বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-০৩): পণ্য বা সেবার রপ্তানি বা আমদানি সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ ও প্রতিকার

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিল গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে 'বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬' এর ২(ঘ)(২) ধারা একটি বিশেষ আইনি কাঠামো প্রদান করে। এই ধারার অধীনে "পণ্য বা সেবার রপ্তানি বা আমদানি" (Export or import of merchandise or services) থেকে উদ্ভূত যেকোনো বিরোধকে বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্রস-বর্ডার বা আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তাবলি, পণ্যের মান বা মূল্য পরিশোধ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে এই ধারাটি অত্যন্ত কার্যকর। ধারা ২(ঘ)(২) এর অধীনে "পণ্য বা সেবা" শব্দদ্বয় দ্বারা বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় সকল উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে ‘পণ্য’ বা ‘মার্চেন্ডাইজ’ বলতে কেবল দৃশ্যমান বস্তু নয়, বরং কাঁচামাল থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তা পণ্য পর্যন্ত সবকিছুকে বোঝানো হয়েছে 。 অন্যদিকে, ‘সেবা’ বা ‘সার্ভিসেস’ বলতে আধুনিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি যেমন—আইটি সার্ভিস, ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স, কনসালটেন্সি এবং ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিংকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে

নিচে এই ধারার অধীনে সৃষ্ট বিরোধের ধরন এবং মামলা দায়েরের গ্রাউন্ডগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. ধারা ২(ঘ)(২) এর অধীনে সৃষ্ট প্রধান বাণিজ্যিক বিরোধসমূহ:
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে পণ্য (Merchandise) এবং সেবা (Services) উভয় ক্ষেত্রেই বিভিন্ন ধরনের বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। নিচে প্রতিটি বিরোধের নাম ও বাস্তব উদাহরণ দেওয়া হলো:

ক) পণ্য সরবরাহ বা হস্তান্তরে ব্যর্থতা ও বিলম্ব (Non-delivery or Delay in Delivery):
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে 'সময়' একটি অন্যতম প্রধান শর্ত। নির্ধারিত সময়ে পণ্য না পৌঁছালে আমদানিকারকের পুরো ব্যবসায়িক চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য শর্ত। শিপমেন্টে দেরি হওয়ার ফলে বায়ারের সিজন লস (Season Loss) হলে তারা বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ দাবি করে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (সিজনাল গুডস (Seasonal Goods)): পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে একটি বাংলাদেশী চেইন শপ চীন থেকে বিশেষ ধরণের পোশাক আমদানি করার চুক্তি করে। চুক্তিতে শর্ত ছিল যে ঈদের কমপক্ষে ৪৫ দিন আগে পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু সরবরাহকারী কোম্পানি জাহাজীকরণে দেরি করায় পণ্য ঈদের মাত্র ২ দিন আগে পৌঁছায়। ফলে আমদানিকারক সেই পণ্য বিক্রি করতে না পেরে বিশাল লোকসানের মুখে পড়েন। এই আর্থিক ক্ষতি ও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের বিরোধটি বাণিজ্যিক আদালতে নিষ্পত্তিযোগ্য।

বাস্তব উদাহরণ ২ (মৌসুমি পণ্য রপ্তানি): বাংলাদেশের একটি বড় গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান স্পেনের একটি ফ্যাশন হাউসের সাথে ১ লক্ষ পিস 'সামার কালেকশন' টি-শার্ট রপ্তানির চুক্তি করে। চুক্তিতে উল্লেখ ছিল যে, পণ্যগুলো এপ্রিলের মধ্যে মাদ্রিদ বন্দরে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির দোহাই দিয়ে রপ্তানিকারক জুন মাসে পণ্য পাঠায়। ততদিনে স্পেনে গরমের মৌসুম প্রায় শেষের দিকে, ফলে বায়ার পণ্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং এলসি-র টাকা পরিশোধ আটকে দেয়।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (কাঁচামাল আমদানি বিলম্ব): একটি অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্ট জাপান থেকে ১০০০টি ইঞ্জিনের অর্ডার দেয়। জাপানি সাপ্লায়ার সময়মতো ইঞ্জিন না পাঠানোয় বাংলাদেশে কারখানাটির উৎপাদন ৬ মাস বন্ধ থাকে। এর ফলে কারখানার বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয় এবং শ্রমিকদের বেতন দিতে হিমশিম খেতে হয়।

বাস্তব উদাহরণ ৪ (ডেমারেজ ও ডিটেনশন (Demurrage and Detention)): আমদানি পণ্য বন্দরে আসার পর ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারের গাফিলতির কারণে সঠিক সময়ে ডিও (Delivery Order) ইস্যু হয়নি। ফলে কন্টেইনারটি বন্দরে ২০ দিন অতিরিক্ত পড়ে থাকে এবং আমদানিকারককে বিশাল অংকের ডেমারেজ চার্জ দিতে হয়। এই অতিরিক্ত খরচ কে বহন করবে—আমদানিকারক নাকি লজিস্টিক কোম্পানি—তা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ এই ধারার অধীনে বিচার্য।

খ) পণ্যের মান, স্পেসিফিকেশন ও পরিমাণগত বিরোধ (Quality, Specification & Quantity):
পণ্যের কোয়ালিটি কন্ট্রোল বা সঠিক স্পেসিফিকেশন না থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অতি সাধারণ বিরোধ। রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যে সবচেয়ে সাধারণ বিরোধটি ঘটে যখন সরবরাহকৃত পণ্যের মান চুক্তিতে উল্লিখিত নমুনার সাথে মেলে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘ফিটনেস অফ গুডস’ বা পণ্যের উপযুক্ততা একটি মৌলিক শর্ত।

বাস্তব উদাহরণ ১ (মানের ভিন্নতা): একজন বাংলাদেশি আমদানিকারক ভিয়েতনাম থেকে 'গ্রেড-১' চাল আমদানির চুক্তি করেন। কিন্তু শিপমেন্ট আসার পর ল্যাব টেস্টে দেখা যায় চালগুলো 'গ্রেড-৩' মানের এবং সেগুলোতে আর্দ্রতার পরিমাণ চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি। মান নিয়ে এই অসামঞ্জস্যতা একটি বড় বাণিজ্যিক বিরোধ।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ভুল পণ্য বা কালার): একটি কোম্পানি নীল রঙের টেক্সটাইল ডাই (রং) আমদানির অর্ডার দিলেও রপ্তানিকারক ভুলবশত লাল রঙের রং পাঠায়। এই ভুল স্পেসিফিকেশনের কারণে আমদানিকারকের পুরো ডাইং প্রোসেস থমকে যায়।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (তৈরি পোশাক শিল্প (RMG Export)): বাংলাদেশের একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বায়ারের সাথে ১ লক্ষ পিস জিন্স প্যান্ট রপ্তানির চুক্তি করে। চুক্তিতে শর্ত ছিল যে কাপড়ের ঘনত্ব হবে ১২ আউন্স এবং রঙ হবে গাঢ় নীল। কিন্তু পণ্য পৌঁছানোর পর বায়ার পরীক্ষা করে দেখে যে কাপড়ের ঘনত্ব ১০ আউন্স এবং ফিনিশিং ত্রুটিপূর্ণ। বায়ার পুরো শিপমেন্ট গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং এলসি (LC) এর পেমেন্ট বন্ধ করে দেয়। এই ক্ষেত্রে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকের মধ্যে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়, তা ২(ঘ)(২) ধারার অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে বিচারযোগ্য।

বাস্তব উদাহরণ ২ (রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি (Chemical Import)): একটি বাংলাদেশী ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জার্মানি থেকে বিশেষ ধরণের কাঁচামাল (API) আমদানি করে। শর্ত ছিল যে কাঁচামালটির বিশুদ্ধতা হতে হবে ৯৯.৯%। কিন্তু ল্যাবরেটরি টেস্টে দেখা যায় বিশুদ্ধতা ৯৫% এর নিচে, যা ঔষধ তৈরির জন্য অনুপযুক্ত। আমদানিকারক পণ্যটি ফেরত দিতে চায় কিন্তু সরবরাহকারী পক্ষ দাবি করে যে শিপিংয়ের সময় পরিবেশগত কারণে মান পরিবর্তন হয়েছে। এই গুণগত মান সংক্রান্ত জটিলতা একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক বিরোধ

গ) মূল্য পরিশোধ ও বৈদেশিক মুদ্রার জটিলতা (Payment & Remittance Disputes):
পণ্য বা সেবা হস্তান্তরের পর মূল্য পরিশোধে অনীহা বা ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় জটিলতা থেকে এই বিরোধ তৈরি হয়।

বাস্তব উদাহরণ ১ (মূল্য পরিশোধে অস্বীকার): বাংলাদেশের একটি চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতালিতে ৫০০ জোড়া জুতা রপ্তানি করে। বায়ার পণ্যগুলো সফলভাবে বুঝে নেওয়ার পর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই পেমেন্ট দিতে গড়িমসি শুরু করে। এক্ষেত্রে রপ্তানিকারকের পাওনা টাকা আদায়ে আইনি বিরোধ তৈরি হয়।

বাস্তব উদাহরণ ২ (অতিরিক্ত চার্জ দাবি): একজন বিদেশি সাপ্লায়ার চুক্তিতে উল্লিখিত মূল্যের বাইরে হঠাৎ করে 'কারেন্সি ফ্ল্যাকচুয়েশন সারচার্জ' দাবি করে এবং সেই টাকা না দেওয়া পর্যন্ত শিপিং ডকুমেন্টস পাঠাতে অস্বীকার করে, ফলে আমদানিকারক বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে পারে না।

ঘ) পেমেন্ট ও ব্যাংকিং দলিলাদি সংক্রান্ত বিরোধ:
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মূলত দলিলাদির ওপর ভিত্তি করে চলে (Documents against Payment) এলসি বা ঋণপত্রের শর্ত পূরণ হওয়া সত্ত্বেও পেমেন্ট না পাওয়া বা দলিলাদিতে সূক্ষ্ম ত্রুটি দেখিয়ে পেমেন্ট আটকে রাখা একটি নিয়মিত বিরোধের কারণ।

বাস্তব উদাহরণ ১ (এলসি ডিসক্রিপেন্সি (LC Discrepancy)): একজন বাংলাদেশী রপ্তানিকারক ইতালিতে চামড়াজাত পণ্য পাঠালেন। তিনি ব্যাংকে সকল নথিপত্র জমা দিলেন। কিন্তু আমদানিকারক ব্যাংক দাবি করল যে প্যাকিং লিস্টে পণ্যের ওজন উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সামান্য টাইপিং ভুল আছে, যা ইউসিপি ৬০০ (UCP 600) এর সাথে সাংঘর্ষিক। এই অজুহাতে ব্যাংক পেমেন্ট আটকে দেয়, যদিও পণ্য ইতিমধ্যে আমদানিকারক গ্রহণ করেছেন। এই ধরণের ব্যাংকিং ও দলিলাদি সংক্রান্ত বিরোধ ২(ঘ)(২) ধারার আওতাভুক্ত।

বাস্তব উদাহরণ ২ (পেমেন্ট ডিফল্ট (Payment Default)): একটি জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। চুক্তিতে ছিল ৩০% অগ্রিম এবং বাকি ৭০% পণ্য গ্রহণের পর ক্যাশ অন ডেলিভারি। পণ্য বুঝে পাওয়ার পর বাংলাদেশী আমদানিকারক বিভিন্ন অজুহাতে বাকি ৭০% টাকা পরিশোধে গড়িমসি শুরু করে। জাপানি কোম্পানিটি তাদের পাওনা আদায়ের জন্য ধারা ২(ঘ)(২) এর অধীনে মামলা করতে পারে

ঙ) সেবা আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিরোধ (Service-based Disputes):
পণ্য ছাড়াও আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এবং কনসালটেন্সি সেবার আমদানি-রপ্তানি এই ধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে আইটি ও সফটওয়্যার সেবার রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে। ধারা ২(ঘ)(২) বিশেষভাবে ‘সেবা’শব্দটিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (আইটি সেবা রপ্তানি): বাংলাদেশের একটি সফটওয়্যার কোম্পানি অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাস্টমাইজড ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়। কাজ শেষ হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানিটি দাবি করে যে সফটওয়্যারে 'বাগ' (Bug) আছে এবং এই অজুহাতে তারা চুক্তির শেষ ৪০% পেমেন্ট আটকে দেয়।

বাস্তব উদাহরণ ২ (সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট (Software Export)): বাংলাদেশের একটি সফটওয়্যার কোম্পানি যুক্তরাজ্যের একটি ব্যাংকের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ তৈরি করার চুক্তি করে। চুক্তিতে কাজের বিভিন্ন পর্যায় বা ‘মাইলস্টোন’ অনুযায়ী পেমেন্টের কথা ছিল। কোম্পানিটি ৮০% কাজ শেষ করার পর ব্রিটিশ ব্যাংকটি দাবি করে যে ডিজাইনে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে এবং অতিরিক্ত পেমেন্ট দিতে তারা রাজি নয়। কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং পূর্ববর্তী কাজের পেমেন্ট আটকে যায়। এটি সেবার রপ্তানি সংক্রান্ত একটি আধুনিক বাণিজ্যিক বিরোধ।

বাস্তব উদাহরণ ৩ (আইটি আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং (IT Freelancing)): একজন বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সার অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানির ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ করেন। কাজ শেষে ইনভয়েস সাবমিট করা হলেও অস্ট্রেলীয় কোম্পানিটি পেমেন্ট পোর্টাল থেকে অর্থ ছাড় করছে না। সেবার বিনিময়ে পাওনা এই অর্থ আদায়ের জন্য ফ্রিল্যান্সার বাণিজ্যিক আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন

বাস্তব উদাহরণ ৪ (ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা আমদানি): একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরির জন্য জার্মানি থেকে কারিগরি নকশা আমদানি করা হয়। কিন্তু নকশা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় সেটি বাংলাদেশের মাটির গঠনের জন্য উপযুক্ত নয়। এই কারিগরি ত্রুটির কারণে সৃষ্ট বিশাল ক্ষতির দায়ভার নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়।


২. যেসব গ্রাউন্ডে/কারণে/ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(২) ধারার অধীনে মামলা দায়ের করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু আইনগত গ্রাউন্ড বা ভিত্তি থাকতে হয়। কেবল একটি ব্যবসায়িক লেনদেন হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং সেখানে আইনের দৃষ্টিতে নির্দিষ্ট কিছু বিচ্যুতি থাকতে হবে। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(২) ধারার অধীনে মামলা করার জন্য নিম্নলিখিত গ্রাউন্ড বা কারণগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

গ্রাউন্ড ১: পণ্য সরবরাহ বা ডেলিভারি সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Delivery of Merchandise):
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমদানিকারক বা রপ্তানিকারক যদি চুক্তিতে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, বা সম্পূর্ণ পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হয়, তবে তা এই গ্রাউন্ডের আওতায় পড়ে।

বাস্তব উদাহরণ (আমদানি বিলম্ব):
প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের 'মেঘনা প্লাস্টিকস' জার্মানির একটি কোম্পানির সাথে অত্যাধুনিক কারখানার যন্ত্রপাতি (Capital Machinery) আমদানির চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারি মাসের মধ্যে যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর কথা। কিন্তু জার্মান কোম্পানি মে মাস পার হয়ে গেলেও যন্ত্রপাতি পাঠায়নি। ফলে মেঘনা প্লাস্টিকস তাদের নতুন কারখানা চালু করতে না পেরে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মামলার কারণ: এখানে "পণ্যের আমদানি" চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে। মেঘনা প্লাস্টিকস ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ধারা ২(ঘ)(২) এর অধীনে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ (রপ্তানি ব্যর্থতা):
প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের 'সোনালী জুট মিলস' তুরস্কের এক ক্রেতার কাছে ৫০০ টন পাটজাত পণ্য রপ্তানির চুক্তি করে এবং ক্রেতার কাছ থেকে ২০% অগ্রিম মূল্য গ্রহণ করে। কিন্তু কাঁচামালের সংকটের অজুহাত দেখিয়ে সোনালী জুট মিলস পণ্য রপ্তানি করতে ব্যর্থ হয়।

মামলার কারণ: এটি "পণ্যের রপ্তানি" সংক্রান্ত একটি সরাসরি বিরোধ। তুরস্কের ক্রেতা তাদের অগ্রিম অর্থ ফেরত এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির জন্য বাংলাদেশের বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।

গ্রাউন্ড ২: পণ্যের মান ও পরিমাণগত ত্রুটি (Defects in Quality and Quantity of Goods)
চুক্তিতে যে মানের (Quality) এবং যে পরিমাণের (Quantity) পণ্যের কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে যদি তার চেয়ে নিম্নমানের বা কম পণ্য সরবরাহ করা হয়, তবে তা এই গ্রাউন্ডের অধীন একটি বড় ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধ।

বাস্তব উদাহরণ (রপ্তানি পণ্যের মান খারিজ):
প্রেক্ষাপট: 'ক' অ্যাপারেলস যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্র্যান্ডের কাছে ১ লক্ষ পিস টি-শার্ট রপ্তানি করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পৌঁছানোর পর বায়ার (Buyer) দেখতে পায় যে টি-শার্টের কাপড়ের মান চুক্তির নমুনার (Sample) সাথে মিল নেই এবং রঙ উঠে যাচ্ছে। বায়ার সম্পূর্ণ চালান (Shipment) বাতিল করে দেয়।

মামলার কারণ: এটি "রপ্তানি পণ্যের মান" সংক্রান্ত বিরোধ। বায়ার ক্ষতিপূরণ চেয়ে অথবা 'ক' অ্যাপারেলস তাদের পাওনা টাকা চেয়ে এই ধারার অধীনে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ (আমদানি পণ্যের পরিমাণগত ঘাটতি):
প্রেক্ষাপট: 'খ' ট্রেডার্স কানাদা থেকে ৫০ হাজার টন গম আমদানি করে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করার সময় দেখা যায় যে সেখানে মাত্র ৪৫ হাজার টন গম রয়েছে। বাকি ৫ হাজার টন গম সরবরাহকারী পাঠায়নি।

মামলার কারণ: "আমদানি পণ্যের পরিমাণগত ঘাটতি" নিয়ে বিরোধ। 'খ' ট্রেডার্স বাকি ৫ হাজার টন গমের মূল্য ফেরত পেতে সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

গ্রাউন্ড ৩: সেবার রপ্তানি বা আমদানি সংক্রান্ত বিরোধ (Disputes over Export/Import of Services)
বর্তমান যুগে শুধু দৃশ্যমান পণ্যই নয়, বরং অদৃশ্য সেবা (যেমন- সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, আইটি সাপোর্ট, ফ্রিল্যান্সিং, ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি, বিপিও) ব্যাপকভাবে আমদানি-রপ্তানি হয়। এই সেবা সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তিভঙ্গ এই ধারার অন্তর্ভুক্ত।

বাস্তব উদাহরণ (আইটি সেবার রপ্তানি মূল্য না পাওয়া):
প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের আইটি ফার্ম 'গ' টেকনোলজিস যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালের জন্য একটি কাস্টমাইজড ইআরপি (ERP) সফটওয়্যার ডেভেলপ করে দেয় (যা সেবার রপ্তানি)। সফটওয়্যার বুঝিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি অনুযায়ী বাকি ৬০% পেমেন্ট দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

মামলার কারণ: এটি "সেবার রপ্তানি" (Export of Services) সংক্রান্ত বিরোধ। পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য 'গ' টেকনোলজিস ধারা ২(ঘ)(২) অনুযায়ী মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ (বিদেশি কনসালটেন্সি সেবার ত্রুটি):
প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ সরকার বা একটি দেশীয় প্রাইভেট কোম্পানি একটি মেগা স্ট্রাকচার ডিজাইনের জন্য সিঙ্গাপুরের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মকে কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয় (সেবা আমদানি)। সিঙ্গাপুরের ফার্মটি যে ডিজাইন দেয়, তা দেশের মাটির প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না, যার ফলে পাইলট প্রজেক্ট ধসে পড়ে।

মামলার কারণ: এটি "সেবার আমদানি" (Import of Services) এর ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ সেবাদানের বিরোধ। দেশীয় কোম্পানিটি ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে দ্বারস্থ হতে পারবে।

গ্রাউন্ড ৪: চুক্তির শর্ত ভঙ্গ ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ (Breach of Contract & Liquidated Damages):
যখন কোনো পক্ষ চুক্তির মৌলিক শর্ত (যেমন- পণ্যের মান বা সময়) লঙ্ঘন করে এবং এর ফলে অন্য পক্ষের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়। যখন চুক্তির কোনো এক পক্ষ এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ভঙ্গ করে যার ফলে চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই পণ্ড হয়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ মামলা দায়ের করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ: একটি বাংলাদেশী পাওয়ার প্লান্ট জার্মানি থেকে টারবাইন আমদানি করার চুক্তি করে। চুক্তিতে শর্ত ছিল টারবাইনটি সম্পূর্ণ নতুন হতে হবে। কিন্তু পণ্য পাওয়ার পর দেখা গেল সরবরাহকারী পক্ষ একটি পুরনো এবং রিকন্ডিশন্ড টারবাইন পাঠিয়েছে। এখানে চুক্তির ‘মৌলিক শর্ত’ লঙ্ঘিত হয়েছে এবং আমদানিকারক এই গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে প্রতিকার চাইতে পারেন

বাস্তব উদাহরণ: আপনি ভারত থেকে ৩০০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির চুক্তি করলেন এবং ৩০% অগ্রিম দিলেন। কিন্তু ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাপ্লায়ার আপনাকে না পাঠিয়ে অন্য দেশে বেশি দামে বিক্রি করে দিল। আপনি আপনার হারানো লাভ এবং ব্যবসার ক্ষতির জন্য "চুক্তিভঙ্গ" ও "ক্ষতিপূরণ" চেয়ে মামলা করতে পারেন।

গ্রাউন্ড ৫: বকেয়া মূল্য বা পাওনা আদায় (Recovery of Unpaid Price):
পণ্য বা সেবা দেওয়ার পর ক্রেতা যদি চুক্তিমতো অর্থ পরিশোধ না করে।

বাস্তব উদাহরণ: আপনি বিদেশি ক্লায়েন্টকে ডেটা এন্ট্রি বা বিপিও সেবা দিয়েছেন। ক্লায়েন্ট আপনার সেবা ভোগ করছে কিন্তু ইনভয়েসের পাওনা ডলার দিচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে "সুনির্দিষ্ট বকেয়া পাওনা আদায়ের" গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করা যায়।

গ্রাউন্ড ৬: প্রতারণা, জালিয়াতি ও মিথ্যা বর্ণনা (Fraud, Misrepresentation or Deceit):
আমদানি-রপ্তানির আড়ালে যদি ফাঁকা কন্টেইনার পাঠানো হয় বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে এলসি ভাঙানোর চেষ্টা করা হয়। রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যে যদি এক পক্ষ অন্য পক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য অসত্য তথ্য প্রদান করে বা জালিয়াতির আশ্রয় নেয়, তবে তা মামলা দায়েরের একটি শক্তিশালী গ্রাউন্ড।

বাস্তব উদাহরণ: একজন আমদানিকারক ভারত থেকে ১০,০০০ টন প্রিমিয়াম বাসমতি চাল আমদানির অর্ডার দেন। সরবরাহকারী পক্ষ চালের বস্তার ওপর ‘বা্সমতি’ লেবেল লাগালেও ভেতরে সাধারণ মানের চাল সরবরাহ করে। আমদানিকারক যখন দলিলাদি দেখে বিশ্বাস করে পেমেন্ট দিয়েছিলেন, তখন তিনি প্রতারিত হয়েছেন। এই ‘মিসরিপ্রেজেন্টেশন’ বা মিথ্যা বর্ণনার গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করা সম্ভব

বাস্তব উদাহরণ: আপনি আমেরিকা থেকে কম্পিউটার প্রসেসর আমদানির জন্য এলসি খুললেন। কিন্তু বন্দরে কন্টেইনার খুলে দেখা গেল সেখানে প্রসেসরের বদলে সস্তা ভাঙা কাঁচ। রপ্তানিকারক ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার আগেই আপনি "জালিয়াতির" গ্রাউন্ডে জরুরি ভিত্তিতে পেমেন্ট বন্ধের (Stay Order/Injunction) মামলা করতে পারেন।

গ্রাউন্ড ৭: Fiduciary Duty বা বিশ্বাসভঙ্গ (Breach of Fiduciary Duty): 
বাণিজ্যে অনেক সময় এজেন্ট বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়। যদি এই প্রতিনিধি নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য মক্কেলের ক্ষতি করে, তবে এই গ্রাউন্ডে মামলা করা যায়।

বাস্তব উদাহরণ: একটি বাংলাদেশী টেক্সটাইল মিল তুলা আমদানির জন্য তুরস্কে একজন এজেন্ট নিয়োগ করে। এজেন্ট সরবরাহকারী কোম্পানির সাথে যোগসাজশ করে বাজার দরের চেয়ে ২০% বেশি দাম ধরে ইনভয়েস তৈরি করায় এবং অতিরিক্ত টাকা নিজে আত্মসাৎ করে। আমদানিকারক এই বিশ্বাসভঙ্গ বা ‘ব্রিচ অফ ফিডুসিয়ারি ডিউটি’ এর কারণে এজেন্টের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারেন

গ্রাউন্ড ৮: সেবার মানহীনতা ও অবহেলা (Deficiency in Service & Negligence):
আমদানিকৃত সেবা যদি চুক্তির ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ না করে বা অবহেলার কারণে ক্ষতি হয়।

বাস্তব উদাহরণ: আপনি একটি বিদেশি কার্গো শিপিং লাইন থেকে সেবা কিনলেন যেন তারা আপনার ঔষধ সঠিক তাপমাত্রায় পরিবহন করে। কিন্তু তাদের রেফ্রিজারেশন সিস্টেমে অবহেলার কারণে সব ঔষধ নষ্ট হয়ে গেল। এই "সেবার মানহীনতার" গ্রাউন্ডে আপনি মামলা দায়ের করতে পারবেন।

গ্রাউন্ড ৯: চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকারিতা (Specific Performance of Contract):
যখন শুধু টাকা দিয়ে ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়, বরং চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সেই পণ্য বা সেবাটিই পাওয়া অপরিহার্য।

বাস্তব উদাহরণ: আপনি একটি বিশেষায়িত ক্যানসার নিরাময়কারী পেটেন্ট করা ঔষধ আমদানির একমাত্র পরিবেশক। বিদেশি কোম্পানিটি চুক্তি সত্ত্বেও আপনাকে সরবরাহ না করে কালোবাজারে দাম বাড়াচ্ছে। আপনি আদালতকে বলতে পারেন যেন সাপ্লায়ারকে চুক্তি অনুযায়ী "সুনির্দিষ্টভাবে পণ্য সরবরাহে" বাধ্য করা হয়।

গ্রাউন্ড ১০: মেধা স্বত্ব ও লাইসেন্সিং সংক্রান্ত বিরোধ (IP and Licensing Disputes): 
বিশেষ করে সেবা ও প্রযুক্তির রপ্তানি-আমদানিতে মেধা স্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রাউন্ড।

বাস্তব উদাহরণ: একটি আমেরিকান সফটওয়্যার কোম্পানি তাদের একটি বিশেষ ডিজাইন টুল বাংলাদেশের একটি আইটি ফার্মকে ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স প্রদান করে। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশী ফার্মটি সেই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে থাকে এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করে। আমেরিকান কোম্পানিটি ২(ঘ)(২) ধারার অধীনে লাইসেন্সিং চুক্তি লঙ্ঘনের গ্রাউন্ডে মামলা দায়ের করতে পারে।

গ্রাউন্ড ১১: ইনকোটর্মস (Incoterms) এবং ঝুঁকির দায়ভার স্থানান্তর সংক্রান্ত বিরোধ: 
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য শিপিংয়ের সময় ঝুঁকি কার ওপর থাকবে তা ইনকোটর্মস দ্বারা নির্ধারিত হয়। এই শর্তাবলীর ভুল ব্যাখ্যা মামলার একটি প্রধান কারণ।

বাস্তব উদাহরণ: একটি সিআইএফ (CIF - Cost, Insurance, and Freight) চুক্তির অধীনে সিঙ্গাপুর থেকে পণ্য বাংলাদেশে আসার পথে জাহাজডুবি হয়ে পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। বিক্রেতা দাবি করেন যে তিনি পণ্য জাহাজে তুলে দিয়েছেন এবং বীমা করেছেন, তাই তার দায়িত্ব শেষ। ক্রেতা দাবি করেন যে পণ্য তার হাতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ঝুঁকি বিক্রেতার। এই ধরণের ‘ঝুঁকি স্থানান্তর’ (Passing of Risk) সংক্রান্ত আইনি ব্যাখ্যা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায়

গ্রাউন্ড ১২: দলিলের ভুল ব্যাখ্যা (Misinterpretation of Documents):
ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট বা ইনকোটার্মস (Incoterms)-এর ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ।

বাস্তব উদাহরণ: চুক্তিতে 'FOB' (Free On Board) শর্ত ছিল, কিন্তু সাপ্লায়ার 'CIF' (Cost, Insurance, and Freight) অনুযায়ী শিপিং চার্জ দাবি করছে। এই দলিলাদির "ভুল ব্যাখ্যার" গ্রাউন্ডে আদালত থেকে সঠিক ব্যাখ্যা ও ঘোষণা (Declaration) চাওয়ার মামলা করা যায়।

১৩. ইনকোটার্মস (Incoterms) এবং পরিবহন শর্তের লঙ্ঘন (Breach of Shipping & Incoterms)
পণ্য আমদানি বা রপ্তানির সময় পরিবহন, বীমা এবং ঝুঁকি কার ঘাড়ে থাকবে, তা নির্ধারণের জন্য 'FOB', 'CIF', 'EXW' ইত্যাদি আন্তর্জাতিক শর্ত বা ইনকোটার্মস ব্যবহৃত হয়। এই শর্তগুলো লঙ্ঘিত হলে মামলা করা যায়।

বাস্তব উদাহরণ (CIF চুক্তিতে বীমা না করা):
প্রেক্ষাপট: 'ঘ' ইমপোর্টার্স চীন থেকে CIF (Cost, Insurance, and Freight) শর্তে ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানি করে। CIF শর্ত অনুযায়ী বিক্রেতার দায়িত্ব ছিল পণ্যের মেরিন ইনস্যুরেন্স করা। কিন্তু জাহাজ সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে কিছু পণ্য নষ্ট হয়। পরে জানা যায়, চীনা বিক্রেতা ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম জমা দেয়নি, ফলে 'ঘ' ইমপোর্টার্স বীমা দাবি থেকে বঞ্চিত হয়।

মামলার কারণ: "আমদানি চুক্তির শর্ত (Incoterms) লঙ্ঘন"। চীনা বিক্রেতার দায়িত্ব অবহেলার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পূরণের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করা যাবে।

বাস্তব উদাহরণ (FOB চুক্তিতে ক্রেতার ব্যর্থতা):
প্রেক্ষাপট: 'ঙ' লেদার গুডস ইতালির বায়ারের কাছে FOB (Free On Board) শর্তে চামড়া রপ্তানির চুক্তি করে। শর্ত অনুযায়ী বায়ার জাহাজ পাঠাবে এবং 'ঙ' কোম্পানি শুধু বন্দরে পণ্য পৌঁছে দেবে। 'ঙ' কোম্পানি সঠিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য নিয়ে যায়, কিন্তু বায়ারের জাহাজ ১ মাস দেরিতে আসে। এই ১ মাস বন্দরে পণ্য রাখার গুদাম ভাড়া (Demurrage) 'ঙ' কোম্পানিকে দিতে হয়।

মামলার কারণ: বায়ারের পরিবহন শর্ত লঙ্ঘনের কারণে "রপ্তানিকারকের আর্থিক ক্ষতি"। 'ঙ' কোম্পানি এই গুদাম ভাড়ার টাকা বায়ারের কাছ থেকে আদায় করার জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।

উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(২) ধারাটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকিগুলো আইনগতভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ করে দিয়েছে। পণ্য ও সেবার আমদানি-রপ্তানির প্রতিটি ধাপ—চুক্তি স্বাক্ষর থেকে শুরু করে মূল্য পরিশোধ পর্যন্ত—এখন এই ধারার অধীনে সুরক্ষা পাবে। বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(২) ধারায় পণ্য ও সেবার আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিরোধগুলোকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা এখন একটি সুনির্দিষ্ট, দ্রুত এবং বিশেষায়িত আইনি কাঠামোর অধীনে তাদের পাওনা আদায় ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে পারবেন। সঠিক গ্রাউন্ডে মামলা দায়েরের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের অধিকার ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারবেন। 


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com