বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-০৬): নির্মাণ ও অবকাঠামোগত চুক্তি এবং দরপত্র (construction and infrastructure contracts and tenders) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(৫) ধারায় মূলত তিনটি প্রধান উপাদানের সমন্বয়ে বাণিজ্যিক বিরোধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে: নির্মাণ চুক্তি, অবকাঠামোগত চুক্তি এবং এই দুই ধরণের চুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়া । বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন প্রেক্ষাপটে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা পায়রা বন্দরের মতো বিশাল প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন ও শিল্প অবকাঠামো নির্মাণে এই ধারাটি সরাসরি প্রয়োগযোগ্য ।
এই খাতের বিরোধগুলো সাধারণ ব্যবসা থেকে ভিন্ন হওয়ার কারণ হলো এতে প্রকৌশলগত জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প সময়কাল এবং একাধিক পক্ষ যেমন—মালিক (Employer), প্রধান ঠিকাদার (Main Contractor), উপ-ঠিকাদার (Sub-contractor), পরামর্শক (Consultant) এবং অর্থায়নকারী সংস্থা (Financier) জড়িত থাকে । এই আইন আসার আগে এই বিরোধগুলো ১৮৭২ সালের চুক্তি আইন এবং ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির অধীনে পরিচালিত হতো, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল নির্মাণ খাতের চাহিদার তুলনায় ছিল অত্যন্ত ধীর ।
একটা সময় ছিল যখন নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন (Construction and Infrastructure Development) যেমন- মেগা প্রজেক্ট, ফ্লাইওভার, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ সংক্রান্তে চুক্তি এবং দরপত্র (construction and infrastructure contracts and tenders) নিয়ে বাণিজ্যিক বিরোধ সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেওয়ানী আদালতের দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে বিরোধগুলো নিয়ে কোর্টে আসতো না। এখন নির্মাণ চুক্তি এবং দরপত্র সংক্রান্ত বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুততার সাথে নিরসনের জন্য নতুন আইন-আদালত করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে এসব বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৫)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, "নির্মাণ ও অবকাঠামোগত চুক্তি এবং এতদসংক্রান্ত দরপত্র" (construction and infrastructure contracts, including tenders) থেকে উদ্ভূত যেকোনো বিরোধ 'বাণিজ্যিক বিরোধ' হিসেবে পরিগণিত হবে। আধুনিক নগরায়ন, মেগা প্রজেক্ট এবং ব্যাপক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের এই যুগে এই খাতের বিরোধগুলো সাধারণ দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত করে দ্রুত নিষ্পত্তির পথ প্রশস্ত করাই এই অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য ।
নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে সাধারণত যেসব বাণিজ্যিক বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং যেই গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করা যায়, সেগুলোর একাধিক বাস্তব উদাহরণ নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো:
দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes arising from Tenders):
কোনো অবকাঠামো নির্মাণের প্রথম ধাপ হলো দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান। দরপত্র মূল্যায়নে অনিয়ম, অন্যায্যভাবে দরপত্র বাতিল বা জামানত বাজেয়াপ্ত করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ এই গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারে। অধ্যাদেশের ২(ঘ)(৫) ধারায় স্পষ্টভাবে “দরপত্র” শব্দটির উল্লেখ থাকায় এখন টেন্ডার প্রক্রিয়ার অনিয়মগুলো বাণিজ্যিক আদালতের অধীনে বিচার করা সম্ভব । যদিও সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা আছে, তবুও চুক্তিতে রূপান্তরের আগের বাণিজ্যিক বিবাদগুলো এখানে আসতে পারে।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড বা কারণসমূহ:
অন্যায্য মূল্যায়ন: সর্বনিম্ন দরদাতা এবং কারিগরিভাবে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কোনো পক্ষকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করা ।
ই-জিপি (e-GP) কারিগরি ত্রুটি: ইলেকট্রনিক টেন্ডারিং ব্যবস্থায় সার্ভার সমস্যার কারণে দরপত্র জমা দিতে না পারা বা ভুল তথ্য প্রদর্শনের ফলে সৃষ্টি হওয়া বিরোধ ।
দরপত্র জামানত বাজেয়াপ্তকরণ: কোনো দরদাতার বিড সিকিউরিটি বা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি অন্যায়ভাবে এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বাজেয়াপ্ত করা ।
একপাক্ষিক শর্ত পরিবর্তন: দরপত্র আহ্বানের পর এবং জমা দেওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলীতে গোপনে পরিবর্তন আনা ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (সরকারি সড়ক উন্নয়ন):
একটি সরকারি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ৩টি কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়। কোম্পানি 'ক' সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে তাদের অভিজ্ঞতার সনদে ভুল আছে এবং দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে। কোম্পানি 'ক' প্রমাণ দেখায় যে তাদের সনদ সঠিক এবং কর্তৃপক্ষ তাদের ফাইল গায়েব করেছে। এই ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ কোম্পানি দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা চ্যালেঞ্জ করে এবং কার্যাদেশ পাওয়ার দাবিতে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে ।
বাস্তব উদাহরণ ২ (আইটি অবকাঠামো):
একটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ক্যাম্পাস নেটওয়ার্কিং অবকাঠামো তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করে। একটি প্রতিষ্ঠান তাদের দরপত্রের সাথে ২ কোটি টাকার একটি ব্যাংক গ্যারান্টি বা বিড বন্ড জমা দেয়। কর্তৃপক্ষ লবিংয়ের কারণে দরপত্রটি বাতিল ঘোষণা করে কিন্তু ঠিকাদারের বিড বন্ডের টাকা ফেরত দিচ্ছে না, বরং দাবি করছে তারা শর্ত ভঙ্গ করেছে। এই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিড বন্ডের টাকা ফেরত পাওয়ার গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে ।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (অন্যায্যভাবে টেন্ডার মূল্যায়ন):
প্রেক্ষাপট: একটি প্রাইভেট ইকোনমিক জোন কর্তৃপক্ষ রাস্তা নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে। 'ক' কনস্ট্রাকশন কোম্পানি সবচেয়ে কম মূল্যে (Lowest Bidder) এবং সব কারিগরি শর্ত মেনে টেন্ডার জমা দেয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ 'ক' কে কাজ না দিয়ে, দুর্নীতির মাধ্যমে বা পছন্দের কারণে অযোগ্য এবং বেশি দর হাঁকানো 'খ' কোম্পানিকে কাজ দিয়ে দেয়।
মামলার কারণ: দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন। 'ক' কোম্পানি টেন্ডার প্রক্রিয়ার এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে কাজ স্থগিত বা ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৪ (টেন্ডার সিকিউরিটি বা আর্নেস্ট মানি বাজেয়াপ্ত):
প্রেক্ষাপট: 'গ' ইঞ্জিনিয়ারিং একটি পাওয়ার প্লান্টের টেন্ডারে অংশ নিতে ৫০ লক্ষ টাকার 'টেন্ডার সিকিউরিটি' বা আর্নেস্ট মানি জমা দেয়। কর্তৃপক্ষ কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল ঘোষণা করে, কিন্তু 'গ' ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জমা দেওয়া ৫০ লক্ষ টাকা ফেরত না দিয়ে তা বাজেয়াপ্ত (Forfeit) করে।
মামলার কারণ: দরপত্রের শর্তের বাইরে গিয়ে বেআইনিভাবে জামানত বাজেয়াপ্ত করা। টাকা উদ্ধারের জন্য এই ধারায় মামলা করা যাবে।
নির্মাণ কাজে বিলম্ব এবং চুক্তিভঙ্গ (Delay in Work and Breach of Contract):
নির্মাণ চুক্তির সবচেয়ে বড় বিরোধ হলো সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারা অথবা মাঝপথে কাজ ফেলে চলে যাওয়া। সময়ের সাথে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ে, তাই বিলম্ব মানেই বিশাল আর্থিক ক্ষতি।
বাস্তব উদাহরণ ১ (ঠিকাদারের কাজ ফেলে চলে যাওয়া):
প্রেক্ষাপট: 'ঘ' ডেভেলপারস একটি ১০ তলা কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। ২ তলা পর্যন্ত কাজ করার পর তারা কাজ বন্ধ করে দেয় এবং সাইট থেকে তাদের যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেয়। মালিকপক্ষ বারবার তাগিদ দিলেও তারা কাজ শুরু করেনি।
মামলার কারণ: চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন (Breach of Contract) এবং কাজ পরিত্যাগ (Abandonment)। মালিকপক্ষ চুক্তি বাতিল এবং আর্থিক ক্ষতির জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (মালিকপক্ষের কারণে কাজে বিলম্ব):
প্রেক্ষাপট: 'ঙ' বিল্ডার্স একটি কারখানা নির্মাণের কাজ পায়। শর্ত ছিল মালিকপক্ষ জানুয়ারি মাসে জমি বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু মালিকপক্ষ জমি বুঝিয়ে দেয় ৬ মাস পর। এই ৬ মাস 'ঙ' বিল্ডার্সের শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি বসিয়ে রাখতে হয় (Idle Time), যার কারণে তাদের ২ কোটি টাকা লোকসান হয়।
মামলার কারণ: মালিকপক্ষের ব্যর্থতায় কাজে বিলম্ব এবং ঠিকাদারের আর্থিক ক্ষতি (Idle time claim)। ঠিকাদার ক্ষতিপূরণের জন্য মামলা দায়ের করতে পারবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং লিকুইডেটেড ড্যামেজ (Delay and Liquidated Damages):
নির্মাণ চুক্তিতে সময় বা টাইমলাইন হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। একে আইনি ভাষায় 'Time is of the essence of the contract' বলা হয় । যখন কোনো পক্ষ চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন বাণিজ্যিক বিরোধের সূত্রপাত হয়।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড বা কারণসমূহ :
মবিলাইজেশনে বিলম্ব: ঠিকাদার যদি কার্যাদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল সাইটে আনতে দেরি করে ।
সাইট হস্তান্তরে বিলম্ব : মালিক পক্ষ যদি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জমি বা কাজের জায়গা ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হয় ।
নকশা ও ড্রয়িং অনুমোদনে বিলম্ব : অবকাঠামো প্রকল্পের প্রকৌশল নকশা বা ডিজাইন অনুমোদন দিতে কর্তৃপক্ষের অস্বাভাবিক বিলম্বের কারণে কাজ থমকে যাওয়া ।
লিকুইডেটেড ড্যামেজ দাবি : বিলম্বের কারণে মালিক পক্ষ কর্তৃক ঠিকাদারের পাওনা থেকে চুক্তিতে নির্ধারিত হারে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ কর্তন করা ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (বন্দর অবকাঠামো) :
একটি বিদেশি বিনিয়োগকারী সংস্থা বাংলাদেশের একটি গভীর সমুদ্র বন্দরের টার্মিনাল নির্মাণের জন্য একটি চুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তিতে শর্ত ছিল যে, চুক্তি স্বাক্ষরের ৯০ দিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষ জমি লিজ বা হস্তান্তর করবে। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতায় ২ বছর পার হয়ে গেলেও জমি হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। এদিকে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাদের ড্রেজার এবং ভারি যন্ত্রপাতি ভাড়া করে সাইটে এনে বসিয়ে রেখেছে। এই ক্ষেত্রে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক আদালতে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সাইট হস্তান্তরে ব্যর্থতা এবং অলস পড়ে থাকা যন্ত্রপাতির ভাড়াজনিত আর্থিক ক্ষতির দাবিতে মামলা করতে পারবে ।
বাস্তব উদাহরণ ২ (আবাসন প্রকল্প) :
একটি আবাসন কোম্পানি একটি নির্মাণ সংস্থাকে ২০টি বহুতল ভবন নির্মাণের দায়িত্ব দেয়। চুক্তিতে স্পষ্ট ছিল যে ৩ বছরের মধ্যে কাজ হস্তান্তর করতে হবে, অন্যথায় প্রতি মাসের বিলম্বের জন্য চুক্তিমূল্যের ০.৫% হারে জরিমানা দিতে হবে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ৪ বছর পার হওয়ার পরেও কাজ শেষ করতে পারেনি এবং তারা দাবি করছে যে কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে কাজ ধীর হয়েছে। মালিক পক্ষ এই ক্ষেত্রে সময়সীমা লঙ্ঘনের দায়ে লিকুইডেটেড ড্যামেজ আদায়ের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে ।
বিল পরিশোধ, বকেয়া বিল এবং মূল্য বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Payment, Arear, Billing and Cost Escalation):
নির্মাণ খাতের সবচেয়ে সাধারণ বিরোধ হলো অর্থ পরিশোধ নিয়ে। যেহেতু এই প্রকল্পগুলো ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয় এবং বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, তাই পেমেন্টে বিলম্ব হলে পুরো প্রকল্প স্থবির হয়ে যায় । কাজ করার পর রানিং বিল (Interim/Running Bill) আটকে দেওয়া, কিংবা কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বর্ধিত মূল্য না দেওয়া এই খাতের একটি সাধারণ বিরোধ।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড বা কারণসমূহ :
রানিং বিল আটকে রাখা : কাজের অংশ বিশেষ সম্পন্ন হওয়ার পর জমাকৃত অন্তর্বর্তীকালীন বিল বা 'রানিং বিল' মালিক পক্ষ কর্তৃক যৌক্তিক কারণ ছাড়াই পরিশোধ না করা ।
ভেরিয়েশন অর্ডার (Variation Order) : প্রকল্পের কাজ চলাকালীন মালিকের নির্দেশে মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত কাজ করা হলেও তার পাওনা পরিশোধে অস্বীকৃতি ।
রিটেনশন মানি (Retention Money) : কাজ শেষ হওয়ার পর জামানত হিসেবে রাখা টাকা ফেরত দিতে মালিকের গড়িমসি ।
মূল্য সমন্বয় (Price Escalation) : দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পে নির্মাণ সামগ্রীর দাম অস্বাভাবিক বাড়লে চুক্তিতে মূল্য সমন্বয়ের ধারা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর না করা ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (মেট্রো রেল প্রকল্প) :
একটি মেট্রো রেল প্রকল্পে একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান একটি উড়াল পথ বা ভায়াডাক্টের কাজ শেষ করে ৫০ কোটি টাকার একটি পেমেন্ট সার্টিফিকেট বা বিল জমা দেয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিলটি অনুমোদন বা সার্টিফাই করলেও কর্তৃপক্ষ বাজেটের দোহাই দিয়ে ৬ মাস ধরে বিলটি আটকে রেখেছে। ঠিকাদার তাদের শ্রমিকদের বেতন এবং সরবরাহকারীদের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না। এই ক্ষেত্রে ঠিকাদার বকেয়া বিল এবং চুক্তিতে বর্ণিত সুদসহ টাকা আদায়ের গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে ।
বাস্তব উদাহরণ ২ (বিদ্যুৎ কেন্দ্র):
একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কাজ চলাকালীন কর্তৃপক্ষ নকশায় পরিবর্তন এনে একটি অতিরিক্ত জেনারেটর কক্ষ নির্মাণের মৌখিক নির্দেশ দেয়। ঠিকাদার সেই অতিরিক্ত কাজ সম্পন্ন করার পর ভেরিয়েশন ক্লেম জমা দিলে কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে এটি মূল চুক্তিরই অংশ ছিল এবং আলাদা টাকা দেওয়া হবে না। এই ক্ষেত্রে ঠিকাদার ভেরিয়েশন পেমেন্ট আদায়ের লক্ষে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে ।
বাস্তব উদাহরণ ৩ (রানিং বিল আটকে দেওয়া):
প্রেক্ষাপট: একটি সাব-কন্ট্রাক্টর কোম্পানি মূল ঠিকাদারের (Main Contractor) অধীনে একটি ব্রিজের কাজ করছিল। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে বিল দেওয়ার কথা। সাব-কন্ট্রাক্টর ৫০% কাজ শেষ করে ৩টি রানিং বিল জমা দেয়, কিন্তু মূল ঠিকাদার কোনো কারণ ছাড়াই বিলগুলো আটকে রাখে।
মামলার কারণ: সম্পাদিত কাজের চুক্তিভিত্তিক পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতা। সাব-কন্ট্রাক্টর বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ৪ (এসকেলেশন বা মূল্য বৃদ্ধির দাবি অস্বীকার):
প্রেক্ষাপট: 'চ' কনস্ট্রাকশন একটি তিন বছর মেয়াদী প্রজেক্টের কাজ পায়। চুক্তিতে 'প্রাইস এসকেলেশন ক্লজ' (Price Escalation Clause) ছিল, অর্থাৎ রড বা সিমেন্টের দাম অস্বাভাবিক বাড়লে মালিকপক্ষ অতিরিক্ত টাকা দেবে। ২ বছর পর রডের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, কিন্তু মালিকপক্ষ এসকেলেশন ক্লজ মানতে অস্বীকার করে এবং আগের দামেই কাজ করতে বাধ্য করে।
মামলার কারণ: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বর্ধিত ব্যয় (Cost Escalation) প্রদানে অস্বীকৃতি।
কাজের মান এবং ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ (Defective Work and Quality Issues):
চুক্তিতে উল্লেখিত ডিজাইন, স্পেসিফিকেশন বা গুণগত মান অনুযায়ী কাজ না করলে, অথবা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করলে এই গ্রাউন্ডে মামলা হয়।
বাস্তব উদাহরণ ১ (নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার):
প্রেক্ষাপট: 'ছ' লিমিটেড একটি আইটি পার্ক নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করে। চুক্তিতে ৫০০ গ্রেডের স্টিল এবং প্রিমিয়াম সিমেন্ট ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু কাজ শেষে বিশেষজ্ঞ পরিদর্শনে দেখা যায় ঠিকাদার অত্যন্ত নিম্নমানের লোকাল রড ব্যবহার করেছে, ফলে ভবনটি ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।
মামলার কারণ: চুক্তিভিত্তিক স্পেসিফিকেশন (Specification) লঙ্ঘন এবং ত্রুটিপূর্ণ কাজ (Defective workmanship)। মালিকপক্ষ ক্ষতিপূরণ এবং ভবন সংস্কারের খরচ চেয়ে মামলা করতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডে ত্রুটি):
প্রেক্ষাপট: একটি হাসপাতাল ভবন নির্মাণের পর হস্তান্তর করা হয়। চুক্তিতে ১ বছরের 'ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড' (Defect Liability Period) ছিল। ৬ মাসের মধ্যেই ভবনের ছাদে ফাটল ধরে এবং পানি পড়তে শুরু করে। ঠিকাদারকে জানানোর পরও তারা নিজ খরচে তা মেরামত করতে অস্বীকার করে।
মামলার কারণ: নির্মাণ পরবর্তী ওয়ারেন্টি বা লায়াবিলিটি পিরিয়ডের শর্ত ভঙ্গ।
কাজের গুণগত মান এবং স্পেসিফিকেশন সংক্রান্ত বিচ্যুতি (Quality and Specifications Disputes):
অবকাশঠামো প্রকল্পের স্থায়িত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চুক্তিতে বর্ণিত নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। এই মানদণ্ড থেকে বিচ্যুতি ঘটলে তা গুরুতর চুক্তিভঙ্গ হিসেবে গণ্য হয় ।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড বা কারণসমূহ:
নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার: চুক্তিতে বর্ণিত গ্রেডের সিমেন্ট, রড বা পাথর ব্যবহার না করে সাশ্রয় করার চেষ্টা করা ।
প্রকৌশল নকশার ব্যত্যয়: অনুমোদিত আর্কিটেকচারাল বা স্ট্রাকচারাল ডিজাইন পরিবর্তন করে কাজ করা ।
ত্রুটি সংশোধন না করা: কাজ হস্তান্তরের পর 'ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড' এর মধ্যে ধরা পড়া ত্রুটিগুলো ঠিকাদার কর্তৃক সংশোধন করতে অস্বীকৃতি জানানো ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (সেতু নির্মাণ):
একটি আন্তঃজেলা মহাসড়ক সেতু নির্মাণে চুক্তিতে বলা ছিল যে পাইলিংয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিএসটিআই মানসম্পন্ন এবং নির্দিষ্ট ব্রান্ডের হাই-টেনসিল স্টিল ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু তদারকি প্রকৌশলী পরীক্ষার মাধ্যমে দেখতে পান যে ঠিকাদার অন্য একটি স্বল্প মূল্যের এবং কম শক্তিশালী ব্র্যান্ডের রড ব্যবহার করেছে। প্রকৌশলী কাজ বন্ধের নির্দেশ দিলেও ঠিকাদার দাবি করে যে তাদের ব্যবহৃত রডও সমমানের। এই ক্ষেত্রে কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী মানসম্মত সামগ্রী ব্যবহারের আদেশ চেয়ে মালিক পক্ষ বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে ।
বাস্তব উদাহরণ ২ (শিল্প কারখানা):
একটি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন কারখানার জন্য একটি বিশেষায়িত 'ক্লিন রুম' (Clean Room) নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়। স্থাপনের পর দেখা যায় যে ঘরের আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক যন্ত্রগুলো চুক্তিতে বর্ণিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না, যা ওষুধের গুণগত মান নষ্ট করছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দাবি করছে যে এটি ব্যবহারের ভুলে হয়েছে। এই ক্ষেত্রে মালিক পক্ষ স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না করার অভিযোগে এবং প্রতিকার চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে ।
ব্যাংক গ্যারান্টি বা জামানত নগদায়ন (Wrongful Encashment of Bank Guarantees):
বড় নির্মাণ কাজে ঠিকাদারকে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (Performance Guarantee) বা অগ্রিম পেমেন্ট গ্যারান্টি (Advance Payment Guarantee) দিতে হয়। মালিকপক্ষ যদি অন্যায়ভাবে এই গ্যারান্টি ভাঙিয়ে (Encash) টাকা নিয়ে নেয়, তবে ভয়াবহ আইনি বিরোধ সৃষ্টি হয়।
বাস্তব উদাহরণ ১ (অন্যায্যভাবে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি ভাঙানো):
প্রেক্ষাপট: 'জ' ঠিকাদার একটি প্রকল্পের ৯৫% কাজ সফলভাবে শেষ করে। শেষ ৫% কাজে ছোট একটি ভুল বোঝাবুঝি হয়। মালিকপক্ষ এই ছোট ভুলের সুযোগ নিয়ে ঠিকাদারের জমা দেওয়া সম্পূর্ণ ৫ কোটি টাকার 'পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টি' ব্যাংকে জমা দিয়ে ভাঙিয়ে (Encash) ক্যাশ করে নেয়।
মামলার কারণ: ব্যাংক গ্যারান্টির অপব্যবহার বা প্রতারণামূলক নগদায়ন (Fraudulent encashment of Bank Guarantee)। ঠিকাদার এই গ্যারান্টি নগদায়ন ঠেকাতে বা টাকা উদ্ধারে ইনজাংশন (Injunction) চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে আসতে পারবে।
বাস্তব উদাহরণ ২ (অগ্রিম জামানত বা অ্যাডভান্স গ্যারান্টি সমন্বয়ে অস্বীকৃতি):
প্রেক্ষাপট: 'ঝ' কনসোর্টিয়াম একটি মেগা প্রজেক্টের কাজ পায় এবং চুক্তিমূল্যের ১০% অগ্রিম (Advance Payment) নেওয়ার জন্য একটি সমপরিমাণ অঙ্কের 'অ্যাডভান্স পেমেন্ট গ্যারান্টি' প্রদান করে। প্রজেক্টের ৪০% কাজ শেষ হওয়ার পর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী চলমান বিল থেকে অগ্রিম টাকার সমন্বয় (Adjustment) শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু মালিকপক্ষ রানিং বিল থেকে তা সমন্বয় না করেই সম্পূর্ণ গ্যারান্টির টাকা ক্যাশ করার জন্য ব্যাংকে চিঠি পাঠায়।
মামলার কারণ: চুক্তির শর্তের বরখেলাপ এবং বেআইনিভাবে অ্যাডভান্স পেমেন্ট গ্যারান্টি ভাঙানোর চেষ্টা। ঠিকাদার বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করে এর উপর স্থগিতাদেশ (Stay Order) চাইতে পারবে।
যৌথ উদ্যোগ (Joint Venture) এবং অংশীদারিত্বের বিরোধ:
বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সাধারণত দেশি ও বিদেশি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অংশীদারদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ পুরো প্রকল্পকে ঝুঁকিতে ফেলে ।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড বা কারণসমূহ:
লভ্যাংশ বণ্টন না করা: প্রকল্পের অর্থ আসার পর এক অংশীদার কর্তৃক অন্য অংশীদারকে তাদের প্রাপ্য অংশ না দেওয়া ।
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা: জেভি চুক্তিতে বর্ণিত কারিগরি বা আর্থিক দায়িত্ব কোনো এক পক্ষ পালন না করায় প্রকল্পের ক্ষতি হওয়া ।
অনৈতিক লেনদেন: এক অংশীদার কর্তৃক অন্যকে না জানিয়ে প্রকল্পের ফান্ড ব্যক্তিগত বা অন্য ব্যবসায় ব্যবহার করা ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (পাওয়ার গ্রিড নির্মাণ):
একটি বিদেশি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি এবং একটি স্থানীয় নির্মাণ কোম্পানি ৫০:৫০ অনুপাতে একটি জেভি গঠন করে ৫০০ কোটি টাকার একটি কাজ পায়। কাজ শুরুর ৬ মাস পর বিদেশি কোম্পানিটি দাবি করে যে স্থানীয় কোম্পানি প্রয়োজনীয় শ্রমিক দিতে পারছে না, অন্যদিকে স্থানীয় কোম্পানি দাবি করে বিদেশি পক্ষ তাদের ফান্ড দিচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে জেভি চুক্তির শর্ত ভঙ্গের দায়ে এবং প্রকল্পের ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে ।
ব্যাংক গ্যারান্টি এবং লেটার অফ ক্রেডিট (LC) এর অপব্যবহার:
নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে পেমেন্ট সিকিউরিটি হিসেবে ব্যাংক গ্যারান্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি অন্যায়ভাবে নগদায়ন করা হলে তা বড় ধরণের বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি করে ।
মামলা দায়েরের গ্রাউন্ড বা কারণসমূহ:
প্রতারণামূলক Encashment: ঠিকাদার কোনো চুক্তিভঙ্গ না করা সত্ত্বেও মালিক পক্ষ প্রতিহিংসামূলকভাবে তার পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা ।
LC জালিয়াতি: অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে এলসি বা ঋণপত্রের শর্তানুযায়ী পণ্য না পাঠানো সত্ত্বেও পেমেন্ট দাবি করা ।
বাস্তব উদাহরণ ১ (গ্যাস পাইপলাইন):
একটি গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের ১০ দিন আগে কাজ শেষ করে এবং সাময়িক হস্তান্তরের আবেদন করে। মালিক পক্ষ কিছু খুঁটিনাটি ভুল ধরে হঠাৎ করে ঠিকাদারের জমা দেওয়া ১০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টিটি নগদায়ন করার জন্য ব্যাংকে চিঠি দেয়। ঠিকাদার দাবি করে যে এটি একটি 'ফ্রড' বা প্রতারণা কারণ কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে ।
বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াগত সুবিধা ও কৌশল:
সাধারণ দেওয়ানি আদালতের তুলনায় নির্মাণ বিরোধের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক আদালতের কিছু স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এই খাতের জন্য অত্যন্ত কার্যকর ।
ক. দ্রুত বিচার ও ৯০ দিনের সময়সীমা:
নির্মাণ প্রকল্পে 'সময়ই টাকা'। সাধারণ আদালতে একটি নির্মাণ বিরোধ চলতে চলতে ৫-১০ বছর সময় লাগে, যার ফলে প্রকল্পের খরচ ২-৩ গুণ বেড়ে যায়। বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশের ৯(৬) ধারা অনুযায়ী চূড়ান্ত শুনানির ৯০ দিনের মধ্যে রায় দিতেই হবে । এটি ঠিকাদারদের নগদ প্রবাহ সচল রাখতে এবং মালিকদের প্রকল্প হস্তান্তরে সাহায্য করে।
খ. বিশেষজ্ঞ বিচারক ও পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি:
নির্মাণ ও অবকাঠামো চুক্তির ভাষা অত্যন্ত কারিগরি। সাধারণ দেওয়ানি আদালতের বিচারকদের পক্ষে অনেক সময় এই জটিল প্রকৌশলগত দলিলগুলো বোঝা কঠিন হয়। বাণিজ্যিক আদালতে এমন বিচারক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে যারা বাণিজ্যিক আইন ও জটিল প্রকল্পের বিরোধ মোকাবিলায় দক্ষ ।
গ. প্রযুক্তি ও ভার্চুয়াল কার্যক্রম:
অনেক অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশি বিশেষজ্ঞ বা ইঞ্জিনিয়ারদের সাক্ষ্য নেওয়ার প্রয়োজন হয়। বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশের ১৪ ধারা অনুযায়ী ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ই-ফাইলিংয়ের সুবিধা থাকায় বিদেশে বসেই এই মামলাগুলো পরিচালনা করা সম্ভব, যা এফডিআই (FDI) আকর্ষণে বড় ভূমিকা রাখে ।
ঘ. সংক্ষিপ্ত বিচার (Summary Trial):
অধ্যাদেশের ১০ নম্বর ধারায় কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে 'সংক্ষিপ্ত বিচার' বা সামারি জাজমেন্টের আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে । যদি দেখা যায় যে বিবাদীর কোনো জোরালো আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি নেই, তবে আদালত দীর্ঘ ট্রায়াল ছাড়াই দ্রুত রায় দিতে পারে। যেমন—চেক ডিজঅনার বা বিল অফ এক্সচেঞ্জ সংক্রান্ত নির্মাণ বিরোধে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতের অংশীজনদের জন্য বিশেষ পরামর্শ:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(৫) ধারার পূর্ণ সুবিধা নিতে এবং সম্ভাব্য বিরোধ এড়িয়ে চলতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য কিছু কৌশলগত সুপারিশ নিচে দেওয়া হলো:
চুক্তি পর্যালোচনা: বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ চুক্তিগুলো এই অধ্যাদেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ড্রাফটিং করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিরোধ নিষ্পত্তি ক্লজ (Dispute Resolution Clause) এ বাণিজ্যিক আদালতের এখতিয়ার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত ।
নথিপত্র সংরক্ষণ: নির্মাণ বিরোধে প্রমাণ হিসেবে সাইট ডায়েরি, ইমেইল যোগাযোগ, মেগা প্রজেক্টের ক্ষেত্রে ড্রোন ফুটেজ বা ডিজিটাল রেকর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক আদালতে ডিজিটাল এভিডেন্স গ্রহণের সুযোগ বেশি থাকায় এগুলো মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে ।
আর্থিক মূল্যমান: যেহেতু মামলার আর্থিক মূল্যমান ৫০ লক্ষ টাকা হতে হবে, তাই ছোট বিরোধগুলোকে একত্রিত করে বা বড় বিরোধের অংশ হিসেবে মামলা দায়েরের কৌশল অবলম্বন করতে হবে ।
এডিআর (ADR) এবং বাণিজ্যিক আদালত: অনেক সময় চুক্তিতে আরবিট্রেশন বা সালিশির কথা বলা থাকে। তবে বাণিজ্যিক আদালতগুলো আরবিট্রেশন প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ (যেমন—ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন ঠেকানো) প্রদানে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে ।
উপসংহার: