বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-০৫):পণ্য পরিবহন (carriage of goods) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ

বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য স্থানান্তর। পণ্য পরিবহনের সময় বিভিন্ন কারণে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে যা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৪)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, "পণ্য পরিবহন" (Carriage of Goods) সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ 'বাণিজ্যিক বিরোধ' হিসেবে গণ্য হবে। এটি সড়ক, সমুদ্র, আকাশ বা রেলপথ—যেকোনো মাধ্যমে পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

ধারা ২(ঘ)(৪) অনুসারে “পণ্য পরিবহন” বলতে সড়ক, রেল, আকাশ এবং সমুদ্রপথের মাধ্যমে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য স্থানান্তরের সময় সৃষ্ট যেকোনো আইনি দ্বন্দ্বকে বোঝায় । এটি কেবল দেশীয় পরিবহন নয়, বরং রপ্তানি-আমদানির সাথে জড়িত আন্তর্জাতিক পরিবহনকেও অন্তর্ভুক্ত করে । এই ধারার অধীনে মামলা দায়ের করার প্রাথমিক শর্ত হলো বিরোধটি অবশ্যই বাণিজ্যিক প্রকৃতির হতে হবে এবং পণ্য পরিবহনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে হবে ।

পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত বাণিজ্যিক বিরোধের প্রকৃতি ও শ্রেণিবিভাগ:
পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিনটি পক্ষ জড়িত থাকে: প্রেরক বা কনসাইনর (Consignor), পরিবহনকারী বা ক্যারিয়ার (Carrier) এবং প্রাপক বা কনসাইনি (Consignee) । এই পক্ষগুলোর মধ্যে দায়বদ্ধতা, ক্ষতিপূরণ এবং সেবার মান নিয়ে নানা ধরনের বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। ধারা ২(ঘ)(৪) এর অধীনে প্রধানত নিম্নোক্ত বিরোধগুলো সৃষ্টি হয়:

১. পণ্যের বিনাশ বা ক্ষতি (Loss or Damage of Goods): পরিবহনের সময় পণ্য সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়া বা কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।

২. পৌঁছাতে বিলম্ব (Delay in Delivery): নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য গন্তব্যে না পৌঁছানোর ফলে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি।

৩. ভুল বিতরণ বা অসহযোগিতা (Mis-delivery or Non-delivery): সঠিক মালিকের কাছে পণ্য বুঝিয়ে না দেওয়া বা ডেলিভারি দিতে অস্বীকার করা।

৪. ভাড়া বা ফ্রেইট সংক্রান্ত জটিলতা (Disputes over Freight and Charges): ভাড়ার পরিমাণ, ওয়েটেজ বা অতিরিক্ত চার্জ নিয়ে বিরোধ।

৫. চুক্তিভঙ্গ (Breach of Contract of Carriage): পরিবহন চুক্তির শর্তাবলি বা সুরক্ষা ব্যবস্থা অমান্য করা।

৬. দলিলাদি বা ডকুমেন্টেশন বিরোধ: বিল অব ল্যাডিং (Bill of Lading), এয়ার ওয়েবিল বা চালানের সত্যতা ও ব্যবহার সংক্রান্ত বিরোধ।

এই ধারার অধীনে মামলা দায়ের করার প্রধান গ্রাউন্ড বা ক্ষেত্রগুলো এবং সেগুলোর বাস্তব উদাহরণ নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো:

পণ্য হারানো, ক্ষতি, বিনাশ বা নষ্ট হওয়া (Disputes over Loss or Damage of Goods):
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মামলা দায়ের হয় মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার কারণে। এটি মূলত ক্যারিয়ার বা পরিবহনকারীর অবহেলার কারণে সৃষ্ট একটি দায়বদ্ধতা। পরিবহনের সময় পণ্য যদি পুরোপুরি হারিয়ে যায় বা আংশিক নষ্ট হয়, তবে এটি মামলার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পণ্য মালিক বা প্রেরক এক্ষেত্রে বাহক (Carrier) বা লজিস্টিক কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ
অবহেলার প্রমাণ (Proof of Negligence): পরিবহনকারী যদি পণ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী (যেমন ভঙ্গুর বা পচনশীল) যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করেন, তবে এটি একটি শক্তিশালী গ্রাউন্ড ।

সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব: পরিবহনে ব্যবহৃত যানে যদি ছিদ্র থাকে বা ত্রিপল বা লক সিস্টেম কাজ না করে এবং এর ফলে পণ্য নষ্ট হয় ।

আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন: ক্যারিয়ার্স অ্যাক্ট ১৮৬৫ এর ধারা ৮ অনুযায়ী, পরিবহনকারী বা তার এজেন্টের অপরাধমূলক কাজ বা অবহেলার জন্য তারা দায়বদ্ধ থাকবেন ।

বাস্তব উদাহরণ:
উদাহরণ (সড়কপথ): একটি ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে রেফ্রিজারেটেড ভ্যানের মাধ্যমে ২ কোটি টাকার ইনসুলিন পাঠায়। পথিমধ্যে ভ্যানের কুলিং সিস্টেম বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যায় এবং চালক বিষয়টি উপেক্ষা করে গন্তব্যে পৌঁছান। এর ফলে সব ইনসুলিন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এখানে “পণ্য পরিবহন” ২(ঘ)(৪) ধারার অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করা যাবে। গ্রাউন্ড হিসেবে দেখানো হবে যে, ক্যারিয়ার পচনশীল পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে যা চুক্তির মৌলিক অবহেলা।

উদাহরণ (সড়কপথে পণ্য চুরি):
প্রেক্ষাপট: 'ক' ট্রেডার্স ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ৫ কোটি টাকার ইলেকট্রনিক্স পণ্য পাঠানোর জন্য একটি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির ট্রাক ভাড়া করে। পথিমধ্যে ট্রাকের চালক ও সহকারীর অবহেলায় বা যোগসাজশে পণ্যবাহী ট্রাকটি নিখোঁজ হয়ে যায়।

মামলার কারণ: এখানে বাহক বা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি পণ্যটি গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। ধারা ২(ঘ)(৪) এর অধীনে 'ক' ট্রেডার্স পণ্যের পূর্ণ মূল্য ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

উদাহরণ (সমুদ্রপথে পণ্য নষ্ট হওয়া):
প্রেক্ষাপট: 'খ' লিমিটেড বিদেশ থেকে রেফ্রিজারেটেড কন্টেইনারে করে ফ্রোজেন ফুড আমদানি করে। শিপিং লাইনের অবহেলায় কন্টেইনারের কুলিং সিস্টেম বন্ধ থাকায় বন্দরে পৌঁছানোর পর দেখা যায় সব খাবার পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

মামলার কারণ: বাহকের অবহেলায় পণ্য নষ্ট হওয়া। আমদানিকারক শিপিং লাইনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক দলিল (Bill of Lading) ও ধারা ২(ঘ)(৪) ব্যবহার করে মামলা করতে পারবে।

উদাহরণ (রেলপথ): একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ১০টি রেল ওয়াগনে করে ৫০০০ ব্যাগ সিমেন্ট সিলেটে পাঠায়। রেলের ওয়াগনে ছিদ্র থাকার কারণে বৃষ্টির পানি ঢুকে ১০০০ ব্যাগ সিমেন্ট জমাট বেঁধে নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে রেলওয়ে আইন ১৮৯০ অনুযায়ী, রেলওয়ে প্রশাসন মালামালের জিম্মাদার বা বেইলর (Bailee) হিসেবে কাজ করে । সিমেন্ট মালিক বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবেন এই গ্রাউন্ডে যে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পণ্য পরিবহনের জন্য ত্রুটিমুক্ত ওয়াগন সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

পণ্য পরিবহন বা ডেলিভারিতে বিলম্ব ও বাণিজ্যিক ক্ষতি (Disputes over Delay in Carriage, Delivery and Loss):
বাণিজ্যিক লেনদেনে 'সময়' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পচনশীল দ্রব্য বা মৌসুমী পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবহনে বিলম্ব হলে পণ্যের বাজারমূল্য কমে যায় বা পণ্যটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে কাঁচামাল বা ফিনিশড গুডস না পৌঁছালে ব্যবসায়িক সুযোগ নষ্ট হয় এবং অনেক সময় ডেমারেজ গুনতে হয়।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ
অযৌক্তিক বিলম্ব (Unreasonable Delay): কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা হরতাল ছাড়াই যদি যান্ত্রিক ত্রুটি বা গাফিলতির কারণে পণ্য দেরি করে পৌঁছায় ।

আর্থিক ক্ষতি (Consequential Loss): বিলম্বের ফলে যদি কোনো রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়ে যায় বা পণ্যের বাজারমূল্য কমে যায় ।

চুক্তিতে উল্লিখিত সময়সীমা লঙ্ঘন: বিল অব ল্যাডিং বা চুক্তিতে যদি নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ থাকে এবং তা অতিক্রান্ত হয়।

বাস্তব উদাহরণ
উদাহরণ (আকাশপথ): একজন আমদানিকারক কোরবানির ঈদ উপলক্ষে চীন থেকে ২০০০টি স্মার্ট ওয়াচ আকাশপথে আনার চুক্তি করেন। পণ্যটি ঈদের ৫ দিন আগে পৌঁছানোর কথা থাকলেও এয়ারলাইন্স কোম্পানি কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই ১০ দিন পর ডেলিভারি দেয়। এর ফলে আমদানিকারক সিজনাল ব্যবসা হারিয়ে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এখানে বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(৪) ধারার অধীনে মামলা করা যাবে। গ্রাউন্ড হবে- "Time is of the essence in the contract" এবং ক্যারিয়ারের অযৌক্তিক বিলম্বের কারণে মুনাফা হারানো।

উদাহরণ (আকাশপথে রপ্তানি বিলম্ব):
প্রেক্ষাপট: একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইউরোপের বড়দিন (Christmas) উপলক্ষে বিশেষ পোশাক পাঠানোর জন্য একটি কার্গো এয়ারলাইন্সের সাথে চুক্তি করে। এয়ারলাইন্সের অব্যবস্থাপনার কারণে পণ্যটি বড়দিনের পর পৌঁছায়, ফলে বায়ার পণ্যটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।

মামলার কারণ: সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছাতে না পারায় রপ্তানিকারকের বিশাল বাণিজ্যিক ক্ষতি। এই ক্ষতির প্রতিকার চেয়ে ধারা ২(ঘ)(৪) এর অধীনে এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে।

উদাহরণ (ট্রেন বা মালবাহী ওয়াগনের বিলম্ব):
প্রেক্ষাপট: 'গ' সিমেন্ট ফ্যাক্টরি রেলপথের মাধ্যমে ৫০০ টন কয়লা পরিবহনের চুক্তি করে। রেলওয়ের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে কয়লা পৌঁছাতে ১৫ দিন দেরি হয়, যার ফলে ফ্যাক্টরির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং কোটি টাকা লোকসান হয়।

মামলার কারণ: পরিবহনে অন্যায্য বিলম্বের কারণে সৃষ্ট ব্যবসায়িক লোকসান।

সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ও জাহাজের অযোগ্যতা (Seaworthiness Disputes):
সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক সংশ্লেষ থাকে। এখানে “ক্যারিয়েজ অব গুডস বাই সি অ্যাক্ট, ১৯২৫” এবং হেগ-ভিসবি রুলস প্রযোজ্য হয় ।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ
জাহাজের সমুদ্র-অযোগ্যতা (Unseaworthiness): যাত্রার শুরুতে জাহাজটি যান্ত্রিকভাবে বা কাঠামোগতভাবে চলাচলের উপযোগী ছিল না ।

যথাযথ সংরক্ষণে ব্যর্থতা: জাহাজের হোল্ড (Hold) বা মালামাল রাখার স্থানটি পরিষ্কার বা নিরাপদ ছিল না।

ডিউ ডিলিজেন্স (Due Diligence) পালনে অবহেলা: জাহাজের মালিক জাহাজটিকে উপযুক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেননি ।

বাস্তব উদাহরণ
উদাহরণ: একটি রিফাইনারি কোম্পানি জাহাজযোগে ৩০,০০০ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। যাত্রাপথে জাহাজের ট্যাঙ্কারের তলদেশে ফাটল দেখা দেয় এবং ৫,০০০ টন তেল সাগরে মিশে যায়। তদন্তে দেখা যায়, জাহাজটির বার্ষিক সার্ভে বা পরীক্ষা ঠিকমতো করা হয়নি এবং এর কাঠামো অনেক পুরনো ছিল। এক্ষেত্রে তেল কোম্পানি বাণিজ্যিক আদালতে ২(ঘ)(৪) ধারার অধীনে মামলা করতে পারবে। প্রধান গ্রাউন্ড হবে জাহাজের মালিকের পক্ষ থেকে "Absolute Warranty of Seaworthiness" প্রদান না করা এবং যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণে চরম অবহেলা ।

বিপজ্জনক পণ্য এবং প্যাকিং সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Dangerous Goods & Packaging):
যদি পণ্য প্রেরক বিপজ্জনক পণ্য (যেমন- রাসায়নিক) সম্পর্কে বাহককে সঠিক তথ্য না দেয় বা ত্রুটিপূর্ণ প্যাকিং করে, যার ফলে বাহকের যানবাহন বা অন্য পণ্যের ক্ষতি হয়, তবে বাহক মামলা করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ (রাসায়নিক বিস্ফোরণে ট্রাকের ক্ষতি):
প্রেক্ষাপট: 'ঘ' কেমিক্যাল কোম্পানি সাধারণ সার হিসেবে একটি ট্রাকে করে দাহ্য রাসায়নিক পাঠাচ্ছিল। পথে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটে ট্রাকটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।

মামলার কারণ: বিপজ্জনক পণ্য সম্পর্কে তথ্য গোপন এবং ভুল ঘোষণার কারণে বাহকের সম্পদের ক্ষতি। ট্রাক মালিক পক্ষ 'ঘ' কেমিক্যাল কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।

দলিলাদি ও বিল অব ল্যাডিং সংক্রান্ত বিরোধ (Bill of Lading and Documentation):
বাণিজ্যিক দলিলাদি পণ্য পরিবহনের মালিকানা এবং চুক্তির প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। এই দলিলাদির অপব্যবহার বা ভুল ব্যাখ্যা বড় ধরনের বিরোধ সৃষ্টি করে।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ
দলিল ছাড়া ডেলিভারি (Delivery without B/L): ক্যারিয়ার যদি মূল বিল অব ল্যাডিং ছাড়াই অন্য কাউকে পণ্য বুঝিয়ে দেয় ।

ভুল বিবরণ (Mis-description): বি/এল-এ পণ্যের ওজন বা পরিমাণ যা লেখা আছে, বাস্তবে তার চেয়ে কম পাওয়া যাওয়া।

ইলেক্ট্রনিক দলিলের বৈধতা: ২০২৬ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী ডিজিটাল বিল অব ল্যাডিং-এর স্বীকৃতি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা ।

বাস্তব উদাহরণ
উদাহরণ: চট্টগ্রাম বন্দরে একটি বিদেশি জাহাজ ১০০০ টন ইস্পাত নিয়ে আসে। আমদানিকারক ব্যাংক থেকে এলসি (LC) রিলিজ করতে দেরি করায় মূল বিল অব ল্যাডিং তার হাতে ছিল না। কিন্তু শিপিং এজেন্ট স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর সাথে সখ্যতা থাকায় দলিল ছাড়াই তাকে পণ্য খালাস করার অনুমতি দেয়। এটি একটি গুরুতর বাণিজ্যিক অপরাধ। মূল আমদানিকারক বাণিজ্যিক আদালতে ক্যারিয়ার বা এজেন্টের বিরুদ্ধে ২(ঘ)(৪) ধারার অধীনে মামলা করবেন এই গ্রাউন্ডে যে, ক্যারিয়ার মালিকানা দলিল ছাড়াই মালামাল হস্তান্তর করে "Trust and Security" ভঙ্গ করেছে ।

এয়ার কার্গো ও মন্ট্রিল কনভেনশন সংক্রান্ত বিরোধ:
আকাশপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন আইন এবং আন্তর্জাতিক মন্ট্রিল কনভেনশন ১৯৯৯ এর সমন্বয় ঘটেছে ।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ
এসডিআর (SDR) ক্ষতিপূরণ দাবি: কেজি প্রতি নির্ধারিত স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ না দেওয়া ।

পণ্য নিখোঁজ হওয়া: এয়ারলাইন্সের গুদাম থেকে মালামাল চুরি হওয়া বা ট্রেস করতে না পারা।

প্যাকেজিং বিতর্ক: ক্যারিয়ারের দাবি যে পণ্যটি প্রেরক ভুলভাবে প্যাক করেছিলেন, বনাম প্রেরকের দাবি যে হ্যান্ডলিং-এর সময় ক্ষতি হয়েছে।

বাস্তব উদাহরণ
উদাহরণ: একটি আইটি কোম্পানি বিদেশ থেকে ৫০টি হাই-কনফিগারেশন সার্ভার আমদানি করে। বিমানবন্দরে হ্যান্ডলিং করার সময় ক্রেন থেকে পড়ে ৫টি সার্ভার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ সাধারণ ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলেও কোম্পানিটি মন্ট্রিল কনভেনশন এবং ২(ঘ)(৪) ধারার অধীনে পূর্ণাঙ্গ বাজারমূল্য ও ব্যবসায়িক ক্ষতি দাবি করে মামলা করতে পারে। গ্রাউন্ড হবে- "Proven negligence in cargo handling during international carriage" ।

বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর অধীনে বিশেষ আইনি কাঠামো
বাণিজ্যিক আদালত কেবল মামলা নেয় না, বরং এটি নিষ্পত্তির জন্য কিছু আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে যা পণ্য পরিবহন বিরোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক। নিচের টেবিলটিতে এই আইনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং পরিবহন মামলার ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োগ দেখানো হলো:

ধারা ৭: প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা: মামলা দায়েরের আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা । শিপিং ডেমারেজ বা ভাড়ার ছোট বিরোধগুলো কোর্টের বাইরে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হয়।

ধারা ৯: মামলা ব্যবস্থাপনা শুনানী: বিচারক ইস্যু গঠন এবং সাক্ষ্য গ্রহণের পরিকল্পনা করেন। পরিবহনের জটিল দলিলাদি (B/L, Invoice) শুরুতেই যাচাই করে মামলার গতি বাড়ানো হয়।

ধারা ১০: সংক্ষিপ্ত বিচার (Summary Judgment): যদি বিবাদীর কোনো বাস্তব ডিফেন্স না থাকে। যদি ক্যারিয়ার স্বীকার করে যে পণ্য হারিয়েছে, তবে দীর্ঘ বিচার ছাড়াই সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদেশ দেওয়া যায়।
৯০ দিনের সময়সীমা: চূড়ান্ত শুনানির পর ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি। পরিবহন ব্যবসায়ীদের ক্যাশ-ফ্লো বা মূলধন আটকে থাকা রোধ করে।

ধারা ১৪: প্রযুক্তি ব্যবহার: ই-ফাইলিং এবং ভার্চুয়াল শুনানি । বিদেশি জাহাজ মালিক বা এয়ারলাইন্সের সাথে দূরবর্তী শুনানি সম্ভব করে।

মাশুল, ভাড়া এবং লিয়েন (Lien) সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Freight and Charges):
পণ্য পরিবহনের ভাড়া (Freight charges), ডেমারেজ (Demurrage) বা অতিরিক্ত চার্জ নিয়ে বাহক এবং পণ্য মালিকের মধ্যে প্রায়ই বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরিবহনকারী অনেক সময় ভাড়া না পাওয়ার অজুহাতে মালামাল আটকে রাখে, যা লিয়েন বা ধারণাধিকার হিসেবে পরিচিত। এটি অনেক সময় অযৌক্তিক হলে বাণিজ্যিক বিরোধের জন্ম দেয়।

মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডসমূহ
অতিরিক্ত ভাড়া দাবি: চুক্তির বাইরে ডেমারেজ বা ডিটেনশন চার্জ দাবি করা।
বেআইনিভাবে পণ্য আটকে রাখা: ভাড়া পরিশোধ করার পরেও বিভিন্ন অজুহাতে পণ্য ডেলিভারি না দেওয়া।
নিলাম সংক্রান্ত বিরোধ: ভাড়া না পাওয়ার কারণে ক্যারিয়ার যদি মালিককে পর্যাপ্ত নোটিশ না দিয়ে পণ্য নিলামে তুলে দেয় ।

বাস্তব উদাহরণ
উদাহরণ: একটি ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানি একজন রপ্তানিকারকের গার্মেন্টস পণ্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর জন্য বুকিং নেয়। মাঝপথে তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে তারা অতিরিক্ত ৩০% ভাড়া দাবি করে এবং তা না দিলে পণ্য সিঙ্গাপুর বন্দরে নামাতে অস্বীকার করে। রপ্তানিকারক চুক্তির কপি নিয়ে বাণিজ্যিক আদালতে ২(ঘ)(৪) ধারার অধীনে মামলা করতে পারেন। গ্রাউন্ড হবে- "Arbitrary increase of freight in breach of signed contract" এবং পণ্যের ওপর বেআইনি জবরদখল ।

উদাহরণ (অতিরিক্ত ডেমারেজ দাবি):
প্রেক্ষাপট: একটি শিপিং এজেন্ট বন্দরে পণ্য আসার পর আমদানিকারকের কাছে চুক্তির বাইরের অতিরিক্ত গুদাম ভাড়া বা ডেমারেজ দাবি করে এবং টাকা না দিলে পণ্য খালাসের অনুমতি দিচ্ছে না।

মামলার কারণ: অন্যায্য ভাড়া দাবি এবং পণ্য আটকে রাখা। আমদানিকারক পণ্য অবমুক্ত করার আদেশ এবং অতিরিক্ত দাবি বাতিলের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

উদাহরণ (ভাড়া পরিশোধে অস্বীকৃতি):
প্রেক্ষাপট: একটি লজিস্টিক কোম্পানি সারা দেশে একটি কোম্পানির পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ সফলভাবে শেষ করে ইনভয়েস জমা দেয়। কিন্তু পণ্য মালিক কোম্পানিটি কোনো কারণ ছাড়াই চুক্তিকৃত ভাড়া পরিশোধে টালবাহানা করছে।

মামলার কারণ: সেবার বিনিময়ে পাওনা অর্থ আদায়। বাহক বা লজিস্টিক কোম্পানি ধারা ২(ঘ)(৪) অনুযায়ী মামলা করতে পারবে।

মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট এবং দায়বদ্ধতা (Multimodal Transport Disputes):
একটি পণ্য যখন সড়ক, রেল এবং জলপথ—সবগুলো মাধ্যমে পৌঁছায়, তখন কোনো এক পর্যায়ে সমস্যা হলে কার ওপর দায় বর্তাবে তা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।

বাস্তব উদাহরণ (ট্রান্সশিপমেন্টে পণ্য নিখোঁজ):
প্রেক্ষাপট: একটি থার্ড পার্টি লজিস্টিক (3PL) কোম্পানি চীন থেকে ঢাকা পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেয় (সমুদ্র ও সড়ক পথ মিলে)। কন্টেইনারটি সিঙ্গাপুরে ট্রান্সশিপমেন্টের সময় হারিয়ে যায়। লজিস্টিক কোম্পানি দায় নিতে অস্বীকার করে।

মামলার কারণ: পূর্ণাঙ্গ পরিবহন চুক্তির লঙ্ঘন। আমদানিকারক মূল লজিস্টিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ধারা ২(ঘ)(৪) এর অধীনে মামলা করতে পারবে।

উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৪) পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। সড়ক, জল, আকাশ বা রেলপথ—যে মাধ্যমেই হোক না কেন, পণ্যের নিরাপত্তা এবং সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করতে বাহক এবং প্রেরক উভয়ের ওপর আইনি দায়বদ্ধতা আরোপ করেছে এই ধারাটি। এর ফলে লজিস্টিক খাতে পেশাদারিত্ব বাড়বে এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা কমবে।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com