বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-০৭): ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবহৃত ‘স্থাবর সম্পত্তি’ সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়ে বাণিজ্যিক বিরোধ
যেকোনো বড় ব্যবসা, কলকারখানা, ব্যাংক বা শপিং মল পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় উপযুক্ত স্থাবর সম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেট (যেমন- অফিস স্পেস, গোডাউন, কারখানার জায়গা)। এই ধরনের মূল্যবান বাণিজ্যিক সম্পত্তির চুক্তি নিয়ে বিরোধ হলে ব্যবসার অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৬)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, "ব্যবসা বা বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত চুক্তি" (agreements relating to immovable property used exclusively in trade or commerce) থেকে উদ্ভূত বিরোধগুলো 'বাণিজ্যিক বিরোধ' হিসেবে গণ্য হবে এবং বাণিজ্যিক আদালতে এর বিচার হবে। ধারা ২(ঘ)(৬) মূলত স্থাবর সম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেটকে বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একটি কলকারখানা, শপিং মল, গুদামঘর বা কর্পোরেট অফিস—এই সবকিছুর মূলেই রয়েছে স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত চুক্তি।
এই ধারার মূল শর্ত হলো সম্পত্তিটিকে শুধুমাত্র ব্যবসা বা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে (Exclusively in trade or commerce) ব্যবহৃত হতে হবে। সাধারণ আবাসিক বাড়ি বা কৃষি জমির বিরোধ এই ধারার আওতায় পড়বে না।
এই ধারার অধীন মামলা দায়ের করার প্রধান গ্রাউন্ড বা ক্ষেত্রগুলো এবং সেগুলোর একাধিক বাস্তব উদাহরণ নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো:
বাণিজ্যিক ইজারা, লিজিং বা ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ (Commercial Lease and Rent Disputes):
আধুনিক ব্যবসায় বড় বড় কারখানা, শপিং মল বা লজিস্টিক সেন্টারগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী ইজারা বা লিজিং চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয় । এই চুক্তিগুলোর বাণিজ্যিক শর্ত অত্যন্ত জটিল হয়ে থাকে, যা সাধারণ আবাসিক ভাড়া আইনের বাইরে গিয়ে বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নেওয়া অফিস স্পেস, শোরুম বা কারখানার জায়গা ভাড়ার চুক্তি (Lease Agreement) নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ এই গ্রাউন্ডের অন্তর্ভুক্ত। ভাড়াটিয়া যদি ভাড়া না দেয় অথবা মালিক যদি চুক্তির শর্ত ভেঙে বেআইনিভাবে উচ্ছেদ করতে চায়, তবে মামলা করা যায়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড বা কারণসমূহ:
মেয়াদ-পূর্ব উচ্ছেদ (Wrongful Eviction): চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া বা চুক্তি বহির্ভূতভাবে মালিক পক্ষ যদি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে উচ্ছেদ করতে চায় ।
ভাড়া বৃদ্ধি ও সার্ভিস চার্জ নিয়ে দ্বন্দ্ব: চুক্তিতে নির্ধারিত হারের বাইরে অন্যায়ভাবে ভাড়া বৃদ্ধি বা ইউটিলিটি বিলের অসঙ্গতি ।
সম্পত্তির ব্যবহারিক পরিবর্তন: ইজারা গ্রহীতা যদি মালিকের অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক সম্পত্তির কাঠামো পরিবর্তন করে বা চুক্তির শর্ত ভেঙে ভিন্ন ধরনের ব্যবসা শুরু করে ।
বাস্তব উদাহরণ ১:
একটি বহুজাতিক কফি চেইন একটি লাক্সারি শপিং মলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে ১০ বছরের জন্য ইজারা চুক্তি করে তাদের আউটলেট পরিচালনা করছে। ৩ বছর পর শপিং মল কর্তৃপক্ষ ভবনটি সংস্কার করার অজুহাত দেখিয়ে কফি চেইনটিকে দ্রুত জায়গাটি খালি করার নোটিশ দেয়। কফি চেইন কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে, তাদের কয়েক কোটি টাকার ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন এবং গুডউইল নষ্ট হবে। এক্ষেত্রে কোম্পানিটি তাদের ইজারা অধিকার রক্ষায় এবং অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Temporary Injunction) জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে ।
বাস্তব উদাহরণ ২ (বেআইনিভাবে উচ্ছেদের চেষ্টা):
প্রেক্ষাপট: 'ক' রেস্টুরেন্ট একটি বাণিজ্যিক ভবনের নিচতলায় ৫ বছরের চুক্তিতে একটি স্পেস ভাড়া নেয়। রেস্টুরেন্টটি খুব জনপ্রিয় হওয়ার পর, ৩ বছর পার হতেই ভবনের মালিক বেশি ভাড়ার লোভে 'ক' রেস্টুরেন্টকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার জন্য পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
মামলার কারণ: বাণিজ্যিক ইজারা চুক্তির (Commercial Lease) সরাসরি লঙ্ঘন। 'ক' রেস্টুরেন্ট তাদের ব্যবসা রক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন দখল বজায় রাখা এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করে ইনজাংশন (Injunction) চাইতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (বাণিজ্যিক কারখানার ভাড়া বকেয়া):
প্রেক্ষাপট: 'খ' গার্মেন্টস লিমিটেড গাজীপুরে ৫০,০০০ স্কয়ার ফিটের একটি গোডাউন ভাড়া নেয়। প্রথম এক বছর ঠিকমতো ভাড়া দেওয়ার পর তারা টানা ৮ মাস গোডাউনের ভাড়া দেওয়া বন্ধ রাখে এবং জায়গাটিও ছাড়ছে না।
মামলার কারণ: বাণিজ্যিক সম্পত্তির ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থতা। গোডাউনের মালিক বকেয়া ভাড়া আদায় এবং ভাড়াটিয়াকে আইনানুগভাবে উচ্ছেদের জন্য ধারা ২(ঘ)(৬) এর অধীন মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৪:
গাজীপুরের একটি টেক্সটাইল মিল মালিক তার ফ্যাক্টরি শেডটি ১০ বছরের জন্য অন্য একটি কোম্পানিকে সাব-লিজ দেন। সাব-লিজ চুক্তিতে উল্লেখ ছিল যে প্রতি বছর ৫% হারে ভাড়া বাড়বে। কিন্তু ভাড়াটিয়া কোম্পানিটি টানা ২ বছর কোনো ভাড়া বৃদ্ধি না করে পুরনো হারে ভাড়া পাঠিয়ে দিচ্ছে এবং ফ্যাক্টরি প্রাঙ্গণে অবৈধভাবে কেমিক্যাল স্টোর করছে যা চুক্তির পরিপন্থী। মালিক পক্ষ এখানে বকেয়া ভাড়া আদায় এবং চুক্তি ভঙ্গের কারণে উচ্ছেদের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন ।
বাণিজ্যিক সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি (Sale and Purchase Agreements of Commercial Property):
বাণিজ্যিক ফ্লোর, শপিং মলের দোকান বা কারখানার জন্য জমি কেনার উদ্দেশ্যে বায়না চুক্তি বা সেলস এগ্রিমেন্ট করার পর কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালে এই গ্রাউন্ডে মামলা হয়।
বাস্তব উদাহরণ ১ (দখল হস্তান্তরে বিলম্ব):
প্রেক্ষাপট: 'গ' আইটি সল্যুশনস একটি কমার্শিয়াল টাওয়ারে নিজেদের প্রধান কার্যালয় বানানোর জন্য একটি ডেভেলপার কোম্পানির সাথে ১০ হাজার স্কয়ার ফিট ফ্লোর কেনার চুক্তি করে এবং মূল্যের ৮০% পরিশোধ করে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালে ফ্লোর বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ডেভেলপার ২০২৬ সালেও দখল হস্তান্তর করতে পারেনি।
মামলার কারণ: বাণিজ্যিক সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তিতে ব্যর্থতা এবং ব্যবসায়িক ক্ষতি। 'গ' আইটি সল্যুশনস দখল বুঝে পাওয়া অথবা ক্ষতিপূরণসহ টাকা ফেরতের জন্য মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (বায়না চুক্তির পর সাফ কবলায় অস্বীকৃতি):
প্রেক্ষাপট: 'ঘ' লজিস্টিকস তাদের ট্রাক টার্মিনাল বানানোর জন্য একটি বাণিজ্যিক প্লট কেনার বায়না (Deed of Agreement) করে ২ কোটি টাকা অগ্রিম দেয়। ৬ মাস পর জমির দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে বিক্রেতা চুক্তির বাকি টাকা নিতে এবং জমিটি রেজিস্ট্রি করে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
মামলার কারণ: বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত স্থাবর সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদন বা 'Specific Performance of Contract'। 'ঘ' লজিস্টিকস বিক্রেতাকে জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে বাধ্য করার জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
বাণিজ্যিক ভবনের লিজ এবং 'প্রকৃত ব্যবহার' সংক্রান্ত জটিলতা:
উদাহরণ: একটি বেসরকারি ব্যাংক একটি ভবনের নিচতলা ১৫ বছরের জন্য লিজ নিয়ে সেখানে শাখা পরিচালনা করছে। ১০ বছর পর ভবনের মালিক দাবি করেন যে, ব্যাংকের এটিএম (ATM) বুথ স্থাপনের ফলে ভবনের কাঠামোগত ক্ষতি হচ্ছে এবং তিনি ব্যাংকের লিজ বাতিল করে উচ্ছেদের নোটিশ দেন। ব্যাংক দাবি করে যে এটিএম বুথ স্থাপনের অনুমতি চুক্তিতেই ছিল।
আইনি গ্রাউন্ড: ব্যাংক শাখা একটি বিশুদ্ধ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ভবনটি একান্তভাবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে । ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২(ঘ)(৬) ধারার অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করে একটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Temporary/Permanent Injunction) আবেদন করতে পারবে যাতে তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত না হয় । এখানে গ্রাউন্ড হলো চুক্তির সঠিক ব্যাখ্যা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের নিরবচ্ছিন্নতা রক্ষা করা ।
বাণিজ্যিক প্লট বা ভবনের বিক্রয় ও হস্তান্তর সংক্রান্ত বিরোধ:
বাণিজ্যিক ভবন, ইন্ডাসট্রিয়াল প্লট বা অফিসের স্পেস কেনা-বেচার ক্ষেত্রে সম্পাদিত ‘Agreement to Sell’ বা বায়না চুক্তি থেকে এই বিরোধের সূত্রপাত হয় । যখন কোনো পক্ষ চুক্তির শর্তানুযায়ী দলিল সম্পাদন বা দখল হস্তান্তরে ব্যর্থ হয়, তখন বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় ।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড বা কারণসমূহ:
চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদন (Specific Performance): ক্রেতা সমুদয় মূল্য পরিশোধ করার পরও বিক্রেতা যদি বাণিজ্যিক সম্পত্তি হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে, তবে এই গ্রাউন্ডে মামলা করা যায় ।
প্রতারণা ও তথ্য গোপন (Fraud and Misrepresentation): বিক্রিত বাণিজ্যিক সম্পত্তিটি যদি অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক থাকে এবং সেই তথ্য গোপন করে বিক্রি করা হয়, তবে তা এই ধারার অধীনে বিচার্য হবে ।
মূল্য পরিশোধে ব্যর্থতা: চুক্তির কিস্তি বা অবশিষ্ট মূল্য প্রদানে ক্রেতার ব্যর্থতা বিক্রেতাকে চুক্তি বাতিলের অধিকার দেয়, যা প্রায়শই বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।
বাস্তব উদাহরণ ১: ঢাকার কারওয়ান বাজারে একটি ১৫ তলা বাণিজ্যিক ভবনের ৫টি ফ্লোর ক্রয়ের জন্য একটি আইটি কোম্পানি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সাথে ৫ কোটি টাকার একটি চুক্তি সম্পাদন করে। আইটি কোম্পানিটি ৮০% টাকা পরিশোধ করার পর দখল বুঝে পায় এবং সেখানে তাদের অপারেশন শুরু করে। কিন্তু বাকি ২০% টাকা পরিশোধের সময় ডেভেলপার কোম্পানি হঠাৎ করে ফ্লোরগুলোর দাম বাড়িয়ে দেয় এবং রেজিস্ট্রি দলিল দিতে অস্বীকার করে। যেহেতু ফ্লোরগুলো বর্তমানে আইটি কোম্পানির অফিস হিসেবে ‘আসলে ব্যবহৃত’ হচ্ছে, সেহেতু এটি ধারা ২(ঘ)(৬) এর অধীনে একটি নিখুঁত বাণিজ্যিক বিরোধ এবং আইটি কোম্পানিটি ‘Specific Performance’ এর গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে ।
বাস্তব উদাহরণ ২: একটি সিমেন্ট কোম্পানি নারায়ণগঞ্জে একটি শিল্প এলাকাতে ৫ বিঘা জমি ক্রয়ের জন্য বায়না করে। বায়না পত্রে উল্লেখ ছিল জমিটি সকল দায়-মুক্ত (Encumbrance free)। কিন্তু পরে অডিট রিপোর্টে দেখা যায় জমিটি একটি ব্যাংকের কাছে ঋণ পরিশোধ না করার কারণে নিলামে ওঠার প্রক্রিয়ায় আছে। কোম্পানিটি বায়নার টাকা ফেরত চেয়ে মামলা করতে চাইলে তা এই ধারার আওতায় আসবে, কারণ জমিটি শিল্প বা বাণিজ্যিক কাজের উদ্দেশ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল ।
অগ্রিম বা জামানত ফেরত সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes regarding Advance and Security Deposits):
বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়ার ক্ষেত্রে সাধারণত বিপুল অঙ্কের (কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত) সিকিউরিটি মানি বা অগ্রিম জমা দিতে হয়। চুক্তি শেষে এই টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে ব্যাপক বিরোধ সৃষ্টি হয়।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ব্যাংকের সিকিউরিটি মানি আটকে রাখা):
প্রেক্ষাপট: একটি বেসরকারি ব্যাংক তাদের একটি শাখা পরিচালনার জন্য ১০ বছরের চুক্তিতে একটি স্পেস ভাড়া নেয় এবং ৫ কোটি টাকা অ্যাডভান্স (Advance) দেয়। ১০ বছর পর ব্যাংকটি স্পেস ছেড়ে দিলে, ভবনের মালিক সম্পূর্ণ অযৌক্তিক অজুহাত দেখিয়ে ৫ কোটি টাকা ফেরত দিতে টালবাহানা শুরু করে।
মামলার কারণ: বাণিজ্যিক চুক্তির মেয়াদ শেষে জামানত ফেরত দিতে অস্বীকৃতি। ব্যাংক তাদের বিশাল অঙ্কের এই অর্থ উদ্ধারের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (অযৌক্তিক কর্তন করে জামানত ফেরত):
প্রেক্ষাপট: 'চ' ফ্যাশন ব্র্যান্ড একটি শপিং মল থেকে তাদের শোরুম গুটিয়ে নেওয়ার সময় দেখে যে মল কর্তৃপক্ষ তাদের ১ কোটি টাকা জামানত থেকে 'মেরামত ও ক্ষতিপূরণ' বাবদ ভুয়া বিল দেখিয়ে ৬০ লক্ষ টাকা কেটে রেখেছে, অথচ শোরুমের তেমন কোনো ক্ষতিই হয়নি।
মামলার কারণ: বাণিজ্যিক ভাড়ার জামানত থেকে অন্যায্য ও বেআইনি কর্তন। 'চ' ব্র্যান্ড তাদের সম্পূর্ণ পাওনা টাকা ফেরত পেতে মামলা করতে পারবে।
৪. রক্ষণাবেক্ষণ এবং সার্ভিস সুবিধা সংক্রান্ত বিরোধ (Maintenance and Common Facility Disputes):
শপিং মল, কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স বা আইটি পার্কে সাধারণত সেন্ট্রাল এসি, এস্কেলেটর, সিকিউরিটি এবং পার্কিংয়ের মতো সুবিধা দেওয়ার কথা বলে উচ্চ সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। এই সুবিধাগুলো নিশ্চিত না করা হলে বিরোধের জন্ম হয়।
বাস্তব উদাহরণ ১ (প্রতিশ্রুত বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদানে ব্যর্থতা):
প্রেক্ষাপট: একটি বহুতল কমার্শিয়াল ভবনে পাইকারি ব্যবসায়ীরা দোকান বরাদ্দ নেন। চুক্তিতে ডেভেলপার সেন্ট্রাল এসি এবং পণ্য ওঠানামার জন্য বিশাল কার্গো লিফটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ভবন চালুর পর দেখা গেল সেন্ট্রাল এসি কাজ করে না এবং কার্গো লিফটও বসানো হয়নি, ফলে ব্যবসায়ীদের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
মামলার কারণ: বাণিজ্যিক সম্পত্তির চুক্তিতে উল্লেখিত অত্যাবশ্যকীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানে ব্যর্থতা। ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ এবং দ্রুত সুবিধাগুলো চালুর নির্দেশ চেয়ে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (অযৌক্তিকভাবে সার্ভিস চার্জ বৃদ্ধি):
প্রেক্ষাপট: একটি আইটি প্লাজার ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই দোকান মালিকদের সার্ভিস চার্জ (Service Charge) প্রতি স্কয়ার ফিটে ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে হঠাৎ ৫০ টাকা করে দেয় এবং টাকা না দিলে জেনারেটরের লাইন কেটে দেওয়ার হুমকি দেয়।
মামলার কারণ: বাণিজ্যিক চুক্তির শর্তের বাইরে গিয়ে একতরফা এবং অন্যায্যভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ফি বৃদ্ধি। দোকান মালিকরা এই সিদ্ধান্তের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে যেতে পারবেন।
শিল্প প্লট হস্তান্তরে বিলম্ব ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়া:
উদাহরণ: একটি বহুজাতিক ইস্পাত প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান 'ক' একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫ একর জমি কেনার জন্য ১০০ কোটি টাকার চুক্তি করে। প্রতিষ্ঠানটি ৫০% অর্থ অগ্রিম প্রদান করে এবং চুক্তিতে বলা হয় যে ২৪ মাসের মধ্যে জমিটি সমস্ত ইউটিলিটি সংযোগসহ হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু ৩০ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও জমি উন্নয়ন শেষ হয়নি এবং কোনো গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়নি। 'ক' প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি (LC) খুলেছে এবং এখন সেগুলো রাখার জায়গা পাচ্ছে না।
আইনি গ্রাউন্ড: এখানে বিরোধটি "ব্যবসার জন্য ব্যবহৃত স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত চুক্তি" থেকে উদ্ভূত। সম্পত্তির মূল্য ৫ কোটি টাকার উপরে হওয়ায় এটি বাণিজ্যিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত । বাদী 'ক' প্রতিষ্ঠান চুক্তির শর্তভঙ্গের কারণে 'নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন' (Specific Performance) এবং বিলম্বের কারণে আর্থিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারবে ।
শপিং মল ডেভেলপমেন্ট এবং মালিক-ডেভেলপার দ্বন্দ্ব:
উদাহরণ: ঢাকার বনানীতে একটি ৫ কাঠা জমির মালিক জনৈক ব্যক্তি একটি ডেভেলপার কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হন ১০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য। চুক্তিতে নির্ধারিত ছিল যে মালিক ৪টি ফ্লোর পাবেন এবং সেগুলো তিনি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কাছে ভাড়া দিতে পারবেন। ভবন নির্মাণের পর ডেভেলপার কোম্পানি মালিকের অংশ বুঝিয়ে না দিয়ে সেগুলো নিজেরাই সাব-লিজ দিতে শুরু করে।
আইনি গ্রাউন্ড: যেহেতু ভবনটি বাণিজ্যিক এবং এর প্রতিটি ইঞ্চি ব্যবসার উদ্দেশ্যে নির্মিত, তাই এটি ২(ঘ)(৬) ধারার আওতায় আসে । জমির মালিক বাণিজ্যিক আদালতে মামলার মাধ্যমে তার অংশের দখল পুনরুদ্ধার এবং ডেভেলপার কোম্পানি অবৈধভাবে যে ভাড়া আদায় করেছে তা 'মেসনে প্রফিট' হিসেবে দাবি করতে পারবেন ।
আইটি পার্কের পরিষেবা ও চুক্তিভঙ্গ:
উদাহরণ: একটি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি একটি আইটি পার্কে তিনটি ফ্লোর লিজ নেয়। চুক্তিতে বলা ছিল আইটি পার্ক কর্তৃপক্ষ নিরবচ্ছিন্ন হাই-স্পিড ইন্টারনেট এবং ২৪ ঘণ্টা ব্যাকআপ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করবে। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে প্রায়ই বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকে, যার ফলে কোম্পানিটি তাদের বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ সময়মতো জমা দিতে পারছে না এবং তাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
আইনি গ্রাউন্ড: আইটি পার্ক একটি বাণিজ্যিক স্থাবর সম্পত্তি। লিজ চুক্তিতে প্রদত্ত পরিষেবার মান বজায় না রাখা একটি গুরুতর বাণিজ্যিক বিরোধ । কোম্পানিটি চুক্তির শর্ত পালনে বাধ্য করতে এবং তাদের ব্যবসায়িক সুনামের ক্ষতির জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৬) শুধুমাত্র সেইসব স্থাবর সম্পত্তির জন্যই প্রযোজ্য, যা একচেটিয়াভাবে (Exclusively) ব্যবসা বা বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত হয়। আগে বাণিজ্যিক স্পেস নিয়ে বিরোধ হলে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে বছরের পর বছর পার হয়ে যেত, যার ফলে ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার পুঁজি আটকে থাকত। এই ধারাটির মাধ্যমে বাণিজ্যিক লিজ, সেলস এগ্রিমেন্ট এবং সার্ভিস চার্জ সংক্রান্ত বিরোধগুলো এখন দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাণিজ্যিক আদালতে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com