার চুক্তি" (Shareholders Agreements) থেকে উদ্ভূত যেকোনো আইনি দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধ একটি 'বাণিজ্যিক বিরোধ' (Commercial Dispute) হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারী বা শেয়ারহোল্ডাররা এখন তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে দীর্ঘমেয়াদি সাধারণ দেওয়ানি মামলার পরিবর্তে দ্রুততর সময়ে বাণিজ্যিক আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে পারবেন।

নিচে শেয়ারহোল্ডার চুক্তির অধীনে কী কী ধরণের বাণিজ্যিক বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে এবং কোন কোন সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ড বা কারণে ধারা ২(ঘ)(১১) এর অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়, তা বাস্তব উদাহরণসহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. শেয়ার হস্তান্তরের শর্ত লঙ্ঘন এবং ROFR/ROFO অধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিরোধ:
মামলার গ্রাউন্ড: শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে সাধারণত শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধিনিষেধ থাকে, যেমন- Right of First Refusal (ROFR), Tag-along rights, বা Drag-along rights। কেউ যদি বাইরের কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে শেয়ার বিক্রি করার আগে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের প্রস্তাব না দেয় (ROFR লঙ্ঘন) অথবা সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার উপেক্ষা করে শেয়ার বিক্রি করে দেয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ মামলা করতে পারে।

শেয়ারহোল্ডার চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কেউ চাইলেই হুট করে বাইরের কারো কাছে শেয়ার বিক্রি করতে পারবে না। Right of First Refusal (ROFR) বা Right of First Offer (ROFO) এর শর্ত থাকে।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণ; ১) বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের (পার্টনারদের) প্রস্তাব না দিয়ে গোপনে তৃতীয় পক্ষের কাছে শেয়ার বিক্রয়, ২) চুক্তিতে উল্লেখিত শেয়ার হস্তান্তরের "লক-ইন পিরিয়ড" (Lock-in period) অমান্য করে শেয়ার বিক্রয়, ৩) প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির (Competitor) কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শেয়ার হস্তান্তর।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ROFR লঙ্ঘন): 
'ক' এবং 'খ' একটি স্টার্টআপ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার। চুক্তিতে ROFR ক্লজ রয়েছে। কিন্তু 'ক' তার ৪০% শেয়ার 'খ'-কে কেনার কোনো প্রস্তাব না দিয়েই গোপনে তাদের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী 'গ'-এর কাছে বিক্রি করে দেয়। 'খ' এই অবৈধ শেয়ার হস্তান্তর বাতিল করতে ধারা ২(ঘ)(১১) এর অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ROFR লঙ্ঘন): 
'এবিসি লিমিটেড'-এ রহিম, করিম ও সালাম সমান শেয়ারের মালিক। চুক্তিতে ROFR ক্লজ আছে। রহিম তার শেয়ার বিক্রি করতে চায়, তাই নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে তাকে করিম ও সালামকে শেয়ারগুলো কেনার অফার করতে হবে। কিন্তু রহিম তা না করে বেশি টাকার লোভে বাইরের একজন ব্যবসায়ী জব্বারের কাছে সব শেয়ার বিক্রি করে দেয়। করিম ও সালাম এই চুক্তিভঙ্গের বিরুদ্ধে এবং বিক্রয় বাতিলের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (Tag-along Right লঙ্ঘন): 
একটি কোম্পানিতে মেজরিটি শেয়ারহোল্ডারের (৭০%) পাশাপাশি একজন মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডার (৩০%) আছেন। চুক্তিতে বলা আছে মেজরিটি শেয়ারহোল্ডার তার শেয়ার বিক্রি করলে মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডারও একই দামে তার শেয়ার বিক্রির সুযোগ (Tag-along) পাবেন। কিন্তু মেজরিটি শেয়ারহোল্ডার শুধুমাত্র নিজের শেয়ার চড়া দামে বিক্রি করে বেরিয়ে যান। মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডার এই অধিকার বঞ্চনার জন্য মামলা দায়ের করতে পারেন।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (Lock-in Period অমান্য): 
একটি স্টার্টআপে ইনভেস্টর টাকা দেওয়ার সময় শর্ত দেয় যে, মূল প্রতিষ্ঠাতারা (Founders) আগামী ৫ বছর তাদের শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানি থেকে বের হতে পারবেন না। কিন্তু ৩ বছর পরেই এক প্রতিষ্ঠাতা তার শেয়ার বিক্রি করার চেষ্টা করেন। ইনভেস্টর শেয়ার বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) চেয়ে মামলা করতে পারবেন।

২. ট্যাগ-অ্যালং (Tag-Along) এবং ড্র্যাগ-অ্যালং (Drag-Along) অধিকার ক্ষুণ্ণ করা:
এই অধিকারগুলো মূলত মেজরিটি (Majority) এবং মাইনরিটি (Minority) শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণ; ১) Tag-Along লঙ্ঘন: মেজরিটি শেয়ারহোল্ডার যখন নিজের শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যায়, তখন মাইনরিটিকে একই শর্তে শেয়ার বিক্রির সুযোগ না দেওয়া, এবং ২) Drag-Along লঙ্ঘন: মেজরিটি শেয়ারহোল্ডার পুরো কোম্পানি বিক্রি করতে চাইলে, মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডার যদি জেদ করে নিজের শেয়ার বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়।

বাস্তব উদাহরণ ১ (Tag-Along): 
একটি কোম্পানিতে 'ক'-এর ৭০% এবং 'খ'-এর ৩০% শেয়ার। চুক্তিতে 'খ'-এর ট্যাগ-অ্যালং অধিকার আছে। 'ক' তার ৭০% শেয়ার একটি বিদেশি কোম্পানির কাছে চড়া দামে বিক্রি করে দিচ্ছে, কিন্তু 'খ'-কে সেই বিদেশি কোম্পানির কাছে শেয়ার বিক্রির সুযোগ দিচ্ছে না। ফলে 'খ' নতুন মালিকের অধীনে মাইনরিটি হিসেবে আটকে পড়ছে। 'খ' তার অধিকার আদায়ের জন্য মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (Drag-Along): 
'এক্স' কোম্পানির ৮০% শেয়ারের মালিক একটি কর্পোরেট গ্রুপ। তারা পুরো কোম্পানিটি অন্য একটি বড় কোম্পানির কাছে ১০০ কোটি টাকায় বিক্রি করার ডিল চূড়ান্ত করেছে। কিন্তু ২০% শেয়ারের মালিক কয়েকজন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের শেয়ার ছাড়তে রাজি হচ্ছে না, ফলে পুরো ডিলটি আটকে যাচ্ছে। মেজরিটি গ্রুপ ড্র্যাগ-অ্যালং অধিকার প্রয়োগ করে বাধ্য করার জন্য বাণিজ্যিক আদালতে যেতে পারে।

৩. প্রি-এম্পটিভ রাইটস লঙ্ঘন এবং অন্যায়ভাবে শেয়ার ডাইলুশন (Breach of Pre-emptive Rights & Unfair Dilution):
মামলার গ্রাউন্ড: কোম্পানি যখন নতুন শেয়ার ইস্যু করে, তখন বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের তাদের বর্তমান শেয়ারের অনুপাতে নতুন শেয়ার কেনার অগ্রাধিকার (Pre-emptive Right) থাকে, যাতে কোম্পানিতে তাদের মালিকানার হার (Ownership percentage) কমে না যায় (Dilution)। এই অধিকার না দিয়ে গোপনে নতুন শেয়ার ইস্যু করা হলে মামলা করা যায়।

বাস্তব উদাহরণ ১ (গোপনে মূলধন বৃদ্ধি): 
একজন বিনিয়োগকারীর কোম্পানিতে ২৫% শেয়ার আছে। মেজরিটি শেয়ারহোল্ডাররা ওই বিনিয়োগকারীকে কোনো নোটিশ না দিয়ে অত্যন্ত কম মূল্যে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের নামে নতুন শেয়ার ইস্যু করে। এর ফলে ওই বিনিয়োগকারীর শেয়ারের হার ২৫% থেকে কমে ৫%-এ নেমে আসে। এই অন্যায় ডাইলুশনের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করতে পারবেন।

উদাহরণ ২ (অধিকার বঞ্চিত করা): 
কোম্পানি রাইট শেয়ার (Right Shares) ছাড়ার ঘোষণা দিল। কিন্তু একজন নির্দিষ্ট শেয়ারহোল্ডারকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেয়ার কেনার অফার লেটার পাঠানো হলো না। ফলশ্রুতিতে তার শেয়ারের ভ্যালু কমে গেল। তিনি বাণিজ্যিক আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারেন।
 
৪. পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব এবং ভোটাধিকার থেকে বঞ্চনা (Denial of Board Representation and Voting Rights):
কোম্পানির সিদ্ধান্তগুলো বোর্ড অফ ডিরেক্টরস নিয়ে থাকে। বোর্ডে কার কয়জন ডিরেক্টর থাকবে এবং কার ভেটো ক্ষমতা থাকবে, তা শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে লেখা থাকে। শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে নির্দিষ্ট শতাংশ শেয়ারধারীদের জন্য পরিচালনা পর্ষদে (Board of Directors) ডিরেক্টর নিয়োগের অধিকার বা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে ভেটো (Veto) দেওয়ার অধিকার সংরক্ষিত থাকে। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ (Majority) শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংখ্যালঘু (Minority) শেয়ারহোল্ডারদের ডিরেক্টর নিয়োগে বাধা দেয় বা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না দেয়, তবে তা বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে গণ্য হবে।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণ; ১) চুক্তিতে উল্লেখিত সংখ্যক ডিরেক্টর নিয়োগ দিতে অস্বীকৃতি জানানো বা বাধা প্রদান, ২) মাইনরিটি ইনভেস্টরের মনোনীত ডিরেক্টরকে বেআইনিভাবে বোর্ড থেকে অপসারণ, এবং ৩) 'সংরক্ষিত বিষয়' (Reserved Matters) গুলোতে চুক্তিবদ্ধ ভেটো ক্ষমতা (Veto Power) বা সম্মতি অগ্রাহ্য করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ডিরেক্টর নিয়োগে বাধা): 
একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম 'জেড ইনভেস্টমেন্টস' একটি আইটি কোম্পানিতে ২০% শেয়ার কিনেছে এবং শেয়ারহোল্ডার চুক্তি অনুযায়ী বোর্ডে তাদের একজন প্রতিনিধি (Director) থাকার কথা। কিন্তু কোম্পানির মেজরিটি শেয়ারহোল্ডাররা সাধারণ সভায় ভোট দিয়ে সেই প্রতিনিধিকে ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দিতে দিচ্ছে না। ইনভেস্টর চুক্তি অনুযায়ী তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ডিরেক্টর নিয়োগে বাধা): 
একটি ফার্ম একটি কোম্পানিতে ১৫% বিনিয়োগ করে এবং চুক্তিতে তাদের একজন প্রতিনিধিকে ডিরেক্টর হিসেবে বোর্ডে রাখার শর্ত থাকে। কিন্তু কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতারা ইচ্ছাকৃতভাবে বোর্ড মিটিংয়ে ওই প্রতিনিধিকে ডাকছেন না বা তাকে বোর্ড থেকে অপসারণের চেষ্টা করছেন। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মটি এই চুক্তিভঙ্গের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (ভেটো ক্ষমতা লঙ্ঘন): 
শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে বলা আছে যে কোম্পানির মূল সম্পদ (যেমন: অফিস বিল্ডিং) বিক্রি করতে হলে মাইনরিটি ইনভেস্টরের পূর্বানুমতি বা ভেটো ক্ষমতা লাগবে। কিন্তু মাইনরিটি ইনভেস্টরকে না জানিয়েই মেজরিটি শেয়ারহোল্ডাররা বোর্ড মিটিং করে বিল্ডিং বিক্রির রেজুলেশন পাশ করে। মাইনরিটি ইনভেস্টর এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য মামলা করতে পারবে।

উদাহরণ ৪ (ভেটো ক্ষমতার অবমূল্যায়ন): 
চুক্তিতে বলা আছে, কোম্পানি ব্যাংক থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিতে চাইলে মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতি (Affirmative vote) লাগবে। কিন্তু মেজরিটি শেয়ারহোল্ডাররা তাদের সম্মতি ছাড়াই রেজুলেশন পাস করে ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়। মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডাররা এই বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে যেতে পারে।

৫. শেয়ারের অবমূল্যায়ন (Dilution) এবং তথ্য পাওয়ার অধিকার (Information Rights) হরণ:
বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার পর কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা জানার অধিকার রাখেন এবং তাদের শেয়ারের আনুপাতিক হার রক্ষার অধিকার থাকে।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণ; ১) প্রি-এমপ্টিভ রাইট (Pre-emptive Right) বা নতুন শেয়ার কেনার অগ্রাধিকার না দিয়ে গোপনে নতুন শেয়ার ইস্যু করা (যাতে অন্যের শেয়ারের অনুপাত কমে যায়), এবং ২) কোম্পানির অডিট রিপোর্ট, ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য দেখতে না দেওয়া।

বাস্তব উদাহরণ ১ (বেআইনি Dilution): 
'পি' একটি কোম্পানির ১০% শেয়ারের মালিক। কোম্পানির আরও ফান্ডের প্রয়োজন হলে নতুন শেয়ার ইস্যু করার সিদ্ধান্ত হয়। শেয়ারহোল্ডার চুক্তি অনুযায়ী নতুন শেয়ার প্রথমে বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের অফার করতে হবে। কিন্তু মেজরিটি শেয়ারহোল্ডাররা 'পি'-কে কোনো অফার না দিয়ে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের নামে সব নতুন শেয়ার ইস্যু করে দেয়, ফলে 'পি'-এর শেয়ারের পরিমাণ ১০% থেকে কমে ৫% হয়ে যায়। 'পি' এই শেয়ার ইস্যু বাতিলের গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (তথ্য গোপন): 
একজন অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর শেয়ারহোল্ডার চুক্তি অনুযায়ী প্রতি ত্রৈমাসিকে কোম্পানির আয়-ব্যয়ের হিসাব পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু কোম্পানির সিইও (যিনি নিজেও একজন শেয়ারহোল্ডার) ইচ্ছাকৃতভাবে এক বছর ধরে কোনো আর্থিক প্রতিবেদন দিচ্ছেন না। ইনভেস্টর তথ্য পাওয়ার অধিকার (Information rights) আদায়ের জন্য আদালতে যেতে পারেন।

৬. লভ্যাংশ (Dividend) বণ্টন নীতি লঙ্ঘন (Violation of Dividend Distribution Policy):
মামলার গ্রাউন্ড: কোম্পানি যদি লাভজনক হয়, তবে শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে উল্লেখিত নীতি অনুযায়ী লভ্যাংশ বণ্টন করতে হয়। অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডাররা বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইচ্ছা করে লভ্যাংশ ঘোষণা করে না, যাতে সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডাররা আর্থিকভাবে চাপে পড়ে শেয়ার বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয় (যাকে 'Starving out' বলা হয়)।

বাস্তব উদাহরণ ১ (ইচ্ছাকৃত লভ্যাংশ না দেওয়া): 
একটি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি গত ৩ বছর ধরে বিশাল মুনাফা করছে। শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে বলা আছে, কর-পরবর্তী মুনাফার অন্তত ৩০% লভ্যাংশ হিসেবে দিতে হবে। কিন্তু মেজরিটি শেয়ারহোল্ডাররা 'ব্যবসা সম্প্রসারণের' ভুয়া অজুহাত দেখিয়ে কোনো লভ্যাংশ দিচ্ছে না। বঞ্চিত শেয়ারহোল্ডাররা চুক্তি অনুযায়ী লভ্যাংশ আদায়ের জন্য মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (অসম বণ্টন): 
কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা করল, কিন্তু মেজরিটি শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের জন্য এক রেটে এবং মাইনরিটিদের জন্য কম রেটে লভ্যাংশ নির্ধারণ করল, যা শেয়ারহোল্ডার চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

৭. তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং হিসাব নিরীক্ষায় বাধা (Denial of Information and Inspection Rights):
মামলার গ্রাউন্ড: শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর কোম্পানির আর্থিক বিবরণী (Financial Statements), অডিট রিপোর্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিপত্র দেখার অধিকার থাকে। যদি ম্যানেজমেন্ট বা সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডাররা এই তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় বা হিসাবে অস্বচ্ছতা রাখে, তবে সেটি মামলার একটি শক্ত গ্রাউন্ড।

বাস্তব উদাহরণ ১ (হিসাব লুকাতে তথ্য না দেওয়া): 
একজন বিদেশি শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির মাসিক আর্থিক রিপোর্ট দেখতে চাইলেন, যা চুক্তিতে তার প্রাপ্য অধিকার। কিন্তু স্থানীয় পরিচালকরা কোম্পানির তহবিল তছরুপের বিষয়টি লুকাতে তাকে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। বিদেশি বিনিয়োগকারী আদালতে গিয়ে অডিটর নিয়োগ ও নথিপত্র পরিদর্শনের আদেশ চাইতে পারেন।

উদাহরণ ২ (ফরেনসিক অডিটে বাধা): 
সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে মাইনরিটি শেয়ারহোল্ডাররা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফরেনসিক অডিট দাবি করলেন। কিন্তু কোম্পানি ম্যানেজমেন্ট অডিটরদের অফিসে ঢুকতে বাধা দিল। এটি বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে সরাসরি আদালতে বিচারযোগ্য।

৮. প্রতিযোগিতা না করার শর্ত (Non-Compete) এবং গোপনীয়তা (Confidentiality) লঙ্ঘন:
শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে প্রায়শই উল্লেখ থাকে যে কোম্পানির অংশীদার থাকা অবস্থায় বা বের হয়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেউ একই ধরণের ব্যবসা করতে পারবে না। শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে শর্ত থাকতে পারে যে, কোম্পানিতে শেয়ার থাকা অবস্থায় বা শেয়ার বিক্রি করে চলে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির প্রতিযোগী কোনো ব্যবসা শুরু করতে পারবেন না বা কোম্পানির গোপন তথ্য অন্য কাউকে দিতে পারবেন না।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণ; ১) কোম্পানির ডিরেক্টর বা শেয়ারহোল্ডার থাকা অবস্থায় সমজাতীয় আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসা শুরু করা, এবং কোম্পানির ক্লায়েন্ট লিস্ট, ট্রেড সিক্রেট বা সাপ্লায়ার লিস্ট চুরি করে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা।

বাস্তব উদাহরণ ১:
'হাসান' একটি ই-কমার্স কোম্পানির ৩০% শেয়ারহোল্ডার এবং ডিরেক্টর। শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে স্পষ্ট নন-কম্পিট ক্লজ আছে। কিন্তু হাসান গোপনে তার স্ত্রীর নামে হুবহু আরেকটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট চালু করে এবং কোম্পানির মূল ক্লায়েন্টদের সেখানে ডাইভার্ট করে দেয়। কোম্পানি ও অন্যান্য শেয়ারহোল্ডাররা হাসানের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গ ও ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (প্রতিযোগী ব্যবসা শুরু): 
একটি ই-কমার্স কোম্পানির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেয়ারহোল্ডার নিজের শেয়ার রেখে দিয়ে গোপনে অন্য একটি একই ধরনের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করলেন এবং প্রথম কোম্পানির ক্লায়েন্ট ডেটাবেস সেখানে ব্যবহার শুরু করলেন। কোম্পানি ওই শেয়ারহোল্ডারের বিরুদ্ধে ইনজাংকশন (নিষেধাজ্ঞা) ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারে।

উদাহরণ ৩ (ট্রেড সিক্রেট ফাঁস): 
কোম্পানির একজন শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির আগামী ৫ বছরের ব্যবসায়িক কৌশল ও নতুন পণ্যের ব্লু-প্রিন্ট অর্থের বিনিময়ে একটি প্রতিযোগী কোম্পানির কাছে ফাঁস করে দিলেন। এটি শেয়ারহোল্ডার চুক্তির গোপনীয়তা ক্লজের চরম লঙ্ঘন।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা (Deadlock Situations)
অনেক সময় কোম্পানিতে ৫০-৫০ শেয়ারহোল্ডিং থাকে। তখন কোনো বড় বিষয়ে দ্বিমত হলে কোম্পানি আর চলতে পারে না।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড/কারণ; ১) বোর্ডে বা শেয়ারহোল্ডার মিটিংয়ে ক্রমাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা (Deadlock), এবং ২) চুক্তিতে থাকা ডেডলক নিরসন মেকানিজম (যেমন- Russian Roulette clause বা Texas Shootout clause) মানতে অপর পক্ষের অস্বীকৃতি।

বাস্তব উদাহরণ ১: 
একটি কোম্পানিতে দুজন শেয়ারহোল্ডার, প্রত্যেকের ৫০% শেয়ার। কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ১০০ কোটি টাকা লোন নেওয়া দরকার। একজন রাজি, অন্যজন তীব্র বিরোধী। ফলে কোম্পানির কাজ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে। শেয়ারহোল্ডার চুক্তিতে বলা ছিল এমন অচলাবস্থা হলে একজন আরেকজনের শেয়ার কিনে নেবে (Buy-out mechanism)। কিন্তু কেউই শেয়ার ছাড়তে রাজি হচ্ছে না। এই ডেডলক নিরসন এবং চুক্তি বলবৎ করার জন্য বাণিজ্যিক আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।

উপসংহার:
‘বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬’-এর ধারা ২(ঘ)(১১) শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যকার এই জটিল আইনি অধিকার ও দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোকে বাণিজ্যিক বিরোধের স্বীকৃতি দিয়ে দ্রুততম সময়ে আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম করেছে। এর ফলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অধিকার সুরক্ষিত হবে।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com